শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ফল যেন অশুভ না হয়

আমীন আল রশীদ

আমীন আল রশীদ

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিরাট অংশ এবং বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানিয়েছেন, ১২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া যাবে। তবে অ্যাসাইনমেন্ট প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। 

বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ শিক্ষক এরই মধ্যে টিকা নিয়েছেন। ফলে করোনায় তাদের ঝুঁকি কমেছে। শিক্ষার্থীদেরও অনেকে নিয়েছেন। অনেকে রেজিস্ট্রেশন করেছেন। টিকা দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। সব কিছু মিলিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি একটা ইতিবাচক দিকেই অগ্রসর হচ্ছে; কিন্তু যেহেতু শিশুদের টিকা দেওয়ার বিষয়টি এখনো অনুমোদিত হয়নি, তাই প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থীরা এখনো করোনার ঝুঁকিমুক্ত নয়। এ কারণে সব অভিভাবক, বিশেষ করে শহর, নগর ও মহানগরের স্কুলগুলোয় শুরুর দিকে শিশুদের উপস্থিতি কম থাকবে বলে ধারণা করা যায়। অধিকাংশ অভিভাবকই তার সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর বিষয়ে দোটানায় থাকবেন। তারা প্রথম অন্তত এক সপ্তাহ পরিস্থিতি বুঝতে চাইবেন। যারা স্কুলে যাবে, তাদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা শুনবেন। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে আশাবাদী হতে চাইবেন। 

আমার ৬ বছরের মেয়েও রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলে পড়ে। এই স্কুলের অভিভাবকদের ফেসবুক গ্রুপে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যেসব কথাবার্তা ও আলোচনা হয়, তাতে মনে হয় অনেকে এখনো তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর বিপক্ষে। অনেকে এমন কথাও লিখেছেন, বেঁচে থাকলে পড়ালেখা হবে; কিন্তু করোনা পরিস্থিতি সে রকম ভয়াবহ অবস্থায় নেই। তারপরও প্রত্যেক বাবা মা-ই তার সন্তানকে নিয়ে চিন্তিত থাকবেন- এটিই স্বাভাবিক। ফলে ১২ তারিখ স্কুল খুললেও প্রথম দিন বা প্রথম সপ্তাহ থেকেই যে ক্লাসরুম পরিপূর্ণ হয়ে যাবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। 

এ অবস্থায় স্কুল কর্তৃপক্ষ কিছু বাড়তি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। যেহেতু দেড় বছর ধরে স্কুল বন্ধ এবং অনলাইন ক্লাসে শিশুরা সেভাবে মনোযোগী নয়; মাসের পর মাস ঘরে থাকতে থাকতে শিশুরাও ক্লান্ত, সুতরাং দীর্ঘ বিরতির পর তাদের স্কুলযাত্রাটি যাতে আনন্দময় হয়, যাতে তাদের যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালানো যায়, সে জন্য শুরুতে কিছু বাড়তি সতর্কতা গ্রহণ করা উচিত। 

যেমন- একসঙ্গে ক্লাসের সব শিক্ষার্থীকে হাজির না করে দুই বা তিনটি শিফটে, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাস চালু করা যায়। এভাবে আগামী এক-দুই মাস শিক্ষক-কর্মচারীরা একটু বেশি শ্রম ও সময় দিলে ক্লাস পরীক্ষা চালু করা যাবে। সব ক্লাসের নির্ধারিত ক্লাসের সংখ্যা কমিয়ে আনা যায়। ধরা যাক, কেজিতে যদি প্রতিদিন ৫টি ক্লাস থাকে, তাহলে সেটি দুই বা তিনটিতে নামিয়ে আনা যায়। এতে অন্তত শিশুদের কিছুটা উপকার হবে। তারা যেখানে বাসায় বসে মোটেও পড়ালেখা করতে চায় না, সেখানে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন যদি ১০টা ক্লাসও করে, তাতেও বড় কাজ হবে। 

চ্যালেঞ্জ হলো, শিশুদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করা। আবার শিশুরা সংক্রমিত হয়ে অসুস্থ না হলেও তাদের মাধ্যমে বাসায় থাকা বয়স্ক মানুষরা সংক্রমিত হবে কি-না- তাও বলা যায় না। ফলে একটা চ্যালেঞ্জ রয়েই যাবে। তবে চ্যালেঞ্জ রয়েছে মানেই অনির্দিষ্টকালের জন্য স্কুল বন্ধ রাখাও যৌক্তিক নয়। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই পড়ালেখা এগিয়ে নিতে হবে। অটোপাস ও অনলাইন ক্লাসের সমাপ্তি টানতে হবে। অন্তত শিশুরা যে অনলাইন ক্লাসে খুব বেশি মনোযোগী নয় বা এখান থেকে খুব বেশি কিছু শেখে না- তার প্রমাণ আমার নিজের কেজিতে পড়া মেয়ে। 

দেড় বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে যে ক্ষতি হয়েছে, অনলাইন ক্লাসে তার খুব সামান্যই পোষানো গেছে। এখন শিক্ষার্থীরা ক্লাস করা শুরু করে দিলেই যে দেড় বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে, ব্যাপারটা এত সহজ নয়। সুতরাং দেড় বছরের ক্ষতি পোষানোর একটি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যেসব শিশু নার্সারির পড়ালেখা ভালো করে না শিখেই কেজিতে উঠে গেছে এবং দুই মাস পরে ওয়ানে উঠে যাবে, তারা নার্সারি ও কেজিতে যেসব পড়া ভালো করে শেখেনি, সেগুলো তাদের ওপর বাড়তি বোঝা হিসেবে থেকে যাবে। এই বোঝা হালকা করার পদ্ধতি বের করতে হবে। এখানে শিক্ষকের পাশাপাশি অভিভাবকেরও দায়িত্ব আছে।

দেড় বছর ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুদের ‘আর্লি টু বেড আর্লি টু রাইজ’ মানে তাড়াতাড়ি ঘুমানো এবং ভোরে ঘুম থেকে ওঠার প্রবণতা নষ্ট হয়ে গেছে। যেহেতু স্কুল নেই, তাই তাদের অনেকে ১০ টা পর্যন্ত ঘুমায়। অনেক রাত পর্যন্ত খেলে বা টিভি ও মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকে। দেড় বছর পরে আবার তাদের আগের রুটিনের মধ্যে নিয়ে আসা বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই সময়ের মধ্যে তাদের মনোজগতেও বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। ফলে তাদের নতুন করে সিস্টেমের মধ্যে আনতে অভিভাবকদের বেশ বেগ পেতে হবে বলে ধারণা করা যায়। 

পরিশেষে, সরকার স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটিকে সাধুবাদ জানিয়ে বলা যায়, স্কুল যাতে আবার বন্ধ করে দিতে না হয়, সে জন্য প্রথম ও সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে অভিভাবকদেরই। তাদের ভুলে গেলে চলবে না, পৃথিবী ও বাংলাদেশ থেকে করোনাভাইরাস এখনো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। এখনো প্রতিদিন অনেকে সংক্রমিত হচ্ছেন, মারা যাচ্ছেন। সুতরাং হাল ছেড়ে দেওয়া বা পিকনিক মুডে চলে যাওয়ার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি দুনিয়ার সমস্ত কাজ চললেও করোনার ভয়ে শুধু স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকবে- সেটিও কাম্য নয়।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //