করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং পহেলা বৈশাখ

দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব মহামরি করোনার লকডাউনের মধ্যে বাঙালির নববর্ষ পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হবে। 

উৎসব মানেই আনন্দ, সমবেত হওয়া, রঙিন পোশাকে ও রঙে সাজিয়ে তোলা। আমাদের প্রাত্যহিক একঘেয়ে জীবনের মধ্যে উৎসব কিছুটা পরিবর্তন নিয়ে আসে। আমরা আবার নতুন করে চলতে শুরু করি। তাই জাতীয় জীবনে উৎসবের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই; কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশসহ সারাবিশ্ব এমন এক সংকট মোকবেলা করছে- যা অতীত ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। 

করোনার মতো এক মড়কের সঙ্গে জাতি আজ টিকে থাকার লড়াই করছে। আর এই লড়াই বিচ্ছিন্নতার, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার, একা গৃহবন্দি থাকার। ফলে সমবেত হওয়ার মতো সব ধরনের অনুষ্ঠানের বাহ্যিকতা এবার পরিহার করতে আমরা বাধ্য হবো। অতীত উৎসবের স্মৃতি রোমন্থন আর ভবিষ্যৎ উৎসবের পরিকল্পনা এবারে বৈশাখের মূল প্রতিপাদ্য হতে পারে। ঘরে বসে সহবাসীদের সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কিংবা ডিজিটাল ভ্রমণের মাধ্যমেও গতবারের মতো এবারও পহেলা বৈশাখ উদযাপনের নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাঙালির পরিচয় ঘটতে পারে। 

মানবজীবনে যতই বিপর্যয় নেমে আসুক, কালচক্র পরিক্রমে সময় যথারীতি নতুন করে হাজির হবে। পহেলা বৈশাখও প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে আমাদের মনকে দোলা দিয়ে যাবে। আমরা হয়তো বর্ণাঢ্য বৈশাখী সাজে বাইরে মিলিত হতে পারব না; পরস্পরকে জড়িয়ে ধরতে পারব না; কিন্তু উৎসবের বিয়োগান্তু আনন্দ আমাদের ঘিরে 

থাকবে। পৃথিবীর অধিকাংশ উৎসবের সঙ্গে থাকে একটি বেদনা বিসর্জনের সম্পর্ক। জাতীয় বেদনাই আমাদের একসূত্রে গেঁথে রাখে। যদিও বাংলা নববর্ষের উৎপত্তির সঙ্গে কোনো বিষাদময় ঘটনা ছিল কি-না আমরা তা বলতে পারব না। তবে এটা ঠিক, এদেশের কৃষকরা তাদের ঘামে ও শ্রমে উৎপাদিত ফসল পণ্য রাজকোষে খাজনা আকারে বিসর্জন দেওয়ার মাধ্যমে এই উৎসবের অংশীদার হয়েছে। সে দিক দিয়ে এই উৎসব যেমন রাজার, তেমনি এই উৎসব প্রজারও।

এ কথা বহুল আলোচিত যে, খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য মোগল স¤্রাট আকবর বাংলাবর্ষের সূচনা করেন। আকবরের রাজদরবারের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজী এই বাংলা বর্ষের সূচনা করেছিলেন। চন্দ্রের হ্রাস বৃদ্ধির ওপর নির্ভরতার সময় গণনার হিসাব বাদ দিয়ে সূর্যের আহ্নিক গতিকে গ্রহণ করা হয়েছিল। চাঁদের হিসাবে মাস গণনা করতে গেলে প্রকৃতির হিসাবের গরমিল ঘটে। বছরের মাস ও দিনগুলোর বিপর্যয় ঘটে। এই বছরে বর্ষাকালে বৃষ্টি হলো, তো অন্য বছরে শীত। তবে একই সঙ্গে এই বাংলাবর্ষ মুসলমানের চাঁদের আরবি সন ও সৌর পদ্ধতির নিদর্শন হয়ে আছে। যেমন বর্তমানে বাংলা সৌর বছর গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির নিয়মে চললেও, এটি যিশু খ্রিষ্টের সঙ্গে যুক্ত বছর গণনাকে অনুসরণ না করে হিজরি সনের উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আকবরের আমলে চলতি হিজরি সন অক্ষুণ্ন রেখে বাংলা সাল গণনা শুরু হয়। তাছাড়া এই সনটি আকবরের সিংহাসন আরোহনের বছরকে স্মরণীয় করার জন্য প্রবর্তিত সাল ১৫৮৫ থেকে কিছুটা পেছনে গিয়ে ১৫৫৬ থেকে শুরু করা হয়। একই সঙ্গে এটি আরবিয় চন্দ্রসন, সৌর বছর গণনার রীতি ও আকবরের সিংহাসন আরোহনের ইতিহাস ধারণ করেছে। ফসল দিয়ে খাজনা পরিশোধ করা হতো বলে বাংলাবর্ষকে ফসলি সনও বলা হয়। 

গ্রাম ও শহরের মধ্যেও এই দিনটি পালনে কিছুটা ঐতিহ্যগত পার্থক্য দেখা যায়। বিশেষ করে শহুরে বৈশাখে অনিবার্য সংযোজন সকালের পান্তা-ইলিশ- সেটিও হালের সৃষ্টি। কয়েক দশক আগেও বৈশাখের অনুষ্ঠানের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের কোনো সম্পর্ক ছিল না। যেহেতু শহুরে বাঙালি- যাদের গ্রামীণ ও কৃষিজীবনের সঙ্গে সম্পর্কের ছেদ ঘটেছে, সেহেতু তারা নিজেদের শ্রেণি অবস্থান ঠিক রেখে নানা উপাচারের মাধ্যমে পূর্ব-পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকতে চায়। সে-দিক থেকে পহেলা বৈশাখ একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক ধারার উৎসব হিসেবে আজ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। উত্তর-উপনিবেশিকতার একটি লক্ষণ- কোনো কারণে কিংবা বহির্দেশীয় হস্তক্ষেপে একদিন যে সম্পর্কের শিকড়চ্যুতি ঘটেছিল, তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জাতীয় প্রচেষ্টা। বাঙালি পূর্বপুরুষের খাদ্যাভাস, তৈজসপত্র, কৃষিপ্রযুক্ত, শিল্পবোধ, পোশাকের অভ্যাসের সঙ্গে এ দিনে যুক্ত হতে চেষ্টা করা হয়; কিন্তু সেখানে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়, তারই বিবর্তিত অবশিষ্টাংশে সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার প্রচেষ্টাই আধুনিক বাঙালিয়ানা। তবে সংশ্লেষের পথে যতই বাধা থাক, পহেলা বৈশাখ আজ বাঙালির নিজস্ব উৎসবে, যার উত্তরাধিকার কেবল বাঙালির।

তবে আজকের বৈশাখের অনুষ্ঠানমালার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করপোরেট সংস্কৃতি। বাণিজ্যের প্রয়োজনে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্যের বাজারজাত করণের স্বার্থে চলে মনোহারি বিজ্ঞাপন, বাজার দখলের লড়াই। দুই ঈদের পরে সবচেয়ে বেশি টাকার বাণিজ্য হয়ে থাকে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে। ঈদের মতো পহেলা বৈশাখেও সরকারিভাবে চালু করা হয়েছে উৎসবভাতা (কিছু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে)। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চলে সারা বছরব্যাপী উৎসব সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন। বিশেষ করে দেশি তাঁতের শাড়ি, বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পোশাক শিল্প, মৃৎশিল্প, গ্রাফিক্স শিল্প, শোরুমগুলো- পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র্র করে তাদের প্রস্ততি নিতে থাকে; কিন্তু এবার বিশ^ব্যাপী করোনাভাইরাসের ফলে ইতিমধ্যেই এই শিল্প লোকসানি খাতে পরিণত হয়েছে। বিগত কয়েক দশক ধরে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার কোটি টাকার যে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, এ বছরেও করোনা মহামারিতে তার ধস নামার সম্ভাবনা রয়েছে। 

তবে সময় একরকম যায় না। হয়তো শিগগিরি এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। ফিরে আসবে কর্মময় উৎসব মুখর দিন; কিন্তু এবারের বৈশাখ জাতীয় জীবনে যে বার্তা নিয়ে এসেছে তা উপেক্ষা করলে চলবে না। এবারের বাংলা নববর্ষ আত্মোপলব্ধির নববর্ষ। গ্রামীণ জীবনকে আমরা উন্নত না করে শহর জীবনের গাদাগাদি বসবাসও বর্তমান সংকটের জন্য দায়ী। মানুষ আজ প্রকৃতির অংশ না হয়ে প্রকৃতির প্রভু হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

জাতি হিসাবে বাঙালির যেমন অর্জন আছে তেমন সংকীর্ণ স্বার্থবুদ্ধি ও উঞ্ছবৃত্তিরও অভাব নেই। আজ এই কঠিন সময়ে আসা বাঙালির নিজস্ব উৎসব পহেলা বৈশাখে দিনে সেসব ভাবার সুযোগ এসেছে। অতীতের ভুল ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে খুলতে হবে পরিশুদ্ধ নতুন হালখাতা। যাতে আমরা স্বার্থপরতার বিপরীতে পরার্থপরতা, ব্যস্টিক চেতনার বদলে সামষ্টিক চেতনা, কৃত্রিমতার পরিবর্তে প্রকৃতির সাধনা করতে পারি।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh