ভাইরাসের মতোই ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বাল্যবিবাহ

এ আর সুমন

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:০৫ পিএম

আগস্টের শেষ সপ্তাহের গল্প। খুলনার তেরখাদা উপজেলার নৌকাডুবি গ্রামের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া (ছদ্মনাম)। বয়স ১৫ বছর। তার বড় বোন সুরাইয়া (ছদ্মনাম) খুলনার একটি কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে পড়ছেন। বাবা সাবেক সরকারি কর্মচারী। করোনাভাইরাসে সবকিছু স্থবির। পড়েছেন আর্থিক সংকটে। তবে বসে থাকতে রাজি নন সুমাইয়া-সুরাইয়ার বাবা। তিন মেয়ের মধ্যে দুই মেয়েকেই একসঙ্গে বিয়ে দিতে চান। যেমন কথা তেমন কাজ। প্রতিবেশী পাত্র দেখে দুই মেয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেললেন। অল্প বয়সী মেয়ের বিয়ের চাপ সামাল দিতে সিস্টেমে বড় মেয়ের বিয়ের আয়োজন করে সেই সঙ্গে মেজ মেয়েকেও বিয়ে দিতে চান। ১৫ বছরের মেয়েকে বাল্যবিবাহ দেয়ার বিষয়ে আত্মীয়-স্বজন নিষেধ করলেও এই বাবা তা শুনতে নারাজ। রাজি না ছোট্ট সুমাইয়া। আর্থিক অনটনের কথা বারবার বলছেন। ঘরোয়া পরিবেশে প্রশাসন, আত্মীয়দের লুকিয়ে বড় মেয়ের সঙ্গে মেজ মেয়েকেও বিয়ে দিয়েছেন। করোনাকালে এমন চিত্র নতুন নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব বাল্যবিবাহের ছড়াছড়ি অবস্থা। শুধু দেশ নয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে এশিয়াজুড়ে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে স্কুলগামী হাজারো মেয়ে। মূলত করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পরিবারগুলো একরকম বাধ্য হয়েই তাদের মেয়েদের বাল্যবিবাহ দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরে বাল্যবিবাহ রোধে যে অগ্রগতি হয়েছিল, করোনাকালে তা ভেঙে পড়েছে। উল্টো ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে বাল্যবিবাহ বন্ধের সব প্রচেষ্টা।

প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মেয়ের বয়স ১৮ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। করোনাভাইরাসের কারণে আগামী দুই বছরে ৪০ লাখ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ভিশন। এ ছাড়া আগামী এক দশকে অতিরিক্ত আরও এক কোটি ৩০ লাখ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হতে পারে বলে গত মাসে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল জাতিসংঘ। সম্প্রতি বাল্যবিবাহ ঠেকাতে কাজ করা এক হাজার চারশ’র বেশি সংস্থার বৈশ্বিক সংগঠন ‘গার্লস নট ব্রাইডস’ জানায়, বাল্যবিবাহ নিয়ে তাদের সদস্য সংস্থাগুলো খুবই উদ্বিগ্ন। ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে বাল্যবিবাহ একটি পুরনো সামাজিক সমস্যা। বাংলাদেশেও সমস্যাটি ব্যাধির মতোই। তবে বিগত সময়ে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার গৃহীত পদক্ষেপের মাধ্যমে এসব দেশে শিক্ষার পাশাপাশি নারী স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা; কিন্তু এ অগ্রগতির পথে নতুন করে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনাভাইরাসের আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব। আয়ের উৎস হারিয়ে সন্তানদের ভরণ-পোষণে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। আর এ পরিস্থিতিতে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বাল্যবিবাহ।

এ বিষয়ে গার্লস নট ব্রাইডের এশিয়া অঞ্চলের প্রধান শিপ্রা ঝা বলেন, ‘গত এক দশকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আমরা যে অগ্রগতি করেছি, তা এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এমনিতেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় বাল্যবিবাহ বেশ শক্তভাবে প্রোথিত। আর কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে এশিয়ায় বাল্যবিবাহ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।’

জাতিসংঘের হিসাবে, বছরে সারাবিশ্বে এক কোটি ২০ লাখ ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। তবে সংস্থাটি এখন বলছে, কভিড-১৯ সংক্রমণজনিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ নেয়া না হলে, আগামী এক দশকে অতিরিক্ত এক কোটি ৩০ লাখ শিশু বাল্যবিবাহের শিকার হবে। এরই মধ্যে এশিয়ায় কয়েক লাখ শিশু করোনাকালে বাল্যবিবাহে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা।

ভারতের ওয়ান স্টেপ টু স্টপ চাইল্ড ম্যারেজের পরিচালক রোলি সিং বলেন, ‘করোনাকালীন লকডাউনে ভারতে বাল্যবিবাহের সংখ্যা বেড়েছে। সত্যি বলতে, বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছে। বহু পরিবার তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণেই হিমশিম খাচ্ছে। ফলে তাদের অনেকেই কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন।’

এদিকে সেভ দ্য চিলড্রেন এরই মধ্যে সতর্ক করেছে যে, এ পরিস্থিতিতে মেয়েদের ওপর সহিংসতা বাড়বে। একই সঙ্গে বাড়বে তাদের জোরপূর্বক বিয়ে দেয়ার ঘটনা; যা করোনাভাইরাসের চেয়েও বড় ঝুঁকিতে পরিণত হবে। বিশেষ করে মেয়েদের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের প্রধান অবলম্বন হলো শিক্ষা; কিন্তু লকডাউনের কারণে বহুদিন ধরেই স্কুল বন্ধ রয়েছে। আর ঠিক এ সুযোগেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন দরিদ্র পিতা-মাতারা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে বিশ্বের দরিদ্রতম অঞ্চলের মেয়েরা।

দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাল্যবিবাহ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধিই নয়, বাল্যবিবাহের দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে কিশোরী ও নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য, মাতৃমৃত্যু, নারীর শিক্ষা, উপার্জনসহ সামগ্রিক সামাজিক সক্ষমতা। করোনাভাইরাসে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের ঘটনা ব্যাপকহারে বেড়েছে। প্রশাসন ও একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে বেশ কিছু বাল্যবিবাহ রুখে দেয়া সম্ভব হলেও তা সংখ্যায় একেবারে হাতে গোনা। বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) এক সমীক্ষাতেই এমন তথ্য সম্প্রতি উঠে এসেছে।

এমজেএফের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত জুন মাসে দেশে ৪৬২টি শিশুকন্যা বাল্যবিবাহের শিকার হয়। ২০৭টি বাল্যবিবাহ রুখে দেয়া সম্ভব হয়। গত মে মাসেও ১৭০টি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটে। প্রশাসন ও সচেতন মানুষের উদ্যোগে ২৩৩টি বিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হয়। বাল্যবিবাহ রোধে ২০১৭ সালে দেশে আইন চালু করা হয়। ওই আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের আগে মেয়েদের এবং ২১ বছরের আগে যদি কোনো ছেলে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তাহলে তাকে দুই বছর জেল খাটতে হবে। যারা বিয়ে দেবেন, সেই অভিভাবকদের জন্যও একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে; কিন্তু সেই আইনেও পরিস্থিতি বদলায়নি। 

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘দেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়। আর ২২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগে। বাল্যবিবাহের ঘটনায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।’ করোনাকালীন বাল্যবিবাহ কেন বেড়েছে তার কারণ তুলে ধরে এমজেএফের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘ভাইরাস সংক্রমণ রোধে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। বহু মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। কাজ না থাকায় অনেকের ঘরেই অভাব। সামাজিক নিরাপত্তার বিষয় চিন্তা করে অনেক বাবা-মা শিশুকন্যাকে নিজের কাছে রাখতে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। তাই তড়িঘড়ি বিয়ে দিচ্ছেন।’ 

দেশে বাল্যবিবাহের আরেকটি চিত্র পাওয়া গেল জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) জরিপে। সংস্থার তথ্য অনুসারে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারী গ্রুপের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয় প্রায় ৫৯ শতাংশ মেয়ের। ১৯৯৩ সালে ১৮ বছরের আগে বিয়ে হতো ৭৩ শতাংশ মেয়ের। ১৯৯৯-২০০০ বছরে কমে দাঁড়ায় ৬৫.৩ শতাংশে। ২০১১ সালে ৬৫ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ৫৮.৬ শতাংশ ছিল। সবশেষ ২০১৭-১৮ সালের জরিপে দেখা গেছে, এ হার প্রায় একই জায়গায় আটকে রয়েছে, ৫৮.৯ শতাংশ। বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক দেশকালের কথা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‘দেশে প্রায় প্রতি তিন কিশোরীর একজন এখনো গর্ভধারণ করেন ২০ বছরে পৌঁছানোর আগেই। এই বাস্তবতায় করোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো- বাল্যবিবাহ, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, কিশোরী মাতৃত্ব, উচ্চ মাতৃমৃত্যু হার এবং পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অপূর্ণ চাহিদার মতো বিষয়গুলো।’ 

বেসরকারি সংগঠন ব্র্যাক সম্প্রতি ১১টি জেলায় ৫৫৭ জন নারী-পুরুষের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জানিয়েছে, বাল্যবিবাহ আগের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেড়েছে। বেশির ভাগ বাবা-মা মনে করেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে। তাই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়াই ভালো। করোনাকালে বাল্যবিবাহের সঙ্গে আরেকটি বিষয় ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, তা হলো- লাগামছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ। দেশের বাল্যবিবাহের পরিস্থিতি গুরুত্ব দিয়ে এসব সমস্যা নিয়ে এখনি তৎপর হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

অনলাইন সম্পাদক: আরশাদ সিদ্দিকী | ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh