ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব: ০১)

দেখার মাঝে

রিকশা থেকে নেমে অদিতির মন খারাপ হয়ে গেল। পুরো পাড়া অন্ধকারে ডুবে আছে। তাদের এখানে লোডশেডিং নতুন কোনো সমস্যা না। কিন্তু আজকের মতো এমনটা হয়নি কখনো। দুই হাত দূরের কাউকে দেখা যাচ্ছে না। 
-অদিতি দাঁড়াও।

আনিসকে মজিদের হোটেলের ভেতর থেকে বের হতে দেখে অদিতি দাঁড়িয়ে যায়। 

-এই কাজটা কেন করেন আনিস ভাই? আমাকে দেখলেই ডাক দেন। 
-আজ ডাকার বিশেষ কারণ আছে। মজিদের আজকের চা-টা ফার্স্ট ক্লাসেরও ওপরে। তুমি যদি এক কাপ চা খেতে আমার খুব ভালো লাগত। একা অমৃত পানে আনন্দ নাই। তার চেয়ে বড় কথা পাঁচ টাকায় অমৃত আর কোথাও মিলবে না।
-আমি হোটেলের চা খাই না। 
-হোটেলের চায়ে তোমার কোনো অনীহা নেই। অনীহা আছে আমার প্রতি। ঠিক আছে তুমি যাও।
-আপনি চা নিয়ে আসুন। আমি এখানে দাঁড়িয়েই চা খাব।

অদিতি চায়ে চুমুক দিয়ে বিস্মিত হয়ে গেল। এটা সত্যিই অমৃত। 
-একটা কলা খাও অদিতি। এখানকার কলা খুব মিষ্টি। মেডিসিন নাই। মজিদের কাছে মেডিসিন টেস্ট করার মেশিন আছে।
-আমি কলা খেলে আপনার লাভ? এটা নিয়ে কবিতা লিখবেন? কবিতার নাম কী হবে? অদিতি কলা খায়?
হতেও পারে। নাম কোনো সমস্যা না। হোয়াটস ইন এ নেইম? অদিতি কলা খায়- নামটা খারাপ না। এ নাম দিলে কেমন হয়?
-যা খুশি তা নাম দিন। 
-তুমি আমার দেখা বিরল বুদ্ধিমতীদের একজন। অথচ কবিতা তোমার ভালো লাগে না। এটা একটা বিস্ময়।

বিরল বুদ্ধিমতীদের ভালোলাগাটাও হয় বিরল। এটাও একটা বিস্ময়।
তোমার চায়ের বিল আমি দিয়ে দেব। মজিদকে বলছি লিখে রাখতে। দশ বিশ টাকার ব্যাপার। কেউ বাকি রাখে না; কিন্তু আজ পকেট একদম খালি। কাল অবশ্য ভরে যাবে। পকেট খালি হতে যেমন সময় লাগে না ভরতেও সময় লাগে না।

বিল কত হয়েছে সেটা বলুন।
-তোমার আমার মিলে পঁচিশ টাকা। আমি দু’কাপ চা আর একটা কলা খেয়েছি। কলা খাওয়ার জন্য দুঃখিত।
-টাকাটা ধরুন।
-রাগ করলে?
-হ্যাঁ, আপনি পঁচিশ টাকার জন্য একগাদা কথা বলেছেন।
-কথা এক জিনিস, নিয়ন্ত্রণে থাকতেই চায় না। বুঝলে অদিতি, মানুষ সব কিছ্রু ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। কিন্তু নিজের কথার ওপর নিতে পারেনি। ইটস এ ট্র্যাজেডি।
-আপনার মোবাইল ফোনের টর্চটা জ্বালান। আমাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিন।
-আমার মোবাইল ফোন নেই। নো প্রবলেম। তুমি আমার পেছনে হাঁটতে থাক। আমি তোমাকে বাসার গেট পর্যন্ত পৌঁছে দেব। 

অদিতি চায়ের কাপ হাতে শিলার পড়ার টেবিল লাগোয়া খাটটিতে বসল। শিলা তার ছোট বোন। এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। এ মুহূর্তে সে গভীর মনোযোগের সঙ্গে কী যেন পড়ছে। সে তার পড়া শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
-আপা, বাসার পরিস্থিতি কিন্তু ভালো না।
-কেন? কী হয়েছে?
-বাবা একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে। তার ধারণা এটা কোনো সাধারণ স্বপ্ন না? সে তিনজন স্বপ্ন বিশারদের সঙ্গে কথা বলেছে। তৃতীয় জনের ব্যাখ্যা শোনার পর থেকেই বাবার মন খারাপ।

সন্ধ্যার পরের সময়টা কবি সাহিত্যিকদের তেমন পছন্দের সময় না। এ সময়টাতে আনিস বিষণ্ন থাকে। এমন অনেকবার হয়েছে সে সন্ধ্যার সময় খাতা কলম নিয়ে বসেছে। মাথার মধ্যে কবিতার প্লট। কিন্তু কবিতা লেখা হলো না। আজ ঘুটঘুটে অন্ধকারে সে কবিতা লিখে ফেলেছে। কবিতার নাম ‘অদিতি কলা খায়’।

অদিতি শিলার বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে। সে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। 
-আপা, নে ধর।
-কী ধরব?
-কবিতা, পড়ে নম্বর দে। আনিস ভাই বাইরে উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার উৎকণ্ঠার অবসান ঘটা।
-তুই পড়। আমি শুনছি।
শিলা পড়তে শুরু করে।
অদিতি কলা খায়
তাতে কী-ইবা আসে যায়।
বাড়ির পথটি হারিয়ে ফেলে
এদিক ওদিক চায়।

এসব কী লিখেছে আপা? কবিতার মধ্যে কলা কেন? পড়তে বিশ্রী লাগছে। এ কবিতা পাস করানো যায় না। 
-একশতে বত্রিশ দিয়ে ফেল করিয়ে দে। 

শিলা কবিতার কাগজটি আনিসের হাতে দেয়। তারপর বিনীত স্বরে বলে, সরি আনিস ভাই। কবিতা পাস করেনি।
-কেন? সমস্যা কোথায়?
-সমস্যা হচ্ছে কলা।
-সমস্যা হচ্ছে কলা মানে? কলাতে অদিতির কোনো সমস্যা থাকার কথা না। সি লাইকস বানানা। 
-আমি মিথ্যা বলি না এটা কিন্তু আপনি ভালো করে জানেন। 

অদিতির বাবা মীর মোশাররফ হোসেন বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করতেন। বছর চারেক আগে রিটায়ার্ড করেছেন। তার এ মুহূর্তের ব্যস্ততা ঘুমের মধ্যে দেখা এক অদ্ভুত স্বপ্ন নিয়ে। স্বপ্নটা এরকম- সে পুকুর ঘাটে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছে। বড়শি ফেলে বসে আছে মাছের অপেক্ষায়। হঠাৎ ছিপে তীব্র টান। পারলে তাকে টেনে পুকুরের মধ্যে ফেলে। সে কোনো রকমে নিজেকে সামলায়। একটা সময় সেই জল দানবকে টেনে তুলতে সক্ষম হয়। তারপর তাকিয়ে দেখে বড়শিতে আটকে আছে একটা মরা মাঝারি সাইজের কাতল মাছ। স্বপ্নটা দেখার পর থেকেই সে অস্থির। এটা কোনো সাধারণ স্বপ্ন না। সে তার স্ত্রীকে স্বপ্ন সম্পর্কে জানায়। তার স্ত্রী ফরিদা খাতুন সব শুনে বলে, মাছ মরা হইলে রশি ধইরা টান দিল কে? 
-রশি ধরে টান দিল কে এ প্রশ্ন কেন আসছে? মরা মাছের বিষয়টা নিয়ে বল। মরা মাছ দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে?
-কী কইরা বলি? কিছুই তো বুঝতেছি না।

সে উৎকণ্ঠা নিয়ে হোমিও ডাক্তার বজলুর রশিদের চেম্বারে হাজির হয়। পুরো স্বপ্নটা বজলুর রশিদকে অবহিত করে। সব শুনে সে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবে। তারপর হতাশা নিয়ে বলে, এই স্বপ্নের কোনো ব্যাখ্যা নেই। জ্যান্ত মাছ ধরতে পারলে ব্যাখ্যা দিতাম। 

আনিস তার স্বপ্নের দুইটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক তুলে ধরে। একটি- বড়শিতে টান, অপরটি-মরা কাতল মাছ। বড়শির তীব্র টান তাকে পুকুরে ফেলে দিচ্ছিল-এর অর্থ মোশাররফ সাহেব পরিবারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবেন। মরা কাতল মাছের ব্যাখ্যা-সে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে তবে কোনো একজনের জীবনের বিনিময়ে। আনিসের এ ব্যাখ্যা তাকে ভীষণভাবে অস্থির করে তোলে। 

রাত ১০টার দিকে অদিতি তার বাবার ঘরে যায়। তাকে দেখে সে শোয়া থেকে উঠে বসে। 
-বাবা, তোমার স্বপ্নটা বলার মতো হলে বলতে পার।

মোশাররফ সাহেব সতর্কতার সঙ্গে স্বপ্নের বর্ণনা দেয়। 
-বেশ মজার স্বপ্ন।
-এর মধ্যে মজা পেলি কোথায়?
-পুরোটাই মজা। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ইভেন্ট হলো তোমাকে টেনে পানির মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। আমার তো এ দৃশ্য দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে।

আমি পানিতে পড়ে যাচ্ছি এ দৃশ্য দেখতে তোর ভালো লাগছে একথা তুই বলতে পারলি?
-সমস্যা কী বাবা? তুমি তো সাঁতার জানো।
-এই স্বপ্নের ইশারা কী?
-কোনো ইশারা নেই।
-তুই ধরতে পারিসনি সেটা বল। আনিস কিন্তু ধরে ফেলেছে। তার ব্যাখ্যাটা বলছি। মন দিয়ে শোন।
-আনিস ভাইর কথা ছাড় তো। যে নিজে সমস্যায় থাকে সে অন্যের জীবনেও সমস্যা খুঁজে বেড়ায়।
-তুই সত্যি বলছিস?
-হ্যাঁ, এবার তুমি ঘুমাও। 

অদিতি নিজের ঘরে চলে আসে। তার মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করছে। আনিসকে নিয়ে সে অশোভন কিছু কথা বলে ফেলেছে। আনিস এরকম মানুষ না। (চলবে)

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //