প্রলয়ঙ্করী বন্যা আর প্রকৃতিবিনাশী পরিকল্পনা

কোলের সন্তান নিয়ে মায়ের শুকনো জায়গা খুঁজে বেড়ানো, খাদ্যের জন্য হাত বাড়ানো মানুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার অসহায় চাহনি, গবাদি পশু আর মানুষের গাদাগাদি করে থাকার ছবি প্রচার মাধ্যমে ভেসে বেড়িয়েছে। কী হারায়নি মানুষ এই বন্যায়!

মাথার উপরে ছাদ নেই, পায়ের নিচে শুকনো মাটি নেই, জমির ফসল, গোলার ধান, পুকুরের মাছ, রাস্তাঘাট, দোকানপাট সব ভেসে গেছে, ভেসে গেছে বই খাতা শিক্ষা উপকরণসহ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। ভয়াবহ বন্যায় সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ সারাদেশের ৩৫টি জেলার ৭৩টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছিল। এর মধ্যে সিলেট অঞ্চলের বন্যার ভয়াবহতা ছিল তীব্র। সুনামগঞ্জের প্রায় ৯০ শতাংশ আর সিলেটের ৬০ শতাংশ জায়গা প্লাবিত হয়েছে এই বন্যায়। 

এটাই তো শেষ নয়। জুলাই এবং আগস্ট মাসে আবার বন্যা আসবে। বাংলাদেশ বন্যার দেশ। বন্যার সঙ্গেই বসবাস আমাদের। বাংলাদেশ বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চার ধরনের বন্যা হয়। এগুলো হচ্ছে-

১. মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাবে নদ নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত বর্ষাকালীন বন্যা। 

২. আকস্মিক (পাহাড়ি ঢল) বন্যা। এই বন্যা বাংলাদেশের উত্তরের কিছু এলাকা, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে হয়ে থাকে। 

৩. অপ্রতুল নিষ্কাশন ব্যবস্থাজনিত বন্যা। এ ধরনের বন্যা সাধারণত পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় মাঝারি বা ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে পানি জমে বিভিন্ন এলাকায় বন্যা দেখা দেয়। এই বন্যার পানি খুব ধীরে কমে এবং দীর্ঘমেয়াদি হয়।

৪. সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে ঝড়-সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস বা জোয়ারের উচ্চতাজনিত বন্যা। 

পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে ভারতের চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে। সেখানে এবার একটানা তিন দিন বৃষ্টিপাত হয়েছে, ২৪৮৭ মিলিমিটার। চেরাপুঞ্জির ভাটি এলাকা হিসেবে এই পানি ঢল হিসেবে নেমে এসেছে সিলেট অঞ্চলে। অতীতে এরকম ধারাবাহিক বৃষ্টি খুব কম দেখা গেছে। চেরাপুঞ্জিতে যখন বৃষ্টি হয়, সেটা ছয় থেকে আট ঘণ্টার ভেতরে তাহিরপুরে চলে আসে। কিন্তু সিলেট অঞ্চলে এসে পানি আর দ্রুত নামতে না পারায় সেটা আশপাশে ছড়িয়ে বন্যা তৈরি করে। 

এ কারণে মেঘালয় বা আসামে বেশি বৃষ্টিপাত হলেই সিলেট বা কুড়িগ্রাম এলাকায় বন্যা তৈরি হচ্ছে বলে গবেষকরা মনে করেন। কিন্তু কে বা শোনে কাহার কথা! এবারের হঠাৎ বন্যার পর এসব কারণকে কি আর উপেক্ষা করা যাবে? আগে জলাভূমি, ডোবা, খাল, নদী থাকায় অনেক স্থানে বন্যার পানি ধরে রাখা যেত। কিন্তু এখন তার কোনো উপায় নেই। হাওরের ভূপ্রকৃতি বিবেচনা না করে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা তৈরির কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া বন্যার অন্যতম কারণ।

আমাদের দেশে উজান থেকে পানি নামে উত্তর থেকে দক্ষিণে। হাওরে যে সমস্ত রাস্তা তার বেশিরভাগ পূর্ব-পশ্চিমে তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোই হাওরের পানি চলাচলে মূল বাধা তৈরি করছে। হাওরে যেসব সড়ক বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হচ্ছে, তা পরিকল্পিতভাবে কেন করা হয়নি জবাব চাওয়ার সময় এসেছে এখন। 

সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যাকবলিত সুনামগঞ্জ জেলার হাওর এলাকায় যেসব সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, তার বেশিরভাগই এখনো ‘অল সিজন’ বা ‘সাবমার্সিবল’ সড়ক। এক্ষেত্রেও কোনো বিজ্ঞানসম্মত ভাবনা অনুসরণ করা হচ্ছে না। অথচ আমাদের অঞ্চলে বন্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভাবনা এবং গবেষণা হয়েছে। 

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তার আত্মচরিতে ১৯২২ সালে উত্তরবঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের বন্যা সম্পর্কে বলেছেন, ‘প্রজাদের আবেদন গ্রাহ্য করিয়া যদি রেলওয়ের সংকীর্ণ কালভার্টগুলো বড় সেতুতে পরিণত করা যাইত, তবে এই বন্যা নিবারণ করা যাইত।...সম্প্রতি প্রসিদ্ধ জলশক্তি বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার স্যার উইলিয়াম উইলকক্স যেসব বক্তৃতা করিয়াছেন, তাহার দ্বারা বাঁধ নির্মাণ করিবার অসারতা প্রমাণিত হইয়াছে।’ ১৯২২ সালের বন্যা নিয়ে ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকার এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, বন্যার জন্য দায়ী নদী নয়, অতিবৃষ্টি নয়, দায়ী ব্রিটিশের তৈরি রেলপথ। স্থপতি ড. বেল্টলিকের মন্তব্য ছিল এ রকম, যেসব প্রকৌশলী ওই অঞ্চলে জেলা বোর্ড ও রেলওয়ের রাস্তাগুলো নির্মাণ করেছেন, তাঁরা এ দেশের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথগুলোর কথা ভাবেননি। বন্যার কারণ বাংলার নদ-নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বিঘ্নিত করে রেলপথগুলো। 

১৯০৭ সালে ইন্ডিয়ান মিরর পত্রিকায় লেখা হয়, রেললাইন বাঁচাতে গিয়ে দামোদরের পূর্বপাড় বরাবর বাঁধ নির্মাণের পর বর্ধমান ও হুগলি জেলার জলাভূমিগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়নি। ১৯১৭ সালে তৈরি করা হয় হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইন। এভাবে ১৯ শতকের মধ্যভাগ থেকে নদ-নদীর পাড়ে বাঁধ নির্মাণের ফলে শাখা নদ-নদীগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফল ১৯৪৩ সালে দামোদরের ভয়াবহ বন্যা, যার তোড়ে দামোদরের বাঁধ, জিটি রোড ও রেললাইন ভেঙে গিয়ে কলকাতা উত্তর ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শাখা নদ-নদীগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে বালুতে ঢেকে ও মজে মৃতপ্রায় হয়ে যায়। 

বাংলাদেশ মূলত প্লাবনভূমি। এই ভূখণ্ড গড়ে ওঠার ইতিহাস হচ্ছে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া পানি আসবে, আবার তা বেরিয়ে সমুদ্রে যাবে। আসা যাওয়ার পথ বন্ধ করা তো এই ভূখণ্ডের গড়ে ওঠার নিয়মের পরিপন্থী। কিন্তু নদীর পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে হাজার হাজার একর জমিতে বালি পড়ে গেছে। কারণ যে পানি ঢুকেছিল সেটি বের হতে পারেনি।

বাংলাদেশ একটি বৃহত্তম বদ্বীপ, শুধু তাই নয়, জীবন্ত বদ্বীপও বটে। যেকোনো বদ্বীপের জন্যই বর্ষাকালে পানির ঢল নামাটা খুব জরুরি; মাছ থেকে শুরু করে ফসল ও বাস্তুসংস্থানের জন্য। হাওরে যদি পানি না আসে তাহলে মাছও হবে না, ফসল চাষ করাও সম্ভব হবে না। কারণ বন্যা মূলত মিষ্টি পানির প্রবাহ। এই প্রবাহ সমুদ্র থেকে আসা নোনা পানির স্রোতকে সরিয়ে দেয়। 

তাই নিয়মিত এবং নিয়ন্ত্রিত বন্যা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ কাজ করার কথা ছিল। বন্যার পানি না হলে মাটির জৈব পদার্থ, উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে না। আর কৃষি ক্ষেত্রে ফসল উৎপাদন অনেকটাই বর্ষাকালের ঢলে বয়ে আনা পানি এবং পলির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এসব বিবেচনায় না নিয়ে অপরিকল্পিত উন্নয়নের মোহে বা অনুকরণের প্রবণতায় আমরা প্রকৃতির রুদ্র রোষের শিকার হচ্ছি। 

প্রাকৃতিক বন্যা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দুর্নীতি আর লুণ্ঠন সাধারণ মানুষের জীবনে নামিয়ে এনেছে ভয়ানক দুর্ভোগ। গবেষকরা বলছেন, প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয় এই সব দুর্যোগে। এই দুর্যোগে দুর্ভোগ পোহায় তো সাধারণ মানুষ, হাড় ভাঙা শ্রমে আবার তারা গড়ে তোলে তাদের বাড়িঘর, ফসল ফলায়, ঋণের কিস্তি শোধ দেয় আর অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে গিয়ে নিজেরা শোষণের চাকায় পিষ্ট হয়। প্রকৃতিকে জয় করা মানে প্রকৃতিকে পরাজিত করা নয়, প্রকৃতির নিয়ম জেনে তাকে কাজে লাগিয়ে জীবনকে সহজ করা। বন্যার ভয়াবহতায় শুধু ত্রাণ দেওয়া নয় পরিত্রাণ পাওয়ার শিক্ষা কি আমরা নেব না?


লেখক- সহ-সাধারণ সম্পাদক, বাসদ

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //