সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিজাত সংকটের নেপথ্যে

অতিসম্প্রতি ঘটে যাওয়া নড়াইলের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত দুর্গাপূজার সময়ে যে সব ঘটনা ঘটেছে, বছর কয়েক আগে চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধমন্দির ও প্যাগোডা পোড়ানো এবং সংখ্যালঘু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ঘর-বাড়ি পোড়ানোর ঘটনা এবং  সেই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে একের পর এক এরূপ নানা রঙবেরঙের যে বহু ঘটনা ঘটে চলেছে, এগুলোর একটিও কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

এসব ঘটনার যোগসূত্র, উদ্দেশ্য ও পরিণতি একসূত্রে গাঁথা। এই সবই যে একটি মূল কেন্দ্র থেকে স্থূল ও নোংরা কৌশল খাটিয়ে তৈরি খুবই পরিকল্পিত ঘটনা, এটি বোঝার জন্য বেশি বুদ্ধি খরচের প্রয়োজন পড়ে না। 

একদিকে দেশের ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো নিয়ে এই অভিন্ন ঘটনাগুলোর সূত্র সম্পর্কে একটি সাধারণ পপুলার মতামত আছে যে, এগুলো বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের চিরায়ত ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিজাত বিস্ফোরণ। কথাটা সত্য হলেও স্বাধীন বাংলাদেশে প্রায় চার দশক ধরে ধর্মীয়  বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি চালিত  ছোট-বড় যে সকল বিস্ফোরণ ঘটেছে ও ঘটছে তার আদি কারণ ‘ধর্ম’ হলেও তার চেয়েও বড় কারণ হলো রাজনীতি। ধর্মীয় কারণই যদি এসবের একমাত্র কারণ হতো তাহলে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিজাত বিস্ফোরণ, স্বাধীন বাংলাদেশে যে পরিমাণে ও যে মাত্রায় ঘটেছে ও ঘটছে তার চেয়ে আরও বহুগুণ বেশি পরিমাণে ও বেশি মাত্রায় ঘটত, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে পুরো পাকিস্তান আমলে ও তারও পূর্বেকার আমলে। কিন্তু ইতিহাস তা প্রমাণ করে না।  

এ কারণেই নিশ্চিত করে বলা যায়, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি চালিত যে সব বর্বরতা স্বাধীন বাংলাদেশে ঘটছে তার মূলে হলো রাজনীতি। সাধারণভাবে যে, সরকার ও বিরোধী দলের ক্ষমতার রাজনীতি বলা হয়, এটি মূলত তা নয়। এটি সরকার ও বিরোধী দলের বাইরে নেপথ্যে থেকে পরিচালিত ভিন্ন চরিত্রের ও ভিন্ন মাত্রার রাজনীতি। এই অদৃশ্য রাজনীতির বেনিফিশিয়ারি প্রধানত দেশের সরকারও  নয়, বিরোধী দলও নয়, জনগণ তো নয়ই। সরকার যে বেনিফিশিয়ারি নয় তার প্রমাণ হলো দেশে এ ধরনের  বর্বরোচিত ঘটনা চলতে থাকলে সরকারি দলের বরং ক্ষমতা হারানোরই ভয়। আর বিরোধী দলগুলোর তো দেশ ও জনগণের স্বার্থের সুস্পষ্ট রাজনীতিই নেই। জাতীয় রাজনীতির আপন সত্তা না থাকার কারণেই এই দুরবস্থা।

জাতীয় রাজনীতির বাইরে ভিন্ন মাত্রার নেপথ্য রাজনীতি তৈরি হলো কীভাবে? একাত্তরের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের ও তার পূর্বাপরের নানা জটিল টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে দেশে যে রাজনৈতিক আবহ তৈরি হয়, তারই এক অংশ হলো এই ভিন্ন মাত্রার নেপথ্য রাজনীতি। এই রাজনীতির মধ্যেই যে এক ‘গুপ্তশক্তি’ লুকিয়ে আছে, সেই শক্তি এই পশ্চাৎপদ অবিকশিত সংস্কৃতির দেশে সাধারণ জনগণের এক অংশের ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিকে ব্যবহার করে ঘটায় এ রকম বর্বরোচিত সাম্প্রদায়িক বিস্ফোরণ। সেই শক্তির দ্বারাই এই রাজনীতির মধ্যে তৈরি হয়েছে একটি গ্যাং। বাস্তব কারণেই অনুধাবন করা যায়, সমাজে এরা বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ‘আইকন’, যারা সবসময়ই থাকেন ক্ষমতার রাজনীতি ও বিরোধী দলের রাজনীতির বাইরে এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। দেশে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিজাত সংকট সৃষ্টিতে এরাই কৌশলী কলকাঠি নাড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত যত সরকার ক্ষমতায় এসেছে তারা কেউই এই সংকটের শেকড় উৎপাটন করতে পারেনি। 

এখন কথা হলো, সংকটের ডালপালা, শাখা-প্রশাখা নিয়ে সাতকাহন ও আহাজারি করা সংকট থেকে মুক্তির পথ নয়। মুক্তির পথ হলো- জাতীয় জীবনে, ইতিহাসের দুর্বিপাকে সৃষ্ট সংকটের মুলোৎপাটনের মাধ্যমে জাতির নতুন জাগরণ বা রেনেসাঁ সৃষ্টি করা। 


লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //