সোনালি আঁশের সোনালি অতীত ও দিশাহীন ভবিষ্যৎ

(শেষ পর্ব)

বাংলাদেশের সোনালি আঁশকে দিশাহীন পথে তথা অবলুপ্তির দিকে টেনে নিয়ে যেতে আমাদের দেশের সব সরকারগুলোই কাজ করেছে। কেন তারা এ কাজ করছে তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোর পরামর্শে কাজ করা, অবৈধভাবে ক্ষমতায় থাকার অন্যায় লোভ, অপাঙক্তেয় দুর্নীতি, দেশ ও জনবান্ধবহীন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ইত্যাদিই সুস্পষ্ট প্রতিফলন। 

কে না জানে যে ভূমণ্ডলের বিপজ্জনক উষ্ণতা বৃদ্ধি, পরিবেশ বিপর্যয়, প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ বিনাশের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে পরিবেশবান্ধব পাটকে সরিয়ে বিকল্প হিসেবে পরিবেশ-বিনাশী প্লাস্টিক, পলিমার ব্যবহার করা। 

পাটকে এ দেশের আর্থিক উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী মৌলিক টেকসই সম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে না দেয়া তথাকথিত ধনীদেশগুলোর ‘সাম্রাজ্যবাদী’ অপকৈাশল। আর মজার বিষয় হলো এ অপকর্মের ফলে সবার সাথে ‘সাম্রাজ্যবাদী’ ধনীদেশগুলোকেও কিন্তু ভুগতে হচ্ছে। তবে বিশ্ববিপর্যয়ে দায়ী রাষ্ট্রসমূহের সাথে বাংলাদেশও যুক্ত। বলা যায় পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি না করে, পাট থেকে নানা ধরনের ব্যবহার্য দ্রব্যাদি না বানিয়ে, আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ না করে, পুরনো মিলগুলোকে ভেঙে নবায়ন-সংস্কার না করে, মিলের অবাধ দুর্নীতি বন্ধ না করে পাটশিল্প ধ্বংস করা হয়েছে। 

ক্ষমতায় থাকার অবৈধ পন্থা অবলম্বনের পথ হিসেবে শ্রমিক সংগঠনগুলোকে অবৈধ-অনৈতিকভাবে ব্যবহার করে একটি জাতির, একটি দেশের অভাবনীয় মূল্যবান সম্পদকে নিশ্চিহ্ন করার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। পাট ও পাট জাতের কোনো উন্নয়ন যেন আর না হয় এই লক্ষ্যেই সোনালি আঁশের ভাণ্ডারকে লুটেরা পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। লুটেরা পুজিপতিরা পাটের দখলে থাকা সব স্থাবর, অস্থাবর সম্পদ, জায়গা যেন লুটেপুটে খায়। এভাবে সরকার চাহিদা কমিয়ে পাট উৎপাদন হ্রাস করার মাধ্যমে ধনীদেশগুলোর দ্বারা তৈরি বিকল্প দ্রব্যের বিকাশ ও বাণিজ্য বৃদ্ধি চায়। এসবই পরিকল্পিত। তৃতীয়বিশ্ব ভুক্ত কোনো দেশে পাটের মতো মূল্যবান কোনো সম্পদের বর্ণাঢ্য উপস্থিতি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো পছন্দ করে না। 

এটি আগেও বিধৃত হয়েছে যে বিশ্বে বাংলাদেশ দ্বিতীয় পাট উৎপাদনকারী দেশ ও ভারত শীর্ষ পাট উৎপাদনকারী। ২০১০ সালের হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বে মোট পাট উৎপাদনের ৩০ শতাংশ উৎপাদন করে যার সর্বমোট ৪০ শতাংশ কাঁচা পাট হিসেবে রফতানি করে। 

বাংলাদেশে পাট প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে চিহ্নিত। সারাদেশের জমিই পাট উৎপাদন সহায়ক। তবে অঞ্চল বা এলাকা ভেদে জমির ওপর নির্ভর করে পাটের গুণাগুণের তারতম্য হয়। বাংলাদেশের মোট আবাদযোগ্য কৃষিজমির ৪.১৪ শতাংশ অংশে মাত্র পাট চাষ করা হয় এবং এ থেকেই কাঁচা পাট ও পাটজাত দ্রব্যাদি রফতানি করে দেশে উপার্জিত মোট বৈদেশিক মুদ্রার ১৬ শতাংশ অর্থ আয় করে। বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে পাট খাত অর্থনীতিতে এক বিরাট অবদান রাখে। ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ বছরে ২৪ লাখ বেল কাঁচা পাট রফতানি করে, যার আর্থিক মূল্যমান দাঁড়ায় ৯৭৭ কোটি টাকা। পাটের আয় কয়েক বছরে ক্রমবর্ধনশীল হিসেবে প্রতিফলিত। আমরা দেখছি ২০০৯ ইংরেজি সালে সামগ্রিকভাবে পাট ও পাটজাত দ্রব্যাদি রফতানি করে ২০১২.৫ কোটি টাকা আয় হয়েছিল তা ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২৯৩৯.৫ কোটি টাকা। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জিডিপিতে এই কয়বছরে পাট খাতের অবদান গড়ে ১.৩ শতাংশ। বাংলাদেশে গড়ে ১১ লাখ খানা পাটচাষ ও উৎপাদনে জড়িত। এবং পাটজাত দ্রব্যাদি নির্মাণে ৩ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে পাট ও পাটজাত দ্রব্যাদি চাহিদা পায় ৭.৫০ লাখ টন। যা অচিরেই প্রায় ১৫ লাখ টনে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলিত। যেখানে বাংলাদেশ একক দেশ হিসেবে প্রায় ৪.৬০ লাখ টন পাট ও পাটজাত দ্রব্যাদি সরবরাহ করতে পারে। এর নিগূঢ় অর্থ দাঁড়ায় বাংলাদেশ বিশ্ব বাজারের পাট ও পাটজাত দ্রব্যাদির ৬২ শতাংশ সরবরাহকারী হিসেবে দখলে রেখেছে। বাংলাদেশে ৬০ লাখ বেল কাঁচা পাট উৎপাদন হয় ৩২ লাখ বেল সরকারি ও বেসরকারি মিলে মোট ১৪৮টি জুটমিলে ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশ পাটের ওপর নির্ভর করেই তার অর্থনীতিকে অনেকদূর নিয়ে যেতে পারে। RCA হলো তুলনামূলক একটি চিত্র, যা বলে দেবে স্বল্প খরচে কোন কোন পণ্য নিজ দেশে উৎপাদন করে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সম্ভব। প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কোনো কৃষিপণ্য স্বল্পখরচে দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদন করার বিষয়টি এক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়। এটি পরিমাপ করতে ব্যবহার করা হয় RCA স্কোর। আর সেই মানদণ্ডে দেশে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এখন পাট। বাংলাদেশের কৃষিপণ্য বিবেচনায় RCA স্কোরশিটটি নিচে দেয়া হলো।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। কোনো পণ্য যদি RCA-তে বর্ণিত স্কোর ১.০০ থেকে বেশি হলে পণ্যটি প্রতিযোগী দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। সেটি দেশে উৎপাদন করার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে পাটের আরসিএ মান ৪৮৮। দেশে গত বছর প্রায় ৮৬ লাখ বেল পাটের উৎপাদন হয়েছে। এ ছাড়া পাট ও পাটজাতীয় পণ্যের মাধ্যমে রফতানি আয় হয়েছে ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার। RCA মান বেশি থাকায় দেশে আরো বেশি বেশি পাটের উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে অধিক সুবিধা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। কৃষিজ অন্যান্য যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে আরসিএ মান ভালো, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সরিষা, রসুন, তিল ও তুলা। পাশাপাশি মাছ, মসলা, তামাক, পালংশাক, পেঁপে, আলু ও মরিচেরও ভালো অবস্থান রয়েছে।

আমাদের দেশের একটি বড় সুবিধা হলো ইচ্ছে করলেই সব উৎপাদন করতে পারি। আমাদের আবহাওয়া ও মাটি সেটিকে সাপোর্ট করে। তবে কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো ও শস্যের বহুমুখীকরণে অবশ্যই বাণিজ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দিতে হবে। যে পণ্যটি বেশি সুবিধা দেবে সেটি দেশেই উৎপাদনে নজর দিতে হবে। 

তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে যেটি কম সুবিধা দেবে, সে শস্য উৎপাদন বাড়ানোর অর্থ হলো কৃষককে কার্যকর সুবিধা দিতে পারা যাবে না। কৃষিপণ্যের তুলনামূলক সুবিধা একটি পরিবর্তনশীল বিষয়। তার জন্য একটি কার্যকর জঈঅ তালিকা থাকা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে নতুন কোনো পণ্য দেশে উৎপাদন করতে গেলে নীতি ও কৌশল নির্ধারণে সহায়ক হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি, জ্ঞান ও উপকরণ সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা যাবে।

১৮১৭ সালে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ডেভিড রিকার্ডো রিলেটিভ কমপারেটিভ অ্যাডভানটেজ তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্বটি প্রথম প্রবর্তন করেন, যার মূল বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানির চেয়ে দেশে উৎপাদন করে যে সব পণ্য বেশী বেশি লাভবান হওয়া যাবে, সে পণ্য দেশেই উৎপাদন করা। যেটি কম লাভ দেবে, সে পণ্য প্রতিযোগী দেশে উৎপাদনের জন্য ছেড়ে দেয়া। আর এভাবেই দুটি দেশ দুটি পণ্য উৎপাদন ও বাণিজ্য করে তুলনামূলক সুবিধা পাবে। তখন দুই দেশের মধ্যে একটি পণ্য উৎপাদন অন্য পণ্যটি আমদানির মাধ্যমে ব্যয়ের সাশ্রয় ও দক্ষতা অর্জন করবে। দুটি দেশের দুটি পণ্যের পরিপ্রেক্ষিত তৈরিকৃত এ তত্ত্বটি জনপ্রিয় RCA মানদণ্ডে পরিমাপ করা হয়। আমরা দেখলাম বাংলাদেশ আরসিএ মানে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে কলা, দুধ, আঙ্গুর, তিসি। এছাড়া যব, কপি ও ব্রকলি, সয়াবিন, লেবু ও আদার মান নিম্ন সারিতে রয়েছে। এসব কৃষিজ পণ্যে RCA মান শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম। ১ শতাংশের নিচে রয়েছে বেশ কিছু কৃষিজ পণ্য। এর মধ্যে পেঁপেতে শূন্য দশমিক ৯৩, আলুতে শূন্য দশমিক ৭৫, মরিচে শূন্য দশমিক ৭১। ফলে বাণিজ্য সুবিধায় পিছিয়ে রয়েছে এসব কৃষিজ পণ্য।

সব কৃষিজ পণ্য একই সঙ্গে উৎপাদনের প্রয়োজন নেই। কৃষকের কাছে জোর করে কোনো পণ্য উৎপাদন বাড়াতে গেলে দক্ষতার পরিচয় হবে না। এক্ষেত্রে শস্যের উৎপাদন খরচ, প্রয়োজনীয়তা ও বাণিজ্যেও তুলনামূলক সুবিধা বিশ্লেষণ জরুরি। পাশাপাশি ভূপ্রাকৃতিক গঠন, বাজারদর, আবহাওয়া উপযোগিতা ও মাটির কার্যকারিতা বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। বাণিজ্যিক ও রফতানিমুখী কৃষি এগিয়ে নিতে শস্য আবাদে বহুমুখীকরণে জোর দিতে হলে অবশ্যই বাণিজ্য সুবিধাকে বিবেচনায় নিতে হবে। RCA মানে ভালো অবস্থানে থাকা অন্যান্য কৃষিজ পণ্যের মধ্যে সরিষা ও রসুনে স্কোর ১০ দশমিক ৫২। এছাড়া তিলে ৪ দশমিক ৮২, তুলায় ২ দশমিক ৩৪ ও মাছে ২ দশমিক ১৮। এছাড়া মসলায় ১ দশমিক ৫৪, তামাকে ১ দশমিক ২৬, পালংশাকে ১ দশমিক শূন্য ৪। এসব পণ্য আমদানি না করে দেশেই উৎপাদনে নজর দিলে দেশের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। পাশাপাশি উৎপাদন প্রক্রিয়া হবে দক্ষ ও কার্যকর। কৃষিজ পণ্যের আমদানি প্রতি বছরই বাড়ছে। গত অর্থবছরে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি করতে হয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে তুলা। গত অর্থবছরে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার তুলা আমদানি করতে হয়েছে। এছাড়া তেল ও মসলা জাতীয় পণ্যেও আমদানিও বাড়ছে। এসব পণ্য দেশে উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।

স্পষ্টতই এটি বোধগম্য যে RCA মান দেখে যেকোনো দেশপ্রেমিক লোক এটি বলতে বাধ্য হবে যে আমরা শুধু পাটের উৎপাদন বাড়াবোই না, পাটকে কেন্দ্র করে এদেশে একটি কর্মযজ্ঞ সৃষ্টি করবো। পাটকেন্দ্রিক একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে কর্মকৌশল বাস্তবায়ন করে এগিয়ে গেলে এদেশ বিশ্বের অন্যতম ধনী স্বচ্ছল দেশ হিসেবে দাঁড়িয়ে যেত; কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারকরা দেশ কাদের হাতে তুলে দিয়ে এমন অঘোরে ঘুমাচ্ছে? আমরা কেমন দুর্ভাগা দেশের নাগরিক তা কি ভেবে দেখেছেন? আমাদের ভাবনা আসে নীতিনির্ধারকরা জঈঅ বুঝতে চায় না হয়তো এ কারণে যে তাহলে তো বিদেশিদের স্বার্থ আর রক্ষা করতে পারবে না। বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকদের কয়েকটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও নীতিশিক্ষা দিতে পারেন। প্রথমত, দেশপ্রেম, সততা, নিষ্ঠা ও জনবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি। দ্বিতীয়ত, পাট তন্তুটি কি, পরিবেশবান্ধব দ্রব্য কাকে বলে, জঈঅ মানে কী, সাধারণ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ কী ও উৎপাদন-সরবরাহ নীতি ও বৈশিষ্ট্য। 

নীতিনির্ধারকরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এগুলো বোঝাতে পারলে নিশ্চয়ই তারা পাটকলগুলোকে আর বিজাতীয়করণ করতো না, আমাদের দেশ ও গণমানুষের অর্থাভাবে এতো মানবেতর জীবন পালন করতে হতো না। দেশ প্রকৃত অর্থে স্বচ্ছল ও স্বয়ম্ভর হয়ে উঠত।

লেখক : জ্বালানি বিশেষজ্ঞ

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh