নারীর দৃষ্টিতে কোভিড-১৯

আমরা একটি দুঃসময় পার করছি। কবে এ থেকে মুক্তি পাবো বা আদৌ মুক্তি পাবো কি-না জানি না। এখনো কোভিডের চরিত্র বোঝা নিয়ে নানা মত এবং সংশয় আছে। দুই হাজার বিশ সালে কোভিড-১৯ ভাইরাস সম্পর্কে প্রথম যখন শোনা যায়, তখন একে ‘নভেল’ করোনা বলা হতো; অন্যান্য ভাইরাসের তুলনায় এটি নতুন। সংক্রমণ চরিত্র ও উপসর্গেও নতুন। এক বছরের মধ্যেই এর নানা ধরনের ভ্যারিয়েন্ট বেরুতে শুরু করে, ফলে এর চরিত্র বোঝা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কয়েকটি করোনা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্যারিয়েন্ট, ইউকে ভ্যারিয়েন্ট আর সর্বশেষ এবং সম্ভবত সব চেয়ে মারাত্মক ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট এখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। এই ভ্যারিয়েন্ট প্রথম ভারতে শনাক্ত হয়েছিল, তাই একে ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্টও বলা হয়। এর চরিত্র চেনার আগেই ছিনিয়ে নিচ্ছে শত শত প্রাণ, দ্রুত ফুসফুসে ছড়িয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে হাসপাতালে রোগীরা অক্সিজেনের জন্য কাতর দিন কাটাচ্ছে। এই লেখা যখন লিখছি, তখন আমারই চারপাশে আপনজনদের কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে, উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে। 

কিন্তু তবুও এই অবস্থায় আমাদের পথ চলা থামবে না। কোভিডের সব চেয়ে মর্মান্তিক দিক হচ্ছে আপনজনদের জন্য যতই মায়া থাকুক তার কাছে গিয়ে সেবা করার সুযোগ কম। যাদের বাড়িতে কোভিড রোগী শনাক্ত হয়, তারা যেমন চান না কেউ আসুক, তেমনি অন্যরাও যেতে পারেন না। করোনা পরীক্ষায় পজিটিভ হলে এবং অক্সিজেনের সেচুরেশন ৯৫-এর ওপরে থাকলে ‘হোম আইসোলেশন’ এ ১৪ দিন কাটিয়ে দিলে সুস্থ হয়ে যেতে পারে। একই বাড়িতে যদি কয়েকজনের হয়, তাহলে জনে জনে আইসোলেশনের জন্য আলাদা রুম দেওয়া সম্ভব না হলে সব পজিটিভরা একসঙ্গে থাকতে পারেন আর সংখ্যালঘু নেগেটিভদের বরং একটু দূরে সরিয়ে রাখা যায়, এমন ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে। নভেল করোনার নভেল আয়োজন। শতকরা ৮০ ভাগের হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, (যদি অক্সিজেন সাপোর্ট না দিতে হয়), তারা তো এভাবেই সুস্থ হচ্ছেন। 

‘কোভিডের কোনো চিকিৎসা নেই’ এটাই এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত তথ্য; কিন্তু তা হলেও কোভিড ধরা পড়লেই চিকিৎসকরা এন্টিবায়োটিক, প্যারাসিটামল, কয়েক ধরনের ভিটামিনসহ বিভিন্ন ওষুধ অবস্থা বিশেষে দিচ্ছেন। এর সবই প্রয়োজন ছিল কি-না, তা আলোচনাতেই নেই। ডাক্তার দেখালেই তাকে এই ব্যবস্থাপত্র নিতে হচ্ছে। গত বছর অথবা কোভিডের শুরুতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে অনেক বেশি। খাওয়া-দাওয়ার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ালে কোভিড মোকাবেলা সহজ হবে। তার জন্য প্রোটিনযুক্ত খাদ্যের প্রয়োজন। খাদ্যের মধ্যে প্রোটিন, ভিটামিন সি, লিক্যুইড খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীকালে কোভিডের রোগীরা ওষুধনির্ভর হয়ে গেছেন। রোগী করোনা শনাক্ত হওয়ার কিছু দিনের মধ্যে স্বাদ-গন্ধ যখন পায় না, তখন তার খেতে খুব কষ্ট হয়। মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, শ্বাস কষ্ট ইত্যাদি কখন মারাত্মক হয়ে উঠবে তা কেউ বলতে পারে না। অক্সিমিটারে সেচুরেশন ৯০ এর নিচে গেলে বিপদ এটুকু মোটামুটি সবাই জানেন, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়; কিন্তু এই ফাঁকে খাদ্য যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা তা অনেকেই আর মনে রাখেননি। কোভিডের নতুনত্ব নিয়ে মাথা ঘামাতে গিয়ে সবাই ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। যারা চিকিৎসকের নাগাল পাচ্ছেন না, তারা অন্যদের দেওয়া ওষুধের প্রেসক্রিপশন থেকে দেখে ওষুধ কিনে নিচ্ছেন। প্রশ্ন আসতে পারে এটা করা ঠিক কি না, সেই প্রশ্ন করার আগে এটাও প্রশ্ন করতে হবে চিকিৎসকরা কি আসলেই রোগী ভেদে ভিন্ন ভিন্ন প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন? উত্তর হচ্ছে, না। চিকিৎসকরাও কোভিড পজিটিভ শুনলেই টেমপ্লেট প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন দেখা যায়। কাজেই একই বাড়ির সবাই জনে জনে চিকিৎসকের ফি দিয়ে দেখানোর যদি প্রয়োজন মনে না করেন তাহলে দোষ দেওয়া যায় না। 

কোভিড কি নারী-পুরুষ বাছবিচার করে? 

নারীর দৃষ্টিতে কোভিড-১৯ অতিমারির পর্যালোচনা করতে গিয়ে এসব সাধারণ কিন্তু দৈনন্দিন বিষয়গুলো শুরুতে টেনে আনলাম। আমরা প্রতিদিন জানতে পারছি গত ২৪ ঘণ্টায় কতজন শনাক্ত (পজিটিভ) হয়েছেন, কতজন মারা গেছেন, কতজন সুস্থ (নেগেটিভ) হয়েছেন। কতজনকে পরীক্ষা করা হয়েছে তাও বলা হয়। এবং ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত মোট কত শনাক্ত হয়েছেন, কতজন মারা গেছেন, তা প্রতিদিন জানা যায়; কিন্তু যা জানা যায় না, তা হচ্ছে এর মধ্যে নারী-পুরুষের বিভাজনটা কেমন। যদিও শনাক্তের মধ্যে কতজন পুরুষ, কতজন নারী আছেন, মৃতদের মধ্যে কতজন পুরুষ এবং নারী আছেন জানা যাচ্ছে; কিন্তু যাদের পরীক্ষা করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে কতজন নারী এবং কতজন পুরুষ ছিলেন, তা বলা হয় না। ফলে আমরা জানি না কতজন নারীকে পরীক্ষা করে কত শতাংশ শনাক্ত হয়েছে, এবং কতজন পজিটিভ হওয়ার পর কত নারী মৃত্যুবরণ করেছেন। নারীদের বিষয় আলাদা করে দেখতে চাওয়ার কারণ হচ্ছে আমরা দেখেছি অ-সংক্রামক রোগ (NCD) বা হার্টের অসুখ, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্টজনিত রোগের ক্ষেত্রেও নারী-পুরুষ ভেদে তথ্য পাওয়া খুব সহজ হয় না। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা, ডায়াবেটিসের মতো রোগ নারীদের মধ্যে বেশি পাওয়া গেলেও চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে আছেন। অনেক ক্ষেত্রে নারী তার রোগ চরম অবস্থায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত হয়তো ডাক্তারের কাছেই যান না। পরিবারেও তিনি তার শারীরিক সমস্যার কথা জানাতে পারেন না। ফলে তাদের রোগও শনাক্ত হয় না। পুরুষ পরিবারের প্রধান, তার সুস্থ থাকার সঙ্গে পরিবারের ভরণপোষণ জড়িত, তাই তার অসুস্থতা দূর করা প্রাধান্য পেলে দোষ দেবার কিছু নেই। পরিবার প্রধান অসুস্থ হলে কিংবা মারা গেলে পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে স্ত্রীর কান্নার ভাষা হচ্ছে ‘এখন আমাদের কী হবে? আমরা কীভাবে চলবো?’। ফলে পুরুষকে সুস্থ রাখা, কর্মক্ষম রাখার প্রয়োজনে রোগ শনাক্ত এবং চিকিৎসা হয়। অথচ পরিবারে নারীর মৃত্যু হলে সেই পরিবারের সব কিছু তছনছ হয়ে যায় সেটা যেন কোনো বিষয় নয়। এই সমাজের নারী-পুরুষের দায়িত্ব যেভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া আছে, তারই ভিত্তিতে হচ্ছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ড্যাশ বোর্ডে দেওয়া তথ্য থেকে (৩ আগস্ট, ২০২১) পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা হচ্ছে ১২,৯৬,০৯৩, মৃত্যু হয়েছে ২১, ৩৯৭ জন। Worldometer এ নারী-পুরুষ ভাগ দেখানো হয় না। IEDCR এর তথ্য অনুযায়ী শনাক্ত হওয়া রোগীদের ৬৮% পুরুষ, ৩২% নারী অর্থাৎ নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা দ্বিগুণ। মৃতদের ৭৩% পুরুষ, ২৭% নারী, নারীর তুলনায় পুরুষের মৃত্যু হার প্রায় ৩ গুণ। ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে পুরুষ পেয়েছেন ৬১%, নারী পেয়েছেন ৩৯%। 

কোভিড সংক্রমণ নারীর কম হচ্ছে দেখে ভালো লাগছে অবশ্যই, কিন্তু কেন? বিষয়টা কেবল বাংলাদেশে ঘটেছে তা নয়। চীনে Chinese Centre of Disease Control and Prcvention প্রায় ৪০ হাজার মানুষের ওপর ব্যাপক একটি গবেষণা করে দেখেছে করোনা আক্রান্ত পুরুষ রোগীদের ২.৮% মারা গেছেন, অথচ নারী মারা গেছেন ১.৭%। এর একটি ব্যাখ্যা গবেষকরা দিয়েছেন এভাবে যে পুরুষ ও নারীর জীবনযাপনের পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য আছে। একটি বড় পার্থক্য হচ্ছে চীনে ৫২% পুরুষ ধূমপান করেন, নারীদের মধ্যে মাত্র ৩% ধূমপায়ী রয়েছে। ধূমপান ফুসফুসের ক্ষতি করে। করোনাভাইরাসও ফুসফুসের ক্ষতি করে। বাংলাদেশে পুরুষদের ধূমপান ৩৬.২% আর নারীদের মধ্যে মাত্র ০.৮% পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশে নারীদের ২৪.৮% পানের সঙ্গে জর্দা ও সাদাপাতা খায় এবং গুল ব্যবহার করে। অর্থাৎ তামাক সেবন নারীও করে; কিন্তু বেশির ভাগ পুরুষ ধূমপান এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক দুটিই সেবন করে। ধূমপান সরাসরি ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, তাই পুরুষদের বেশি মৃত্যু কিছুটা ব্যাখ্যা হয়তো এখান থেকে পাওয়া যায়। 

কিন্তু ল্যান্সেটে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে (নভেম্বর ৫, ২০২০) দেখা গেছে ভারত, নেপাল, ভিয়েতনাম, স্লোভানিয়াসহ বেশ কিছু দেশে পুরুষের তুলনায় নারীর সংক্রমণের হার বেশি। ভারতে case fatality rate পুরুষের ২.৯%, নারীর ৩.৩%। এই ফলাফল দেখে অনেকেই অবাক হয়েছেন কারণ এরই মধ্যে ধারণা জন্মেছিল যে পুরুষের জীবনধারণের কারণে তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন আর নারীর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (immune responses) অনেক বেশি। এই বিশ্বাস আমাদের গার্মেন্ট শিল্পের মালিকদের মধ্যেও তীব্রভাবে আছে। তারা মনে করেন গার্মেন্ট শ্রমিকদের (যার অধিকাংশই নারী) কোভিড সংক্রমণের হার মাত্র ০.০৩%। কাজেই তাদেরকে একবার বাড়ি যাও, আর একবার চলে আসো বললেও কোনো ক্ষতি হবে না। ওরা ভালো থাকবে। চল্লিশ লাখ শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ৫ হাজার জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে, ২৯৯ জনের পজিটিভ এসেছে; কিন্তু নতুন গবেষণা সেই ভুল ভেঙে দিচ্ছে। 

বর্তমানে সারা বিশ্বে কোভিডের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট, যা প্রথমে ভারতে ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে শনাক্ত হয়, বিশ্বে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, কোভিড শনাক্ত হওয়া রোগীদের ৮০ ভাগ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হচ্ছে। এটিই প্রথম ভ্যারিয়েন্ট (আলফা), (যা যুক্তরাজ্যে প্রথম শনাক্ত হয়েছে বলে ইউকে ভ্যারিয়েন্ট বলে পরিচিত) এর তুলনায় ৬০% বেশি সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম। ইউকে ভ্যারিয়েন্ট চিনের উহানের ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় বেশি সংক্রমণ করছিল। উল্লেখ্য, এরই মধ্যে কয়েকটি ভ্যারিয়েন্ট নতুনভাবে শনাক্ত হওয়ায় বিশ্বে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারটি ভ্যারিয়েন্টকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা Variants of Concern (VOCs) বা উদ্বেগজনক ভ্যারিয়েন্ট বলে চিহ্নিত করেছে, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট তার মধ্যে অন্যতম। 

সিডিসি এর তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট পুরুষদের জন্য বেশি হুমকি সৃষ্টি করেছে কারণ ভ্যাকসিন দেওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে আছেন (৫৩%)। ভ্যাকসিন দেওয়া পুরুষদের (৪৭%) এর মধ্যে শ্বেতাঙ্গ পুরুষের সংখ্যাই বেশি। বাংলাদেশে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট সংক্রমণের হার প্রায় ৭৮% এবং এই ভ্যারিয়েন্ট নারীদের ছাড়ছে না। এর একটি অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে আগের ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় ডেল্টা দ্রুত ছড়ায়, একটি পরিবারে একজনের হলে পরিবারের সকলের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে নারী যদি ঘর থেকে বের না-ও হন, পরিবারের পুরুষ সদস্যদের মাধ্যমে তার সংক্রমিত হবার আশঙ্কা থেকেই যায়।

কোভিড রোগী সেবা দানেও নারী বৈষম্যের শিকার

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের মধ্যে নারী এবং পুরুষ রয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক নার্স ক্রমবর্ধমান কোভিড রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কোভিড ডেডিকেটেড সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে হাজার হাজার ডাক্তার এবং নার্স নিরলস সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অনেকেই কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন, মারাও গিয়েছেন কয়েকশত চিকিৎসক এবং নার্স। গত বছর জুন মাসের তথ্য (ইউএনবি), যখন মোট সংক্রমণ ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৭৭৫ জন তখন ডাক্তার, নার্স এবং টেকনিশিয়ানদের মধ্যে সংক্রমণ ছিল ৩৩০১ জন (১০৪০ জন ডাক্তার, ৯০১ জন নার্স, ১৩৬০ জন টেকনিশিয়ান)। বাংলাদেশে কোভিড সংক্রমিত রোগীদের ১১% ডাক্তার এবং নার্স রয়েছেন। এটা আমরা জানি চিকিৎসকদের বেশির ভাগ পুরুষ হলেও নার্সদের সিংহভাগ হচ্ছেন নারী। তাদেরকেই রোগীর একেবারে কাছে গিয়ে সেবা করতে হয়, ওষুধ খাওয়ানো, অক্সিজেন দেওয়া কোনোটাই শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে করা সম্ভব নয়। গত বছর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে দৈনিক যে বুলেটিন প্রকাশ করা হতো, তাতে জানা যেত হাসপাতালগুলোতে পিপিই, মাস্ক ইত্যাদি কত দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু পত্রিকার খবরে দেখা যায় ডাক্তাররা পিপিই পেলেও নার্সদের দেওয়া হচ্ছে সাধারণ স্যুট, আর যারা পরিষ্কার করতে আসেন তাদের দেওয়া হয় শুধু মাস্ক। এন৯৫ মাস্ক সকল ডাক্তার নার্সরা পাননি। যারা হাসপাতালে আসা রোগীদের সেবা দিয়ে সারিয়ে তুলছেন তাদের নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্যোগ নেই। এবং এখানেও নারী-পুরুষ বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। 

কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দ্বারা ঢাকা শহরের দুটি প্রাইভেট হাসপাতালে (২০২০ সালে) পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, নার্সদের প্রতি সপ্তাহে মাত্র দুই সেট পিপিই প্যাক দেওয়া হয়, যার মধ্যে একটি গাউন এবং জুতার কভার (Nx1 to Np5)। কোনো গ্লাভস, মাস্ক বা ফেস শিল্ড দেওয়া হয়নি। নার্সরা নিজেরাই ঘ৯৫ মাস্ক কিনেছেন এবং মেডিকেল ওয়ার্ডে ঢোকার সময় তা ব্যবহার করেন। দশ ঘণ্টার শিফটে কাজ করলে ১০ দিনের মাস্ক ৫ দিনে শেষ হয়ে যায়। ডাক্তারদের ক্ষেত্রেও সুরক্ষার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। 

নার্স এবং ডাক্তারদের যথেষ্ট সুরক্ষা না থাকা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও দেখা গেছে। ইতালিতে অনেক ডাক্তার এবং নার্স কোভিড আক্রান্ত হয়েছেন; ফ্রান্সে একজন ডাক্তার কোভিড সংক্রমিত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন। আসলে তাদের যথেষ্ট পিপিই না থাকা এবং সুরক্ষার অভাব বোধ ডাক্তার-নার্সদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয় এবং ভীতি সৃষ্টি করে। চীন এবং অস্ট্রেলিয়াতেও একই চিত্র দেখা গেছে। 

লকডাউন ও নারী

বাংলাদেশে কখনোই সরকার দ্বারা ঘোষিত কোনো সফল ‘লকডাউন’ হয়নি, আমরাই সরকারের দেওয়া বিধিনিষেধকে লকডাউন বলে আখ্যায়িত করেছি। লকডাউন মানে সব কিছু বন্ধ হয়ে যাওয়া, রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকা। এমন ছবি ইতালি, লন্ডন, নিউ ইয়র্কের দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের এই বিধিনিষেধেও তাই হতে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ লকডাউন ইংরেজি শব্দ হলেও বাংলায় বিধিনিষেধ, সাধারণ ছুটি, কঠোর বিধিনিষেধ ইত্যাদি অনেক নামকরণ করলেও এটাকে লকডাউনই বুঝেছে। এর অর্থ জনগণের কাছে দাঁড়িয়েছে সরকারের নির্দেশে অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকান পাট, গণপরিবহন, হাট বাজার, শিল্প-কলকারখানা সব এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ বন্ধ রেখে জনসমাগম হতে না দেওয়া। করোনা যেহেতু মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় তাই মানুষের সমাগম বন্ধ রাখা খুব জরুরি। করোনা সংক্রমণ বাড়তে না দেওয়ার জন্য এই সরকারি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, ফলে সঠিক বলেই ধরে নেওয়া হয়েছে। দুই হাজার বিশ সাল থেকে কয়েক দফা এভাবে বিধি নিষেধ আরোপ করা হলো, এক সপ্তাহের কথা বলে শুরু করে তা দুই মাসে গিয়ে ঠেকলো। একবার মেয়াদ শেষ হতে না হতেই আরও বাড়াতে গিয়ে মাসের পর মাসও পেরিয়ে গেছে। 

মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত কর্মজীবীদের জন্য নির্দেশনা এলো ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়িতে বসে কাজ করার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই প্রস্তাব দিয়েছে; এবং করপোরেট অফিস, এনজিও, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এমন নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছে। তারা মনে করে করোনাভাইরাস ঠেকাতে হলে ঘরের বাইরে বের হওয়া ঠিক হবে না। আইসিটি প্রযুক্তির কল্যাণে মধ্য ও উচ্চবিত্তের ঘরে ঘরে ইন্টারনেট সংযোগ থাকায় ওয়ার্ক ফ্রম হোম কার্যকর করা হলো। দেখা গেল এতে একটি কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ঘরে থাকা জরুরি, মোবাইল ফোনটাও এন্ড্রয়েড হতে হবে, নইলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হবে না। লকডাউনের প্রথম অবস্থায় ল্যাপটপ বেচা-কেনার খোঁজ নিলে জানা যেত অনেক পরিবারে কাজ রক্ষা করতে গিয়ে ধার করে হলেও ল্যাপটপ কেনা হয়েছে, বাড়িতে ওয়াই-ফাই সংযোগ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সব নারী কি ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম করতে পেরেছেন? তারা কাজ রক্ষা করতে পেরেছেন? অনেক নারী নীরবে চাকরি হারিয়েছেন তার ঘরে বসে কাজ করার সরঞ্জাম না থাকার কারণে; কিন্তু তাই বলে তাদের কাজ কমে যায়নি। কারণ ফ্ল্যাট বাড়িতে গৃহকর্মীদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি, তারা করোনা বহন করে আনবে বলে। তাই মধ্যবিত্ত নারীদের ঘরের কাজ করতে হয়েছে আগের চেয়েও বেশি, কারণ এখন স্বামী-সন্তান সবাই ঘরেই আছে। 

ওদিকে নিম্নবিত্ত ও গরিব মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মধ্যে পড়ে গিয়েছে। এখনো লকডাউন দিলে সে প্রশ্নই ঘুরে ফিরে উঠছে। দিন আনে দিন খায়, মাস গেলে বেতন না হলে যাদের চলে না, তাদের জন্য লকডাউন যে নামেই আসুক না কেন করোনার মতোই ভয়ংকর হয়ে যায়। করোনা দেখা যায় না, কিন্তু জীবিকা হারালে দিন শেষে বা মাস শেষে হাতে টাকা না থাকলে বেশ দেখা যায়। সকলের চোখে মুখে ফুটে ওঠে। বস্তিতে থাকা মানুষদের মধ্যে গৃহকর্মীরা ভালোই আয় রোজগার করছিল, তারা দ্রুত কাজ হারালো। মাসের পর মাস কোনো বাসাবাড়িতে তাদের বিনা কাজে বেতন দিয়ে রাখবে না। শুরুতে কেউ কেউ বেতন চালিয়ে নিলেও সেটা বেশি দিন করা সম্ভব হয়নি। 

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে সারা বিশ্বে প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লক্ষ শ্রমজীবী স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সেক্টরে কাজ করে, এর ৭০% নারী। বিশ্বের ৮০% গৃহ শ্রমিকই নারী। বাংলাদেশে গৃহ শ্রমিকের সংখ্যা আইএলও’র হিসাব অনুযায়ী ১ কোটি ৫ লক্ষ (২০১৩ সালের জরিপ), যার ৯০% নারী। অর্থাৎ সংখ্যার দিক থেকে গার্মেন্ট শ্রমিকের চেয়েও গৃহ শ্রমিক বেশি। প্রবাসেও বেশির ভাগ নারীদের কাজের সুযোগ দেওয়া হয় গৃহ শ্রমিক হিসেবে। করোনা এবং লকডাউনের কারণে এদের সিংহভাগই কাজ হারিয়েছেন।

বস্তিতে থাকা নারীদের কাজ কর্ম না থাকায় তারা ঢাকা শহর ছেড়েছে। অনেক গার্মেন্ট কারখানা কর্মী ছাঁটাই করেছে। প্রায় তিন লাখের ওপর নারী শ্রমিক কাজ হারিয়েছে বলে জানা যায়। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে কাজ হারাবার পর যখন তারা গ্রামে ফিরে গেলেন, বাপের বাড়ি কিংবা শ্বশুর বাড়িতে কিন্তু তাদেরকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানো হয়নি। এত দিন তারা প্রতি মাসে বাড়িতে টাকা পাঠাতেন, কারণ তাদের ছেলে মেয়েদের দাদা-দাদি বা নানা-নানির কাছে রেখে গিয়েছিলেন; কিন্তু এখন তারা ফিরে এসেছেন নিঃস্ব হয়ে। বস্তির বাড়িভাড়া এবং দোকানের ঋণ শোধ করে হাতে বেশি টাকা নিয়ে আসতে পারেননি। 

গ্রামে পুরুষের জন্য কিছু কাজ পাওয়া গেলেও নারীদের জন্য কোনো কাজ নেই। গ্রামে কাজ ছিল না বলেই তো তারা এতো কষ্ট করে আয় উপার্জনের জন্য শহরে গিয়েছিল। এই শহর তাদের কাজ ছাড়া আর কিছুই দেয় না। তাই একটু ছুটি হলেই তারা ছুটে আসে গ্রামে। লকডাউনের কারণে কাজ হারিয়ে যারা গেছে তাদের আবার চাকরি না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা শহরে ফেরা হবে না; কিন্তু গ্রাম তাদের নিয়ে কী করবে? 

তাদের সঙ্গে আরও যোগ হয়েছে প্রবাসী শ্রমিক। তারাও দলে দলে ফিরে আসছেন করোনার কারণে কাজ হারিয়ে। পুরুষ প্রবাসী শ্রমিকরা ফিরে আসলেও নারীদের আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আর যেসব নারী নিজেরাই প্রবাসে কাজ করে ফেরত আসছেন তারা ঋণ করে যাওয়ার খরচও হয়তো তুলতে পারেননি। 

ছোট বড় শহরে করোনার আগে নারীরা তাদের স্বল্প পুঁজি নিয়ে নানা ধরনের ব্যবসা শুরু করেছিলেন এবং মোটামুটি ভালোই করছিলেন। বুটিক, ক্যাটারিং, খাদ্যসহ নানা ধরনের কাজে নারীরা জড়িত ছিলেন যা দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মধ্যম উদ্যোক্তা (এসএমই) হিসেবে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। তারা দেশের প্রায় ৬০ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা জিডিপিতে ২৫% অবদান রেখেছে এবং ৭৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। তাদের কারণে প্রায় ৩ কোটি মানুষের, (বেশির ভাগ নারী) জীবিকার সংস্থান হয়েছে। গত দেড় বছরে তাদের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে। প্রায় ৫২% উদ্যোক্তা তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এবং তাদের সঙ্গে যারা কাজ করতো তারাও বেকার হয়ে গেছে। অনলাইন ব্যবসাও করা কঠিন হয়ে পড়েছে কারণ সেটা চালাতে হলেও যে উৎপাদন করা দরকার তা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। 

ভ্যাকসিনে কি নারী-পুরুষ সমতা আছে

ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে আনা ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে। এ পর্যন্ত সবার দুটি ডোজ দেওয়া সম্পন্ন হয়নি। একটি ডোজ নিয়েছেন ৫৪,৭০,১৩১ জন পুরুষ (৫৪%) এবং ৩৫,৮৫,১০১ জন নারী (৩৬%)। দুটি ডোজ পেয়েছেন ২৭,৮৯,৭৫৪ জন পুরুষ (৬৩%) এবং ১৫,৮০,২৩০ জন নারী (৩৬%) ডোজ নিয়েছেন। চার ধরনের ভ্যাকসিন এখন দেশে এসেছে, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার, সিনোফার্ম এবং মডার্না। তবে ফাইজার এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন এখন খুব হাতে নেই। সিনোফার্ম এবং মডার্নার ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। 

সাধারণ নারীদের জন্য ভ্যাকসিনের নিবন্ধন থেকে শুরু করে দিতে যাওয়ার প্রক্রিয়া খুব সহজ নয়। নারীদের জন্য আলাদা করে কোনো ব্যবস্থাও করা হয়নি। ভোটের লাইনের মতো নারীদের ভ্যাকসিন নেওয়ার আলাদা লাইন আছে বটে, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ নারী, যেমন বয়স্ক নারী, গর্ভবতী নারী ইত্যাদির জন্য আলাদা কোনো উদ্যোগ নেই। ভ্যাকসিন দেওয়াই যদি কোভিড ১৯ সংক্রমণ এবং ঝুঁকি কমানোর অন্যতম প্রধান উপায় হয়ে থাকে তাহলে নারী এই দৌড়ে পিছিয়ে থাকছে নিয়মের কারণে এবং নারীর সুবিধা অসুবিধার কথা বিবেচনায় না আনার কারণে। 

করোনায় অসমতা বৃদ্ধি? 

আমরা জানি, যে কোনো মহামারি বা অতিমারি বিদ্যমান অসম অবস্থাকে প্রকট করে তোলে। ধনি-গরিব, নারী-পুরুষ, ধর্মীয়, বর্ণ ও জাতি গোষ্ঠির অসমতা, শ্রমিক-মালিক, প্রতিবন্ধী, বয়স্ক-তরুণ ইত্যাদি নানা ধরনের অসম যা প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্য ছিল তা ফুটে উঠছে। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, অপ্রতুল টেস্ট করার সক্ষমতা, খাদ্য, ভ্যাকসিন এসব কিছুই কি আমরা সমানভাবে এবং প্রয়োজন অনুসারে সকলকে দিতে পারছি? বা সে চেষ্টা কি আছে? ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেই দেখা যাক না কেন। প্রথম যেভাবে দেওয়া হয়েছে তা মূলত মধ্যবিত্ত, যারা অনলাইনে নিবন্ধন করতে পেরেছে তারাই পেয়েছে। আর যখন সীমিতসংখ্যক টিকা নিয়ে ‘গণটিকা’ দিচ্ছে তখন তা এমনই গণ হয়েছে যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে টিকা ছাড়াই বাড়ি ফিরতে হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে, নারীকে তো বটেই। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে তারা করোনা নিয়ে ফেরেনি এমন নিশ্চয়তা কি দিতে পারছেন? 

আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকতে হলে অন্তত ৭০% মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে, সেখানে আমাদের টিকা দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩%। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (১০ আগস্ট, ২০২১) জানাচ্ছে, টিকার প্রথম ডোজের আওতায় এসেছে ১ কোটি, ৪৭ লাখ, ৬৯ হাজার ৪৪৭ জন, টিকার ২য় ডোজের আওতায় এসেছে ৪৯ লাখ, ২ হাজার ১৭৩ জন। এটা সবাই জানে টিকার দুটি ডোজ সম্পন্ন না করা হলে গ্রহীতার শরীরে এন্টিবডি তৈরি হবে না, ফলে টিকা দিয়ে যে সুরক্ষা পাওয়ার কথা ছিল তা অর্জন করা যাবে না। নিজ দেশে টিকা উৎপাদনের কোনো উদ্যোগ না থাকায় ভারত, চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভ্যাকসিন উপহার, দেওয়া বা কিনে আনতে হচ্ছে। আমাদের প্রয়োজন কয়েক কোটি ডোজ টিকার, আমাদের টিকা আসছে মাত্র কয়েক লাখ। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অর্ডার করা ৩ কোটি ডোজ কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনের মধ্যে মাত্র ৫০ লাখ ডোজ পেয়েছে, এর সঙ্গে ভারত উপহার হিসেবে দিয়েছে ২০ লাখ ডোজ। চিন থেকে ৫ লাখ ডোজ সিনোফার্ম ভ্যাকসিন উপহার হিসেবে এসেছে। GAVI vaccine alliance থেকে বাংলাদেশ ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ পাবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে মডার্না, ফাইজার, জনসন অ্যান্ড জনসনের ভ্যাকসিনও সীমিতভাবে এসেছে এবং দেওয়া হয়েছে। সব যোগ করলেও বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়সংখ্যক ভ্যাকসিন হবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। অথচ দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া দরকার তা না করে ভ্যাকসিন কূটনীতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে যা আমাদের জন্য মোটেও সম্মানজনক নয়। 

অথচ উৎপাদনের জন্য এই মহামারিতেও ভ্যাকসিনের Intellectual Property Rights Agreement (TRIPS) বিশ্বের বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের হাতে রেখে দিয়েছে যেন তারা এই ব্যবসা করে মুনাফা করতে পারে। ইতিমধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় ভ্যাকসিনের ওপর ঞজওচঝ সাময়িকভাবে শিথিল করে উন্নয়নশীল দেশসমূহকে নিজ দেশে উৎপাদনে সহায়তার দাবি উঠেছে। তাহলে সকল দেশ স্বল্প খরচে ভ্যাকসিন উৎপাদন করে মহামারি মোকাবেলা করতে পারবে। ভ্যাকসিন নিয়ে ব্যবসা ও রাজনীতির বিরুদ্ধে অনেকেই দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘Feminists for People’s Vaccine’ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারীবাদীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই জোট কোভিড-১৯ নিয়ে যে জাত, বর্ণ, লিঙ্গ, ধর্মসহ নানারকম বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। 

তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা এবং তার ভিত্তিতে সঠিক নীতি ও কৌশল গ্রহণ করবার কোনো কার্যকর প্রতিষ্ঠান আমরা সরকারি বা বেসরকারি কোনো পর্যায়েই গড়ে তুলতে পারিনি। এর কুফল জনগণ ভোগ করছে। এর অবসান কীভাবে হবে কে জানে!  

১২ আগস্ট, ২০২১


লেখক : প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকার কর্মী

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //