ইসি গঠন

সার্চ কমিটি নয় দরকার আইন প্রণয়ন: কাদের সিদ্দিকী

নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন হওয়া প্রয়োজন। সার্চ কমিটি গঠন না করে আইন প্রণয়ন দরকার বলে মন্তব্য করেছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।

রবিবার (৯ জানুয়ারি) নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সংলাপ শেষে তিনি এ কথা বলেন।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, সার্চ কমিটি গঠন না করে, সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নিজের উদ্যোগে নির্বাচন কমিশন গঠন করুন। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকে নিয়ে কমিশন করুন। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবেই সম্পূর্ণ স্বাধীন। তার কারো কাছে জবাবদিহি করার দরকার নেই। যদি কমিশন নিজেই নিয়ন্ত্রিত হয় তাহলে তো কিছু বলার নেই।

তিনি বলেন, আমরা অনেক সময় একসঙ্গে চলেছি। অনেক পথ হেঁটেছি, সেজন্য পুরোনো বন্ধু হিসেবে কথা বলতে এসেছিলাম।

তিনি বলেন, তিনদিনের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করার প্রয়োজন আমরা মনে করছি না। আর সার্চ কমিটির মাধ্যমে বর্তমান নির্বাচন কমিশন খুব ভালো ফল দেয়নি। এর আগে একটা রকিব কমিশন ছিল, সেটাও ভালো ফল দেয়নি। আমরা মেরুদণ্ড সম্পন্ন নির্বাচন কমিশন আশা করি।

কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বলেছি, নির্বাচন কমিশন হওয়ার জন্য একটা আইন হওয়া দরকার। এতকিছু হয়, আইন হয় না কেন?

দলের পক্ষ থেকে কোনো নাম প্রস্তাব করা হয়নি জানিয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে আমরা বলেছি যে নির্বাচন কমিশন তিনিই (রাষ্ট্রপতি) গঠন করবেন। আর গত কমিশনে একজন নারী নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। এবার আমরা বলেছি পাঁচজনের মধ্যে থেকে দুইজন নারী নির্বাচন কমিশনার রাখতে।

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কোনো আলাপ-আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটা প্রস্তাব দিয়েছি যে, সব দলকে নিয়ে আলোচনা করে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি কী বলেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাদের কথার সঙ্গে অনেক বিষয়েই একমত।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি এ সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, কারণ বিগত দিনে কোনো দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের প্রয়োজন নেই বলে রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন বলে জানান কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেন, একটা বিষয়ে আমরা জোর দিয়ে বলেছি যে, জাতীয় নির্বাচন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এক নয়। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক দেওয়ার কোনো মানে হয় না। এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যতগুলো মানুষ মারা গেছে, তা প্রতীক দেওয়ার কারণেই। দ্বন্দ্ব-হানাহানি ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি আমাদের এই অভিমতের সঙ্গে দৃঢ়তার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, জাতীয় নির্বাচন এবং বড়জোর সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোর বাইরে অন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হওয়ার কোনো মানে হয় না।

বিএনপির মতো বড় দল সংলাপে অংশ নিচ্ছে না, এতে সংলাপ সফল হবে কি না এমন এক প্রশ্নের জবাবে কাদের সিদ্দিকী বলেন, সফলতা, ব্যর্থতা নির্ভর করে একাগ্রতার ওপরে, চেষ্টার ওপরে। সব কটি দল সংলাপে অংশ নিয়ে কোনো ভালো কিছু না হলে কোনো লাভ নেই। আর দু/একটি দল অংশগ্রহণ না করলে, দেশ ভেসে যাবে এটাও সত্য কথা নয়।

তিনি বলেন, একটা মস্ত বড় দল বিএনপি সংলাপে আসছে না। তাদের সঙ্গে অনেকেই আসছে না, কিন্তু আমরা এসেছি। আমরা দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, রাষ্ট্রপতি আমাদের দাওয়াত দিয়েছেন, তার সম্মানের জন্য সংলাপে আসা উচিত।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের চেয়েও জরুরি নির্বাচনকালীন সরকারকে কীভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকায় রাখা যায়।

মহামারির কারণে ক্ষতি ও যাদের হারিয়েছেন তাদের কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি সঠিক ও যথোপযুক্ত ভূমিকা রাখবেন আশা করে তিনি বলেন, মহামারির প্রকোপকে পাশ কাটিয়ে আমরা যারা বেঁচে আছি, তাদের দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের জন্য এ বিশ্বকে বাসযোগ্য করে যাওয়া। দেশ ও মানুষের কল্যাণে জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ভূমিকা রাখা।

নির্বাচনকালীন সরকারকে নিরপেক্ষ রাখার উপায় বের করতে রাষ্ট্রপতির কাছে ছয় দফা প্রস্তাবও তুলে ধরেন কাদের সিদ্দিকী। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে-

১. নির্বাচন কমিশন আইন অবিলম্বে প্রণয়ণ করার প্রস্তাব করছি। এই মুহূর্তে আইন প্রণয়ণ সম্ভব না হলে সার্চ কমিটি নয়, দেশের অভিভাবক ও প্রবীণ রাজনীতিক হিসেবে আপনার চিন্তা-চেতনা, বিবেক-বিবেচনায় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন দেশপ্রেমিক মানুষদের নিয়ে দেশের মানুষের আস্থাভাজন গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিশনে কমপক্ষে দুইজন নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

২. দেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন অন্যতম নিয়ামক। কিন্তু প্রহসনমূলক নির্বাচন হওয়ায় দেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত, সরকারও তেমনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ক্ষুন্ন হয়েছে দেশের মর্যাদা। তাই নির্বাচন কমিশন এবং নির্ভেজাল নির্বাচন জাতির জন্যে খুবই জরুরি। অতএব, সংবিধানের নির্দেশমতো প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কে সম্পূর্ণ স্বাধীন-মুক্ত করার প্রস্তাব করছি।

৩. মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচে না, তেমনি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছাড়া চলার কথা না। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশন কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের মতামতের তোয়াক্কা করেনি। প্রতিবছর অন্তত চারবার নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার বিধান থাকা উচিত। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মতামত না নিয়ে নির্বাচন কমিশন নতুন কোনো নির্বাচনী বিধি-বিধান প্রণয়ণ করতে পারবে না।

৪. গণতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে রাজনৈতিক দল। প্রধানমন্ত্রী যেমন বিদেশ সফর শেষে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন, ঠিক তেমনি নিবন্ধিত দলের সঙ্গে বছরে অন্তত দুইবার নির্বাচন কমিশন দেশের পরিস্থিতি, অগ্রগতি, শান্তি-শৃঙ্খলা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দলগুলোর মতামত নেবেন এবং তিনিও তার মতামত ব্যক্ত করবেন।

৫. রাষ্ট্রপতি দেশের প্রধান অভিভাবক। তাই আপনিও একইভাবে বছরে দুইবার, সম্ভব না হলে অন্তত একবার সব রাজনৈতিক দলের মতামত নেবেন এবং আপনিও আপনার অভিমত ব্যক্ত করবেন।

৬. নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //