স্বাস্থ্যবিধি মেনে চাঙা রাখতে হবে অর্থনীতি

গত বছর ৮ মার্চ প্রথম বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। তারপর থেকে যে হারে শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছিল, এ বছর সে হারও ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিন নতুন রেকর্ড হচ্ছে। মৃত্যুর হার বাড়ছে, বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যাও। 

এই মুহূর্তে যদি ব্যাপকভাবে আমাদের জনসাধারণ করোনায় আক্রান্ত হয় এবং তার কিছু অংশেরও যদি সিভিয়ার করোনা উপসর্গ থাকে, তাহলে এটি স্বাস্থ্যসেবার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করবে। 

বর্তমান অবস্থায় দেখা যাচ্ছে, আমাদের সরকারি হাসপাতালই শুধু নয়, বেসরকারি হাসপাতালেও রোগীরা আইসিইউ সাপোর্ট পাচ্ছেন না। কোনো আইসিইউ খালি পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়াও রোগীদের ভর্তি করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে সিট পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার এ পরিস্থিতিতে কোভিড হাসপাতালগুলো চালু করার চিন্তা করছে। 

আমরা জানি, যে কোনো মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনার একটি পদ্ধতি হলো লকডাউন। অর্থাৎ যিনি যেখানে থাকবেন, সেখানেই তিনি অবস্থান করবেন। এর মাধ্যমে অন্য মানুষের মধ্যে যেন সংক্রমণ না ছড়ায়, সে বিষয়টি সামনে আনা হয়। যুগ যুগ ধরে এটি চলে আসছে। আমাদের নবী করিম (সা.) মহামারির সময় বলেছিলেন, ‘যখন কোনো মহামারি আসে, তখন তোমরা যে যেখানে আছ, সেখানেই অবস্থান করবে। অন্য জায়গায় যেও না।’ এভাবে প্রাচীনকাল থেকেই মহামারিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেশি, সে তুলনায় স্বাস্থ্য কাঠামো, সুযোগ-সুবিধা কম। এখন আমাদের সুইডেন বা কোরিয়ার কথা চিন্তা করলে হবে না। বর্তমান অবস্থায় আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাই লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ খুব জরুরি ছিল। 

সংক্রমণ যদি নিয়ন্ত্রণে আসে, তাহলে আমাদের যে সীমিত হেলথ ফ্যাসিলিটিজ আছে, এর মাধ্যমে রোগীরা কিছুটা চিকিৎসা পাবেন। এর ব্যত্যয় ঘটলে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে। উন্নত বিশ্বে যেখানে ব্যাপকভাবে সংক্রমণ হয়েছিল গত বছর, যেমন- যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রে অনেক রোগী বাসায় মারা গিয়েছেন। তারা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তাদের যথেষ্ট অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও তারা রোগটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। মূলত অবকাঠামোর তুলনায় সংক্রমণ হার অত্যধিক বেড়ে যাওয়াই এমন অবস্থার জন্য দায়ী। আমাদের মতো দেশে দুর্বল অবকাঠামোগত স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে মহামারি মোকাবেলা এক অসম লড়াই। আমাদের দেশে যদি সংক্রমণ হার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে দেখা যাবে রাস্তাঘাটে মানুষ মরে পড়ে রয়েছে। গত বছর এমন অবস্থাও দেখা গেছে, ঢাকা মেডিক্যালের মর্গেও অনেকক্ষেত্রে লাশ রাখার জায়গা ছিল না। তখন তো শুরুর দিক ছিল, আমরা সেভাবে শনাক্ত করতে পারিনি। অনেক মানুষ করোনা উপসর্গ নিয়ে হয়তো বাসায় বসে জটিলতা অনুভব করেও হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে মারা গেছেন। এমন অনেক রোগীকে আমরা শনাক্ত করতে পারিনি, সেজন্য কোভিড-১৯ মৃত্যু তালিকায় তাদের নাম আসেনি। যে কারণে মৃত্যুহার কম দেখা গেছে। 

এমন এক পরিস্থিতিতে সরকার লকডাউনের মতো কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে আমরা যদি যথাযথভাবে তা পালন করি- অন্তত ৭ বা ১৪ দিন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাসার বাইরে বের না হই, একে-অপরের কাছ থেকে ছয় ফুট দূরত্ব মেনে চলি, মাস্ক পরিধান করি এবং কমপক্ষে বিশ সেকেন্ড ধরে হাত ধৌত করি সাবান দিয়ে- তাহলে হয়তো সংক্রমণ হার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। কারণ, আমরা সবাই জানি- করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছে চোখ, মুখ এবং নাকের মাধ্যমে। আমরা যদি ভাইরাসটি স্পর্শ করি এবং সেটি হাতের বা নখের মাধ্যমে আমাদের চোখে যায়, তা থেকেই কিন্তু সংক্রমণ ঘটতে পারে। এছাড়া যদি বদ্ধ জায়গায় অনেক মানুষ বিনা মাস্কে থাকে তাহলে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে। সে জন্য আমাদের জনবহুল স্থানগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। তাই সংক্রমণহার নিয়ন্ত্রণে লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ একটি উত্তম পন্থা।

দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে আমাদের চিকিৎসা কিন্তু একদিনের জন্যও বন্ধ থাকেনি। উন্নত বিশ্বে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন চিকিৎসা বন্ধ থাকলেও আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছি। আমাদের জরুরি অপারেশন সবসময়ই চালু ছিল। করোনা রোগীদের জন্য যেহেতু হাসপাতালের একটি বিশাল অংশ ছেড়ে দিতে হয়েছে, আমরা অন্যান্য রোগীদের ক্ষেত্রে যেমন- হার্নিয়া অপারেশন, পিত্তথলির পাথর অপারেশন, যা আপাতত না করলে রোগীর বড় কোনো সমস্যা হচ্ছে না, সেসব অপারেশন স্থগিত রেখেছিলাম। করোনা একটু কমে যাওয়ার পর আবার সবরকম অপারেশন করেছি। এখন আবার করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেছে। আমাদের অনেক চিকিৎসকও আক্রান্ত। আমাদের লোকবল সীমিত। একই সময়ে যদি সবাই আক্রান্ত হয়ে যায়, পরবর্তী সময়ে দেখা যাবে রোগীদের চিকিৎসা করার জন্য ডাক্তারও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এজন্য আমরা গতি কমিয়ে ডাক্তারদেরও সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি রোগীদের জরুরি সেবাও দিয়ে যাচ্ছি।

উন্নত বিশ্বের মতো, আমাদের দেশে যথেষ্ট সাপোর্ট নেই। আমাদের দেশে অনেক জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা হতদরিদ্র- তাদের প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতে প্রতিদিনই বাইরে যেতে হয়। সরকারি যে সাহায্য দেয়া হয়, সেটিও অপর্যাপ্ত। আবার এত বিশাল জনগোষ্ঠীকে সাপোর্ট দেয়ার ব্যবস্থাও কিন্তু আমাদের নেই। সেই ব্যাপারটিও আমাদের চিন্তা করতে হবে। একদিকে যেমন জীবন বাঁচাতে হবে, অন্যদিকে মানুষ যেন না খেয়ে না মরে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। অর্থনীতিকে সচল রাখতে হবে। তাই শিল্পকারখানা খোলা। বইমেলাও চালু ছিল। আমাদের সবকিছুই চলবে। এর মাঝেই জনগণকে বেশি সচেতন করতে হবে। হাত ধোয়ার অভ্যাস, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। সেই সঙ্গে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য অন্যান্য কাজও করতে হবে। 

আমাদের মতো বিশাল জনগোষ্ঠীর তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশকে সরকারের একার পক্ষে সাপোর্ট দেয়া সম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বে যেমন চিকিৎসা পদ্ধতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সেখানে বিভিন্ন ইন্স্যুরেন্সের মাধ্যমে তারা চিকিৎসা করে থাকে। তাদের বিশাল বরাদ্দ থাকে; কিন্তু আমাদের এখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে বরাদ্দের হার বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেকক্ষেত্রেই অপ্রতুল। সেজন্য আমরা যদি একাধারে সবকিছু বন্ধ করে দেই, তাহলে আমাদের অনেক মানুষ করোনায় মারা যাওয়ার আগে না খেয়েই মারা যাবে। সেই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই সরকার ও নীতি-নির্ধারকদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh