পুঁজিবাজারে আবারো ধস: বিনিয়োগের টাকা যাচ্ছে কোথায়?

এম এইচ রশিদ

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২১, ০৮:৫৮ এএম | আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২১, ০৯:০০ এএম

ঘুরে দাঁড়িয়ে আবারো খাদের কিনারে দেশের পুঁজিবাজার। ব্যাংক ও দু’একটি বড় কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ায় লেনদেন বাড়তে থাকে; কিন্তু মার্চের শুরু থেকে লেনদেনে ভাটা পড়তে থাকে। 

নানা গুজবে আস্থাহীন বিনিয়োগকারীরা লোকসানে শেয়ার বিক্রি করছেন। ফলে শুধু মার্চেই দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূলধন কমেছে ১৯ হাজার কোটি টাকা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কমে যাওয়া এই টাকা যাচ্ছে কাদের পকেটে। 

বাজারের পতনের বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘শেয়ারবাজারের সংকট একদিনের নয়। অনেকদিন থেকে চলে আসছে। যে যেভাবেই বিশ্লেষণ করুক, মূল সমস্যা হলো এ বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। বিভিন্ন সময়ে যারা বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তাদের বিচার হয়নি। ফলে আস্থা ফিরে আনতে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতরা যত শক্তিশালীই হোক ও যে পদেই থাকুক তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। কারসাজির মাধ্যমে কেউ পুঁজি হাতিয়ে নিলে তার বিচার- এ নিশ্চয়তা দিতে হবে বিনিয়োগকারীদের।’ 

এছাড়াও দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি মার্চের শুরুতে করোনাভাইরাসের প্রকোপ ব্যাপকহারে বাড়তে থাকে। প্রায় প্রতিদিনই মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণ বাড়ছে। এই প্রকোপ বৃদ্ধির কারণে সরকার আবারো সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে পারে এমন গুজব ছড়ানো হচ্ছে। সাধারণ ছুটিতে পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ হয়ে যেতে পারে- এমন গুজবের কারণে পুঁজিবাজারে পতনের মাত্রা বেড়ে গেছে। এতে অনেক বিনিয়োগকারী আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। তবে বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের গুজবে কান দেয়া উচিত হবে না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘পুঁজিবাজারে যেভাবে দরপতন হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। নানাধরনের গুজবে বিনিয়োগকারীদের মাঝে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের গুজবে কান দিয়ে লোকসানে শেয়ার বিক্রি করা উচিত হবে না। করোনাভাইরাসের কারণে পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ ইতিমধ্যে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি থেকেও বলা হয়েছে, ব্যাংক খোলা থাকলে পুঁজিবাজারও খোলা থাকবে। ফলে লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে এই ধরনের গুজবে কান দেওয়া যাবে না।’

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় দরপতনের মধ্য দিয়ে মার্চের চতুর্থ সপ্তাহ (২১-২৫ মার্চ) সপ্তাহ পার করছেন বিনিয়োগকারীরা। ওই সপ্তাহে বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা হারিয়েছেন। আগের সপ্তাহে বিনিয়োগকারীরা হারান সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এর ফলে টানা দুই সপ্তাহের বড় দরপতনে প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা হারিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার কারণে এই অর্থ হারান বিনিয়োগকারীরা।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, আলোচ্য সপ্তাহে লেনদেন হওয়া পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তিন কার্যদিবস শেয়ার বাজারে দরপতন হয়। এর মধ্যে দুই কার্যদিবসে রীতিমতো ধস নামে শেয়ার বাজারে। এতেই বড় অঙ্কের অর্থ হারান বিনিয়োগকারীরা। সেই সঙ্গে মূল্য সূচকেরও বড় পতন হয়েছে। কমেছে লেনদেনের পরিমাণও। যদিও ডিএসইর বাজার মূলধন একসময় ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ওই সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের (২৫ মার্চ) লেনদেন শেষে ডিএসইর সেই বাজার মূলধন কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকায়, যা তার আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল ৪ লাখ ৭২ হাজার ৯৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৮ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কমে ১০ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। এই হিসাবে টানা দুই সপ্তাহের পতনে বাজার মূলধন কমলো ১৯ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের গবেষক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘করোনা বাড়তে থাকায় হয়তো অনেকেই আগের মতো বিনিয়োগ করার সাহস পাচ্ছেন না। তবে শেয়ারবাজার ঝুঁকিমুক্ত করতে হলে প্রথমেই সুশাসন জরুরি। আর বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করতে ভালো কোম্পানি বাজারে আনতে হবে বেশি বেশি করে। এই দুটি বিষয় করা সম্ভব হলে বাজারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে। কোনো গুজবই বাজারকে প্রভাবিত করতে পারবে না।’

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্চের প্রথম সপ্তাহ (২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ মার্চ) ডিএসইর বাজার মূলধন বাড়ে ৬ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। ২৮ ফেব্রুয়ারি মূলধনের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। ওই সপ্তাহের শেষ দিন তা দাঁড়ায় ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫ কোটি টাকায়। দ্বিতীয় সপ্তাহে (৭ থেকে ১১ মার্চ) মূলধনের পরিমাণ আরও সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পায়। ওই সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৩৩০ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার। এর আগের (২৮ ফেব্রুয়ারি-৪ মার্চ) সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ৭৩৪ কোটি টাকা। লেনদেন বৃদ্ধি পাওয়ায় মুলধন বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮২ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকায়; কিন্তু এরপর থেকেই পতনের ধারায় রয়েছে শেয়ারবাজার। 

মার্চের চতুর্থ সপ্তাহজুড়ে ডিএসই’র প্রধান সূচক ডিএসইএক্স কমেছে ১০৭ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট। আগের সপ্তাহে সূচকটি কমেছিল ১৩৪ দশমিক ১৬ পয়েন্ট। অর্থাৎ দুই সপ্তাহে ডিএসই’র প্রধান মূল্য সূচক কমেছে ২৪১ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট।বড় পতন হয়েছে ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচকেরও। গত সপ্তাহজুড়ে সূচকটি কমেছে ৫২ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট। আগের সপ্তাহে সূচকটি কমেছিল ৮০ দশমিক ৭৮ পয়েন্ট । আর ইসলামি শরিয়াহ ভিত্তিতে পরিচালিত কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক কমেছে ২৯ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট। আগের সপ্তাহে সূচকটি কমেছিল ১৮ দশমিক শূন্য ৯ পয়েন্ট। ডিএসইতে দাম বাড়ার তালিকায় রয়েছে ৫৩টি প্রতিষ্ঠান। দাম কমেছে ২২১টির। আর ৯৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

বাজার কারসাজির বিষয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অর্থনীতির আকারের তুলনায় বাজারের আকার অনেক ছোট। এখানে ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ কম। বাজার ছোট হওয়ায় কারসাজির কারিবারিরা কারসাজি করার সুযোগ পান। এই বাজারে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির শেয়ারের মুল্য কমে আরো নামসর্বস্ব কোম্পানির শেয়ারমুল্য বাড়ে। এই কারসাজি বন্ধ করা না গেলে বাজার স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে না।

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh