আওয়ামী লীগে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অন্তর্ভুক্তি

আজাদ খান ভাসানী

আজাদ খান ভাসানী

গতকাল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার ৭২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করেছে। যদি বলি আওয়ামী লীগ কিসের ভিত্তিতে এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে থাকে? উত্তর সবারই জানা আছে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে মওলানা ভাসানী কর্তৃক ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগে’র প্রতিষ্ঠা দিবস ধরে। 

আজকাল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতার ইতিহাস নিয়ে নানাবিধ গুঞ্জণ শোনা যায়। অস্বীকার না করলেও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মওলানা ভাসানীর চেয়ে অনেককেই বড় করে দেখানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যদি তাই হয় এসব নিয়ে খোলামেলা কিছু আলোচনা করার অবকাশ রয়েছে। 

শুরুতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে দুটো উদ্ধৃতি তুলে ধরছি। ১. “আমি তাঁকে জানালাম, আপনি জিন্নাহ আওয়ামী লীগ করেছেন, আমরা নাম পরিবর্তন করতে পারব না। কোনো ব্যক্তির নাম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগ করতে চাই না। দ্বিতীয়ত আমাদের ম্যানিফেস্টো আছে, গঠনতন্ত্র আছে, তার পরিবর্তন করা সম্ভবপর নয়। মওলানা ভাসানী সাহেব আমাকে ১৯৪৯ সালে আপনার কাছে পাঠিয়েছিলেন। তখনও তিনি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তাঁরও কোনো আপত্তি থাকবে না, যদি আপনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টো ও গঠনতন্ত্র মেনে নেন।” -অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা: ২১৬। 

২. “মওলানা সাহেব আমাকে জেনারেল সেক্রেটারি করার পক্ষপাতী। তাঁকেও আমি বলেছিলাম, আমি ছাড়া অন্য কাউকে ঠিক করতে, তিনি রাজি হলেন না এবং বললেন, ‘তোমাকেই হতে হবে।’ শহীদ সাহেব করাচিতে আছেন, তিনি এ সমস্ত বিষয় কিছুই জানতেন না।” -অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা: ২৩৮। 

২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ধরে এগোলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন এ দলের কেউ না। দেশভাগের পর তিনি প্রথমে কলকাতা ও পরে করাচীতে অবস্থান করেন। ১৯৫০ সালে তিনি করাচীতে বসে মওলানা ভাসানীর পৃষ্ঠপোষকতা ও শেখ মুজিবের প্রচেষ্টায় ‘পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ তৈরি করেন ও তার সভাপতি নিযুক্ত হন। আবার ওই একই সময় মিয়া ইফতেখারুদ্দিনের জিন্নাহ মুসলিম লীগের সাথে যুক্ত হয়ে দলের নামকরণ করেন- ‘জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগ’। পরিস্থিতি পাল্টে গেলে ১৯৫২’তে ‘জিন্নাহ’ শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগে থিতু হন। এরই মধ্যে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জিত হয়। ’৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার পথও প্রায় পরিষ্কার হয়ে যায়। এভাবেই আওয়ামী লীগের সাথে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গাঁটছড়া বাঁধা।

একটু পেছন ফিরে গিয়ে আমরা যদি আর একটু বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখবো- মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পাশাপাশি শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেও তো পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়। কারণ তিনিই ১৯৪৬ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লীতে বঙ্গ প্রদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার খায়েশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই অংশ নিয়ে এক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন। তার আশা ছিল জিন্নাহ সাহেব তার পাকিস্তান প্রস্তাব মূল্যায়ন করে উভয় পাকিস্তানের রাজনীতির স্বার্থে তাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করতে পারেন। তখন তিনি বঙ্গ প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীও ছিলেন। এই প্রস্তাবে লাহোর প্রস্তাবকে সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করা হয়। যেমনটি জিন্নাহও করেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী যদি অবিভক্ত বাংলা চেয়ে থাকেন- তাহলে এই প্রস্তাব ও দলিল তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ। 

প্রসঙ্গত, পাকিস্তানে একটি গণতান্ত্রিক বিরোধী দল প্রতিষ্ঠার পেছনে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা নিয়ে একটু আলোচনা করা দরকার। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের যেদিন জন্ম হয় মওলানা ভাসানী সেদিন আসামের কারাগারে। স্বাধীন পাকিস্তানে ফিরেই তিনি ১৯৪৮ সালের গোড়ার দিকে ঢাকায় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ইস্ট হাউসের দক্ষিণ দিকের মাঠে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় সর্বপ্রথম ভাষণ দান করেন।

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে তিনি মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি পরিষদ অধিবেশনে বাংলায় কথা বলার দাবি উত্থাপন করেন। ১৯ মার্চ বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানিদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘আমরা কি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের গোলাম?’ 

‘৪৮-এর ২৭ রমজান লালবাগ পুলিশ হত্যার ঘটনা ও শাসনতন্ত্র সংক্রান্ত মূলনীতি কমিটির রিপোর্ট তাকে মুসলিম লীগের ভাবগতি নিয়ে সন্দিহান করে তোলে। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র শুরু করলে তিনি এর প্রতিবাদ স্বরূপ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। 

১৯৪৯ সালের মার্চে তিনি কয়েকদিনের জন্য আসাম গমন করেন ও ১৭ মার্চ সেখানে গ্রেফতার হন। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি জেলখানা থেকে ছাড়া পান ও দেশে ফিরে আসেন। মুসলিম লীগ সেসময় তার মুক্তির জন্য বিশেষ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বরং অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রগতিশীল ছাত্র যুবক অংশটি তার মুক্তির দাবিতে মিছিল সমাবেশ করেছে। এহেন পরিস্থিতিতে তিনি দেশে ফিরে এসে সারা দেশ ঘুরে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেন। ইতিমধ্যেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম লীগ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

মওলানা ভাসানী ১৯৪৯ সালের ১৫ জুন এক বিবৃতিতে ২৩ ও ২৪ জুন মুসলিম লীগের বিক্ষুব্ধ কিছু তরুণ কর্মীদের নিয়ে ঢাকার রোজ গার্ডেনে এক সম্মেলন আহ্বান করেন। ২৩ জুন শুরু হওয়া সম্মেলনে আতাউর রহমান খান সভাপতিত্ব করেন। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মওলানা ভাসানী। শেরে বাংলা ফজলুল হকও কিছুক্ষণের জন্য উপস্থিত হয়ে সংক্ষিপ্ত এক ভাষণ দিয়েছিলেন। সভায় উপস্থিত প্রায় শ’তিনেক প্রতিনিধির সম্মতিতে গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। 

৪০ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা ভাসানী; সহ-সভাপতি যথাক্রমে- আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হোসেন, আলী আহমদ এমএলএ, আলী আমজাদ খান ও আবদুস সালাম খান; সাধারণ সম্পাদক- শামসুল হক; সহ-সম্পাদক যথাক্রমে- খন্দকার মোশতাক আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান ও এ কে রফিকুল হোসেন; কোষাধ্যক্ষ- ইয়ার মোহাম্মদ খান…প্রমুখ। 

২৪ জুন সদ্যগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয় আরমানিটোলা মাঠে। সভায় সভাপতির ভাষণে মওলানা ভাসানী সরকারের ২২ মাসের অপকীর্তির খতিয়ান তুলে ধরে সবাইকে আওয়ামী মুসলিম লীগের পতাকাতলে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানান। ১১ অক্টোবর তিনি আরমানিটোলা মাঠে এক জনসভায় খাদ্য সমস্যা সমাধানে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীনের ব্যর্থতার জন্য তার পদত্যাগ দাবি করে বক্তব্য রাখেন। সভাশেষে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে খাদ্যের দাবিতে ভুখামিছিল বের করলে ১৩ অক্টোবর বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাকে গ্রেফতার করা হয়। 

১৯৫০ সালের ১০ ডিসেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ২৪ ডিসেম্বর তিনি আরমানিটোলা ময়দানে বিশাল জনসভায় ভাষণ দান করেন। ওইদিন একই সময়ে পল্টন ময়দানে লিয়াকত আলীর জনসভায় হাতেগোনা মানুষের উপস্থিতি তখনকার সময়ে মওলানা ভাসানী ও আওয়ামী মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা জানান দেয়।

১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। যেখানে সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। এরপর ’৫৩ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে ভাসানী আওয়ামী মুসলিম লীগকে একটি ধর্ম নিরপেক্ষ পার্টিতে পরিণত করতে ‘আওয়ামী লীগ’ নামকরণের প্রস্তাব করেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব দ্বিমত পোষণ করলেও শেখ মুজিব তখন তার প্রস্তাবকে সমর্থন দিলেন। তারপর ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়। 

সেসময়ের একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকার বলেন, ‘মওলানা ভাসানীর বর্ণনাতীত ও অপরিসীম ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রমই আওয়ামী লীগকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান দখলে সক্ষম করে। অত্যাচারী জালেম মুসলিম লীগ সরকারের আমলে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক সরকারি চাকরি অ্যাডভোকেট জেনারেলের পদ গ্রহণ করেন। জনাব আতাউর রহমান খান স্বীয় ওকালতি পেশায় অধিকাংশ সময়ই মগ্ন ও স্বীয় পরিবার পরিজনদের তত্ত্বাবধানে ব্যস্ত ছিলেন। অবসর সময়ে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতেন। ফলে সরকারি অত্যাচার, নির্যাতন, জেল, জুলুম, আর্থিক কষ্টভোগ সবকিছুই সহ্য করিতে হইত সর্বত্যাগী মওলানা ভাসানীকেই। মজলুম নেতার উপযুক্ত পার্শ্বচর ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক তরুণ নেতা শামসুল হক ও যুগ্ম-সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫২ সালে ঢাকা কারাগারে আটকাবস্থায় জনাব শামসুল হক মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন ও মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত অবস্থায় কারামুক্তি লাভ করেন। জনাব শামসুল হক ১৯৫২ সালে কারান্তরালে থাকা বিধায় যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৫৩ সালে সভাপতি মওলানা ভাসানীর অনুরোধক্রমে জনাব শামসুল হকের স্থলে শেখ মুজিবর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়।’

পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে স্বায়ত্বশাসন, ‘সিয়াটো-সেন্টো’ চুক্তি এবং আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নীতির বিচ্যুতি তথা ২১ দফা থেকে ছিটকে পরার কারণে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গড়ে তোলেন। প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী চলে আসেন পার্টি ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে।

লেখক: সভাপতি, মওলানা ভাসানী কৃষক সমিতি ও সদস্য সচিব ভাসানী পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh