সিইসির ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’

প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কাজী হাবিবুল আউয়াল এমন সব কথাবার্তা বলছেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে।

অনেক সময় তিনি যা বলছেন, অথবা বলতে ও বোঝাতে চাচ্ছেন, সেটি সবাই বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে। অথবা তিনি নিজেও হয়তো বোঝার চেষ্টা করছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো আসলে কী করতে বা কী বলতে চাইছে। 

সবশেষ বিতর্কটি শুরু হয়েছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ অর্ধেক আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারে ইসির সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরে। কিন্তু ২৩ আগস্ট এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার অর্ধ মাস না যেতেই গত ৭ সেপ্টেম্বর তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক সমঝোতা হলে ভোট ব্যালটে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, যেখানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ হাতে গোনা কয়েকটি দল ইভিএমের পক্ষে এবং সরকারের বাইরে থাকা সবচেয়ে বড় দল বিএনপিসহ অন্যান্য দলগুলো সরাসরি ইভিএমের বিপক্ষে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে; নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপেও যেখানে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশই ইভিএমের বিপক্ষে মতামত দিয়েছে, সেখানে নির্বাচন কমিশন কী কারণে দেড়শ আসনে ব্যবহারের সিদ্ধান্তের কথা জানাল? আবার এখন কেন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছেন সিইসি? যদি এখানে রাজনৈতিক সমঝোতাই মুখ্য হয়ে থাকে, তাহলে এই সমঝোতার আগেই তারা কেন দেড়শ আসনে ইভিএম ব্যবহারের ঘোষণা দিলেন? একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যদি এত নড়বড়ে অবস্থানে থাকে, তাহলে তারা জাতীয় নির্বাচনের মতো অত্যন্ত কঠিন ও স্পর্শকাতর আয়োজনে কতটা সাহসী ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারবেন- সেটি নিয়ে জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে। 

আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়ে ৬ সেপ্টেম্বর দেশের ৩৯ জন নাগরিকের বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় পরদিন সিইসি সাংবাদিকদের বলেন, ইভিএম নিয়ে কোনোভাবেই রাজনৈতিক সংকট প্রকট হবে না বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষায়, ‘সংকট ইভিএম নিয়ে নয়, সেটা আরও মোটাদাগের সংকট।’ রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে ফয়সালা হলে সব ভোট ব্যালটে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। 

সিইসি যে মোটা দাগের সংকটের কথা বলছেন, সেটি আসলে কী? তিনি সম্ভবত ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর, বিশেষ করে বিএনপি ও তার শরিকদের নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিকেই বলছেন। এটি মোটা দাগের অথবা বড় সংকট এই কারণে যে, বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে কোনো নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুযোগ নেই। যদি এটি করতে হয় তাহলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে হবে। অর্থাৎ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের বিধান ফিরিয়ে আনতে অথবা নতুন কোনো বিধান যুক্ত করতে হবে- যার জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। কিন্তু বিএনপি ও তার শরিকদের দাবি মেনে সরকার সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের বিধান যুক্ত করবে কি না এবং না করলে রাজনীতিতে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে বা হতে পারে- সেটিকেই সম্ভবত সিইসি মোটা দাগের সংকট বলে বিবেচনা করছেন এবং এ কারণে তিনি ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’র কথা বলছেন। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক কোনো বড় সমস্যার সমাধান সমঝোতার মাধ্যমে হয়নি। 

বিএনপি ও তার শরিকরা এখন যে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে সোচ্চার, সেই বিধানটি সংবিধানে যুক্ত করতে ১৯৯৬ সালে তাদের বিরুদ্ধেই তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলেছিল বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ওই সময়ের সরকারকে বাধ্য করেছিল সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান যুক্ত করতে এবং ওই নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এরপর ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনও এই নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলেও ২০১০ সালে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। বিএনপি ও তাদের শরিকদের দাবি, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ পরপর তিন মেয়াদে সরকার গঠন করতে পারত না। এবারও যদি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয় তাহলে আওয়ামী লীগ হেরে যাবে। 

প্রশ্নটা এখানেই যে, যদি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের হেরে যাওয়ার শঙ্কা থাকে, তাহলে তারা কেন সংবিধান সংশোধন করে এই বিধান ফিরিয়ে আনবে? ১৯৯৬ সালে যে বিধান সংবিধানে যুক্ত করতে অনেক রক্ত ঝরাতে হয়েছে, রাজনীতির মাঠ যেভাবে দখলে নিতে হয়েছে, সেরকম পরিস্থিতির কি পুনরাবৃত্তি হবে? ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকার নামে রাজনীতিতে সহিংসতা, জ্বালাও-পোড়াও নিশ্চয়ই দেশের সাধারণ মানুষ চায় না। তাহলে সমাধান কী? সিইসি সম্ভবত সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই সমঝোতার কথা বলছেন। কিন্তু কে কার সঙ্গে সমঝোতা করবে? আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ নেই। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে আওয়ামী লীগ যেভাবে মাঠ দখল করেছিল, সরকারের উপরে চাপ প্রয়োগ করতে পেরেছিল, এখন বিএনপির কি সেই সাংগঠনিক শক্তি ও জনসম্পৃক্ততা আছে যে তারা আওয়ামী লীগকে বা সরকারকে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের বিধান ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করতে পারবে? 

গত ৯ আগস্ট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, যতই বাধা আসুক, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। তার মানে বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে যদি নির্বাচন হয়, তাহলে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাই দায়িত্ব পালন করবেন- বিএনপির মূল আপত্তি যেখানে। 

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের কাছে আইনি সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। নির্বাচনকালীন সরকারের চরিত্র, আচরণ ও গঠন কী হবে- এ ধরনের বিষয়গুলো সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন তাদের চিন্তাভাবনা প্রসূত পরামর্শ সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে পারে বলে টিআইবি মনে করে। কিন্তু সেজন্যও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আবার সংবিধান সংশোধন না করে কোনো আইন তৈরি করে বিষয়টির সুরাহা করা যায় কি না, সে বিষয়ে প্রধান দুটি দলের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু সালিশ মানলেও যেহেতু প্রত্যেকেই তালগাছের মালিকানা দাবিতে অনড়; অর্থাৎ বিএনপি যেখানে নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে এবং আওয়ামী লীগ যেখানে বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অটল- যেখানে সমঝোতা হবে কী করে? 

সংবিধান সংশোধন না করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠন সম্ভব না হলেও নির্বাচনকালীন এমন একটি সরকার গঠন করা সম্ভব, যেখানে বিরোধী দলের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। ধরা যাক, নির্বাচনের তিন মাস আগে একটি ছোট মন্ত্রিসভা গঠন করা হলো যারা ওই তিন মাসে নির্বাচন ছাড়া আর কোনো কাজ করবে না। ওই সময়ে কোনো উন্নয়নপ্রকল্প গ্রহণ করা হবে না; তারা মূলত নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কাজগুলোই করবে। কিন্তু সেই সরকারের প্রধান হিসেবেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকেই বহাল থাকতে হবে। কারণ তিনি যদি পদত্যাগ করেন তাহলে পুরো মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করেছে বলে গণ্য হবে। তখন রাষ্ট্রপতি কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানাবেন? শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কারো পক্ষে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বিএনপির দাবি যেহেতু সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কাউকে থাকতে হবে, সেটি যেহেতু বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে সম্ভব নয়, ফলে নির্বাচনকালীন একটি ছোট মন্ত্রিসভা গঠন করা হলে এবং সেখানে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা রাজি হবে কি না- তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ফলে এই ইস্যুতে সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ। 

বলা হয়, আন্দোলনের মাঠ যার দখলে, ভোটের ফলও যায় তার ঘরে। অতীত অভিজ্ঞতাও তা-ই বলে। সুতরাং বিএনপি ও তার শরিকদের দাবি মেনে আওয়ামী লীগ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের বিধান সংবিধানে যুক্ত করবে, এটি ভাবার কোনো কারণ নেই। আবার বিদেশি শক্তির সহায়তায় বিএনপি সরকার গঠন করে ফেলবে, বিষয়টা অত সহজও নয়। সব মিলিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি কোন ধরনের সরকারের অধীনে হবে- এই ইস্যুতে যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, সেটিকেই ‘মোটা দাগের সংকট’ বলে ইঙ্গিত করে সিইসি যে ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’র কথা বলছেন, সেটি খুব কঠিন। ফলে সামনের দিনগুলোয় দেশে যেসব পরিস্থিতি তৈরি হবে বা হতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানই বর্তমান নির্বাচন কমিশনের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ।

এদিকে ১৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওস্থ নির্বাচন কমিশন ভবনের অডিটোরিয়ামে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোড ম্যাপ ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মো. আলমগীর । রোড ম্যাপ অনুযায়ী আগামী ২০২৩ সালের নভেম্বরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। একই বছর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ না করলে তার দায় নির্বাচন কমিশন নেবে না। কমিশনের মোট ৩০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে। এর মধ্যে যদি ২০ দল নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ১০টি দল অংশ না নেয়, তাহলে ওই ১০টি দলের দায় আমরা নেব না। তবে অংশ নেওয়া ২০টি দলের দায় আমরা নেব।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //