ডিজিটাল নিরাপত্তা না-কি ফেসবুক ও সংবাদ নিয়ন্ত্রণ আইন?

আমীন আল রশীদ

আমীন আল রশীদ

বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সাইবার দুনিয়ায় নাগরিকের নিরাপত্তার কথা বলা হলেও শুরু থেকেই এই আইনটি ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও শেয়ারের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। এ কারণে বলা যায়, কার্যত আইনটি নাগরিকের ডিজিটাল নিরাপত্তা নয়, বরং ফেসবুক নিয়ন্ত্রণের জন্যই ব্যবহার করা হচ্ছে। 

গত ৩০ জুন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বরাতে বলা হয়েছে, ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পড়েছে ফেসবুক পোস্টের কারণে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৪। আর এ বছর মে পর্যন্ত সেটি দাঁড়িয়েছে ৬০টিতে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের বরাতে আরও বলা হয়, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা কিছুটা কমেছে। ২০২০ সালে ৭০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হলেও, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মামলা হয় ১৬টি। 

২০২১ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যে ৮১টি মামলা হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৪টি মামলা হয় ফেসবুক পোস্ট ঘিরে। এরপরে আছে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও উস্কানি দেওয়া, বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করা, জমির বিরোধ, মিথ্যা ইউটিউব কনটেন্ট, শিশু নির্যাতন ও আইপিএল-এর মিথ্যা সংবাদের অভিযোগে।

এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২০ সালেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যে ১৩৩টি মামলা হয়েছিল, তার মধ্যেও সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ছিল ফেসবুক পোস্টের কারণে। তার সঙ্গে ছিল প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করা, কটূক্তি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ইত্যাদি। আর এসব মামলায় যারা আসামি হয়েছেন, তাদের মধ্যে সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মীও রয়েছেন।

ঢাকায় কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গ্রুপ ‘আমাদের গণমাধ্যম, আমাদের অধিকার’ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১৩টি মামলায় আসামি কমপক্ষে ৮০ জন গণমাধ্যমকর্মী। মূলত প্রকাশিত সংবাদের প্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মামলাগুলো করেন। বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল, মুদ্রিত সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনে খবর প্রকাশিত ও প্রচারিত হলেও মামলা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। মামলার অভিযোগে বলা হয়, খবরগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মানহানি করা হয়েছে বা ভুয়া সংবাদ প্রকাশ করে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এটি একটি জাদুকরি শক্তি যে, সংবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও এই আইনে মামলা করা যায় শুধু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে খবরটি ছড়ানোর অভিযোগে। অথচ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনো সংবাদে সংক্ষুব্ধ হলে তার প্রতিকারের জন্য প্রথম উপায় হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদ পাঠানো। এরকম আরও অনেক ধাপ আছে; কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হওয়ার পরে প্রভাবশালীরা এখন আর সে সব প্রক্রিয়া অনুসরণের ধারে-কাছে না গিয়ে বরং সরাসরি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে দেন। কারণ এই আইন অন্য যে কোনো আইনের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী এবং এই আইনে মামলা হওয়ার পরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আসামিকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট পত্রিকা বা টেলিভিশনে প্রতিবাদ পাঠিয়ে এই সুবিধা পাওয়া যায় না। সুতরাং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন শুধু ফেসবুক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং এটি এখন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ আইন হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।  

যদিও আইনটি পাসের পর সরকারের তরফে বরাবরই বলা হয়েছিল, এই আইনে সাংবাদিকরা টার্গেট নন বা সাংবাদিকরা এই আইনের ভিকটিম হবেন না; কিন্তু বাস্তবতা হলো করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরুর পর এই বিতর্কিত আইনে যত লোকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তার মধ্যে অনেক সাংবাদিকও রয়েছেন। আবার ডিজিটাল আইনের মামলায় গ্রেফতারই শুধু নয়; বরং রাজশাহী এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষককে চাকরি থেকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। ফলে শুরু থেকেই যে প্রশ্নটি বারবার সামনে আসছে তা হলো, কার নিরাপত্তায় ডিজিটাল আইন? 

মুশকিল হলো যে, এই আইনে ডিজিটাল নিরাপত্তার কোনো সংজ্ঞা নেই। ফলে রাষ্ট্রের যে কোনো নাগরিক তার সহ-নাগরিকের বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা করতে পারছেন এবং এ আইনের এমনই জাদুকরী ক্ষমতা যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আসামিদের গ্রেফতার করা হয়। আবার গ্রেফতারের পরে সহজে তার জামিনও হয় না। 

এই আইনে এ যাবত যতগুলো মামলা হয়েছে, তার অধিকাংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্য, মতামত অথবা সংবাদমাধ্যমে কোনো খবর প্রকাশের জেরে কোনো না কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির মানহানির অভিযোগে। অথচ মানহানির প্রতিকার পাওয়ার জন্য দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধিতেই (৪৯৯ ধারা) বিধান রয়েছে। তাহলে কারও মানহানি হলে তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করছেন কেন? এই আইনটি বেশি শক্তিশালী এবং অধিকতর ভীতি সঞ্চারকারী বলে? দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানি মামলা করলে পুলিশ তৎক্ষণাৎ কাউকে গ্রেফতার করে না বা আদালত সহজে জামিন দিয়ে দেন বলে?

যার মানহানি হয়, যদি তিনি জীবিত হন, তাহলে মামলা করার কথা তার নিজের। কোনো মৃত ব্যক্তির মানহানি হলে তার পক্ষে অন্য কেউ মামলা করতে পারেন। অথচ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এ যাবত যত মামলা হয়েছে, অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, তার বাদী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নিজে নন; বরং তার পক্ষে অন্য কেউ মামলা করেছেন। অর্থাৎ এখানে শুধু মামলা করাই নয়; বরং ক্ষমতা দেখানোরও একটা বিষয় কাজ করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এ যাবত যেসব অভিযোগে মামলা হয়েছে, তার অধিকাংশই দুর্বল; কিন্তু এসব দুর্বল অভিযোগে পুলিশ কেন মামলা নিল, সে প্রশ্নও আছে।

উল্লেখ্য, গত ৬ এপ্রিল সারাদেশে আটটি সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে সরকার। একই সঙ্গে এসব ট্রাইব্যুনালের অধিক্ষেত্রও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। করোনার কারণে দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মূলত জুন থেকে কাজ শুরু হয়। সুতরাং এসব ট্রাইব্যুনাল প্রতিটি মামলায় উল্লিখিত অভিযোগের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ, অভিযোগকারীর উদ্দেশ্য তথা ইনটেনশন পর্যবেক্ষণ এবং অভিযুক্তদের সঙ্গে অভিযোগকারীদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বৈরিতার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে তথ্যপ্রযুক্তি তথা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হওয়া মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করবে- এটিই প্রত্যাশা। 

সর্বোপরি বাকস্বাধীনতার অর্থ যেমন যা খুশি তাই বলা বা লেখা নয়, তেমনি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা বক্তব্যের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দেওয়া, তথা এই আইনকে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার বন্ধেও রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হতে হবে। আবার কেউ কিছু বললে বা লিখলেই যে, তার বিরুদ্ধে মামলা করে দিতে হবে- এমন অসহনশীলতা থেকেও বেরিয়ে এসে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সংস্কৃতিও জোরদার করতে হবে। না হলে অর্থনৈতিক নানা সূচকে দেশ এগিয়ে যেতে থাকবে; কিন্তু গণতন্ত্র ও মূল্যবোধের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh