ক্রীড়াঙ্গনে আলোকিত বঙ্গবন্ধু পরিবার

মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২১, ১১:৪৫ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্রীড়ানুরাগ নতুন নয়, পারিবারিকভাবে আসা। বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সবাই রাজনীতিবিদ হিসেবেই চেনেন; কিন্তু তিনি ছিলেন ভালো ফুটবলার। খেলেছেন ভলিবল। 

ছোটবেলা থেকেই তার ভেতর ছিল খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব। ফুটবল খেলেছেন ঢাকা লিগে। ছেলে শেখ কামাল প্রতিষ্ঠা করেছেন দেশসেরা দুই ক্লাবের একটি, ঢাকা আবাহনী। তার স্ত্রী সুলতানা কামাল তো ছিলেন পাকিস্তানের নামকরা অ্যাথলেট। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান অলিম্পিক গেমসে রেকর্ড গড়ে জিতেছিলেন লংজাম্পের স্বর্ণ।

ফুটবলার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নেতার আড়ালে তিনি যে একজন ফুটবলার ছিলেন সেটি অনেকেরই অজানা। রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সব সময় ক্রীড়াঙ্গনকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তরুণ বয়সে চল্লিশ দশকের গোড়ার দিকে তিনি ঢাকায় মাঠ মাতিয়েছেন ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের হয়ে। স্কুলজীবনে তিনি খেলার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তার উদ্যোগেই ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে গড়ে উঠেছিল ফুটবল ও ভলিবল দল। 


শুরু থেকেই তিনি ছিলেন স্কুল দলের নিয়মিত সদস্য। ব্যক্তিগত পারফরমেন্সে অল্প দিনেই নিজেকে স্কুলের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে দাঁড় করান। যার ফলে তিনি নিজেকে প্রাদেশিক পর্যায়ে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। ১৯৪০ সালের দিকে পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় ওয়ান্ডারার্স ক্লাবটি ছিল নেতৃস্থানীয়। ঢাকার মাঠে ক্লাবটির দাপট ছিল অপ্রতিহত। বঙ্গবন্ধু তখন মাঠে নামতেন ওয়ান্ডারার্সের একজন নিয়মিত ফুটবলার হিসেবে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ব্যক্তিগত নৈপূণ্য দেখিয়ে দর্শকদের মন জয় করে নিলেন। তিনি হয়ে ওঠেন ওয়ান্ডারার্সের নির্ভরতার প্রতীক। একই সময় শেখ মুজিব ক্লাবটির সংগঠকের ভূমিকাও পালন করেন গুরুত্ব নিয়ে। কলকাতা চলে যাওয়ার পর খেলাধুলায় ছেদ পড়ে তার; কিন্তু সেখানে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ক্লাবটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। পরবর্তী জীবনে যদি বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করা হতো, আপনি কোন দলের সমর্থক, তিনি নির্দ্বিধায় জবাব দিতেন ওয়ান্ডারার্সের। বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানাতে আজীবন সদস্য পদ দিয়েছে ক্লাবটি। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময় প্রায়ই তিনি সময় কাটাতে চলে আসতেন ক্লাবটির মতিঝিল প্যাভিলিয়নে। সে সময়টা তার কাটত সিদ্দিকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো. ওয়াজেদ আলীদের সঙ্গে।

ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ শেখ হাসিনা

বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবলের নবজাগরণ ঘটে ২০১২ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ দিয়ে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই প্রতিযোগিতা থেকে খেলোয়াড় বাছাই করে বয়সভিত্তিক দলের জন্য নেয়া হয়। তারাই অনূর্ধ্ব-১৪ থেকে শুরু করে বর্তমানে জাতীয় দলে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তেমনি একটি দলের খেলোয়াড় ছিলেন তহুরা খাতুন। বেশ কয়েক বছর আগে এএফসি বাছাই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে গণভবনে গিয়েছিলেন। সেখানে তারা প্রধানমন্ত্রীকে নানু বলে সম্বোধন করেছিলেন। এরপর থেকে এখনো তিনি এই মেয়েদের নানু হিসেবে পরিচিত। 


একজন প্রধানমন্ত্রী হয়ে খেলাধুলা কতটা প্রিয় হলে এভাবে তার কাছাকাছি আসতে পারেন মেয়েরা। শুধু কি মেয়েরা, জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রায় সব সদস্যই প্রধানমন্ত্রীর পরিচিত। বড় ম্যাচে জয় পেলেই প্রথমে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়ে থাকেন। সময় হলে মাঠে গিয়ে খেলা দেখে খেলোয়াড়দের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আসেন।

নিজের তিন ভাইয়ের নামেই এখন ক্লাব রয়েছে। শেখ কামালের নামে না হলেও আবাহনী লিমিটেড যে তার ক্লাব সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ছোট দুই ভাই শেখ জামাল ও শেখ রাসেলের নামে প্রতিষ্ঠিত ক্লাব দুটি এখন দেশের অন্যতম সেরা ক্লাব হিসেবে স্বীকৃত। খেলাধুলা নিজের কতটা প্রিয়, সেটি প্রধানমন্ত্রী বহুবারই প্রমাণ করেছেন। যে বাবার রক্ত তার শরীরে প্রবাহমান সেখানে খেলাধুলা থাকবে না, এটা যে অবিশ্বাস্য ব্যাপার। খেলাধুলার জন্য সবসময়ই আলাদা মনোযোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামাল

প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতির ছেলে নয়, একজন খেলোয়াড় হিসেবেই নিজের পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন শেখ কামাল। আজকে আবাহনী যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেটির পুরো অবদান বঙ্গবন্ধুর এই কনিষ্ঠ পুত্রের। কামাল একাধারে ফুটবল-বাস্কেটবল খেলেছেন। ক্রিকেটেও পারদর্শী ছিলেন। এক পর্যায়ে দক্ষ সংগঠক হিসেবে নিজেকে দাঁড় করান। কামালের স্বপ্নের আবাহনীকে বলা হয় এদেশের আধুনিক ফুটবলের ধারক। ক্রিকেট, হকিতেও আবাহনীর অবস্থান একই। ‘আবাহনী সমাজকল্যাণ সমিতি’, থেকে আবাহনী ক্রীড়াচক্র, এরপর আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার অধিকারী আজকের ‘আবাহনী লিমিটেড’। 


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় ছিল হারুন-অর রশীদের (পরবর্তী সময়ে আবাহনীর ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, বর্তমানে পরিচালক)। ক্লাবটিকে তিনি সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছেলে কামাল ও জামালকে ক্লাবের সঙ্গে জড়িত করার কথা বলেন। খেলাপাগল কামালের উপস্থিতি ও বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে আবাহনী ক্লাবে নতুন করে প্রাণের ছোঁয়া লাগে। ক্লাবের কর্মকা- ক্রীড়ামুখী করার লক্ষ্যে শুরুতেই শেখ কামালের প্রস্তাব অনুযায়ী মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়। ব্যাপক সাড়া দিয়ে সাফল্যের সঙ্গেই টুর্নামেন্ট শেষ হয়। 

এরই মাঝে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। শেখ কামালসহ ক্লাবের সঙ্গে জড়িত অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতার গৌরবজনক সাফল্যের পর আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করে আবাহনী। আগে থেকেই ক্রীড়াকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ায় শেখ কামাল শুধু খেলাধুলাতেই বিচরণ করার পক্ষে প্রস্তাব দিলে সবাই এতে সম্মতি প্রদান করেন। 

শুরুতেই আবাহনী ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট এই তিনটি ক্ষেত্রেই দেশসেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ও ফলাফলও পেয়ে যায়। ১৯৭৩ সালে ফুটবল লিগে রানার্সআপ হয় ও হকিতে লাভ করে তৃতীয় স্থান। পরের বছর তিনটি খেলাতেই লিগ শিরোপা লাভ করে সবাইকে চমকে দেয় আবাহনী। এরপর আর ক্লাবটিকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনটি ইভেন্টেই আবাহনী সমানভাবে বিচরণ করে আসছে আজও।

আলোকিত অ্যাথলেট সুলতানা কামাল

একজন অ্যাথলেট হিসেবে সুলতানা কামাল খুকী পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশ দু’জায়গাতেই সুনাম কুড়িয়েছেন। ১৯৭৩ সালে নিখিল ভারতে গ্রামীণ ক্রীড়ায় অংশ নিয়ে ‘জয়বাংলা’ বলে লংজাম্প দিয়েছিলেন খুকী। সেবার দ্বিতীয় হয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে এটাই হয়ে দাঁড়ায় রেকর্ড। পুরো ভারত থেকে আসা সেরা মেয়েদের পেছনে ফেলেন তিনি। পরে কোনো এক পুরস্কার বিতরণীতে বঙ্গবন্ধু হাসতে হাসতে খুকীকে বলেছিলেন ‘তুই তো আমার সবচেয়ে প্রিয়।’ খুকী তখনো বঙ্গবন্ধুর পুত্রবধূ হননি। তাই জাতির পিতার এই কথা নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে কত হাসাহাসি! 


খুকীরা ছিলেন ছয় ভাই, তিন বোন। বোনদের মধ্যে সবার ছোট তিনি। বকশীবাজারে রেলগেট পেরিয়ে হাতের বাম দিকে বুয়েট হোস্টেলের (তখন আহছানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ) দিকে চলে যাওয়া পথটাতে ভাই-বোনরা মিলে সকালে জগিং করতেন। যেতে যেতে ফুল তুলতেন সেদিনের সেই ছোট মেয়েটি। ফুল কুড়াতে কুড়াতেই একদিন সেরা অ্যাথলেট হয়ে উঠলেন তিনি। খুকী শুধু একজন ভালো অ্যাথলেটই ছিলেন না, ছিলেন দক্ষ সংগঠকও। মেয়েরা যেন খেলাধুলায় মন ঢেলে দেয়, সে জন্য রীতিমতো কাউন্সেলিংও করতেন তিনি। 

১৯৬৭ সালে মুসলিম গার্লস কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেছিলেন তিনি। তার এক বছর আগেই জাতীয় অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের লংজাম্পে রেকর্ড গড়ে স্বর্ণপদক জিতে তাক লাগিয়ে দেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান অলিম্পিক গেমসে লংজাম্পে নতুন রেকর্ড গড়ে চ্যাম্পিয়ন হন খুকী। ১৯৭০ সালে অল পাকিস্তান উইমেন্স অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে লংজাম্পে মেয়েদের মধ্যে সেরা হন তিনি। ১৯৭৩ সালে ১০০ মিটার হার্ডলসেও প্রথম জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন সদাহাস্য মেয়েটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাথলেটিক্সে প্রথম নারী ব্লু খুকী। সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছিলেন খুকী। মাস্টার্সের ফল বের হওয়ার আগেই ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিলেন বাংলাদেশের ক্রীড়াজগতের এই তারকা। মৃত্যুর আগের সেই দিনের কিছু ঘটনা এখনো স্মরণ করেন খুকীর পরিবারের সদস্যরা। 

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh