বাংলা বর্ষবরণ নিয়ে বিভ্রান্তি

আকবর বাংলা সনের প্রবর্তক, এটি বাংলা নববর্ষ নিয়ে প্রচলিত একটি মস্তবড় কুসংস্কার। আকবর পহেলা বৈশাখ বা বাংলা বর্ষপঞ্জি চালু করেননি। 

এই ক্ষেত্রে তার ভূমিকা প্রবর্তকের নয়, বরং আগে থেকেই চালু স্থানীয় কৃষিভিত্তিক বর্ষপঞ্জিকে তিনি বিজ্ঞচিতভাবে গ্রহণ করেছিলেন। এটার সবচেয়ে বড় প্রমাণ আকবর বাদশার হুকুমতের বাইরের থাইল্যান্ড-মিয়ানমার-কম্বোডিয়া-লাওস-শ্রীলঙ্কাসহ বিশাল একটি অঞ্চলের অনেক ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠী কাছাকাছি সময়ে নববর্ষ পালন করে, সে সব অনুষ্ঠিত হয় মধ্য এপ্রিলেই। 

নিশ্চিতভাবেই এটি ভারতীয় পুরনো কোনো কৃষি সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা, হয়তো এর সঙ্গে বৌদ্ধ কিংবা তারও আগের ব্রাহ্মণ্য সভ্যতার বিস্তারের ফল এসব। এর কারণ বহু অঞ্চলে এই সংক্রান্ত নামগুলোর সঙ্গে সংস্কৃত পরিভাষার সম্পর্ক থাকা, যেমন সংক্রান্তি। আরো মজার বিষয় হলো, এই সময়টিতে নববর্ষ পালন করা জনপদগুলোর মাঝে যারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, তাদের বড় অংশেই থেরবাদী। বাংলাদেশেরও বর্তমানে অস্তিত্বশীল বৌদ্ধ সম্প্রদায় থেরবাদী, যদিও একসময় অন্য মতাদর্শের বৌদ্ধধর্মও এই অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। এছাড়া বেলুচিস্তান, তামিলনাড়ু, উড়িষ্যা ও বাংলাদেশে বসবাস করা হিন্দু ও মুসলমান উভয় জনগোষ্ঠীর মানুষও এই সময়ে নববর্ষ পালন করেন। 

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে আকবরের একটি যোগসূত্র অবশ্য আছে, যেটি আগেই বলা হয়েছে। আকবরের আমলে যেটি করা হয়েছিল, তা হলো এই সৌরবর্ষপঞ্জিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা, কেননা তা কৃষিবর্ষের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে খাজনা আদায়ের জন্য সুবিধাজনক। চান্দ্র বর্ষে ১০ দিন করে কম থাকে বলে ঋতু ঠিক থাকে না, তাই আদিম যাযাবর জনগোষ্ঠী চান্দ্রবর্ষ ব্যবহার করলেও সৌরবর্ষ ছাড়া কোনো কৃষি সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে না। কেননা কৃষিকাজের জন্য চাই ঋতু বিষয়ে সুনির্দিষ্ট জ্ঞান; বছর ও মাস নির্ণয় ছাড়া কোনো সভ্যতাই পাকাপোক্ত হয় না; লেনদেন সম্ভব হয় না। এই কারণেই প্রাচীন কৃষি সভ্যতাগুলোতেই সৌর নববর্ষের উৎপত্তি হয়েছিল, যেমন- মিশর, ব্যাবিলন ইত্যাদি। 

অন্যদিকে প্রাককৃষি সভ্যতায় একদিকে সূর্যের স্থান নির্ণয় করার প্রযুক্তিগত নিখুঁত জ্ঞান বিকশিত হয়নি। ফলে যাযাবর বা পশুপালকদের ঋতুবিষয়ক জ্ঞানের প্রয়োজন হলেও, তারা সেটি পারিপার্শ্বিক আর সব লক্ষণ দেখেই বিচার করাটা রপ্ত করেছিল। এ কারণেই আমরা বহু সভ্যতাতেই দেখতে পাব, প্রাচীন উৎসবের হিসাবগুলো চান্দ্র মাসের ভিত্তিতে করা হয়। কারণ সেগুলোর জন্ম হয়েছিল চাঁদের দৃশ্যমান পূর্ণিমা ও অমাবশ্যার হিসাব থেকে। চাঁদের হিসাব থেকেই মাস গোণা শুরু করে মানব জাতি। অন্যদিকে সৌরমাসগুলো কিন্তু গাণিতিক অনুমানের ওপর নির্ভরশীল। 

বাংলা বছর সৌরভিত্তিক হলেও এক সময়ে এর চান্দ্রভিত্তিক উৎসটি বেশ জটিলতা করত। বছরটা ৩৬৫ দিনে হলেও মাসের শুরুটা এদিক ওদিক হতো চান্দ্রমাসের কারণে। এই কারণেই পশ্চিমবাংলা আর বাংলাদেশে বাংলা বছর হুবহু এক দিনে মেলে না। যা হোক, আকবরের আমলে বাংলা সাল গণনা শুরু হয়েছিল হিজরি চান্দ্রবর্ষের সঙ্গে মিলিয়ে। আকবরের অন্যতম সভাপতি আবুল ফজল ফৌজি ছিলেন এর প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকায়। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে চান্দ্রবর্ষে দিন কম থাকে বলে বাংলা সনটি চালুর সময়ে বাংলা ও হিজরি বছরটি একই থাকলেও এখন হিজরি সনটি এগিয়ে গেছে, বাংলা এ বছর ১৪২৮ বঙ্গাব্দ হলেও হিজরি সনে তা ১৪৪২ হবে। 

নববর্ষকে শোষক ইত্যাদির সংস্কৃতি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা কিংবা ধর্মের সঙ্গে বিরোধাত্মক ইত্যাদি দেখাবার চেষ্টা- এসব সংকীর্ণ মানসিকতার প্রতিফলন। মানুষের আনন্দ, সংস্কৃতি ও বিনোদন প্রয়োজন। এগুলোর সবচেয়ে বড় উৎস হলো উৎসব। নববর্ষ বাংলা অঞ্চলের সবচেয়ে বড় উৎসব। অপরের ক্ষতি না করে মানুষকে আনন্দ জোগানো যেকোনো উৎসবকে স্বাগত জানাই। এমনকি যারা মনে করেন, বাংলা নববর্ষ উৎসবের বয়স বেশি না, তাদেরও বলি, উৎসবের আনন্দ নির্মল হওয়ার জন্য কুলীন হওয়াটা অত্যাবশ্যক নয়। অত্যাবশ্যক হলো মানুষ তাতে সাড়া অনুভব করে কি-না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা নববর্ষের আমেজ বাংলাদেশের মানুষকে নাড়িয়ে দেয়। 

যদি প্রাচীন কাল থেকে বাংলা নববর্ষে তেমন কোনো উৎসবের প্রচলন না থেকে থাকে, তবে উৎসবময় এ দিনকে কেন উদ্ভাবন করার প্রয়োজন পড়লো? আসলে সবই হলো বাংলা নববর্ষকে হেয় করার সব কুযুক্তি। সেই কারণেই নববর্ষে শোভাযাত্রা এত সহজে স্থান করে নিয়েছে আমাদের সমাজে। সংস্কৃতিতে এগুলো নতুন নতুন মাত্রা যুক্ত করে, নগরজীবনে আনে বৈচিত্র্য। একইসঙ্গে অন্য একটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের পরই নববর্ষ আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চাকা ঘোরানো উৎসব। পোশাকের বড় মৌসুম এটি, হস্তশিল্পের একক বড় বিক্রির সময়ও এ উৎসব। তালপাখা, সিকা, মাটির পাত্র থেকে শুরু করে অজস্র রঙিন ঘর সাজানো কিংবা টুকিটাকি গৃহস্থালী সামগ্রীর বড় একটা অংশ পহেলা বৈশাখের মেলায় বিক্রি হয়। বলা যায়, দেশের পুস্তক শিল্পের জন্য যেমন বইমেলা, তেমনি পহেলা বৈশাখের মেলাটি হস্তশিল্পের বাতিটিকে টিকিয়ে রেখেছে জনসমাজে। 

রবীন্দ্রনাথ বাংলা নববর্ষকে একটি অন্যরকম ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ করেছেন। সব ভাষার মতোই নবীনকে আহ্বান করেছেন তিনি; কিন্তু নববর্ষে এত রাজনৈতিক নতুনের আবাহন খুব কম ভাষাতেই মিলবে। ছারখার করে দিতে চান তিনি বাতিল সব কিছুকে: 

‘যা নড়ে তায় দিক নেড়ে, যা যাবে তা যাক ছেড়ে, 

যা ভাঙা তাই ভাঙবে রে- যা রবে তাই থাক বাকি॥’

কিংবা, 

‘মুছে যাক সব গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, 

অগ্নিস্নানে দেহে প্রাণে শুচি হোক ধরা। 

রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি, 

আনো, আনো, আনো তব প্রলয়ে শাঁখ

মায়ার কুজ্ঝটি-জাল যাক দূরে যাক।’

নজরুলের মাঝেও দেখি কালবৈশাখীর প্রবল রূপেরই বন্দনা, সেও তার পুরনোকে ভেঙে নতুনের জন্য জায়গা করে দেয়ার বৈশিষ্ট্যের জন্যই:

‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর!

তোরা সব জয়ধ্বনি কর!

ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়

তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!

আসল এবার অনাগত প্রলয়–নেশায় নৃত্যুপাগল, 

সিন্ধু পারের সিংহ দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল!

মৃত্যু গহন অন্ধ কূপে, মহাকালের চণ্ডু রূপে ধূম্র ধূপে

বজ্র শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর!’

পহেলা বৈশাখকে ঘিরে এই শক্তি ও সাহসের উৎস কী? সম্ভবত শীতের শেষে বসন্তের সতেজ প্রাণ দাবদাহে অস্থির হলেও, প্রাণের আরো বড় উৎস তীব্র বর্ষার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। তাই মধ্যবর্তী সময়ে জীর্ণ সব কিছুকে পুড়িয়ে দিতে গ্রীষ্মের প্রতি এই আন্তরিক ভালবাসা। খুব সম্ভবত আমাদের ঋতুর বৈচিত্র্যই আমাদের বৈশাখ বন্দনার নির্দিষ্ট রূপটি গড়ে দিয়েছে। 

দাবদাহের অগ্নিস্নানে প্রকৃতিকে নতুন করে বিশুদ্ধ করবার এই আবাহনই পহেলা বৈশাখের মূলমন্ত্র। এই অর্থে পহেলা বৈশাখ শক্তির জয়গানই গেয়ে যায়। 

করোনা মহামারি এবারের নববর্ষের উৎসবকে রুদ্ধ করেছে; কিন্তু মঙ্গল শোভাযাত্রা হোক না না হোক, রাষ্ট্রে ও সমাজে কালবৈশাখির আলামত প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে দেশের নানান কোণায়। এই মহামারি কাল অতিক্রমে আমরা হয়তো বেশি সাফল্য দেখাতাম, কালবৈশাখীর স্পর্ধাকে যদি আমরা নিজেদের চেতনায় আরেকটু বেশি করে ধারণ করতাম। এই পহেলা বৈশাখে কত মানুষ অক্সিজেনের অভাবে কাৎরাবেন, সর্বোচ্চ মহলের সঙ্গে যোগাযোগের অভাবে আইসিইউ না পেয়ে কত প্রিয় জনের মৃতদেহ দেখতে হবে, আমরা জানি না; কিন্তু এ যেন একটা জেগে ওঠবারই আহ্বান- কালবৈশাখির কাছে আমাদেরও আবেদন তাই: 

‘আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ। 

মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক॥’

সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। শুভেচ্ছা বিউ, বিষু, বিজু, বিহু, বৈসু, সাংগ্রাইসহ আরো যেসব বর্ষ শুরুর আয়োজন বাংলাদেশে প্রচলন আছে, সেগুলোরও।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh