মিয়ানমার রাষ্ট্রের কী হবে!

বার্মা বা মিয়ানমার কোন পরিণতির দিকে যাচ্ছে? এককথায় বললে, বার্মার ওপর ‘মানবাধিকার ইস্যু’ বলে চাপ আর নেই বললেই চলে। বিশেষত গত মাসের ২৭ মার্চের পর থেকে। 

কেন? আমেরিকায় গত বছর নভেম্বরের নির্বাচনের আগে প্রচারণার শুরু থেকেই বাইডেন আমাদের মতো বিভিন্ন দেশে হিউম্যান রাইট রক্ষা করে চলার নীতি কার্যকর না থাকলে, এ নিয়ে সোচ্চার হবেন ঘোষণা করেছিলেন। এমনকি সুনির্দিষ্ট করে ভারতের কাশ্মীর ইস্যু ও মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন বা নাগরিক বৈষ্যম্যের শিকার হওয়াকে ইস্যু করে কথা তুলবেন তাও প্রকাশ্যেই বলেছিলেন। স্বভাবতই নির্বাচনে বাইডেন বিজয়ী হবার পর থেকে ভারত সুযোগ বা উপায় খুঁজতে থাকে বাইডেনের কথিত নীতির চাপ থেকে কীভাবে মুক্ত থাকতে পারে। অনেকটা এরই সুযোগ আসে গত ২৭ মার্চ। ওইদিন বার্মার সামরিক বাহিনীর প্রতিষ্ঠা দিবস; কিন্ত দিনটি কেবল বার্মার জন্য নয়, সংশ্লিষ্ট অনেক রাষ্ট্রের জন্যও এক বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়েছিল। কী সেটা? 

মূলত কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো ‘হিউম্যান রাইট’স কথাটি শুনতেই পারে না, বা পছন্দ করে না। তাদের চোখে রাষ্ট্র মাত্রই তা কোনো ‘শ্রেণির আধিপত্যের’। ফলে ক্ষমতাসীন এক শ্রেণি অন্য সব শ্রেণিকে দাবড়ে অধীনস্ত করে নিজ শ্রেণির একনায়কত্ব কায়েম করবে এটাকেই তারা স্বাভাবিক মনে করে থাকে। ফলে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টদের রাষ্ট্রে নাগরিক বলে কোনো ধারণা নাই, নাগরিক মানবিক অধিকারের ধারণা নাই, এমনকি কমিউনিস্ট শ্রেণিস্বার্থে ওই সমাজের অন্যান্য শ্রেণির লোকদের উৎখাত করা বা দরকার হলে তাদের গুম-খুন করাও প্রকারান্তরে জায়েজ বলে মনে করতে পারে। লেনিনের আমল থেকে আজ পর্যন্ত এই একই ধারা অনুসরণ করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে একমাত্র ব্যতিক্রম সম্ভবত ২০১৫ সালে গঠিত হওয়া ‘রিপাবলিক নতুন নেপাল’। 

যদিও ব্যবহারিকভাবে কমিউনিস্টরা কোনো দেশে ক্ষমতাসীন হবার আগে পর্যন্ত নিজেরা ট্রেড-ইউনিয়ন আন্দোলনে শ্রমিকদের ‘অধিকারের’ জন্য অভ্যাসবশত আন্দোলন করে থাকে। এমনকি কোনো কোনো কমিউনিস্ট দলকে হয়ত দেখা যাবে ‘অধিকারের অন্দোলনে’ শুধু অংশগ্রহণ করছে না, সেটাকে তারা কথিত ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলন’ বলেও ডাকছে; কিন্তু পরিষ্কার থাকতে হবে গণতান্ত্রিক বা অধিকার শব্দগুলো তারা ব্যবহার করছে কৌশলগত শব্দ হিসেবে, ঠিক বিশ্বাস করে নয়। সবার সঙ্গে মিশে ভিতরে লুকিয়ে থাকতে। এক কথায় বললে, নাগরিক-মানবাধিকার কমিউনিস্টদের কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নয়, লক্ষ্য নয়। কাজেই কেউ যদি নিজেকে কমিউনিস্ট বলে গণ্য করে বা নিজ রাষ্ট্রকে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র বলে মনে করে তবে স্বভাবতই তারা বাইডেনের নীতির বিরোধী হবে বা সংঘাত করবে। তবু এবারের ২৭ মার্চ হয়ে উঠেছিল বাইডেনের কথিত ‘হিউম্যান রাইট’ নীতিকে যেন অমান্য করে দেখানোর দিন। বলা যায় সমমনাদের জড়ো করে চীন-রাশিয়ার বাইডেনের মানবাধিকার নীতিকে অবজ্ঞা দেখানোর দিন। কিন্তু কেন এমনটা হচ্ছে? আবার বিপরীত দিক থেকে আমাদের কিছুটা সাবধান হওয়ারও দরকার আছে যে, বাইডেন হিউম্যান রাইটের কথা তুলছেন তাই তিনি সাধুপুরুষ, কীংবা আদর্শবাদী নেতা- সরি এটাও বিবেচনা করা যাচ্ছে না। কারণ, ২০০৭ সালের পর থেকে আমেরিকা হিউম্যান রাইটকে চীন বা অন্যান্যদের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো, ব্যবহার করা অথবা বাণিজ্যিক সুবিধা পেলে বিনিময়ে একে বেচে দেওয়া ইত্যাদি দিকে প্রবলভাবে, খুবই নির্লজ্জ হয়ে ছুটছে। এমনকি গত ২০১৭ সালে বার্মার জেনারেলরা তাদের দেশের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে খেদানোর পক্ষে কথিত আরসা (ARSA) বাহিনীর সন্ত্রাসের গল্প সাজিয়েছিল - এটিকে সাফাই হিসাবে হাজির করেছিল আমেরিকার এক উপমন্ত্রী প্যাট্রিক মার্ফি; এসব কথা আমরা সবাই কমবেশি জানি। ফলে চীন-রাশিয়াসহ যারাই নিজ নিজ দেশে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স না থাকা বা ভঙ্গ করাকে জরুরি মনে করে, তাদেরকে চীন-রাশিয়া সহজেই বাইডেনের বিপক্ষে জোটবদ্ধ করে হাজির করতে পেরেছে। 

এমন একাত্মতা প্রকাশের দিন হিসাবে যেন তারা বেছে নিয়েছিল এবারের ২৭ মার্চকে। তারা বার্মায় এবারের সামরিক বাহিনী দিবস উপলক্ষে আট রাষ্ট্রের এক সম্মিলন ঘটিয়েছিল। ওই আট রাষ্ট্র হলো- ভারত, বাংলাদেশ, বার্মা, ভিয়েতনাম, লাওস, থাইল্যান্ড, রাশিয়া ও চীন। রাশিয়ার ক্ষেত্রে আবার তার উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আর এর মাধ্যমে ভারতের পক্ষ থেকে যে ম্যাসেজ দেয়া হয়েছিল তা হল, আমেরিকার ‘হিউম্যান রাইট নীতি’ ভারত ও তার বন্ধুদের বেলায় ছাড় দিতে হবে। না দিলে তারা আমেরিকার- কোয়াড জোটের বদলে এখানে চীন-রাশিয়ার জোটে শামিল হয়ে নিজের অবস্থান দেখাতে থাকবে; কিন্তু এই ছাড় দিলে বাইডেন আর হিউম্যান রাইট নীতির বাইডেন থাকেন না। ফলে এক উভয় সঙ্কট বলতে পারি বাইডেনের জন্য। কিন্তু কথা না শুনলে বাইডেনের কী হবে? এরই এক ইঙ্গিত আমরা দেখেছি এরপরে এবার গত-সপ্তাহে কোয়াডের এক নৌ-সামরিক মহড়ায়। যদিও এবার ফ্রান্সও কোয়াডের চার-রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে অনেকে তা গর্ব করে বলতে চেষ্টা করেছে। 

কিন্তু এতে বিরাট দুর্বলতার দিকটি হল, ভারত যদি বাংলাদেশ, বার্মাসহ ওদিকে চীন-রাশিয়া মিলে মোট আট রাষ্ট্রের সঙ্গে বাইডেনবিরোধী নীতিতে জোট পাকায়, তাহলে আবার একই সঙ্গে ভারত যদি কোয়াডের মধ্যেও থাকে তবে এর সোজা মানে হবে, এই নতুন কোয়াড আর অন্তত ওই আট-রাষ্ট্রের কারও জন্য কোনো সামরিক-হুমকি নয়, কিছুই হতে পারবে না! কারণ সেক্ষেত্রে দু’পক্ষের-দিকেই ভারত আছে! কাজেই এরপর আর চীন-রাশিয়ার জন্য কোয়াড আর গুরুত্ব দেবার মতো ইস্যুই থাকে না। এককথায় ভারত একাই খোদ কোয়াডকেই অকেজো করে রাখার জন্য যথেষ্ট! মানে সারা এশিয়ায় বাইডেনের হিউম্যান রাইটের আর কাজ নাই, এমন হয়ে যাবে। 

আর বার্মার ক্ষেত্রে কী হবে তাহলে? বার্মায় এপ্রিলের দশ তারিখে সরকারি হিসাবে রাজনৈতিক আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা ১১৪ এর উপরে এবং বেসরকারিভাবে ৫শ’-এর উপরে। যেহেতু বাইডেনের দিক থেকে রুটিন প্রতিক্রিয়া ছাড়া কার্যকর কোনো কাউন্টার-ওজন নাই, এর ওপর ২৭ মার্চের বার্মা-ভারত ইত্যাদি আর দেশ মিলে পালটা শো-আপ করে তা বাইডেনের শক্তিকে অনেকটাই খর্ব করে দিয়েছে। ওদিকে এমন খর্ব হবার পেছনে মূল কারণ সেই ২০০৭ সালে বুশ ও পরে ওবামা প্রশাসনও জেনারেলদের বার্মাকে সার্টিফিকেট দিয়েছিল, বার্মা নাকি কথিত ‘গণতন্ত্রের পথে যাত্রা’ করেছে! অথচ আজ বার্মায় যা কিছু হচ্ছে এর সবকিছুর শুরু হয়েছিল ওই ২০০৮ সালের কনস্টিটিউশনকে ঘিরেই। আমেরিকা, ভারত ও চীন প্রত্যেকেই জেনারেলদের থেকে বার্মার ব্যবসা-বাণিজ্য পাবার সুবিধা ও বিনিয়োগ ঢালার সুবিধার বিনিময়েই এসব সার্টিফিকেট দিয়েছিল। ফলে স্বভাবতই বাইডেনের ‘হিউম্যান রাইট’ নীতির হুঙ্কার আজ হাস্যকর অথবা গুরুত্বহীন অবস্থায় পৌঁছেছে। আর মিছিলে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও আস্তে-ধীরে সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে একসময়। এজন্য বলা হয়, নীতি-পলিসি একবার যদি নিজ নৈতিকতার ভিত্তি হারিয়ে ফেলে, তবে আবার তা কার্যকর দেখার সম্ভাবনা আরও কমে নাই হবার দিকে যায়। 

আজ ‘হিউম্যান রাইট’ নীতিকে আমেরিকা অপব্যবহার করে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যে, না আমেরিকার নেতৃত্বের জোট- না চীনের নেতৃত্বের জোট, কোনোটাই নাগরিক মানবিক অধিকার মেনে চলার জন্য ন্যূনতম কোনো নীতিতে আর কার্যত দায়বদ্ধ নয়। অথচ এমন কোনো ভিত্তিতে দাড়াতেই হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতির সঙ্গে যদি তুলনা করি, সেসসময় মেজর দুটি পক্ষ তৈরি হয়ে গেলেও, মিত্রশক্তি নিজেরা কিছু কমন নীতির ভিত্তিতে দাঁড়াতে পেরেছিল। যেমন কলোনি শাসন অবৈধ, ভুখণ্ডের বসবাসকারি বাসিন্দারাই নির্ধারণ করবে তাদের শাসক কে হবে; এ ছাড়া জাতিরাষ্ট্রের বদলে হিউম্যান রাইটভিত্তিক রাষ্ট্রগুলো ঢেলে সাজাতে হবে ইত্যাদি ছিল তখনকার প্রধান প্রধান নৈতিক ভিত্তিগত দিক। সে তুলনায় এখনকার সময়ে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স হয়ে থাকাটাই আর তত প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রভিত্তি নয়; কারণ হিউম্যান রাইট-এর কথাগুলো এত বেশি বাণিজ্যবিনিময় সুবিধা পেতে কাজে লাগানো হয়েছে যে এখন রাষ্ট্রজোটের আর এমন কোন ভিত্তিই যেন প্রয়োজনীয় নয়। 

তথাকথিত রাষ্ট্রস্বার্থের নামে রাষ্ট্র যেকোন কিছু করতে পারে এমনই বেপরোয়া নীতিহীন বা নীতিভ্রষ্ট হয়ে গেছে সব কিছু। একারণে না আমেরিকার নেতৃত্বের জোট বা চীনের নেতৃত্বের জোট কোনোটারই নীতিগত ভিত্তি আর অবশিষ্ট নাই।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh