পেঁয়াজ নিয়ে প্যাঁচ কষছে ব্যবসায়ীরা

হারুন-অর-রশিদ ও রেজাউল রেজা

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:২৭ পিএম | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:০৭ পিএম

বছর না ঘুরতেই আবার অস্থিতিশীল পেঁয়াজের বাজার। অজুহাত একই- বাজারে পেঁয়াজের ঘাটতি, দাম বাড়ছে ভারতের বাজারে। 

তবে এই অজুহাত নিছকই খোঁড়া যুক্তি। প্রতি কেজি ১৪ থেকে ১৫ টাকায় ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। গত মাসে আমদানি হয়েছে ৮৩ হাজার ৬৬৬ টন পেঁয়াজ। বছরের ব্যবধানে আমদানির দামও কমেছে, আবার পরিমাণ বেড়েছে। 

কিন্তু ‘বাজারে পেঁয়াজ সংকট’ এমন অজুহাতে দাম বেড়েই চলেছে। 

এর মধ্যেই অতিবৃষ্টি ও বন্যায় সরবরাহ ঘাটতির কথা বলে আপাতত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এই সিদ্ধান্ত আসার পরপরই দেশে অসাধু ব্যবসায়ীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সন্ধ্যার পর রাজধানীর কারওয়ান বাজারের আড়তে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।

সূত্র জানায়, ফের ‘সেপ্টেম্বর আতঙ্কে’ গত তিন সপ্তাহে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে সব ধরনের পেঁয়াজের দাম। ইতিমধ্যে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ৮০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। গত মাসের মাঝামাঝিতে যার দাম ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা। আর দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। যা আগে ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। 

  • প্রতি কেজির আমদানি মূল্য ১৪-১৫ টাকা
  • বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকায়
  • কারসাজি বন্ধে সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি
  • কমদামে বেশি আমদানি করেও সংকট!

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কোনো বাস্তবসম্মত কারণ নেই। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মানিকনগরের এক স্থানীয় দোকানদার বলেন, ‘শ্যামবাজারের মোকাম থেকে বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ আনতে পারিনি। দাম অনেক বেড়েছে। আমরা বেশি দামে কিনে সামান্য লাভ রেখে বিক্রি করি। দাম বাড়লে বিক্রি করতে আমাদের মতো দোকানদারদের সমস্যা বেশি হয়।’

এদিকে দাম বৃদ্ধির জন্য বরাবরের মতো একে-অপরকে দোষারোপ করছেন বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের আড়তদার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা সরাসরি ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করি না। কিছু পেঁয়াজ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তারাই মূলত পেঁয়াজ আমদানি করে আমাদের সরবরাহ করে। আমরা তাদের দাম অনুযায়ী বাজারে পেঁয়াজ ছাড়ি। এখানে আমরা সামান্য কিছু কমিশন পেয়ে থাকি। বেশি দামে কিনে বিক্রিও করি বেশি দামে।’

বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির তথ্য পর্যবেক্ষণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই পর্যবেক্ষণ করা হয়। সর্বশেষ গত আগস্টে ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খুলে ৮৩ হাজার ৬৬৬ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। এতে আমদানিকারকদের ব্যয় হয়েছে এক কোটি ৩৯ লাখ ৩৬ হাজার ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যা ১১৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। প্রতি টন পেঁয়াজ আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২২৭ ডলার। গত বছর আগস্টে আমদানি করা হয় ৫৭ হাজার ৪৭৯ টন। এই হিসাবে পেঁয়াজ আমদানি বেড়েছে ৪৫.৫৫ শতাংশ। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে প্রথম ও শেষ সপ্তাহে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১৫ টাকা দরে আমদানি করা হয়। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে দাম আরো কম ছিল। প্রতি কেজি ১৪ টাকা। এ হিসাবে আমদানিতে দাম কমেছে ১৭ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। গত বছরের আগস্টে আমদানিতে পেঁয়াজের দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৭ থেকে ২৫ টাকা। 

তবে আগস্টের শেষ সপ্তাহে এসে নতুন করে আমদানি করতে গিয়ে যে এলসি খোলা হয়েছে তাতে পেঁয়াজের দাম কিছুটা বেড়েছে। আগস্টের শেষ সপ্তাহের এলসি খোলার ক্ষেত্রে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পড়েছে ১৯ টাকা। অন্য চার সপ্তাহে এই দাম ছিল ১৩ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত। আগস্টে পুরো মাসে ৮০ হাজার ৮৯৪ টন পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়। এতে মোট ব্যয় হয় এক কোটি ৪৪ লাখ ৮৩ হাজার ডলার। 

ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানিকারক মো. হাফিজুর রহমান জানান, ‘পেঁয়াজ আসতে অন্তত এক সপ্তাহ সময়ের প্রয়োজন হয়। আগে এলসি খোলা হলেও পেঁয়াজ আনতে হয় সপ্তাহ খানেক আগের দামে। ভারতে এখন পেঁয়াজের দাম অনেকখানি বেড়েছে। তাই আমাদেরও বেশি দামে পেঁয়াজ আনতে হয়েছে। তার ওপর পরিবহন ভাড়া, শ্রমিকদের মজুরি দিয়ে দেশের বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে।’

আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা জানান, বন্দরে পেঁয়াজের চালান আসার পর সরকারি কিছু খরচসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ প্রতি কেজিতে আরো এক টাকা খরচ হয়। এছাড়া এসব পেঁয়াজ বন্দর থেকে রাজধানী পর্যন্ত আসতে কেজিপ্রতি আরো এক থেকে দেড় টাকা খরচ হয়ে থাকে। এরপর আমদানিকারকরা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে এসব পেঁয়াজ বিক্রি করেন। পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে। সব মিলিয়ে ভারত থেকে আমদানি করার পর তিন-চার হাত হয়ে পেঁয়াজ ভোক্তার কাছে পৌঁছায়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, দেশে বার্ষিক পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ টন। গত বছর উৎপাদন হয় ২৩.৩০ লাখ টন। বাকিটুকু আমদানি করা হয়। আর যে পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়, তার প্রায় ৯৫ থেকে ১০০ ভাগই আসে ভারত থেকে। 

দেশি পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে মালিবাগের পাইকারি ব্যবসায়ী মো. শাহবুদ্দিন বলেন, ‘দেশে পেঁয়াজের সংকট নেই। ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় এক শ্রেণির অসাধু মজুদদার বাজারে পেঁয়াজ কম ছাড়ছেন। এতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে, দেশি পেঁয়াজের দামও বেড়ে যাচ্ছে। পেঁয়াজ এখন মজুদকারিদের কাছে। সেখানে বৃষ্টি-বন্যায় পেঁয়াজের ক্ষতি হওয়ার কথা না। যতটুকু ক্ষতি হয়, সেটুকু ক্ষতি বিবেচনা করেই দাম নির্ধারণ করা থাকে। নতুন করে দাম বাড়ার কথা না।’

গত বছর সেপ্টেম্বরে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর অনুসন্ধান চালায়। সেখানে দাম বৃদ্ধির জন্য আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কারসাজি ছাড়াও কিছু বাস্তবসম্মত কারণ উল্লেখ করা হয়। দাম বৃদ্ধির অন্যতম মূল কারণ হলো- আমদানির জন্য এককভাবে ভারত নির্ভরতা। তাই আমদানির জন্য বিকল্প দেশ খোঁজা ও সারাবছর সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করে ওই কমিটি। কমিটি ভারতনির্ভরতা কমাতে আমদানির অন্তত ৫০ শতাংশ বিভিন্ন দেশ থেকে করার কথা বলা হয়। এছাড়া পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য প্রতি জেলায় আলাদা সংরক্ষণাগার নির্মাণ ও কৃষকের প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে বলা হয়। তবে এখন পর্যন্ত একটি সুপারিশও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়নি সরকার। এমনকি কারসাজি বন্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। ফলে বছর না ঘুরতেই আগের কারসাজির সাথে জড়িতরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। 

কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দিক-নির্দেশনা না দিলেও আমদানির মাধ্যমে বাজারে পেঁয়াজ ভরার ঘোষণা দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘পেঁয়াজ আমদানিতে ৫ শতাংশ ট্যাক্স কমানো হচ্ছে। আমরা সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করবো। ফলে খুব শিগগিরই দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি মো. গোলাম রহমান বলেন, ‘ব্যবসার ক্ষেত্রে নীতিমালা চলে না। এখানে ব্যবসায়ীদের একটিই নীতি- কীভাবে মুনাফা হবে। তাই তারা কেবল সুযোগ খোঁজেন। এর আগেও কারসাজিবাজদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে; কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও সাহসী হয়ে উঠেছে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘ভারতে দাম বাড়ছে। সরকারের উচিত মিয়ানমার, মিসর ও চীনের মতো বিকল্প উৎস থেকে পেঁয়াজের আমদানি বাড়িয়ে দেয়া। এতে দাম কমে আসবে। তবে সরকারের উচিত দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা, আমদানি নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসা। চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন সন্তোষজনক পর্যায়ে থাকলে বাজার আপনা থেকেই স্থিতিশীল থাকবে।’

উল্লেখ্য, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভারত রফতানি বন্ধ করলে দেশের বাজারে হু হু করে বেড়ে পেঁয়াজের কেজি ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। সংকট কাটাতে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মিসর, চীন, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। এমনকি বিমানে করে আনা হয় পেঁয়াজ। এরপর চলতি বছরের মার্চের শুরুতে রফতানি নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেয় ভারত। যার প্রভাবে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে ৩০ থেকে ৪০ টাকায় নেমে আসে।

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

অনলাইন সম্পাদক: আরশাদ সিদ্দিকী | ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh