বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ

বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ‘ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট ২০২১’ নামের একটি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। মূলত মার্কিন বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীর কাছে এই প্রতিবেদনের গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো দেশে বিনিয়োগ করার পূর্বে বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা এবং বিনিয়োগের অনুকূল-প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে সম্যক ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করে থাকে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১২টি বাধাকে চিহ্নিত করা হলেও সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দুর্নীতিকে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী আরও যে সকল কারণে বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় সেগুলো হচ্ছে, শ্রম আইনের শিথিল প্রয়োগ, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, নিরাপত্তার অভাব এবং অর্থায়নের সীমিত সুযোগ। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, বিনিয়োগের পরিমাণ ৪.১০ বিলিয়ন ডলার। 

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সকল বিদেশি বিনিয়োগকারী চাইবে তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ লাভসহ ফেরত নেওয়ার নিশ্চয়তা। যে দেশে ঘন ঘন জঙ্গি হামলা, সিভিল ওয়ার বা রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকে সেই দেশে বিনিয়োগ করতে কেউ আসে না। ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই হামলায় নিহত আটাশ জনের মধ্যে সতেরো জন বিদেশি। এই ঘটনার পর জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ কঠোর না হলে কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হয়তো আর বাংলাদেশে আসত না এবং ইত্যবসরে গৃহীত সকল প্রকল্পের বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেত। নিহতদের মধ্যে ৭ জন ছিলেন জাপানি বিশেষজ্ঞÑ মেট্রোরেল প্রকল্পের সমীক্ষার কাজে তারা ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এত বড় জীবনহানির পরও জাপান মেট্রোরেল প্রকল্পে এক শতাংশেরও কম সুদে প্রদেয় অর্থায়ন বন্ধ করেনি। এখন বাংলাদেশ অনেকটা জঙ্গি মুক্ত, তাই বিদেশি বিনিয়োগে এই বাধাটি দূর হয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার দুর্নীতি দমনে প্রচুর আইন প্রণয়ন করেছে, কিন্তু সেই সকল আইনের প্রয়োগ নেই। দু-একটি দুর্নীতি যে ধরা হয় না তা কিন্তু নয়, কিন্তু যে পরিমাণ দুর্নীতির কথা শোনা যায় সে তুলনায় চিহ্নিত দুর্নীতি খুবই নগণ্য। ঢাকা শহরে ৫০টি খাল কার আমলে কীভাবে ভরাট হয়ে গেল তা বের করার চেষ্টা কখনো হয়েছে বলে মনে হয় না। বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের অবৈধ লাইন মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন করা হয়, কিন্তু যারা সংযোগ দিয়েছে তাদের ধরা হয় না। ব্যবসার জন্য অপরিহার্য ল্যান্ডফোনের সংযোগ নিতে এক সময় প্রচুর ঘুষ দিতে হতো। এখনো কোনো কারখানায় বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের সংযোগ পেতে ঘুষ দেওয়ার পরও হেনস্তার শিকার হতে হয়। বড় বড় শিল্পকারখানা এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ব্যাংক ঋণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এখানেও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে, আছে দুর্নীতি। দীর্ঘসূত্রতার জন্য প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায়। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিং, স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ, নিরীক্ষা ও পরিদর্শনের মধ্যেও অর্থ তছরুপ এবং অনিয়মের কথা প্রায়ই শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে তত্ত্বাবধায়ক দুর্নীতির ভাগীদার বলেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজও সবল হতে পারেনি। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্লিপ্ততার জন্য বেসিক ব্যাংকটির ইমেজ তলানিতে নেমেছে। 

সরকারি অফিসের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথাও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে রয়েছে। প্রতিবেদন মোতাবেক আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশে বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই দীর্ঘসূত্রতার কথা যুগ যুগ ধরে শুনে আসছি, কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই। আমাদের এখানে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা শুধু ঘুষ খায় না, তাদের একটা আলাদা আভিজাত্যও রয়েছে, তারা সব অভিযোগের উপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না, কারণ তাদের কোথাও জবাবদিহি করতে হয় না। একটি সামান্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছয়/সাতটি স্তর পার হতে হয়। অধস্তন অফিস থেকে চিঠি দিয়ে পারস্যু না করলে ওই চিঠি হারিয়ে যায়, উপস্থাপন করা হয় না। ওয়ান স্টপ সার্ভিসের কথা অহরহ বলা হলেও এখনো বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদন এবং বাস্তবায়নে অসংখ্য সংস্থার কাছে ধরনা দিতে হয়। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী এত দুর্নীতি, এত তোয়াজ, এত জটিলতা, এত দীর্ঘসূত্রতায় অভ্যস্ত নয়। তাই বোধ হয় এখনো বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের জিডিপির এক শতাংশেরও কম। 

হেনস্তা হতে হয় ঘাটে ঘাটে। বিনিয়োগ চুক্তির ক্ষেত্রে কোনো পর্যায়ে বিরোধ দেখা দিলে তার মীমাংসায় দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ব্যবসাকে বাধাগ্রস্ত করে থাকে, এই ক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় ধীরগতি বিরোধ নিষ্পত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। জমি সংক্রান্ত বিরোধকেও বিনিয়োগের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। প্রতারণামূলকভাবে জমি বেচাকেনার কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে। খাস জমি বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব। তাই বোধ হয়, ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমার এক সহকর্মী সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগ দিয়েছিলেন। হেনস্তা হতে হয় ঘাটে ঘাটে। বিনিয়োগ চুক্তির ক্ষেত্রে কোনো পর্যায়ে বিরোধ দেখা দিলে তার মীমাংসায় দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ব্যবসাকে বাধাগ্রস্ত করে থাকে, এই ক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় ধীরগতি বিরোধ নিষ্পত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। 

প্রত্যক্ষ বা সরাসরি বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে, এই বিনিয়োগে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়, নতুন প্রযুক্তির সন্নিবেশ হয়, ঋণনির্ভরতা হ্রাস পায়। বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য উপযোগী নয়টি খাতের কথা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করায় বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। করোনাকালে বিদেশি বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ২.৯০ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিনিয়োগ হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বেড়ে কোভিড মহামারির আগের অবস্থায় ফিরেছে।  রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে বিনিয়োগের এই ধারা পরবর্তী বছরগুলোতে অব্যাহত থাকবে কিনা তা নিশ্চিত করে এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। কারণ বড় অর্থনীতির দেশগুলোতেও সুদহার ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে, এর ফলে উৎপাদন ও বিনিয়োগে মন্দা দেখা দিতে পারে। 

বিগত এক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মর্মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ নয়, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণেও বাংলাদেশ অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। অবকাঠামোর সুবিধাদিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে, ইন্টারনেট সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, বিদ্যমান বন্দর সুবিধা বৃদ্ধি ছাড়াও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নিম্ন মজুরি হার তৈরি পোশাক খাতকে সম্প্রসারণে সহায়তা করেছে। বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা যতই বাড়ানো হোক না কেন বিদ্যুৎ সরবরাহের নিমিত্তে পর্যাপ্ত সঞ্চালন লাইন সংস্থাপন করা না হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এছাড়াও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা জিইয়ে রেখে বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে না। ব্যবসাবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য আমলাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে, ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের সামর্থ্য অর্জন করতে হবে এবং আলাদা শ্রেণি হওয়ার অহংবোধ ও আভিজাত্য ত্যাগ করতে হবে।


সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //