স্বতন্ত্রদের অনীহা, ‘আসল’ বিরোধীদল জাতীয় পার্টি

দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য ও নতুন সরকারের মন্ত্রীসভার মন্ত্রীদের শপথগ্রহণ হয়ে গেলেও এখনও স্পষ্ট হয়নি কারা হচ্ছেন প্রধান বিরোধী দল। কারণ, এবারের সংসদে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা।

বিরোধীদল হতে ‌‘অনীহা কেন স্বতন্ত্রদের
বিএনপিবিহীন নির্বাচনে এবারই সর্বোচ্চ ৬২ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাদের মধ্যে ৫৮ জন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কমিটিতে পদে এবং রাজনীতিতে জড়িত আছেন। ফলে, এখন আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ঘরের ছেলেকে ঘরে ফিরিয়ে আনা। তবে, দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিরোধী দল হতে নির্দেশনা দেওয়া হলে স্বতন্ত্রের মধ্যে জোট করতে আপত্তি নেই।

আওয়ামী লীগের গঠতন্ত্রে বলা হয়েছে- জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেউ দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হলে দল হইতে সরাসরি বহিষ্কার হবেন এবং যারা দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করবেন, তারা তদন্তসাপেক্ষ মূল দল বা সহযোগী সংগঠন হইতে বহিষ্কৃত হবেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রধানের বক্তব্যের পর যারা আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়নি।

গত ২৬ নভেম্বর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাদের সঙ্গে গণভবনে মত বিনিময় সভায় দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন- ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো কোনও আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাস দেখতে চান না। সব আসনেই যেন ‘ডামি (বিকল্প)’ প্রার্থী থাকে।

নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও একাধিকবার বলেছেন, সময়ের প্রয়োজনে কৌশল পরিবর্তন করে এগোচ্ছে আওয়ামী লীগ। নেত্রীর গাইডলাইন ফলো করে ডামি বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে বাধা নেই। দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

বরিশাল-৪ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন পঙ্কজ দেব নাথ বলেন, আমি দলের মনোনয়ন চেয়েছিলাম। কিন্তু নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিতে পারেন নাই। তবে, বলে দিয়েছেন চাইলে যে কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারবেন। তার জন্য দল তাকে কোনও শাস্তি দেবে না। তাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলাম।

তিনি আরো বলেন, আমি আওয়ামী লীগের লোক, বঙ্গবন্ধু ও নেত্রীর আদর্শে রাজনীতি করি। ফলে, কোনো বিরোধী জোট করার লক্ষ্য আমার নেই। আওয়ামী লীগের লোক হিসেবে দলে ফিরে যাওয়াই আমার লক্ষ্য।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে গাজীপুর-৫ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, আমরা তো আওয়ামী লীগ করি। আওয়ামী লীগের এমপি ছিলাম। এখন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। দলের মনোনয়ন চেয়েছিলাম, তো সবাইকে তো দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু নেত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন যে, সবাইকে তো মনোনয়ন দিতে পারি নাই। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হতে পারবে না। তাই বলে দিয়েছেন- দল থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে কারও কোনও সমস্যা নেই।

তিনি আরও বলেন, তখন আমার সংসদীয় আসনের আওয়ামী লীগের নেতারা এসে বললেন, যেহেতু নেত্রী নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক করতে এবং বেশি সংখ্যাক ভোটার চাচ্ছেন, তাই আপনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে পারেন। তখন আমি স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছি। ভোটারদের আমি শেখ হাসিনার উন্নয়নের কথা বলে ভোট চেয়েছি। তারা আমাকে ভোট দিয়েছে। কিন্তু, আমি তো আওয়ামী লীগের লোক। তাই আওয়ামী লীগ যতক্ষণ না পর্যন্ত বলছে, স্বতন্ত্র হিসেবে আমি আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করতে চাই। অন্য কোনও বিরোধী জোট করতে চাই না। তবে, আওয়ামী লীগ থেকে যে নির্দেশ দিবে, সেই অনুযায়ী কাজ করবো।

তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ থেকে নির্দেশনা নেই, বিরোধীদল হওয়ার জন্য। আশা করছি আমরা একটা দিক নির্দেশনা পাবো সেই অনুযায়ী কাজ করবো।

দলীয় মনোনয়ন চেয়ে না পেয়ে মাদারীপুর-৩ আসন স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তাহমিনা বেগম। তিনি বলেন, বিরোধী দল নিয়ে চিন্তা করবে কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেই মোতাবেক কাজ হবে। আমি বিরোধী দলে যাবো না। বিশেষ নির্দেশ না আসলে আমি কখনও বিরোধী দলে যাবো না। প্রয়োজনে একাই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত বিরোধী দলের যাওয়ার বিশেষ নির্দেশনা না আসে।

হবিগঞ্জ-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন গত সংসদের আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী। তিনি বলেন, আমি আওয়ামী লীগের লোক। গত সংসদে আওয়ামী লীগের এমপি ছিলাম। এখনও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ও জনগণ ভোট দিয়ে আমাকে এমপি বানিয়েছে। সংসদে স্বতন্ত্র হিসেবে জনগণের জন্য কাজ করতে চাই।

কোনও বিরোধী জোট বা দলে যাওয়ার আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা নেই বলে জানিয়ে কেয়া চৌধুরী বলেন, তবে, দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিরোধীদল বা জোট করার যদি কোনও নির্দেশনা আসে তখন সেই অনুযায়ী কাজ করবো।

অন্যদিকে, সংখ্যায় কম হওয়ায় সংসদের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল জাতীয় পার্টির বিরোধী দল হওয়া, না হওয়া নির্ভর করছে স্বতন্ত্রদের সিদ্ধান্তের ওপর। আর এই জটিলতায় সংসদে প্রধান বিরোধীদল কারা হচ্ছেন এবং কে প্রধান বিরোধী নেতা হচ্ছেন তার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।

আমরা ‘আসল’ বিরোধীদল: চুন্নু
নির্বাচনে জয়ী স্বতন্ত্ররা আলাদা জোট করে সংসদে বিরোধীদল হয়ে সুযোগ-সুবিধা নিতে পারবে। কিন্তু, তারা সরকারের সমালোচনা করতে পারবে না বলে মনে করেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্ন।

তার দাবি, সংসদে তারা ‘আসল’ বিরোধী দল, বিরোধীদলের আসনে আমরা বসবো। আমরা সরকারের সমালোচনা করবো।

তিনি বলেন, সংসদে আমরাই বিরোধীদল। আমরা সরকারের সঙ্গে কিংবা মন্ত্রিসভায় যাইনি। তাহলে আমরা বিরোধীদল কিনা প্রশ্ন আসবে কেন? বিরোধীদল না হলে আমরা তো সরকারেই থাকতাম। আমরা তো আওয়ামী লীগের লোক এনে পাশ করি নাই।

জাপা মহাসচিব আরও বলেন, এখন স্পীকার কাউকে বিরোধীদল হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তারা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবে। কিন্তু রিয়েল অপজিশন তা আমরা। একমাত্র বিরোধীদল জাতীয় পার্টি।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা তো আওয়ামী লীগের পদধারী বলে উল্লেখ করে চুন্নু বলেন, তারা যদি দল থেকে পদত্যাগ করে ৪০-৫০ জন মিলে কোনও জোট করে তাহলে স্বাগত জানাবো। কিন্তু তারা তো সেটা করবে না এবং সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্যও দেবে না। -ভয়েস অফ আমেরিকা

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //