ডলারে অস্বস্তির আশঙ্কা

এম এইচ রশিদ

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২০, ০৮:৪৮ এএম

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে কর্মজীবীদের আয় কমে গেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল হলেও আগের মতো আয় করতে পারছেন না অনেকেই। 

এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর- বৈদেশিক মুদ্রা ডলার প্রবাহ ব্যাপকহারে বেড়েছে। বাজারের ভারসাম্য রক্ষা করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে প্রচুর ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে প্রচুর পরিমাণ নগদ টাকা বাজারে চলে যাচ্ছে। মন্দার বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এক্ষেত্রে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ বাজারে নিত্যপণ্য কিনতে বিপাকে পড়বেন।

সূত্র জানায়, করোনাকালে প্রচুর পরিমাণে রেমিট্যান্স আসছে। প্রায় প্রতি মাসেই রেমিট্যান্সের রেকর্ড গড়ছে। যেখানে কাজ হারিয়ে সারাবিশ্ব বিপাকে, সেখানে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানো হু হু করে বেড়েছে। এতে করোনাকালে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বেড়েছে ব্যাপক। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ব্যাংকগুলো উদ্বৃত্ত ডলার বিক্রি করছে প্রচুর। এতে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেড়ে গেছে। এ কারণে টাকার দরপতন ঠেকাতে বাজার থেকে প্রচুর ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শুধু জুলাই থেকে চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কেনা হয়েছে ৪২০ কোটি ডলার। চলতি বছরের শুরু থেকে কেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০৮ কোটি ডলার। অথচ এর আগের তিন বছরে ব্যাপক চাহিদার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করেছে নিয়মিত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ৫০৮ কোটি ডলার বিক্রি করে ৪৩ হাজার ১৮০ কোটি টাকা পেয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এই টাকা সরাসরি বাজারে প্রবেশ করেছে। এভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক টাকা ছাড়লে বাজারে সাড়ে সাত গুণ প্রভাব পড়ে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকাকে ‘হট মানি’ বলা হয়। দেশে বিনিয়োগ চাহিদা কমে যাওয়া ও ব্যাংকগুলো চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিনিয়োগে ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করায় প্রতিটি ব্যাংকেই উদ্বৃত্ত ডলার থেকে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো কোথাও তা ব্যবহার করতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নিয়ে আসছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখার স্বার্থেই ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনছে। এ ডলারের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্থানীয় মুদ্রা দিচ্ছে। এভাবেই বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যাচ্ছে। এমনিতেই কাজ কমে যাওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।

ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ‘এভাবে ডলার কেনায় বাজারে নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এতে টাকার মূল্যমান বা ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে পণ্যের দাম বাড়ছে। করোনাকালে এমনিতেই মানুষের আয় কমে গেছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপের কারণে পণ্যের দাম বেড়ে গেলে মানুষের বিপদ বাড়বে। তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বজায় রেখেই যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনাভাইরাস মহামারির শুরুর দিকে ধস নামলেও পরে রফতানি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কমে যাওয়ার আশঙ্কার বদলে রেমিট্যান্স বেড়েছে ব্যাপক। অন্যদিকে, আগের সময়ের চেয়ে আমদানি কমছে। অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪৩.২৫ শতাংশ। রফতানিতে এক শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি রয়েছে। অন্যদিকে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমদানি কমেছে ১১.৪৩ শতাংশ। 

এ সময়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রচুর ঋণও এসেছে। আবার বেসরকারি খাতে নেয়া স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর কারণে অনেকে আপাতত ঋণ পরিশোধ করছেন না। সব মিলে অধিকাংশ ব্যাংকের হাতে এখন ডলার উদ্বৃত্ত রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত ডলার কেনার কারণে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে গত বছরের মতো ডলারের দর ৮৪.৮০ টাকায় অপরিবর্তিত রয়েছে। অবশ্য গত জুন মাসের দিকে আন্তঃব্যাংকে সর্বোচ্চ ৮৪.৯৫ টাকা দরে ডলার বিক্রি হয়েছিল।

গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বলেন, ‘বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়লে চাহিদা তৈরি হয়। তখন স্বাভাবিক নিয়মে পণ্যের উপর চাপ পড়ে। এতে দাম বেড়ে যায়। ফলে বাড়ে মূল্যস্ফীতির হার। এতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উপর বাড়তি চাপ পড়ে। এখন পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। বাজারে ইতিমধ্যে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আটা, শাক-সবজি, মাছ, মাংসসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়তির দিকে। কভিড-১৯ এর কারণে সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, বন্যার প্রভাব ও কারসাজির কারণে এগুলোর দাম বেড়েছে। এর সাথে বাজারে প্রণোদনা ও অন্যভাবে নগদ টাকার প্রবাহ বাড়ায় মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার একটি আশঙ্কা রয়েছে।’

ব্যাংকের কাছে ডলার উদ্বৃত্ত থাকলে তা কিনে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেননা প্রতিটি ব্যাংকের ডলার ধারণের একটি সীমা রয়েছে। কোনো ব্যাংকের আমদানির দায় পরিশোধের তুলনায় প্রবাসী রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বেশি হলে ওই ব্যাংকে ডলার উদ্বৃত্ত হয়। এক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত থাকা ব্যাংক প্রথমে সংকটে থাকা ব্যাংকের কাছে বিক্রির চেষ্টা করে। কোনো ব্যাংকের আগ্রহ না থাকলে অর্থাৎ মুদ্রাবাজারে বিক্রি করতে না পারলে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংক তা কিনে নেয়।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হালিম চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা, হুন্ডি প্রবণতা কমার কারণে প্রবাসী আয় ব্যাপক বাড়ছে। আবার বিদেশ থেকে মানুষের আসার পরিমাণ কমে যাওয়ায় আগে সবাই নিজেরা যে ডলার আনতেন, তা কমে গেছে। এই ডলারও এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে।’

ব্যাংকাররা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে। ডলার বিক্রি করলে রিজার্ভ কমে। কয়েক মাস আগেও প্রচুর ডলার বিক্রির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দীর্ঘদিন ধরে ৩১ থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ওঠানামা করছিল। গত মার্চ শেষে যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩২.৩৯ বিলিয়ন ডলার, গত কয়েক মাসে তা বেড়ে ৪১ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। সম্প্রতি এশিয়ান কিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) দায় পরিশোধের পরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে ৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ডলারের চাহিদা কমে গেছে। এতে বাড়ছে রিজার্ভ। 

অর্থাৎ অর্থনীতিতে স্থবিরতা থাকায় রিজার্ভ ক্রমাগত বাড়ছে। এই স্থবিরতার কারণে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে কমে যাবে। তখন বিপদ আরও বাড়বে। মানুষের আয় কমে যাবে, এতে ভোগ কমে গিয়ে বাজারে প্রভাব পড়বে। সেইসাথে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন থমকে দাঁড়াবে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

অনলাইন সম্পাদক: আরশাদ সিদ্দিকী | ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh