নির্বাচনকে ঘিরে বিদেশি তৎপরতা

রাজনীতির ভবিষ্যৎ কোন পথে?

বাংলদেশের নির্বাচনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের তৎপরতার প্রসঙ্গটি নতুন নয়। বরাবরই নির্বাচনের সময় সামনে আসলে দৃষ্টিগোচর হয় বিদেশি কূটনীতিকদের নানা ধরনের দৌড়-ঝাঁপ। বিভিন্ন অরাষ্ট্রীয় সংস্থাও নির্বাচনের প্রাক্কালে নানাভাবে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার পর থেকে বরাবরই এমন তৎপরতা ছিল। তবে ২০০৭ সালের ১/১১-র প্রেক্ষাপট তৈরির সময় থেকে বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদলকে ঘিরে বিদেশিদের সক্রিয়তা বাড়তি গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের বিপুল অগ্রগতির ফলে ব্যাপকভাবে বিশ্বায়িত একটি ব্যবস্থার মধ্যে চলছে বিশ্ব। ফলে কোনো দেশই এখন একাকি ও বৈদেশিক সম্পর্ক ছিন্ন অবস্থায় থাকতে পারে না; কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম একটি মৌলিক প্রসঙ্গ হলো, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা (Non-Interference)। ফলে নির্বাচন বা ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো বিষয়ে বিদেশি প্রভাবের বিষয়টি যে কোনো রাষ্ট্রের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নির্বাচনসহ সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় বিদেশি প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আইনও রয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনের ক্ষেত্রে নানামুখী বিদেশি তৎপরতাকে সীমিত করার তেমন একটা উদ্যোগ দেখা যায় না, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি তৎপরতাকে ইতিবাচকভাবেই দেখা হয়। 

তবে বিভিন্ন সময়ে বিশ্লেষকরা বলেছেন, নির্বাচন হলো যে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ফলে সে ক্ষেত্রে বিদেশিদের সক্রিয় তৎপরতা দৃষ্টিকটু; কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক কারণে দেশগুলোর বিভিন্নমুখী স্বার্থ জড়িত রয়েছে বলেই তারা নির্বাচনকে ঘিরে সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে, কখনো কখনো নিজেদের পছন্দের বা নিজেদের জন্য সুবিধাজনক সরকার গঠনের জন্য আগ্রহী হয়। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সমঝোতা ও বোঝাপড়ার অভাবের কারণে তাদের এ তৎপরতার সুযোগ সৃষ্টি হয়। রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ক্ষমতার জন্য বিদেশিদের সহায়তার ও তৎপরতার ওপর ভর করে। 

দেশের রাজনীতিতে পরস্পরবিরোধী দুই শিবিরের মধ্যে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের কোনো সমঝোতা না থাকার ফলে বিদেশিদের তৎপরতা বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করছে। স্বাধীনতার পর প্রথম দুই দশকে বাংলাদেশ মূলত একটি অনিশ্চিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রথম সরকার গঠন, সামরিক বাহিনী থেকে এসে জিয়াউর রহমানের পর ফের এরশাদের দীর্ঘ সামরিক শাসন শেষ হয়েছিল স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের মাধ্যমে। তারপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক বৈরিতায় একটি বড় সাফল্য ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। দুই শিবিরের সমঝোতার মধ্য দিয়ে এ ব্যবস্থা বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি গ্রহণযোগ্য উপায় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল; কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে ন্যূনতম ন্যায়নীতির বিসর্জন দিয়ে উভয় দলই নানা সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। 

২০০৬ সালে প্রধান বিচারপতির বয়স বৃদ্ধির মাধ্যমে কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করার চেষ্টা করেছিল বিএনপি, যার প্রতিরোধে রাজপথে শক্ত অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগ। ফলে দুই দলের মধ্যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। এই সুযোগেই ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রেসিয়া এ বিউটেনিসের ব্যাপক তৎপরতা সামনে আসে। পরে ১/১১-র মাধ্যমে সেনাসমর্থিত সরকার দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার উচ্চ আদালতের একটি রায়ের বরাত দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। তারপর থেকেই গত দুই দফা শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী পদে রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা একতরফা ও একদলীয় নির্বাচন হিসেবে সুপরিচিত হয়েছে। প্রথমবার ২০১৪ সালে বিরোধী দল নির্বাচন বয়কট করে। দ্বিতীয়বার ২০১৮ সালে নির্বাচনে অংশ নিলেও কার্যত বিরোধী দলকে মাঠে নামার সুযোগই দেওয়া হয়নি। 

সামগ্রিকভাবে প্রধান দুই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে এই বিরোধের জেরেই বার বার বিদেশিদের তৎপরতাকে সামনে আসতে দেখা যাচ্ছে। গত তিন দফায় আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় থেকে ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছে। ফলে তাদের মাঝে মধ্যে বিদেশিদের ভূমিকার সমালোচনা করতে দেখা গেছে; কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোণঠাসা অবস্থায় বিরোধী শক্তিকে প্রায়ই দেখা যায়, যে কোনো বিদেশি তৎপরতায় আশাবাদী হতে। 

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি সেবার নির্বাচন কমিশন, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠকের পর সমঝোতার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মহাসচিবের নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় সংলাপও করেছিলেন; কিন্তু কার্যত তা দুই দলকে নির্বাচন প্রশ্নে কোনো সমঝোতায় আনতে পারেনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে প্রভাবশালী কিছু দেশের দূতাবাস থেকে নানা বক্তব্য-বিবৃতিও দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের দেখা যেত কূটনীতিকদের সঙ্গে দেখা করতে। এমনকি চীনের দূতাবাসও সে বার বিবৃতি দিয়েছিল, যারা বরাবরই রাজনৈতিক ইস্যুতে নীরব কূটনীতির অনুসরণ করে। সে সময় ভারতের মনোভাব বোঝার জন্য মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা দিল্লি সফরও করেছিলেন।

পরে ২০১৮ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০১৭ সালে বিদেশি কূটনীতিকদের একটি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়েছিল। ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন ওই দলে। তারা নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে পদক্ষেপগুলোর বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলেন; কিন্তু সরকার সে সময় এতে সাড়া দেয়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, ক্ষমতাসীন দল বিদেশিদের হস্তক্ষেপের বিষয়ে অনাগ্রহী এবং তারা কার্যত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিদের ভূমিকাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়; কিন্তু নানা বিশ্লেষণে এরই মধ্যে পরিষ্কার হয়েছে যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দলকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার বিষয়ে প্রতিবেশি দেশের নানা তৎপরতা চলে প্রায় প্রকাশ্যেই। এ ছাড়া ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে প্রতিবেশী দেশটি প্রকাশ্য তৎপরতা রেখেছিল। এ ছাড়া সে দেশের বিশ্লেষকরা অনেকে প্রায়ই বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেছিলেন, তাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই শেখ হাসিনাকে সরকারে বহাল রাখার জন্য সহায়তা করার প্রয়োজন রয়েছে। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের দুই দলই জাতীয় নির্বাচনে বিদেশিদের তৎপরতাকে মেনে নিয়েছে নিজেদের স্বার্থেই। 

আসন্ন ২০২৪ সালের সালের নির্বাচনকে ঘিরেও বিদেশি তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের একটি নিরাপত্তা সংস্থা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) ও এর সংশ্লিষ্ট ৭ জন ব্যক্তির ওপর ট্রেজারি স্যাংকশন বা অবরোধ আরোপ করেছে। এ ঘটনাকে অনেকেই বাংলাদেশে আগামী নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের ওপর চাপ প্রয়োগের কূটনীতি বলে ব্যাখ্যা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই পুলিশি নির্যাতন ও বিচার ব্যবস্থা পক্ষপাতদুষ্ট নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, বাংলাদেশের মানবাধিকার প্রশ্নে তাদের এমন উদ্যোগকে মনে করা হচ্ছে সরকারকে চাপে ফেলার কৌশল হিসেবে। এ প্রসঙ্গে বাইডেন প্রশাসনের নীতিও অনেকে সামনে আনছেন। জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর বলেছেন, পৃথিবীতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা এবং কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা তাদের পররাষ্ট্রনীতির অংশ। সে বার্তা দিতেই সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে নিয়ে সম্মেলনও করেছে, যেখানে অনেক সীমিত গণতন্ত্রের দেশ আমন্ত্রণ পেলেও বাংলাদেশ পায়নি। বলা হচ্ছে, শিগগির অন্যান্য পশ্চিমা দেশও অবরোধ দেওয়ার পথে হাঁটতে পারে। এ সব বিষয়কে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনকে ঘিরে বিদেশি তৎপরতার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি বলে ভাবা হচ্ছে। সে জন্য বিরোধী শিবিরে নতুন করে আশা জেগেছে যে, হয়তো এমন সিদ্ধান্তের কারণে সরকার গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে আন্তরিক হবে। কিংবা নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বিরোধী দলের ওপর হামলা ও আক্রমণের বিষয়ে নমনীয় হবে। 

তবে বিরোধী দলের নীতি নির্ধারকদের মনে রাখা দরকার যে, অভ্যন্তরীণভাবে জনগণের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন শুরু না করলে কেবলমাত্র বিদেশি শক্তির ভরসায় ক্ষমতায় আসলে, তারা জনগণের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারবে না।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //