ICT Division

দেশের অর্থনীতির গতি প্রকৃতি

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ৪৮ বিলিয়ন থেকে চলতি বছরের ৮ নভেম্বর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪.৪৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসায় অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। শুধু তা-ই নয়, কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টালে অসম্পূর্ণ তথ্য প্রচার করে জনগণের মধ্যে ভয়ভীতির আবহ তৈরির অপচেষ্টাও হচ্ছে।

সম্ভবত এসব প্রচার লক্ষ্য করে বাণিজ্যিক ব্যাংকের আর্থিক সামর্থ্যরে ওপর আস্থা রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক জনগণকে সম্প্রতি আশ্বস্ত করেছে। 

দেউলিয়া হলেও যে একটি দেশের অস্তিত্ব বিলীন হয় না, শ্রীলংকা তার প্রমাণ। বিশ্বের ধনী দেশগুলো যেখানে তাদের অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো দেউলিয়া কেন হলো না- তা নিয়ে অনেক অর্থনীতিবিদও বিস্মিত। তবে চলমান অর্থনৈতিক সংকট এখনো শেষ হয়নি, উপরন্তু বিশ্বে নতুন নতুন সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। 

আইএমএফ-এর লোন নিয়েও অর্থমন্ত্রীকে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী বলেননি যে, লোন পাস হয়ে গেছে, তিনি বলেছেন- পাস হয়ে যাচ্ছে। করোনা মহামারির সংক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য পৃথিবীর সব দেশ পরস্পর বিচ্ছিন্ন ছিল পুরো এক বছর। করোনার তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন দেশ যখন এগোচ্ছিল ঠিক তখনই শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

রাশিয়ার ওপর আমেরিকা এবং ইউরোপের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বিশ্ব অর্থনীতিকে একেবারে ভঙ্গুর করে দিয়েছে। বিশ্বের অবাধ ব্যবসা-বাণিজ্য বিভিন্ন শর্ত ও নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে প্রায় স্থবির। যুদ্ধ আর নিষেধাজ্ঞার প্রকোপে বিশ্বে তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ এবং খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বেড়ে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে। দরের যেন পতন না হয়, সেজন্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো শীঘ্রই তেল উৎপাদন কমিয়ে দেবে।

রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হলে আফ্রিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দুর্বিষহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চীনও খাদ্য সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছে। সব সংকট কাটিয়ে ওঠা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব না-ও হতে পারে। কারণ এই সংকট বাংলাদেশের একার নয়, বিশ্বের। বিশ্বে সংকট বিরাজ করলে বাংলাদেশ একা তার থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না, কোনো দেশের পক্ষে পারা সম্ভবও নয়। 

চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর- এই চার মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাসী আয় মাত্র ২.০৩ শতাংশ বেড়েছে। বছরের প্রথম দুই মাসে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে পরের দুই মাসে সেই পরিমাণ আসেনি, অনেক কম এসেছে।

প্রবাসী রেমিট্যান্স আসা পরবর্তী মাসগুলোতেও এভাবে কমে গেলে আমাদের রিজার্ভে চাপ পড়বে। প্রবাসী আয় কমার নানাবিধ কারণ রয়েছে। বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত নিউজ পোর্টালগুলো অবিরত বাংলাদেশের বিমর্ষ চিত্র তুলে ধরছে- রিজার্ভের অবস্থা খারাপ, ব্যাংকগুলো এলসি খুলছে না বা এলসি খুললেও দায় পরিশোধ করতে পারছে না ইত্যাদি।

এসব প্রচারণায় প্রবাসীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। দ্বিতীয়ত ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলার পাঠালে প্রবাসীদের আত্মীয়-স্বজন যে পরিমাণ টাকা পান তার চেয়ে বেশি টাকা পান অবৈধ হুণ্ডির মাধ্যমে পাঠালে। তাই অনেক প্রবাসী ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ না করে গোপনে হুণ্ডির মাধ্যমে অবৈধ পথে টাকা পাঠাচ্ছে।  তৃতীয়ত প্রবাসীরা যে সকল দেশে কাজ করছে ওই সকল দেশের; বিশেষ করে মালয়েশীয়া, ইতালি এবং ব্রিটেনে মুদ্রার মান কমছে। চতুর্থত প্রবাসীর বেতন না বাড়লেও খরচ বেড়েছে।

কারণ পৃথিবীর প্রায় সব দেশে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। আমেরিকায় বর্তমানে জিনিসপত্রের যে দাম বিরাজ করছে তা ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে সর্বোচ্য। অস্ট্রেলিয়ায় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের ওপরে, যা বিগত ২১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্য। ভেনিজুয়েলা, লেবানন, জিম্বাবুয়ে, সুদান প্রভৃতি দেশের মূল্যস্ফীতি ২০০ শতাংশের কাছাকাছি।

মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের দেশগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দেওয়ার কারণে বাঙালি প্রবাসীদের খরচ বেড়ে গেছে, টাকা জমাতে পারছেন না, হাতে আগের মতো উদ্বৃত্ত টাকা না থাকায় দেশেও পাঠাতে পারছে না। 

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরেকটি প্রধান উৎস হচ্ছে রপ্তানি। প্রতিটি দেশে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ খরচ করছে কম। এক সময় আমাদের দেশে কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজের দাম বেড়ে গিয়েছিল অত্যধিক; সেই সময় নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের লোকজন কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ কেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল, কিনলেও যৎসামান্য কিনত।

একই অবস্থা বিরাজ করছে এখন সারা পৃথিবীতে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে শুধু গরিব নয়, ধনীরাও কম কিনেন। ধনী দেশগুলোতে আগে কেউ বছরে ১০টি শার্ট কিনলে এখন কিনছেন ৫টি। বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো; কিন্ত এসব দেশের ভোক্তারা মূল্যস্ফীতির চাপে পড়েছেন।

ফলে তৈরি পোশাক বিক্রির দোকানগুলোতে কেনাবেচা কমে গেছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে কিছু ক্রয়াদেশ স্থগিত হয়েছে। নতুন ক্রয়াদেশও কম আসছে। তবু ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৩.৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.৫৫ শতাংশ বেশি।

ক্রেতা দেশগুলোতে চাহিদা না কমলে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ আরও বেশি হতো। পোশাকশিল্প নিয়ে ভয় থাকলেও চীনের তুলা ব্যবহারে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে আমরা সুফল পাব। ইতোমধ্যে চীন থেকে বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের পোশাকশিল্প অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে।

এ ছাড়াও তুলার দাম কম থাকায় পোশাকশিল্প দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশ এসেছে পোশাক খাত থেকে। তাই পোশাক খাত ভালো করলে রপ্তানি আয়ও ভালো হবে। 

২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে মোট রপ্তানি হয়েছিল ১৫৭৪৯. ৪৫ মিলিয়ন ডলার, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে ১৬৮৫৩. ৫১ মিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ৭.০১ শতাংশ; কিন্তু চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে আমদানি ব্যয় হয়েছে ২০৯০৫. ৩০ মিলিয়ন। প্রতিমাসে গড়পড়তা আমদানি হয়েছে ৬৯৬৮.৪৩ মিলিয়ন ডলার।

এই হিসাবে ৪ মাসে আমদানি হয়েছে ২৭৮৭৩.৭৩ মিলিয়ন ডলার। বছরের প্রথম ৪ মাসে প্রবাসী এবং রপ্তানি আয় ২৪০৫১.৭৯ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে আমদানি হয়েছে ২৭৮৭৩.৭৩ মিলিয়ন ডলার; আয়ের চেয়ে ৩৮২১.৮৪ মিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় হয়েছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি পূরণ করতে রিজার্ভ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে।

বিলাসদ্রব্য আমদানির ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও কোনো পণ্যের আমদানি কিন্তু বন্ধ হয়নি। কারণ আমদানির ওপর বেশি কড়াকড়ি হলে আমাদের রপ্তানি কমে যাবে, তবু আমদানি কমছে। 

ডলার সংকটের কারণে কয়েকটি ব্যাংক এলসি খুলছে না বা আমদানি দায় পরিশোধ করতে পারছে না বলে প্রচার হচ্ছে; কিন্তু কথাটি সম্পূর্ণ সত্য নয়, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থ বছরের ৭ নভেম্বর পর্যন্ত এলসি সেটলমেন্ট ২১ শতাংশ বেশি হয়েছে।

ব্যাংকগুলো এলসি খুলবে পণ্য আমদানির গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং তাদের নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতির ভিত্তিতে। বিদেশ থেকে প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি আয় আসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যেকটি ব্যাংক তাদের কাছে রাখতে পারে।

তার পরও পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ডলার সংকট হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের রিজার্ভ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করে থাকে। তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকেও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আনয়নে পদক্ষেপ নিতে হবে, ডলারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হলে ক্রাইসিস বাড়বে। 

রিজার্ভ নিয়ে হতাশ হওয়ার মতো অবস্থা এখনো হয়নি। রিজার্ভের স্থিতি বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো দ্বিতীয়, প্রথম ভারত। আইএমএফ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়া গেলে রিজার্ভ আরও বাড়বে। প্রয়োজনে আইএমএফ থেকে আরও ঋণ নিতে হবে, ঋণ নিতে হবে এডিবি থেকে, জাইকা থেকে, যাদের সুদের হার কম।

এক সময় অর্থনীতিবিদরা বলতেন, রিজার্ভ রেখে লাভ কি, বিনিয়োগ করতে হবে, খরচ করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ মেনে বিদেশ থেকে ঋণ না নিয়ে রিজার্ভ থেকে ডলার নিয়ে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন হয়েছে, যাত্রী সেবার জন্য বিমান কেনা হয়েছে, শিল্পায়নের জন্য মেশিনারিজ কেনা হচ্ছে।

এগুলো না করে রিজার্ভ ইনটেক্ট রেখে দিলে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। ২০০১-০২ অর্থবছরে বিএনপির আমলে আমাদের রিজার্ভ ছিল মাত্র ১.৫৮ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য এখন অর্থনীতির আকার বড় হয়েছে, এখন আর ২ বিলিয়ন দিয়ে চলবে না। বর্তমানে পাকিস্তানের অর্থনীতি বাংলাদেশের চেয়ে বড়, তারা যদি ৮ বিলিয়ন রিজার্ভ দিয়ে দেশ চালাতে পারে আমরা ৩৪ বিলিয়ন দিয়ে পারবো না কেন? 

প্রবাসীদের অর্থ প্রেরণে উদ্বুদ্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতোমধ্যে প্রণোদনা বাড়িয়ে আড়াই পারসেন্ট করা হয়েছে, টাকার অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। বারবার অবমূল্যায়ন না করে ডলারের মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেছেন; কিন্ত বাজারে চাহিদার ভিত্তিতে ডলারের দাম ওঠানামা করলে তা লাগামহীন অবস্থায় পৌঁছে যেতে পারে, তখন প্রবাসীরা লাভবান হলেও জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে অনেক বেশি।

পাকিস্তান ইতোমধ্যে তাদের টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়ন করেও তাদের রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স বাড়াতে পারেনি, তাই শুধু টাকার অবমূল্যায়ন করে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। তবে এই সময়ে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো প্রবাসীদের অর্থ প্রেরণে যথাযথ ভূমিকা পালন করছে কিনা তা মনিটর করা জরুরি। অর্থপাচার রোধ করতে বৈদেশিক বাণিজ্যে ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিং-এর ওপর তদারকি জোরদার করা হয়েছে।

ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিং-এর মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার হয় সবচেয়ে বেশি। এই তদারকি ফলপ্রসূ হলে চলতি হিসাবে আরও ঘাটতি কমতে থাকবে এবং আস্তে আস্তে ইতিবাচক অবস্থানের সৃষ্টি হবে। আমদানি-রপ্তানিতে ইতিবাচক ব্যালেন্স প্রতিফলিত হলে ভবিষ্যতের যে কোন সঙ্কট মোকাবিলা কঠিন হবে না। 

সাবেক নির্বাহী পরিচালক

বাংলাদেশ ব্যাংক

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //