মহাজনের রূপ-রূপান্তর

আনু মুহাম্মদ

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২০, ০৬:০০ পিএম

‘মহাজন’ শব্দটি সাধারণভাবে একটি পেশাগত অবস্থান নির্দেশ করে। আবার এটি একটি বিশেষণ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। কখনো বা এটি একটি অনির্দিষ্ট পরিচয় বহন করে। সংস্কৃত এই শব্দের আক্ষরিক অর্থ ধরলে এর মানে মহান ব্যক্তি, আরেক অর্থ বহুজন। ইংরেজিতে এর আক্ষরিক অর্থ moneylender, অর্থঋণদাতা।

বাংলা অঞ্চলে ব্যবসাবাণিজ্য ক্ষেত্রে কর্তাব্যক্তিকে মহাজন বলে ডাকবার রীতি বহু পুরাতন, এখনো আছে। যেকোনো পর্যায়ের মালিক, নৌকার মালিক, জালের মালিক, তাঁতের মালিক, দোকানের মালিক ‘মহাজন’ নামে পরিচিতি পায় তার অধীনস্ত ব্যক্তিদের কাছে। 

আবার এই ‘মালিক’ কখনো কখনো মানব চৈতন্যে আরও বৃহৎ অবয়ব নেয়। লোকগান ও ভাবনায় মানুষ তার পরম বা চিন্তাজগতের প্রভুকেও সম্বোধন করে ‘মহাজন’ বলে। বহুকাল আগে থেকেই এটি চলছিল, এখনো আছে। 

লালনের গান থেকেও শুনি-
“হা রে মন তোরে আর কী বলি।
পেয়ে ধন সে ধন হারালি।
মহাজনের ধন এনে 
ছড়ালি রে উলুবনে
ও তোর কী হবে নিকাশের দিনে
সে ভাবনা কই ভাবিলি।...”
কিংবা 
“...প্রকৃতি সেবার বিধান
গোপী ভিন্ন জানে কি আন্
প্রাপ্তি হয় সে গোলকধাম
যুগল ভজন পাই।।
গোপীর প্রেমে হয় মহাজন
যাতে বাঁধা মদনমোহন
লালন বলে সে- প্রেম এখন
আমার ভাগ্যে নাই।”

বাংলাদেশে চলতি অর্থে ‘মহাজন’ শব্দ নির্দিষ্ট কাল ও পেশাগত পরিচয় দেয়, নির্দেশ করে এমন এক জনগোষ্ঠী যারা নির্যাতনমূলক অর্থব্যবসায়ী, সুদীকারবারি। উচ্চহারে এবং চক্রবৃদ্ধি সুদের বিনিময়ে ঋণ প্রদানকারী একটি গোষ্ঠী। এরকম গোষ্ঠীর অস্তিত্ব প্রাচীনকালেও বহু অঞ্চলে দেখা যায়। ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মশাস্ত্রে এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান থেকে বোঝা যায়, এর অত্যাচার পুরনোকালেও সাধারণ মানুষের ভেতর প্রবল বিরূপতা সৃষ্টি করেছিলো। এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছিল এর নির্যাতনের ব্যাপকতার কারণেই। কিন্তু সমাজ-অর্থনীতি ক্ষমতার স্রোতে তা যে খুব কাজ করেনি, তা এসব ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর ইতিহাসই বলে।

বাংলা অঞ্চলেও এই পেশার দাপট দীর্ঘসময় গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য মানুষের জীবনকে তছনছ করেছে। গত শতকের ত্রিশ দশকে এই অবস্থা আরও তীব্র হয়। বিশ্বযুদ্ধের সাথে সাথে সংকট সর্বব্যাপী হয়, ক্ষোভেরও বিস্তার ঘটে। চল্লিশ দশকে যখন সারা বাংলায় তেভাগা আন্দোলন চলছিল তখন কৃষক জনতার প্রতিপক্ষ হিসেবে ব্রিটিশ রাজ ছাড়াও উচ্চারিত হতো জমিদার, জোতদার ও মহাজনের নাম। সে সময়ের বহু কবিতা, পুঁথি, গান, যাত্রা, নাটক, পোস্টারে তাই ‘মহাজন’ চরিত্র পাওয়া যায়। 
একটা কবিতা যেমন-
“শহর ছেড়ে চলি অনেক দূরের গ্রামে।
সেখানে দেখি তুখোড় মহাজন,
তার তৃতীয় নয়নের সামনে
জীর্ণ বলদে চষা মাঠে সোনালী ফসল ফলে না,
দিনে দিনে পশ্চিমের যুদ্ধ শক্তিশেল হানে।
তাই অনেক কৃষক আজ জমায়েত, সরবে হাঁকে,
‘লাঙল যার জমি তার।’
এখন সেই পেশার সেই দাপট নেই, তবে তার রেশ আছে, ধারাবাহিকতায় তার ভিন্ন ভিন্ন রূপ আছে। 

সামন্তবাদী অর্থনীতিতে জমিদার ও মহাজন অবিচ্ছেদ্য। গ্রামীণ অর্থনীতিতে সম্পদের কেন্দ্রীভবন, গরিব কৃষকের জমি হারানো, ঋণগ্রস্ততার নির্মম জালবিন্যাসের মাধ্যমে মালিকানা স্থানান্তর ইত্যাদি ক্ষেত্রে মহাজনের ভূমিকা ছিল কঠিন ও নির্মম। বাংলা সাহিত্যে মহাজনদের নিয়ে অনেক লেখা আছে, অনেক গবেষণা আছে। ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে যখন দলীয় রাজনীতির শুরু- শোষণ নিপীড়নে বিপর্যস্ত কৃষক সমাজের ক্ষোভের বিস্তারের প্রভাবে, মহাজন বিরোধী ইস্যু রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়। একে ফজলুল হকের উদ্যোগে ঋণ শালিসী বোর্ড গঠন এবং ঋণের বোঝা থেকে গরিব কৃষকদের রক্ষা করার কিছু ব্যবস্থার কারণে তার বিপুল জনপ্রিয়তা তৎকালীন পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করে। 

এরও আগে এই মহাজনী অত্যাচারে বিপর্যস্ত কৃষকদের দম ফেলার সুযোগ দিতে বাংলায় ভিন্ন ধরনের ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দেখা যায়। এর পথিকৃৎ ছিলেন আবার জমিদার পরিবারের সন্তান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০৫ সালে পতিসরে তিনি কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন, তার উদ্দেশ্য স্পষ্টতই ছিলো প্রচলিত মহাজনী সুদের হারের অনেক কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে মহাজনের একচ্ছত্র দাপট ও জাল থেকে কৃষকদের রক্ষা করা। নিজে মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এই ব্যাংক স্থাপন করেন। কৃষকদের জন্য এখানে ঋণের সুদের হার ছিলো বছরে শতকরা ১২ ভাগ, যেখানে মহাজনদের সুদের হার ছিলো মাসেই শতকরা ১১-১২ ভাগ, তার ওপর তা ছিলো চক্রবৃদ্ধি হারে। কবির নোবেল পুরস্কারের টাকাও এই ব্যাংকে জমা দিতে হয়। এই ব্যাংকের বিস্তার না ঘটলেও এর কারণে কয়েকটি গ্রামের গরিব কৃষক নিঃস্ব হবার হাত থেকে রক্ষা পান। তবে এই ব্যাংক টিকতে পারেনি, ৩০ এর দশকে বন্ধ হয়ে যায়। 

মোগল আমলেই বাংলায় ব্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান দেখা গিয়েছিল। সিরাজের দরবারে জগৎ শেঠ প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকেরই আদিরূপে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন। উপনিবেশ না হলে বাংলায় এগুলোই হয়তো নতুন বণিক শ্রেণি বিকাশের মাধ্যম হতো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্যদিয়ে জমি নির্ভর অনুৎপাদনশীল খাজনাদার গোষ্ঠীর আধিপত্য খুঁটি গেড়ে বসে। এই কাঠামোতে মহাজনী পেশা খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠে। জমিদারের ক্রমবর্ধমান খাজনার চাপ মোকাবিলায় বিপর্যস্ত কৃষকদের শেষ ভরসা ছিলো মহাজন। মহাজনের সুদের ভারে জমি সম্পত্তি হারিয়ে পরিবারে বিপর্যয় ঘটিয়ে এর ভয়াবহ সমাপ্তি ঘটতো। অনেকস্থানে ভোগী জমিদারেরাও  মহাজনের জালে আটকা পড়ে। অনেক মহাজন সূর্যাস্ত আইনে পরাজিত জমিদারী কিনে নতুন পরিচয়ে আবির্ভূত হয়।

পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিস্তারের সাথে সাথে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। প্রকৃতপক্ষে সংগঠিত পুঁজিবাদী অর্থনীতির সাথে ব্যক্তি মহাজনের সুদের কারবার মেলে না। অর্থবণিক হিসেবে মহাজনী পেশা তাই এই ব্যবস্থায় আর আগের দাপট নিয়ে টিকে থাকতে পারেনি। অর্থবাণিজ্যে সেই জায়গা নিয়েছে প্রতিষ্ঠান, যার নাম ব্যাংক, ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে তার আওতা। মহাজন যেমন জমিদার বা জোতদার থেকে একটা ভিন্ন পরিচয়ে দাঁড়িয়েছিল, ব্যাংক মালিক সেরকম শিল্পমালিক থেকে ভিন্ন চরিত্র পায়নি। বরং শিল্প পুঁজি আর ব্যাংক পুঁজি অনেকক্ষেত্রে একাকার হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকের ভূমিকা দাঁড়ায় জনগণের আমানত নিয়ে কতিপয় ব্যবসায়ী/শিল্পপতি গোষ্ঠীর পুঁজির জোগান দেয়া। অনেক শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীর জন্যই ব্যাংকঋণ প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়।

এই মূল ভূমিকা অব্যাহত থাকলেও কালক্রমে ব্যাংক শুধু ছোট বড় পুঁজিপতিকে পুঁজি জোগানোর মধ্যেই তার কার্যক্রম সীমিত রাখেনি। বিভিন্নমুখি ঋণ কর্মসূচি, বিশেষত ভোক্তা ঋণের (consumer loan) মাধ্যমে মানুষের হাতে টাকা পৌঁছে দিয়ে তার ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দূর করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকঋণ এখন পুঁজিবাদের রক্ষাকবচ। কেননা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদন বেড়েছে যে হারে, পুঁজির ক্রিয়ার কারণেই সেই অনুপাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তৈরি হয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কর্মজীবনে থেকে যে আয় করেন, সেটাই যদি ব্যয় করেন- তাহলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির টিকে থাকা কঠিন হবে। বহু পণ্যই অবিক্রীত থাকবে। তাকে ব্যয় করতে হবে আয়ের তুলনায় বেশি। তারজন্যই পুঁজিবাদের বড় অবলম্বন হলো ব্যাংকঋণ, নাগরিকদের বেশি বেশি ব্যাংকঋণের আওতায় আনা। বিশেষত শিল্পোন্নত দেশে ক্রেডিট কার্ডই এখন জীবন চালায়। ঋণগ্রস্ত মানুষ, ঋণগ্রস্ত অর্থনীতি। এখানে ব্যক্তি মহাজন দৃশ্যমান নয়, কোনো ব্যক্তি এগুলো নির্ধারণ করছে, তাও নয়। নিরাকার পুঁজির শাসনের কালে আধুনিক ঋণব্যবস্থা এমন এক অদৃশ্য জাল, যাতে অধিকাংশ মানুষ বন্দি, আপাত জৌলুসের দেশগুলোতেও। আর এই ঋণই তাকে তাড়া করে নতুন নতুন আয়ের উৎসের সন্ধান করতে। 

মহামন্দা কালের অর্থনীতিবিদ কেইনস বলেছেন, ছোট ঋণগ্রহীতারা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক তার হাতে দড়ি লাগায়। আর ঋণগ্রহীতা যদি বড় সাইজের হয়, তাহলে তার পায়ে পায়ে ঘুরতে থাকে ব্যাংক নিজেই। বাংলাদেশে আমরা সকাল-বিকাল সেই দৃশ্য আরও প্রকট চেহারায় দেখি। এখানে প্রশিকা, ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক তার গরিব ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতাকে ঋণ পরিশোধে দেরি হবার কারণে কোমরে দড়ি দিয়েছে, জেলে নিয়েছে, ঘরের টিন, গরু-ছাগল বিক্রি করতে বাধ্য করেছে। গলায় ফাঁস দেয়ার ঘটনাও আছে। দেশের সাধারণ ব্যাংকগুলো ২০/৫০ হাজার বা কয়েক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে আটকে গেলে ছোট ঋণগ্রহীতাদের ওপর সগৌরবে আস্ফালন করে। আর এই একই দেশে যদি কেউ শত বা হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয় তাহলে তার জন্য পুরো ব্যাংকই খুলে যায়। বস্তুত ৮০-এর দশক থেকেই ব্যাংকঋণ, জালিয়াতি বা খেলাপির মাধ্যমে হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের কোটিপতিদের পুঁজি সঞ্চয়ের প্রধান মাধ্যম। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মেরে দেয়া টাকার একাংশ দিয়ে তারাই আবার প্রাইভেট ব্যাংক দিয়েছে। এখন দেশে প্রাইভেট ব্যাংকের জমজমাট ব্যবসা। 

বাংলাদেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। ‘রাইট অফ’ বা অবলোপনের (ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে আলাদা করে রাখা) মাধ্যমে এর আগের অনেক খেলাপি/মন্দঋণ হিসাবের বাইরে চলে গেছে। সর্বশেষ হিসাব থেকেও ‘রাইট অফ’ বাদ দিয়ে খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। বড় প্রভাবশালী ঋণখেলাপির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকে। তাদের জন্য নামে-বেনামে ঋণের সুযোগের শেষ নেই। তবে এসব ঋণ শোধ করবার জন্য নয়। ব্যাংক তো বটেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তাদের কথাতেই পরিচালিত হয়। এদের দাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের চাকুরি চলে যাবার দৃষ্টান্তও আছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংক এরকম আইন করেছিল যে, তিনবারের বেশি কেউ তাদের বকেয়া ঋণ রি-শিডিউল করতে পারবে না। বেক্সিমকো গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি বকেয়া ঋণ বারবার রিশিডিউল করবার আবেদন করেছে। আগেরগুলো তো বটেই সর্বশেষ আবেদনও গৃহীত হয়েছে। সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রথমে সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক এই গ্রুপের প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রি-শিউিউল বা ২০২৪ সাল পর্যন্ত পরিশোধের মেয়াদ বৃদ্ধি করবার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। তাদের জন্য দুই বছরের অর্থাৎ ২০১৬ পর্যন্ত কোনো কিস্তি পরিশোধ না করারও অনুমতি দেয়া হয়েছিল তখন। এখন তারা আরও শক্তিশালী। সম্প্রতি কয়েক দফায় তাদের সুবিধা আরও বাড়ানো হয়েছে। এখন ঋণখেলাপিরা নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের থেকে কম সুদে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। অবশ্য যদি তারা তা চান। বোঝাই যাচ্ছে, না দিলেও কোনো অসুবিধা নাই!

বাংলাদেশে ৮০-এর দশক থেকে গরিবদের কথা বলে যে ক্ষুদ্রঋণের বিস্তার ঘটেছে, তা এখন বিশ্বব্যাপী পরিচিত, বহুভাবে পুরস্কৃত। বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতা সংস্থাগুলোর বৃহৎ বাণিজ্যের কথা আমরা জানি। তারা দারিদ্র বিমোচনের কথা বলেই এই বাণিজ্যের সম্প্রসারণ করেছে। এটা ঠিক যে, এই ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা গরীবদের বাজারের সাথে যুক্ত করেছে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োকারীদের জন্য অর্থলগ্নীর বিশাল ক্ষেত্র উন্মোচন করেছে, গ্রামীণফোন, ডানোন আর মনসান্টোর মতো বহুজাতিক পুঁজির মুনাফার রাস্তা এবং অন্য বহু পণ্য বিক্রির বাজার তৈরি হয়েছে ক্ষুদ্রঋণের জালের মধ্যদিয়ে। এগুলো তাদের ‘সাফল্যের’ দিক। কিন্তু যে কথা বলে এগুলোর যাত্রা, সেখানে তাদের সাফল্য পাওয়া যায় খুব কম। বিভিন্ন বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ঢাকঢোল পেটালেও দারিদ্র বিমোচন ঘটাতে এই ঋণজাল অবদান রেখেছে সামান্যই। বরং তৈরি করেছে অসংখ্য ঋণগ্রস্ত মানুষ আর অনেক খুদে মহাজন।  ঢাকায় অবিরাম জন¯্রােতে ভেসে আসা মানুষদের জিজ্ঞাসা করলে জানা যাবে, তাদের অনেকেই এই ঋণের জাল থেকে বাঁচতেই এলাকা থেকে পালিয়েছে। বাঁচতে গিয়ে হয়তো আবার পড়েছে কোনো নব্য মহাজনের খপ্পরে। বাজারের বিস্তার নতুন অনেক খুদে মহাজনের সফল বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। সুদের হার এখানেও বেশ উঁচু। তবে তারা কেউই মহাজন নামে পরিচিত নয়, একক পেশাও নয়, এটা তাদের আরও অনেক ব্যবসার একটি।

বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্র এখন বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার অধীন। এই শাসনব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা আঞ্চলিক অর্থকরী প্রতিষ্ঠান। এদের আরেক নাম হতে পারে বৈশ্বিক মহাজন। এরা উন্নয়নের নামে ‘দাতা’ মুখোশ নিয়ে নানা খাতে প্রবেশ করে। ঋণ তাদের জন্যও শক্তিশালী একটি অস্ত্র। ঋণ প্রয়োজন না থাকলেও তাকে প্রয়োজনীয় হিসেবে দেখানোর জন্য আছে কনসালট্যান্ট বাহিনী। আগেরকালের মহাজনদের জন্য ঋণের মুনাফাই ছিল মুখ্য, তার জালে পড়ে সর্বস্বান্ত হতো গরিব কৃষকেরা। বর্তমান বৈশ্বিক মহাজনদের কাছে ঋণের মুনাফা গৌণ। প্রধান হলো ঋণ জালে কনসালট্যান্ট, দেশীয় সুবিধাভোগী আর শর্তাবলীর বড় খোপে ফেলে দেশের গতিমুখ নির্ধারণ করা; দেশের লুটেরা আর বহুজাতিক পুঁজির জন্য দেশ উন্মুক্ত করা। এই প্রক্রিয়াতেই সবার অজান্তে দেশের জমি, বন, পাহাড়, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, চিকিৎসা, খনিজসম্পদ এখন সর্বজনের হাত থেকে পুঁজির নিয়ন্ত্রণে, সবই ব্যক্তি বাণিজ্যের অধীন। অভিন্ন প্রভুর কাছে বাঁধা থাকায় নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকারে এই ধারার কোনো পরিবর্তন হয় না। দেশের লুটেরা আর বহুজাতিক কোম্পানির কবলে এখন তাই বাংলাদেশ। তবে ভরসার কথা এই যে, নব্য মহাজনদের সাঁড়াশির বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে লড়াই হচ্ছে, জোরদারভাবে হতে হবে বাংলাদেশেও।

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh