অপরিকল্পিত নগরায়নে বিপন্ন পরিবেশ

ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায় তাঁর এক প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্র যদি এমন একটি শিল্পমাধ্যম হতো যার কিনা ঘ্রাণেন্দ্রিয় আছে অর্থাৎ কোনো কিছুর গন্ধ শুকতে পারত, তবে স্লাম ডগ মিলিওনিয়ার এর মতো ছবি অস্কার জিততে পারত না।’ কথাটি তিনি মূলত ভারতীয় বড় বড় শহরগুলোর অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠা ক্রমবর্ধমান দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বসবাসের অনুপযোগী নগরের কথা বিবেচনা করে বলেছেন।

জাপানি চিন্তাবিদ দার্শনিক দাইসাকু ইকেদার মতে, ‘শিল্পের বর্জ্য পদার্থগুলো যদি স্পষ্ট করে চিহ্নিত করা যায় এবং কোথায় আছে খুঁজে বের করা যায়, তবে সেগুলোকে বন্ধ করা অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু শহরবাসী প্রতিটি লোকই যেহেতু কোনো না কোনোভাবে নানা ধরনের দূষণের কারণ, তাই এ ধরনের পরিবেশ ধ্বংসের সমস্যার সমাধান আরো জটিল। অতীতে একবার শহর সংগঠিত হয়ে গেলে এবং সহজভাবে চলতে থাকলে সে নিজেই তার উদ্ভূত নিষ্কাশিত ময়লা এবং অন্যান্য দূষণ সামলাতে পারত।

এখনকার দিনে সভ্যতার অগ্রগতি দূষণ এমন মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছে যে সাবেক শহরের কাঠামোয় আর তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যায় না। প্রশাসনিক নিয়ম, আইন কানুন এবং পৌর আন্দোলন এ ধরনের দূষণ যদিও দূর করতে পারে তবুও শহরের লোকদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ একইসঙ্গে দোষী এবং ভুক্তভোগী।’ তবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় বড় নগরীর নাগরিকদের ক্ষেত্রে দোষের তুলনায় ভুক্তভোগীই বেশি বলতে হবে। 

সম্প্রতি এক রিপোর্টে দেখা গেছে, গত এক বছরে বিশ্বের প্রধান শহরগুলোর বসবাসযোগ্যতা নিয়ে যে কয়টি জরিপ হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগেই ঢাকার অবস্থান ছিল তলানিতে। গত কয়েক বছর ধরে ঢাকার অবস্থান ক্রমাগত নিচে নেমেছে।

১. কম বসবাসের যোগ্যতা ও বায়ুদূষণে দ্বিতীয়। 

২. জনসংখ্যা ও কম নিরাপত্তায় ৬ষ্ঠ। 

৩. যানজটে নবম। 

৪. ৩০ বছরে সবুজ এলাকা ১৭ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নেমেছে।

বায়ুদূষণে বাংলাদেশের অবস্থান সবার ওপরে। বিশ্বের বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ এখন অন্যতম সমস্যা। কয়েক বছর ধরে ঢাকা সবচেয়ে দূষিত বাতাসের পাঁচটি শহরের মধ্যে রয়েছে। আর শহরের তালিকায় দিল্লির পরেই রয়েছে ঢাকার নাম। এর আগের বছরও ঢাকা এই অবস্থানে ছিল।

তবে ঢাকায় আগে বায়ু দূষণের জন্য ইটভাটাগুলো বিশেষভাবে দায়ী থাকলেও বর্তমানে তা যানবাহনের ধোঁয়ার কারণে বেড়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। অর্থাৎ কংক্রিটের উন্নয়ন ও অতিরিক্ত মানুষের চাপ বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে বলাই বাহুল্য। এ ছাড়া অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশ দূষণের অন্যতম অনুষঙ্গ। হোটেল ও রেস্টুরেন্টের আবর্জনা, শিল্প কারখানা থেকে উৎপাদিত আবর্জনা, মেডিকেল বর্জ্য, রান্নাঘরের পরিত্যক্ত আবর্জনা, হাটবাজারের পচনশীল শাকসবজি, কসাইখানার রক্ত, ছাপাখানার রঙ ইত্যাদি বর্জ্যর অন্যতম উৎস।

বর্জ্যর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মেডিকেল বর্জ্য। বর্ষা মৌসুমে সময়মতো বর্জ্য অপসারণ না করা হলে বর্জ্যসমূহে দ্রুত পচনপ্রক্রিয়া শুরু হয়, পচা বর্জ্য থেকে তরল, কালো রঙের দুর্গন্ধযুক্ত লিচেট (রস) তৈরি হয়। এই লিচেট বৃষ্টির পানির সঙ্গে নদীনালা এবং মাটির বুনটের ফাঁকা স্থানের মধ্য দিয়ে গ্রাউন্ড ওয়াটারে গিয়ে মিশে গিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করে ফেলে। 

নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলামের মতে, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশির ভাগ বৈশ্বিক সূচকে ঢাকার অবস্থানের অবনতি হয়েছে কয়েকটি কারণে। প্রথমত, এই শহরের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু যাঁরা এই শহরে নতুন করে আসছেন, তাঁদের বেশির ভাগই দরিদ্র। ফলে তাঁরা আর্থিক কারণে শহরে নিজেরা নাগরিক সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন না। আবার নগরের সামগ্রিক পরিবেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছেন না। এই শহরকে সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় আনার জন্য একের পর এক পরিকল্পনা হচ্ছে; কিন্তু তার বেশিরভাগের কোনো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে শহরের সামগ্রিক পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের অবনতি হচ্ছে’।

ঢাকা শহর নিয়ে সম্প্রতি করা কয়েকটি গবেষণায় বসবাসের জায়গা হিসেবে ঢাকার এই অবনতি ধরা পড়েছে। এসব গবেষণায় ঢাকায় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি নগর ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যা ধরা দিয়েছে। একটি সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর নগরের জন্য আয়তন অনুযায়ী জনসংখ্যা সীমিত রাখা, গাছপালা ও জলাভূমি রক্ষা করা আর বায়ু-মাটি দূষণ নিয়ন্ত্রণে রাখাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন বিশেষজ্ঞরা। এই সবগুলো ক্ষেত্রে ঢাকার অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে। 

জাতিসংঘের হিসাবে বিশ্বের একটি স্বাস্থ্যকর শহরের প্রতি একর এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ জন নাগরিকের বসবাস করা উচিত। এটা সর্বোচ্চ ১২০ জন পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু ঢাকার এক তৃতীয়াংশ এলাকায় তা ৭০০ থেকে ৮০০ জন। 

আর সামগ্রিকভাবে তা ৩০০ জন। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শহর জাপানের টোকিওতে মোট ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাস করে। কিন্তু সেখানে প্রতি একরে ৯০ জনের কম মানুষ বাস করে। সিঙ্গাপুরের মতো বহুতল ভবনসমৃদ্ধ শহরে তা ৮০ জন, সিডনিতে ৫৮ জন ও নিউইয়র্কে ১১২ জন।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ সালেও ঢাকা শহরের ১৭ শতাংশ এলাকা ছিল সবুজ গাছপালায় ঘেরা। বিশ্বের স্বাস্থ্যকর ও সুন্দর পরিবেশের শহরগুলোতে এই বৈশিষ্ট্য থাকে। কিন্তু ২০২০ সালে অর্থাৎ মাত্র ৩০ বছরে তা ২ শতাংশে নেমে এসেছে। মূলত ২০০৯ সাল থেকে ঢাকার সবুজ ও জলাভূমি এলাকা দ্রুত হারে কমেছে। শহরের নতুন আবাসিক এলাকাগুলোতে কিছু কিছু গাছপালা বাড়লেও তা সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় খুবই কম। 

রাজধানী ছাড়াও নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হওয়ায় ঢাকায় কয়েকগুণ বেশি মানুষের বসবাস, যার চাপ পড়ে সর্বত্র। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক নগরী এর মূল ভিত্তি। জনসংখ্যার ব্যাপক চাপ ও শহর ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনা ও সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে এইসব শহরের সামগ্রিক পরিবেশের দ্রুত অবনতি হচ্ছে।

এক্ষেত্রে নগর সম্প্রসারণ খুব একটা উপকারে আসবে না বলাই বাহুল্য, কারণ চারদিকে নদী রেখে ৪০০ বছর আগে যে রাজধানী গড়ে উঠেছিল- উন্নয়নের ছোবলে, অপরিকল্পিত নগরায়নে তার অবস্থান এখন আইসিইউতে। এক্ষেত্রে দেশের বড় বড় জেলা এবং বিভাগীয় শহরগুলোকে এক একটা ইকোনমিক জোন হিসেবে গড়ে তুলে রাজধানী শহর ও বণিজ্য নগরী কেন্দ্রিক যে ধাবমান গণ বিস্ফোরণ এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে যে পরিবেশ দূষণ তা অনেকটা প্রশমিত করা সম্ভব।

এ ছাড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনো সরকারি নথিতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের যেসব এলাকা সবুজ ও জলাভূমি হিসেবে চিহ্নিত ছিল এসব খাল, নদী, লেক, পাহাড় ও উদ্যানের জমি দখলমুক্ত করে নাগরিকের ব্যবহারের জন্য ফিরিয়ে দিলে এইসব নগরী বসবাসযোগ্যতার দিক থেকে কিছুটা উন্নত হবে।


লেখক: কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //