দায়-দায়িত্বহীন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কিছু কথা

দেশের একটি পুরনো দৈনিকে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে কিছুদিন আগে- ‘২৮ হাজার বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষক নেই।’ শিক্ষানীতির আলোকে সরকার প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা সারাদেশে চালু করে। ২০১০ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা চালু করা হয়েছিল, যা ২০২০ সাল থেকে দুই বছর মেয়াদি করার সিদ্ধান্ত ছিল।

করোনা মহামারির কারণে প্রায় দেড় বছর দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পর ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১ আবার খুলেছে। যদিও এখনই প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা চালু না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। শিক্ষানীতিতে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুর সুপারিশ হয়েছিল, ২৮ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রেখে এই লক্ষ্য কতটুকু পূরণ সক্ষম, তা বিবেচনার দাবি রাখে। এ ধরনের জোড়াতালির প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ২৮ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনতে পারার কথা নয়। বরং অনুসন্ধানে দেখা যাবে প্রাগুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ‘গোদের ওপর বিষফোঁড়া’। দেশের বিভিন্ন দপ্তরে যে জনবল সংকট রয়েছে তা সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সবসময় বলে থাকেন ম্যানেজ করে নাও। দেশে কি শিক্ষা ব্যবস্থাও ম্যানেজ করে চালানো হবে?

জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘শিশুদের জন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরুর আগে প্রয়োজনীয় মানসিক ও দৈহিক প্রস্তুতি গ্রহণের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। তাই তাদের জন্য বিদ্যালয়-প্রস্তুতিমূলক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা জরুরি। অন্যান্য শিশুর সঙ্গে একত্রে এই প্রস্তুতিমূলক শিক্ষা শিশুর মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। কাজেই ৫+ বছর বয়স্ক শিশুদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করতে হবে।’

শিক্ষানীতির সুপারিশকে সামনে রেখে সরকার ২০১০ সালেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে এবং ১২ লাখ ২২ হাজার ৫৯৭ শিক্ষার্থীকে ভর্তি করে, এ সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে গত বছর, প্রায় ৪০ লাখ শিশু প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি হয়। এ কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক আর শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতকে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন; কিন্তু দেশে যেখানে ৪০ শতাংশের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের শিক্ষকই নেই, সেখানে নিবিড় পরিচর্যার স্বপ্নকে সোনার হরিণ ছাড়া কিই বা বলার আছে? প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেই শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে। প্রশ্ন হলে এই যে দীর্ঘ সময় শিক্ষকবিহীন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা হলো, তার ফলে আমাদের শিশুদের যে ক্ষতি হয়ে গিয়েছে তা পূরণ হবে কীভাবে? এই দুর্বলতা শিক্ষার প্রতিটি ধাপে পরিলক্ষিত হবে, যা শিক্ষাকে মানসম্মত করার অন্তরায় হিসেবেই থেকে যাবে। 

জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কৌশল হিসেবে সুপারিশ করা আছে এ রকম- ‘শিশুদের স্বাভাবিক অনুসন্ধিৎসা ও কৌতূহলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তাদের স্বাভাবিক প্রাণশক্তি ও উচ্ছ্বাসকে ব্যবহার করে আনন্দময় পরিবেশে মমতা ও ভালোবাসার সঙ্গে শিক্ষা প্রদান করা হবে। শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে যেন তারা কোনোভাবেই শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের শিকার না হয়।’ আর এই কৌশল বাস্তবায়ন করতে শিক্ষানীতিতে যে পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে- ‘প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য প্রতি বিদ্যালয়ে বাড়তি শিক্ষকের পদ সৃষ্টি ও শ্রেণি কক্ষ বৃদ্ধি করতে হবে। তবে সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় এ কাজটি দেশের সকল বিদ্যালয়ে একইসঙ্গে বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।’ দুর্ভাগ্য, শিক্ষক নিয়োগ ও শ্রেণিকক্ষ বৃদ্ধিসহ প্রাক-প্রাথমিকের শ্রেণি কক্ষ সাজাতে যেসব উপকরণ প্রয়োজন, তার জন্য যে বাজেট বরাদ্দ জরুরি ছিল, তা বিবেচনায় আনা হয়েছে এমন নজির এখনো দেখা যায় না।

স্বাধীনতার পর থেকে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি ইথারেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতার্থে ১৯৭২ সালে যত শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল তার থেকে শতকরা হার প্রতি বছরই কমছে। দেশের শিক্ষানুরাগীদের দাবি শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের, অথচ তা আজও ২ শতাংশের ধারে কাছে ঘোরাফেরা করছে। শিক্ষা খাতের উন্নয়ন করে মানসম্মত, বিজ্ঞানমুখী, কল্যাণমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা সবকিছুই বাজেট বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল। আর এ জন্য প্রয়োজন সরকারগুলোর আন্তরিকতা, মানবিক দৃষ্টিতে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবন। শুধু শিক্ষানীতি তৈরি করে কাজির খাতায় রেখে দিলে লাভের লাভ কিছু হবে বলে মনে হয় না। 

দেশের সর্বত্র জনবল সংকট প্রকট। একমাত্র প্রশাসনের ক্ষেত্রে পদের ২/৩ গুণ ব্যক্তিকে পদায়ন করা হয়ে থাকে। এ বাদে সর্বত্র পদ সৃষ্টি, নিয়োগ, পদোন্নতিতে দশক-যুগ অতিক্রম হয়ে যায়। শিক্ষা খাতেও একই ধারায় চলমান। প্রাক-প্রাথমিক চালু হয়েছে ১০ বছর; কিন্তু আজও শিক্ষক নিয়োগ শেষ করা যায়নি। সাধারণ, কারিগরি শিক্ষা সর্বত্রই শিক্ষকের আকাল। সারাদেশে একটি সরকারি স্কুল-কলেজ-পলিটেকনিকের কথা কেউ বলতে পারবে না যেখানে শিক্ষক স্বল্পতা নেই। সরকারি নীতি অনুযায়ী কোনো কলেজে অনার্স চলমান থাকলে সেখানে ৭ জন শিক্ষক থাকার নির্দেশনা থাকলেও তা তো নেই বরং খোঁজ করলে এক বা দু’জন শিক্ষক দিয়ে অনার্স শিক্ষার কার্যক্রম চলমান রয়েছে, এমন চিত্র পাওয়া যাবে। ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকা ব্যক্তিরা দেশে যে মানসম্মত শিক্ষা হচ্ছে না, তার পুরো দায় শিক্ষক আর কিছুটা শিক্ষার্থীদের কাঁধে চাপিয়ে দায়িত্ব শেষ করে।

বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের পদ শূন্য রেখে সর্বত্র মানসম্মত শিক্ষা কীভাবে পাওয়া সম্ভব, সে বিষয়টি কারও ভাবনার মধ্যে আছে বলেই মনে হয় না। সরকার যদি শিক্ষাকে উন্নয়নের প্রধান উপাদান বিবেচনা করে থাকে, তাহলে শুধু প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার স্তর নয়; শিক্ষার সকল ক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। তবে শিক্ষা নিয়ে আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার বহর দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, সাধারণ জনগণের জন্য শিক্ষাকে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? 

আমাদের পাহাড়সম উন্নয়ন ও অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না সাধারণ মানুষ। স্বাধীনতার ৫০ বছর পালনকালে দেখা যায়, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা মূলত বিভেদ-বৈষম্য সৃষ্টি করে চলেছে। সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনোটাই আমাদের এ শিক্ষা দেয় না। উন্নয়ন ও অগ্রগতি সবসময়ই চলমান, তা কোনো সময় থেমে থাকে না। আমরাও থেমে নেই, সবকিছু নিজের করে তোলার প্রবণতা নিয়ে আর তা রক্ষার জন্য লাঠির ব্যবস্থার শক্ত করে। শিক্ষা মানুষকে চাক্ষুস্মান করে তাই খুব যত্নের সঙ্গে শিক্ষাকে আস্ফালনের গুরুত্বের মধ্যে রাখা হয়েছে। করোনাকালেও দেখা গেল দেশের এই ক্ষেত্রকে বাঁচাতে শুধু সাধারণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা হলো। এক পর্যায়ে যেখানে কাওমি মাদ্রাসা পর্যন্ত খুলে দেওয়া হলো, সেখানে বন্ধ রাখা হলো সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেখানে রাষ্ট্র প্রদত্ত সুবিধা এবং জনগণের সামর্থ্য বিবেচনা না করে নতুন নতুন পদ্ধতির আগমন ঘটানো হলো। অথচ বাস্তবতা হলো, শিক্ষা খাতকে আস্ফালন মুক্ত করা না গেলে আকাশ ছোঁয়া বৈষম্য থেকে মুক্ত হওয়া যাবে না।

গ্রামের স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক পরিচালনার চিত্র সরকারের আন্তরিকতারই কদর্য-কঙ্কালসার বহিঃপ্রকাশ। নতুন একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়-শিক্ষক-শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে যে ধারণা পাচ্ছে, তা থেকে জাতিকে মুক্তি দেয়ো জরুরি। প্রাক-প্রাথমিক তো এতদিন ছিল না। আজ ভালো করতে গিয়ে বিরূপ শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন কি? সরকারের সামর্থ্য না থাকলে প্রাক-প্রাথমিক বন্ধ করে দেওয়া হোক আর সামর্থ্য যদি থাকে তবে সুন্দর ও সুচারুভাবে চালু রাখা হোক। নবীন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষার নামে প্রতারণা বন্ধ করা হোক।

লেখক- সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //