ইভিএম নিয়ে যত প্রশ্ন

ব্যালটে সিল মারার পরিবর্তে ভোটার তার পছন্দের প্রতীকের পাশের সুইচ টিপে যে মেশিনে ভোট দেবে, সেই মেশিনটিই হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম। ১৯৬০ সালে প্রথম আমেরিকায় ইভিএম-এ ভোট গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশে প্রথম ব্যবহার হয় ২০০৭ সালে অফিসার্স ক্লাবের নির্বাচনে। বাংলাদেশের জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনেও এই মেশিনের পরীক্ষণমূলক ব্যবহার কিছু কিছু কেন্দ্র ও আসনে ইতোমধ্যে করা হয়েছে।

কুমিল্লা এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে সব কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুটি নির্বাচনে ভোট কারচুপির কোনো অভিযোগ না থাকলেও ভোটারদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। কোনো কোনো বুথে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ইভিএম বিকল হয়ে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোট নেওয়া সম্ভব হয়নি এবং কোনো কোনো ভোটারের আঙুলের ছাপ না মেলার কারণে বিকল্প পদ্ধতিতে ভোট নিতে বিলম্ব হয়েছে। ইভিএম সম্পর্কে ভালো জ্ঞান না থাকায় অনেকের ভোট দিতে সময় লেগেছে। অনভ্যস্ত ভোটারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে উদ্ভূত সমস্যাগুলোর পুনরাবৃত্তি ভবিষ্যতে হয়ত হবে না। এই বিবেচনায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫০টি আসনে ইভিএম-এ ভোট নেয়া হবে বলে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে। 

বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের কাছে ১ লাখ ৫০ হাজার ইভিএম রয়েছে, ১৫০টি আসনে ইভিএম-এ নির্বাচন করতে আরও ২ লাখ ইভিএম ক্রয় করতে হবে। ইভিএম প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ব্যয় হবে প্রচার, পরিবহন, প্রশিক্ষণ ও ইভিএম-এ ভোটারদের ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করতে। এ ছাড়াও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নিমিত্তে সিসি ক্যামেরা ও নিরাপত্তাসামগ্রী ভাড়া নেওয়া বাবদ ব্যয় হবে ১৩২ কোটি টাকা। ইভিএম সংরক্ষণের জন্য ১০টি ওয়্যারহাউস নির্মাণের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণে ৪০ কোটিসহ মোট খরচ হবে ৩৭০ কোটি টাকা। নির্বাচনকালীন বিভিন্ন কাজে আউটসোর্সিং করবে সহস্রাধিক লোক, যাদের জন্য খরচ হবে ১৯৬ কোটি টাকা। একই প্রকল্পের আওতায় ২৬৪ কোটি টাকার যানবাহন কেনা হবে। আরও অনেক খরচের হিসাব প্রকল্পের প্রোফাইলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

ইভিএম ক্রয় নিয়ে বাজারে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকের অভিমত- আগামী বছর যেখানে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেখানে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে ইভিএম-এর মাধ্যমে ভোট নেওয়ার সিদ্ধান্ত সুবিবেচনা প্রসূত নয়। ২০১৮ সালের চেয়ে এবার প্রতিটি ইভিএমের দাম প্রায় এক লাখ টাকা বেশি ধরা হয়েছে। নির্বাচনে ব্যবহৃত ইভিএম-এর সরবরাহকারী বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি। তাদের প্রদত্ত দর যাচাই করার সুযোগ নেই, কারণ এই মেশিন বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি, এই ধরনের ইভিএম বিশ্বের আর কোথাও ব্যবহার করা হয় না। ভারতে ব্যবহৃত ইভিএম-এর দর অনেক কম; কিন্তু আমাদের দেশে ব্যবহৃত ইভিএম ভারতের ইভিএম থেকে উন্নত, আমাদের ইভিএম-এ বায়োমেট্রিক যাচাইপূর্বক ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব, যা ভারত বা পৃথিবীর আর কোনো ইভিএমে সম্ভব নয়। বিএমটিএফ-এর ইভিএম-এর লাইফ টাইম ২০ বছর, তাই প্রাথমিক খরচ বেশি হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ব্যালট পেপারে নির্বাচনের খরচের চেয়ে কম হবে। 

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের কার্যকারিতা নিয়ে নানা মত ও প্রশ্ন উঠছে। বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বলছে, নীরব এবং নিঃশব্দ প্রক্রিয়ায় ইভিএম-এর মাধ্যমে ভোট চুরি করা যায়; মেশিনটিতে চাইলে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা সম্ভব যে, নির্দিষ্টসংখ্যক ভোটের পর বাকি সব ভোট একটা প্রতীকেই জমা হবে। হয়তো ভোটার দেখবে যে, সে তার পছন্দের প্রতীকে ভোট দিয়েছে; কিন্তু আসলে তা হবে না। এতে ভোটের ফল বদলে দেওয়া সহজ। এই সংশয় অমূলক, কারণ ইনবিল্ট প্রোগ্রাম পরিবর্তন করা যায় না বলে ইভিএম-এ এক প্রতীকের ভোট অন্য প্রতীকে নেওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়াও ভোটার কোন প্রতীকে ভোট দিল কিংবা ভোট ঠিকমতো হয়েছে কিনা তা আশ্বস্ত করতে ব্যালট স্ক্রিন থেকে অন্যান্য সকল প্রতীক উধাও হয়ে যায়, মাত্র ৪ সেকেন্ডের জন্য স্ক্রিনজুড়ে ভেসে ওঠে শুধু সেই প্রতীকটি, যে প্রতীকে ভোট দেওয়া হয়েছে, স্পিকারে উচ্চারিত হবে ‘আপনার ভোট দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে’। অফলাইন সিস্টেম হওয়ায় ইভিএম হ্যাকিং করা সম্ভব নয় মর্মে বিশেষজ্ঞদের অভিমত রয়েছে; কিন্তু এই অভিমতকে খণ্ডন করে বলা হচ্ছে যে, ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াও ইভিএম-এ মোবাইল সিম জাতীয় আইসি গোপনে স্থাপন করে দূর থেকে ইভিএম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে অতীতে সংঘটিত ভোট কারচুপির নানাবিধ ঘটনা বিরোধী দলকে ইভিএম সম্পর্কে সন্দিহান করে তুলেছে। ইভিএম-এর পক্ষে আওয়ামী লীগের জোর সমর্থন বিরোধী দলকে আরও বেশি আতঙ্কিত করেছে। 

ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে যেমন যুক্তি রয়েছে, তেমনি পক্ষেও যুক্তির অভাব নেই। পক্ষের যুক্তি হচ্ছে- বায়োমেট্রিক যাচাই করে ভোট দেওয়ার সিস্টেম থাকায় ইভিএম-এ জালভোট দেওয়ার সুযোগ নেই, অর্থাৎ ভোটারের আঙুলের ছাপ মিললেই কেবল ইলেকট্রনিক ব্যালট পেপার ভোটদানের জন্য উন্মুক্ত হয়, অন্যথায় নয়। ওয়ান টাইম চিপের ব্যবহার ও এমবেডেড পার্টস থাকায় একই সাথে একজন ভোটার একাধিক ভোট দিতে পারে না। বিল্টইন ঘড়ি থাকায় নির্বাচন সময় আরম্ভ হওয়ার আগে ভোট দেওয়া যায় না। ইভিএম-এ ভোটগ্রহণকালে কেন্দ্র দখল করেও কোনো লাভ হয় না, কারণ যতজন ভোটারের আঙুলের ছাপ মিলবে শুধু ততজনের ভোট জোর করে কাস্ট করা সম্ভব; অর্থাৎ ভোটদানের জন্য ভোটারকে অবশ্যই ভোটকেন্দ্রে আসতে হয়, ভোটার কেন্দ্রে না এলে অন্য কেউ কোনোভাবেই ভোট দিতে পারবে না। ব্যালট পেপার পদ্ধতিতে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে যে কোনো জায়গায় বসে সিল মারতে পারে; কিন্তু ইভিএম-এ জোর করে ভোট নিতে হলে অননুমোদিত ব্যক্তিকে অবশ্যই গোপন কক্ষে অবস্থান করতে হবে। ইভিএম মেশিনে কোনো ডেটা থাকে না বলেই কাস্টমাইজেশন ছাড়াই একই মেশিনে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা এবং জাতীয় সংসদের ভোট গ্রহণ করা সম্ভব হয়। এসডি এবং স্মার্টকার্ড সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ভোটার এবং প্রার্থীদের তথ্যাদিসহ প্রিসাইডিং অফিসারের আঙুলের ছাপ দিয়ে কাস্টমাইজ করা হয়। এসডিকার্ড ও স্মার্টকার্ডে কোনো প্রোগ্রাম থাকে না, প্রোগ্রাম থাকে ইভিএম-এ; ইভিএম এসডিকার্ড ও স্মার্টকার্ডের তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করে।

নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী এসডিকার্ড ও স্মার্টকার্ড কাস্টমাইজেশনের সময় প্রার্থী অথবা তাদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকতে পারবেন। এসডিকার্ড ও স্মার্টকার্ডে যে ডেটা ঢোকানো হয় এবং নির্বাচনের সময় যে ডেটা জমা হয়, তা নিজস্ব অ্যালগরিদম এবং কোড ব্যবহার করে এনক্রিপটেড করে রাখা হয়। তাই এসব কার্ডে সংরক্ষিত ডেটা পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না। ইভিএম-এর সুবিধা হচ্ছে- এই মেশিনে গৃহীত ভোট গণনা করতে হয় না, বাটনে চাপ দিলেই ফল পাওয়া যায়। ইভিএম ভেঙে ফেললেও বা পানিতে ডুবিয়ে দিলেও ব্ল্যাকবক্সের মাধ্যমে প্রদত্ত ভোটের হিসাব পাওয়া যাবে। 

নির্বাচন নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মতভেদ চরমে, কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। তবে এক জায়গায় ঐকমত্য দেখা যায় এবং তা হচ্ছে- সবপ্রার্থী কারচুপি করেই জিততে চায়। কারচুপি করে জেতার জন্য টার্গেট করে ভোটকেন্দ্র এবং বুথ। জালভোটের কথা আমরা বাল্যকাল থেকে দেখে ও শুনে আসছি, সাম্প্রতিক কালে জালভোটের প্রতি প্রার্থীর আগ্রহ নেই। কারণ জালভোট দিয়ে এখন বিজয় নিশ্চিত করা যায় না। এখন ভোট ডাকাতি হয়, কেন্দ্রের সব ভোট এক প্রার্থীর পক্ষে কাস্ট হওয়া চাই। কারচুপির মাধ্যমে জিতে আসা মানুষগুলোও জনপ্রতিনিধি, জনতার সেবক। এই ভদ্রলোকেরা আবার আইন পাসে অংশগ্রহণ করেন, সেই আইনে অপরাধীর শাস্তি হয়। এমন জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নীতি-নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা করেন, মূল্যবোধ উজ্জীবিত হতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে থাকেন। 

ইভিএম-এ কারচুপি প্রমাণ করার জন্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান করা হলেও কেউ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছে না। ইভিএম-এর বিরোধী রাজনৈতিক দলের এক সংসদ সদস্য তার আসনে পরবর্তী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের লিখিত অনুরোধ করেছেন, কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হলে প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। ইভিএম-এর সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা না থাকলেও বিরোধী দলের সংশয়, অবিশ্বাস ও সন্দেহের অবসান ঘটানো জরুরি। এটাও সত্য যে, নতুন প্রক্রিয়া-পদ্ধতি প্রবর্তন করার সাথে থাকে হাজারো রকমের প্রশ্ন, ভয়, সন্দেহ আর অনিশ্চয়তা। তাই সবার সম্মতিক্রমে ইভিএম ব্যবহার করা সম্ভব হলে নির্বাচনে হানাহানি, মারামারি, সন্ত্রাস, খুন, ভোট ডাকাতি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে আসবে।


লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2023 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //