হঠাৎ রাজনীতি অশান্ত

ছবি: স্টার মেইল

ছবি: স্টার মেইল

গত ১২ নভেম্বর ঢাকা-১৮ উপনির্বাচনের দিন রাজধানীতে মোটামুটি একই সময়ে অন্তত সাতটি বাস পুড়িয়ে দেয়া হয়। বাসগুলোয় যাত্রী না থাকায় কেউ হতাহত হয়নি। এ ঘটনায় নয়টি থানায় ১৪টি মামলা করে পুলিশ। এসব মামলায় আসামি প্রায় ৬০০। অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

১৫ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে আনা সাধারণ প্রস্তাবের ওপর আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ করে বাসে আগুন দিয়ে অগ্নিসন্ত্রাস। কেন, কী স্বার্থে? কীসের জন্য? নির্বাচন হয়, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার নামে অংশগ্রহণ করে। টাকা-পয়সা যা পায়, পকেটে নিয়ে রেখে দেয়। ইলেকশনের দিন ইলেকশনও করে না। এজেন্টও দেওয়া হয় না। কিছুই করে না। মাঝপথে ইলেকশন বয়কটের নাম দিয়ে, বাসে আগুন দিয়ে পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। এটার উদ্দেশ্যটা কী?’ 

প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কোনো দলের নাম উল্লেখ না করলেও তিনি কথাগুলো যে বিএনপিকে উদ্দেশ্য করেই বলেছেন- সেটি পরিষ্কার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও দাবি করেন, উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুর্বৃত্তরা নাশকতা চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে কিছু কথোপকথন পাওয়া গেছে। এতে শোনা যায়, ফলাফল মেনে নিতে পারেনি বলেই বিএনপি এমনটি করেছে।’ যেখানেই তারা পরাজিত হয়েছে সেখানেই তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

যদিও বিএনপির ভাষ্য ভিন্ন। তাদের দাবি, ঢাকা-১৮ উপনির্বাচনের ফল নিয়ে যাতে জনঅসন্তোষ তৈরি না হয় বা এটিকে কেন্দ্র করে বিএনপি যাতে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারে, সেজন্য সরকার বাসে আগুন দিয়ে বিএনপিকে চাপে রাখতে চাইছে। নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে সাংগঠনিক তৎপরতা স্তিমিত করতে চাইছে।

বাস পোড়ানোর ঘটনাকে ‘সরকারি এজেন্টদের নাশকতা’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার দাবি, সরকারের কিছু কিছু অংশ যারা বিভিন্নভাবে কাজ করে, তারা স্যাবোট্যাজ করার জন্য এই ধরনের ঘটনা ঘটায়। এর আগেও বিএনপিকে একইভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতেই নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তার।

যেকোনো ঘটনার পর সরকার ও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বা বক্তব্য নতুন কিছু নয়। এসব বিতর্কে অনেক সময়ই মূল ঘটনা আড়াল হয়ে যায়। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে অনেক সময় প্রকৃত ঘটনা রহস্যাবৃতই থেকে যায়। কিছু ঘটনার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় না। তবে দু’পক্ষের বক্তব্যে অনেক সময় একটি অভিন্ন বিষয় লক্ষ্য করা যায়, তা হলো- তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র। প্রশ্ন হলো কারা এই তৃতীয় পক্ষ?

অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল থাকলে যাদের সুবিধা, স্থিতিশীল থাকলে তাদের অসুবিধা। বাংলাদেশ অস্থিতিশীল থাকলে কাদের সুবিধা? সেটি কী শুধু অভ্যন্তরীণ কোনো রাজনৈতিক দল বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর নাকি অন্য কোনো দেশেরও সুবিধা, যারা বিশেষ করে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী? আবার শুধু বৈশ্বিক বাজারের প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়, বরং কোনো কোনো দেশ হয়তো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ঈর্ষাবোধ করে; বাংলাদেশের রেমিট্যান্স বেড়ে গেলে কিংবা সামাজিক-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির ইস্যুতে এখানে একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিরাজ করলে যাদের গা জ্বলে, তারাও চাইতে পারে- বাংলাদেশ কোনো না কোনো উসিলায় অস্থিতিশীল হয়ে উঠুক। আর কোনো এক বা একাধিক দেশ সরাসরি যেহেতু বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে না, ফলে তারা দেশের বিশেষ কোনো দল বা গোষ্ঠীকে ইন্ধন দিতে পারে। 

এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না যে, দেশ অস্থিতিশীল থাকলে সেই ঘরপোড়ার ভেতরে আলুপোড়া দিতে দেশের ভেতরেরই এক বা একাধিক শক্তি সব সময়ই সুযোগ খোঁজে। সেটি যেসব সময় রাজনৈতিক শক্তি- এমনও নয়। 

রাজনীতিতে হঠাৎ করে যে সহিংসতার ইঙ্গিত পাওয়া গেল, তা যে মোটেও ভালো লক্ষণ নয়, সেটি বিএনপি মহাসচিবের কথায়ও স্পষ্ট। ৯ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘সরকারবিরোধী আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে ও অনেক আত্মত্যাগও লাগবে।’ এখানে ‘আন্দোলন’ ও ‘আত্মত্যাগ’ শব্দ দুটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি আন্দোলনের ভেতরে আছে বা থাকলেও সেটির ধরন কী? 

গত কয়েক বছর ধরে তারা জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণকে তাদের আন্দোলনের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। তাদের দাবি, এই সরকারের অধীনে যে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়, সেটি প্রমাণের জন্যই তারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছে ও এটিই তাদের আন্দোলনের কৌশল। প্রশ্ন হলো- এই আন্দোলন বা কৌশলের মধ্য দিয়ে জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কি বেড়েছে? বিএনপি কি আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে, একটি শক্তিশালী এবং জনবান্ধব দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণে সক্ষম হয়েছে, না-কি তাদের তথাকথিত আন্দোলন ও কৌশলের মধ্য দিয়ে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং দলীয় কোন্দলই স্পষ্ট হয়েছে?

বিএনপি এখন কে চালাচ্ছেন- খালেদা জিয়া, তারেক রহমান নাকি মির্জা ফখরুল- এই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে কি ঐক্য রয়েছে? তাদের মধ্যে ‘তারেকপন্থি’ ও ‘তারেক বিরোধী’ বলে যে গ্রুপিং ছিল, সেটির কি নিরসন হয়েছে? যদি না হয়, তাহলে বলতে হবে, বিএনপি এখনো নিজের ঘরই গোছাতে পারেনি, অথবা ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের পর তাদের সাজানো ঘর যে এলোমেলো হয়েছে, সেটি এখনো অগোছালোই শুধু নয়; বিশৃঙ্খলা আরো বেড়েছে। 

এ রকম বাস্তবতায় বিএনপি মহাসচিব যখন বলেন, সরকারবিরোধী আন্দোলন দীর্ঘায়িত হতে পারে ও অনেক আত্মত্যাগ লাগতে পারে- তখন মনে হয়, বিএনপি বোধ হয় ভেতরে ভেতরে বড় ধরনের একটি আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রশ্ন হলো- আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলার মতো সাংগঠনিক শক্তি কি এ মুহূর্তে বিএনপির রয়েছে? সেই আন্দোলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই কি তাদের দলের কোনো একটি অংশ বাসে আগুন দিয়ে নিজেদের সক্ষমতা বা অস্তিত্ব জানান দেয়ার চেষ্টা করল?

আন্দোলনের প্রসঙ্গ এলে এই প্রশ্নটিও সামনে আসবে যে, রাজনৈতিক ইস্যুতে আন্দোলনের পরিবেশ দেশে বিরাজ করছে কি-না? যেকোনো দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অধিকার গণতন্ত্রে স্বীকৃত এবং সংবিধানেও অনুমোদিত; কিন্তু গত দুই দশক ধরে বিরোধী রাজনীতি দমনে যেভাবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি কতটা গণতান্ত্রিক, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সরকারের বিরুদ্ধে যৌক্তিক আন্দোলন হবে এটি যেমন স্বাভাবিক, তেমনি সরকার সেই আন্দোলন কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় মোকাবেলা করবে- সেটিও নির্ভর করে সেই সরকার কতটা গণতান্ত্রিক ও ভিন্নমতের প্রতি কতটা কতটা শ্রদ্ধাশীল- তার ওপর। 

আন্দোলন মোকাবেলার বদলে যদি দমন করা হয় এবং কোনো ধরনের ভিন্নমত সহ্য করা না হয়; রাজপথের আন্দোলন তো দূরে থাক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের কোনো নীতি বা সরকারের কোনো এমপি-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই যদি তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়, তাহলে সেই দেশে কোনো দিনই গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। কারণ গণতন্ত্রের প্রধানতম শর্তই হলো ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা। 

সুতরাং ক্ষমতায় থাকা আর ক্ষমতা থেকে সরকারকে টেনে নামানোর এই খেলায় রাজনৈতিক দলগুলো যদি ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে; যদি ক্ষমতাই তাদের কাছে মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এবং দেশ ও জনগণ গৌণ হয়ে যায়, তাহলে হঠাৎ করে বাসে আগুনের মতো ঘটনার পরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যই শুধু চলতে থাকবে- আখেরে দেশের রাজনৈতিক চরিত্রে কোনো পরিবর্তন আসবে না। আর যে দেশের রাজনীতি ঠিক নেই, সে দেশের কোনো কিছু ঠিকভাবে চলতে পারে না।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh