রোহিঙ্গা প্রত্যাগমনে বাংলাদেশের করণীয়

আবুল কাসেম ফজলুল হক

আবুল কাসেম ফজলুল হক

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা কর্তৃক নিপীড়নের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশের চার বছর পূর্ণ হয়েছে। মিয়ানমার সরকার তাদের দেশে ৭শ’-৮শ’ বছর ধরে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সামরিক অভিযান ও গণহত্যা চালিয়ে, বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে বাংলাদেশে বিতাড়িত করছিল। সে সময় প্রায় ৮-৯ লাখ রোহিঙ্গা নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আরও পাঁচ লাখের মতো রোহিঙ্গা বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে এসেছে।

মিয়ানমার সরকার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করেছে। প্রক্রিয়াটি চলমান আছে। রোহিঙ্গাদের দুর্দশা অবর্ণনীয়। বিশ্বজুড়ে জনগণ মিয়ানমার সরকারের ভূমিকার নিন্দায় মুখর ছিল সে সময়।

রোহিঙ্গাদের বিতাড়নকে কেন্দ্র করে সমস্যার প্রকৃতি বোঝার জন্য তাদের ইতিহাস-ভূগোল নিয়ে বহু তথ্য প্রচারমাধ্যমে এসেছে। বিভিন্ন মহলের গবেষণার মাধ্যমেও উন্মোচিত হয়েছে নানা তথ্য ও ঘটনা। এসবের মধ্যে নানা মতলবে কোনো কোনো মহল থেকে মিথ্যা প্রচার দিয়ে সমস্যাকে জটিল করে তোলা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী জনমত আর বিভিন্ন দেশের সরকারের মতো এক রকম নয়।

প্রতিটি দেশেরই সরকার চলছে আগে থেকে চলে আসা পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো দেশের সরকারই নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করেনি এবং এখনো করছে না।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালেও এমনটি ঘটেছিল। প্রতিটি রাষ্ট্রের সরকার চলছিল আগে থেকে চলে আসা তাদের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে। তবে গোটা পৃথিবীর জনমত ছিল বাংলাদেশের পক্ষে এবং পাকিস্তান সরকারের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে।

রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ে যেসব তথ্য সামনে এসেছে তাতে বোঝা যায়, সমস্যা অতি পুরনো ও জটিল। ৭শ’-৮শ’ বছর ধরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন বা আরাকানে বসবাস করা সত্ত্বেও মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করেনি। বৃহৎ শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে সমস্যাটিকে ব্যবহার করে আসছে। কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন যে সুপারিশ ঘোষণা করেছিল, বাংলাদেশ তা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করে আসছে; এখনো সফল হয়নি। বৃহৎ শক্তিগুলোর কূটনীতি সমস্যাকে জটিল করে চলেছে। মিয়ানমার সরকারের বেপরোয়া ভূমিকার সামনে বাংলাদেশ সরকারকে অসহায়ের মতো দেখা যাচ্ছে।

চীন ও ভারত মিয়ানমারের পক্ষ অবলম্বন করে সমস্যার সমাধানের কথা বলেছিল। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক প্রভৃতি রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে থেকে সমস্যার সমাধানের কথা বলেছিল সে সময়। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ বাংলাদেশের ভূমিকার খুব প্রশংসা করেছিল; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কথার ওপর আস্থা রাখা যায় না। আর জাতিসংঘ তো শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোরই সংঘ।

রোহিঙ্গা সমস্যাকে বাংলাদেশের জনগণ এ দেশের জন্য অত্যন্ত বড় সমস্যা হিসেবে দেখছে; কিন্তু আওয়ামী লীগ, বিএনপি, সিভিল সোসাইটি সেভাবে উপলব্ধি করছে বলে মনে হয় না। তাদের বক্তব্যেও পারস্পরিক ভিন্নতা ফুটে ওঠে। আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ আগের অবস্থানে থেকে বিএনপিকে আক্রমণ করে চলেছে। বিএনপি সম্পূর্ণ আগের অবস্থানে থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বলছে এবং সরকারের বিরূপ সমালোচনা করছে। এনজিও মহল তাদের অবস্থানে থেকে কথা বলছে এবং কাজ করছে। বামপন্থী ও কিছু ইসলামী দল মিয়ানমারের ভূমিকার বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদে বেশি সক্রিয় ছিল সে সময়। এই বহুত্ববাদী বাস্তবতায় বাংলাদেশের জাতীয় অনৈক্য সে সময় যেমনভাবে প্রকাশ পেয়েছিল, এখনো তা অব্যাহত আছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুত্ববাদ জাতীয় অনৈক্যের পরিচয়কে প্রকটিত করছে। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে দুর্যোগের মুহূর্তে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর সামনে নিজেকে ঐক্যহীন ও দুর্বল প্রমাণ করছে। আমরা চাই, বহুত্ববাদ নয়, বহুত্বমূলক সংহতি; বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। বহুত্ব ও বৈচিত্র্যকে যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে ঐক্য। এই চার বছর পরেও বিভিন্ন মহল থেকে প্রচারিত বহুত্ববাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও জনজীবনের জন্য সমূহ বিপদের কারণ হচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের কোনো সম্ভাবনাই এখন দেখা যাচ্ছে না।

রাষ্ট্র হলো জাতীয় চেতনার বাস্তব রূপ। যে জনসমষ্টির মধ্যে জাতীয় চেতনা ও জাতীয় ঐক্য থাকে না, তারা নিজেদের চেষ্টায় কোনো রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে না। বাংলাদেশের রাজনীতি বাংলাদেশে অবস্থিত সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর দূতাবাস অভিমুখী, ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্ক এবং দিল্লি অভিমুখী। বাংলাদেশের উচ্চ শ্রেণির লোকেরা তাদের ছেলেমেয়েদের যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের নাগরিক করে চলেছেন। তাদের অনেকে নিজেরাও এসব দেশের নাগরিক হয়েছেন। এনজিও সম্পর্কে অনেকের ধারণা, তারা বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে। এ অবস্থার মধ্যে এখন রোহিঙ্গাদের বোঝা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ কী করতে পারে?

রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত আরও অনেক আগেই বাংলাদেশের বোঝা দরকার ছিল। বুঝে কাজ করা দরকার ছিল। এখন সমস্যা যে পর্যায়ে গেছে এবং বাংলাদেশ সরকারের ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে অবস্থা, তাতে বাংলাদেশ কী করতে পারে? বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার দুর্দশাগ্রস্ত বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে সম্পূর্ণ মানবিক বিবেচনায়। বাংলাদেশ তাদের মিয়ানমারের নাগরিক মনে করে। বাংলাদেশ চায়, মিয়ানমার তাদের ফেরত নিক এবং নাগরিকত্ব দিয়ে তাদের সচ্ছল-সম্মানজনক জীবনের অধিকারী করুক। মিয়ানমার তাদের মিয়ানমারের লোক মনে করে না এবং তাদের ফেরত নেবে না বলে ঘোষণা দিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের সব কথার অর্থ বোঝা যায় না। সরকার কী করছে বা কী করতে চাইছে?

বাংলাদেশের জনগণের, সরকারের, রাজনৈতিক দলগুলোর ও বিশিষ্ট নাগরিকদের আশু কর্তব্য :

১. রোহিঙ্গারা আর যাতে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা।

২. যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসে গেছে, তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা। মিয়ানমার সরকারকে এ ব্যাপারে রাজি করাতে হবে। এর জন্য আন্তর্জাতিক জনমত, কূটনীতি ও জাতিসংঘের ভূমিকা দরকার।

৩. রোহিঙ্গারা যাতে রাখাইনে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব পায় এবং সচ্ছল ও সম্মানজনক জীবনের অধিকারী হতে পারে, তার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো।

বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। যে রোহিঙ্গারা বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে এসে গেছে, তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে না পারা পর্যন্ত তাদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশকে পালন করতে হবে। এখানে যে তিনটি আশু করণীয় নির্দেশ করা হলো, বাংলাদেশ যদি আগামী দিনে সেগুলো করতে পারে, তাহলে তা হবে সরকারের জন্য অসাধারণ গৌরবজনক এবং বাংলাদেশের জন্য পরম কল্যাণকর কাজ। আগামী দিনে যদি সেগুলো বাংলাদেশ করতে না পারে, তাহলে ৩০ বছরের মধ্যেও, এমনকি ৩০০ বছরের মধ্যেও করতে পারবে না। যে অবস্থা চলছে, যদি এগুলো করা না যায়, তাহলে বাংলাদেশের জনসাধারণকে নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে।

লেখক- শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //