বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ, মাটি, সাহিত্য, কবিতা আর গান নবনির্মাণের স্বপ্ন অনুধাবন করেছিলেন। তিনি বাংলার মাটি, ফুল, ফল, পাখি ও প্রকৃতিকে ভালোবেসে স্বাধীন- বাংলাদেশ নির্মাণ করেছেন। প্রকৃতির সঙ্গে এ সম্পর্ক নির্মিত হয়েছে টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর জন্মসূত্রে। নদীবিধৌত বাংলার প্রকৃতি, মানুষ তাঁর মানসগঠনের অপরিহার্য উপাদান তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে বাংলাদেশ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু অবিচ্ছেদ্য। 

উল্লেখ্য, এ বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী স্মরণে মুজিববর্ষ পালিত হচ্ছে। তাঁকে আমরা যেভাবে জেনেছি বা জানতে চেষ্টা করছি, তা কিন্তু ক্ষমতাকেন্দ্রিক বয়ান থেকে নয়। এদেশের ইতিহাসের উপাদান, চিহ্নগুলো আমাদের নিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ও কর্মের কাছে। কোনো কৃত্রিম বয়ান বা চাপানো ব্যবস্থা এবং ইতিহাস দিয়ে তাঁকে আমরা দেখি না বা মূল্যায়ন করি না। আমাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধুকে জানা-বোঝার চেষ্টা করছি। বাঙালি, বাংলাদেশ ও আমাদের স্বাধীনসত্তার পরিচিতিতে আলোকময় কেন্দ্র হলেন বঙ্গবন্ধু। 

প্রসঙ্গত, আদিকাল থেকেই মানবচরিত্র বৈপরীত্য সন্ধানী ও লোভী। কিন্তু ওই মানবসভ্যতারই নানা আয়োজন মানুষকে ইতিহাসচেতনার কাঠামোতে রূপায়ণের চেষ্টা করছে। এর বহুমাত্রিক প্রচেষ্টায় মানুষের মধ্যে নিয়ম, শৃঙ্খলা, দায়, শ্রম ও মেধার অধিকারে কল্যাণকেন্দ্রিক ভাবনা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এ কারণে মানুষ নেতৃত্ব মানে এবং সমাজ ও রাষ্ট্র মানে। লক্ষণীয়, কোনো কোনো ক্রান্তিকালে একদল নেতিবাচক ব্যক্তি, দল-গোষ্ঠীর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি বা কোনোভাবেই সমরূপ দেওয়া যায় না এমন ব্যক্তিকে নায়ক বানানো এবং রূপদানের চেষ্টা ও তৎপরতা দেখেছি। ওই তৎপরতায় সক্রিয় এ গোষ্ঠী সোজা যে অপরাধ করল- তারা এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করল। মিথ্যে ও অপরাধকর্মের সিরিজে অংশ নিতে হলো তাদের। তারা বোঝাতে চেষ্টা করে যে, বঙ্গবন্ধু বলে গুরুত্বপূর্ণ কেউ এখানে ছিলেন না। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর কোনো অবদান নেই। তিনি না কি পাকিস্তানে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেছিলেন! এ মূর্খতা, অপচেষ্টা, অপরাধ যে টেকসই হবে না, তা এ নির্বোধগোষ্ঠী বুঝতে পারেনি। মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা করলেও এ প্রকৃতি কখনো বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করবে না। কারণ, বঙ্গবন্ধু অবশেষে শুধুই বাঙালির, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা নন, তিনি বিশ্বের নিপীড়িত মানুষেরই কণ্ঠস্বর ও প্রতিনিধি। 

তার স্মরণে প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন থাকবে ও পালন করা হবে, এটাই সত্য। আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মাধ্যমে স্মরণ করা হবে নাম ও কর্ম। তবে মানতেই হবে যে, বঙ্গবন্ধুকে স্মরণের জন্য অনুষ্ঠানের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে আছে মানুষের মনোজগৎ। এ কারণে অনেক চেষ্টা করেও বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা যায়নি। সাধারণ মানুষ রাজনীতি, দলাদলির বাইরে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে। এখানেই বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসার মূল শক্তি নিহিত। এটা সবাই জানেন যে, বঙ্গবন্ধু ব্যতিত এ জাতিকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়ার মতো অন্য কেউ ছিল না। এদেশে অনেক নেতার জন্ম হয়েছে, কিন্তু জনগণের মানসচেতনাকে বঙ্গবন্ধুর মতো অনেকেই বুঝেননি। তবে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁদের সবার প্রতিই আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সাল এবং মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ছাড়া তৈরি হতো না, এটাই সত্য। তাঁর ডাকেই গোটা বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং যুদ্ধ করেছে।

স্মরণীয় যে, আমরা কত নির্মমতায় আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছি ১৯৭৫ সালে। কী এক বিশ্বাসঘাতকতায় কালিমাময় নিজেকে এ জাতির অস্তিত্বে যুক্ত করে নিয়েছি। না হলে বাংলাদেশ ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হতো এখন। শুধু তাঁকে স্মরণ করে কথা বলাবলি, বক্তৃতা, বিবৃতির মাধ্যমেই তাঁর ঋণ শোধ করা যাবে না। আমাদের অস্তিত্ব যিনি নির্মাণ করেছেন, এদেশের কারণেই আমি, আমরা। তাঁর ঋণ শোধ সম্ভব নয়। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করা যায়, শোধ করা যায় না। আবার এদেশের আলো-বাতাসে বসবাস করেও তাঁর নাম উচ্চারণ করে না অনেকে, ঋণ স্বীকার তো দূরে থাক। ভিন্ন রাজনীতি, ভিন্ন মত থাকাটাই গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য। এ ব্যবধান গণতন্ত্রের জন্যই। তাই বলে জাতীয় প্রশ্নে ভিন্নমত? দেশ ও জাতির প্রতিষ্ঠাতাকে অস্বীকার- এটা কোন ধরনের রাজনীতি ও সংস্কৃতি, তা আমাদের বোধে আসে না। স্বাধীন দেশে বসবাস করে ওই স্বাধীনতার স্থপতিকে স্বীকার না করা বিস্ময়কর অপরাধও বটে। এসব বিরোধীরা একবারও কি ভেবে দেখেছে যে, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কারণেই তাদের বাংলাদেশে অবস্থান এবং এ মাটিতে রাজনীতি ও সংস্কতিচর্চা করছে। আবার দেশপ্রেমের নানামুখী কথাও এরা বলে। অস্বীকারের মনোভঙ্গি যে আমরা সমূলে বুঝি না, তা নয়। 

এ সূত্রে আরও কিছু কথা বলা প্রয়োজন বলে মনে করি। দেশ-কাল-সমাজ, আবহাওয়া, জলবায়ু অর্থাৎ, পারিপার্শ্বিক অবস্থার বাইরে গিয়ে জীবন যাপন করা যায়, অস্বীকার করা যায় না। এ ভারতীয় উপমহাদেশে কাল পরিক্রমণে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। এর মধ্যেই মানুষের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এ উপমহাদেশে অঞ্চলভেদে ভিন্নতা থাকলেও মূল বৈশিষ্ট্য হলো- লোকজ ও আধ্যাত্ম্য। ফলে সব অঞ্চলেই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়- ভাববাদ। এর সঙ্গে আরও বিষয়াবলি যুক্ত হতে থাকে সময়ের তালে তালে। এ ভূখণ্ডে সাধারণ মানুষ ও প্রাচীনকালের রাষ্ট্রহীন শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব বহমান ছিল। স্বার্থ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, বর্ণদ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই, ভাষার দ্বন্দ্ব ইত্যাদির কারণে এখানে বিরোধ ছিলই। এর ফলে লোকায়ত মানুষের বৈশিষ্ট্য ধ্বংস হতে হতে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু ধর্মের জন্ম হয়। পর্যায়ক্রমে কিছু গৌণধর্মেরও উৎপত্তি হয়। ভাষা, বিশ্বাস, জীবনাচরণ এসবের দ্বান্দ্বিক আবহাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় আরও কিছু বৈশিষ্ট্য। 

বাইরে থেকে যে সব ভালো কিছু এসেছে, তা নয়। এ সবই ক্ষমতা ও লুটপাট বাণিজ্য সম্পর্কের বিষয়াবলি। ক্ষমতা ও শক্তির কাছে সাধারণ মানুষ এক সময় হার মানে জীবনের ভয়ে। ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে কেটেছে এ উপমহাদেশের বহু প্রজন্ম। শুধু ভালো থেকেছে যারা সুবিধাবাদী ও ক্ষমতার কাছাকাছি ছিল। চলমান দর্শন, চিন্তা, ক্ষমতার দম্ভ ধীরে ধীরে উপমহাদেশের মানুষের বৈশিষ্ট্য পাল্টে দেয়। মানুষ এসব ক্ষমতার জয় পরাজয়, শোষণ, শাসন দেখেছে। ক্ষমতার মধ্যে থাকা মানুষের অভ্যন্তরীণ সংঘাত দেখেছে। লুটপাটের ধরন দেখেছে। পুরো ভারত উপমহাদেশে মানুষ কোনো কাঠামোবদ্ধ জীবনে ছিল না বলে তারা এসব সংঘাত ও সংঘর্ষের ভাব বুঝেনি। শুধুই দেখেছে আর হা হুতাশ করেছে। এখানে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও এদেশের সাধারণ মানুষ কোনো লুটপাট ও শক্তিকে প্রতিরোধ করতে পারেনি। এখনো এর কারণ উদ্ধার করা যায়নি স্পষ্ট করে। যদি প্রতিরোধ হতো, তা হলে উপমহাদেশের আজকের ইতিহাস অন্যভাবে বলতে হতো। বঙ্গবন্ধু বাঙালির বহমানতার এ ইতিহাস জেনে নিয়ে সেভাবেই নিজেকে নির্মাণ করেছিলেন। 

এ যে ক্রম পরিবর্তনের ধাপ ও সূত্র তা না বুঝলে, বঙ্গবন্ধুকে বোঝা যাবে না। বাংলার স্বর বুঝেছিলেন বলেই তিনি এদেশের গণমানুষের মুক্তির নেতা হয়ে উঠেছিলেন। এ অর্থে তিনি বাঙালির, বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু হয়েও হলেন সারাবিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর- বিশ্ববন্ধু।

স্বপন নাথ

কবি ও লেখক

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh