সা ক্ষা ৎ কা র

সৌন্দর্য আমাদের বাঁচতে সাহায্য করে

হাসান মাসউদি

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২১, ০৬:১৭ পিএম | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২১, ০৬:২২ পিএম

হাসান মাসউদি

হাসান মাসউদি

আরবি ক্যালিগ্রাফির জগতে হাসান মাসউদি এখন একটা উল্লেখযোগ্য নাম। মাসউদির জন্ম ১৯৪৪ সালে। নিবিড় মনযোগে কাজ করছেন তিনি। পৃথিবীর বড় বড় পত্রিকায় বেরিয়েছে তার শিল্পজীবন ও সাক্ষাৎকার। সমঝদারদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। ক্যালিগ্রাফির নতুন একটি ধারা তৈরি করেছেন। সত্তরের দশকে মাতৃভূমি ইরাক ছেড়ে চলে আসেন শিল্পের তীর্থভূমি প্যারিসে। মাসউদি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, নেদারল্যান্ডস ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যাপকভাবে প্রদর্শনী করেছেন। তার আঁকার মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন জনের কবিতা উৎকলিত হয়েছে। তার এই সাক্ষাৎকারটি ‘সালামি ডটকম’ থেকে ভাষান্তর করেছেন আরবি সাহিত্যের গবেষক মহিউদ্দীন মোহাম্মদ।

আমরা খুশি আপনার সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ পেয়ে। ‘হাসান মাসউদি’ এমন একটি নাম, যা আজ ক্যালিগ্রাফির একটি স্ট্যান্ডার্ডে রূপ নিয়েছে। আমরা আনন্দিত এ সম্পর্কে জেনে।

যতটা পেরেছি আমি শেয়ার করতে পেরেছি।

আপনার নির্মিত প্রিয় শিল্পকর্ম কোনটি?

আমি অর্ধশতাব্দী ধরে শিল্পাঙ্গনে অধ্যয়ন করছি, আর কাজ করে যাচ্ছি। আমার করা প্রচুর শিল্পকর্ম রয়েছে। সেখান থেকে প্রিয়টি বেছে নেওয়া খুব শক্ত। তথাপি আমার অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতি বছর নতুন নতুন শিল্পকর্ম করি। শিল্পকর্মে প্রতিফলিত হয় মানুষের চেতনার গভীরে যা লুকায়িত রয়েছে। আর সেটা এত গভীর যে, শব্দগুচ্ছ দিয়ে এটা প্রকাশ করা যায় না। তুমি একটা চিত্রকর্ম করতে বিবিধ প্রভাব ব্যবহার কর, এটা অনেক আকৃতি, বহু রঙ এবং কাব্যিক অভিজ্ঞতা প্রদান করে, যেটা শব্দে ভাষান্তরিত করা যায় না। এটা তুমি শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করছ; তা বিষাদময়তা নিয়ে আলোচনা হলেও সেটি আসলে সুন্দর। অতএব, সৌন্দর্য আমাদের বাঁচতে সাহায্য করে। আর এটি অন্য মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ততম পথ। অতএব আমার প্রিয় শিল্পকর্মটি আসলে তাদের সকলের থেকে আমাকে আলাদা করে দেখায় যে আমি কে; আমি যদি খুশি বা কষ্ট পেতাম তাহলে আমি আমার চিত্রগুলোতে তা দেখতে পেতাম। আমি আমার চিত্রকলায় সেটাই দেখতে চাই, এবং আমি জানতে চাই কেন এমন অনুভব হচ্ছে? আমি বিশ্বাস করি যে দর্শকরা আমার মতো একই অনুভূতি শেয়ার করে।

ক্যালিগ্রাফিত্তি বিশেষ কিছু কী করেছে এবং আপনি কি মনে করেন যে এটি স্ট্রিট আর্টকে একটি নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে?

ঐতিহ্যবাহী আরবি ক্যালিগ্রাফি ও ক্যালিগ্রাফিত্তির (Calligraffiti) মধ্যে একটা সুপ্ত সংযোগ রয়েছে।

যেমন লিখন সরঞ্জাম : একজন ক্যালিগ্রাফার ছাই ও আরবীয় আঠা দিয়ে তৈরি কালি ব্যবহার করে সেটা নিজের তৈরি কলম দিয়ে পৃষ্ঠার সঙ্গে সংযোগ ঘটায়। আর পৃষ্ঠাটি তিনি স্টার্চ (starch) ও ডিমের শাদা অংশের সাহায্যে প্রস্তুত করেন। অন্যদিকে, স্ট্রিট শিল্পী বাণিজ্যিক সরঞ্জাম ব্যবহার করেন। কোনো বোতাম টিপে পৃষ্ঠের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না ঘটিয়েই রঙ স্প্রে করে। তিনি মহাশূন্যের এক নর্তকের মত, যিনি শূন্য থেকে রঙ পাঠাচ্ছে। সাধারণত এ পদ্ধতিটি ষাট বছর আগে ছিল না; এবং তাদের জন্য ঈর্ষা করি, নাচ ও লিপিকুশলতার অসীম স্বাধীনতার অনুভূতির জন্য। অতএব, স্ট্রিট আর্টকে অস্থায়ী ধরনের শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যে কারণে এতে মার্জিত চিত্রের নমুনা নেই। সাধারণভাবে, দুটি ধারার মধ্যে একটি ছেদ রয়েছে, আর ভবিষ্যতে ক্যালিগ্রাফিত্তি বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।

অনেক বড় ক্যালিগ্রাফার হওয়ার ক্ষেত্রে ইরাক থেকে প্যারিস-আপনার এই যাত্রা কেমন ছিল? 

বাগদাদ ছেড়ে যাওয়াটা ছিল খুব বেদনাদায়ক। তবে প্যারিসে আমি যে আতিথেয়তা পেয়েছি তা আমার কাছে অনেক প্রত্যাশা জাগিয়েছে। প্যারিসের শৈল্পিক পরিবেশ ও বিস্ময়কর সব নানা ধরনের শিল্পকলার সঙ্গে পরিচয়ের মধ্যদিয়ে আমার পঞ্চাশটি বছর কেটে গেছে। এটা না বললে নয়, বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় শহরে দর্শকদের সঙ্গে আলোচনার কারণে আমি মানুষের শিল্পী হতে পেরেছি। তারা আমার শিল্পের প্রতি আগ্রহী হয়েছে। মিশেল টার্নার (Michel Tournier) আমার সম্পর্কে বলেছেন, আমি সর্বশ্রেষ্ঠ একজন আরবি ক্যালিগ্রাফার। তিনি সম্ভবত জানেন আমি একদিন তাই হব! ১৯৮৪ সালে লেখক মিশেল টার্নারের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমার চিত্রপ্রদর্শনী ও পার্টিতে যেতেন। তাঁর ‘গোল্ডেন ড্রপলেট’ (Golden Droplet) বই লেখার সময় আলোচনা করতাম। এই উপন্যাসটিতে পশ্চিমা বিশ্বের চিত্রকলা সম্পর্কে আলোচনা করেন। ওই সময়টাতে তিনি প্রাচ্যের দিকে পা ফেলতে শুরু করেছিলেন, বিমূর্ত আরবি ক্যালিগ্রাফি ও অলংকার শিল্পের প্রেমে পড়ে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আমি যে শিল্প অনুশীলন করছি, তা তাকে সাহায্য করেছে।

শিল্পী হিসেবে আপনি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছেন কীসে?

প্রকৃতিতে আমি যা কিছু দেখি, তা আমাকে প্রভাবিত করে এবং আমাকে ভাবিয়ে তোলে যে আমি যদি এই অনুভূতিগুলোকে কোনো শিল্পে স্থানান্তিরত করতে পারতাম! তুমি যা দেখছ তা নকল করবে না, এটা থেকে অনুপ্রাণিত হও। উদাহরণস্বরূপ, তালগাছের মতো, বিজয়ের স্পষ্ট অভিব্যক্তিতে আকাশের দিকে লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পক্ষান্তরে অন্যগুলোকে দেখলে মনে হয় তারা পরাজিত হয়ে জমিনে পতিত হয়েছে। যাই হোক, যখন একটি ঝড় ছোট গাছগুলোকে আঘাত করে সে দৃঢ় থাকে আর লম্বা গাছ মাটিতে পড়ে যায়। একভাবে তুমি এটাকে লোকজন ও পাখির তারতম্যের মধ্যে আমলে নিতে পার। আমি অন্যান্য সূত্র থেকেও অনুপ্রাণিত হই, এমনকি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংগীতও আমার অনুপ্রেরণার উৎস। আমি কবিতা ও উদ্ধৃতিগুলো পড়ি, এটা মানব সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রাচীন জ্ঞান ও মানবিক প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে কাজ করে।

আপনি অনেক বেশি কবিতা ভালোবাসেন। আপনার প্রিয় কবি কে?

হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে আরবি কবিতা শব্দ ব্যবহারে সৌন্দর্য ও সৃজনশীলতায় সমৃদ্ধ। এটি মরুভূমিতে শুরু হয়েছিল। প্রাচীন আরবি কবিতায় প্রতিটি উপজাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য লিপিবদ্ধ। সে সময় লেখার সরঞ্জামের অভাবে বেদুঈনদের এ জিনিসগুলো মুখস্থ করতে বাধ্য করেছিল। ছান্দিকতার কারণে মুখস্থ সহজ হওয়ায় লোকজন এগুলো নিয়মিত আওড়াতো। বহু বেদুঈনের কবিতা আবৃত্তির শখ ছিল। ধীরে ধীরে, শিল্পের এই আঙ্গিক আব্বাসীয় যুগে বিভিন্নভাবে আলোচনায় এসেছিল। যুগটি ছিল ইসলামী সম্রাজ্যের গৌরবময় যুগ। সাফল্য, বিলাসিতা, বাগান ও বুদ্ধিবৃত্তির যুগ হচ্ছে আব্বাসীয় যুগ। ভ্রমণ বা সংক্ষিপ্ত চিঠি লেখা, প্রেম থেকে শুরু করে সংস্কৃতির সব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হত কবিতা। আল-নাবিঘার (৫৩৫-৬০৪) কবিতায় বিভিন্ন যুদ্ধের বর্ণনা পাওয়া যায়। ইবন কালাকিস (১১৩৭-১১৭২) ৬ষ্ঠ শতাব্দীর ইমরুউল কায়েস-এর মরুভূমির কবিতা পড়ে তিনি তার কবিতায় প্রকৃতি এঁকেছিলেন। ইরাকের দশম শতাব্দীর কবি আল-মুতানব্বী তার কবিতায় বিবৃত করেছেন জ্ঞান ও চিন্তাশীলতা। একাদশ শতাব্দীর আন্দালুসিয়া বা স্পেনের কবি ইবনে জায়দুন ও ১৩ শতাব্দীর কায়রোর ইবন আল-ফরিদ-এর কবিতার মতো অনেকের কবিতা পড়তে চাই। আসো আমরা এই লাইনটার প্রশংসার করি- ‘তুমি যখন আমার দিকে তাকিয়েছিলে তখন আমি প্রেমের অর্থ বুঝতে পারি’ -ইবনে জায়দুন। ওয়ালিবা ইবন আহাব্বাবও আমার পছন্দের। সাধারণত, আমি এমন কবিতার প্রশংসা করি যা কানে সুর জাগায় ও আনন্দ তৈরি করে। তবে আমি আরও প্রশংসা করি সেই কবিকে যে কয়েকটি শব্দ দিয়ে একটি ছবি আঁকবেন, যা তুমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছ। এসব কবিতার মধ্যে শব্দে ঘটনা বর্ণনা করে মানবিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে।

একজন শিল্পী হিসেবে বিশ্বের কাছে আপনার কী বার্তা?

সর্বাত্মক মানবাধিকারের পক্ষে সর্বোত্তম কাজ বক্তব্য রাখা। মুক্ত বক্তব্যের গুরুত্ব দেখিয়ে স্বাধীনতার ধারণাকে শক্তিশালী করা ও বিশ্বজুড়ে আমরা যা করি না তার জন্য ক্ষুধার্ত হওয়ার পরিবর্তে যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। যুদ্ধের পরিবর্তে বৈশ্বিক শান্তির জন্য কাজ করা। জ্যাক রুশো একবার বলেছিলেন- ‘তুমি ভুলে গেছ যে ফলগুলো সবার আর জমিটি কারও না।’

আপনি ইসলামী শিল্পে কী পছন্দ করেন ও কীভাবে এটা আপনাকে একজন ব্যক্তি হিসেবে পরিবর্তন করেছে?

যখন আমি বাগদাদে শিল্পের সঙ্গে ছিলাম, আর আমার কাছে গুরুত্ব ছিল পাশ্চাত্য শিল্প। তবে প্যারিসে আমি অন্যান্য শিল্পকলা এবং বিশেষত প্রাচ্য শিল্পের প্রতি ঝোঁক- জাদুঘর ও বইয়ের মধ্যে পেয়েছি। ইসলামী শিল্প ছিল আমার সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত। আমার পড়াশোনা শেষ হলে আমি আরবি ক্যালিগ্রাফিতে মগ্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমার প্রথম ট্রিপ ছিল কায়রো, সেখানকার শহরতলিতে ছিল স্থায়ী শিল্প প্রদর্শনী। বইগুলোর হাউসে ভ্রমণের সঙ্গে এবং পুরনো পাণ্ডুলিপিগুলো দিয়ে চলেছে। সন্ধ্যার সময় আমি একটি ক্যালিগ্রাফি স্কুলে বিদ্বানদের সঙ্গে দেখা করতে যেতাম, শিখতাম তাদের থেকে। এটি অন্য কোনো দৈনিক ক্রিয়াকলাপের চেয়ে স্ক্রিপ্ট লেখার প্রতি আমার আবেগকে বাড়িয়েছে। এর পরে, আমি বার্সায় গেলাম (অটোমান সাম্রাজ্যের প্রথম রাজধানী)। প্রাচীর এবং স্থাপত্য মাইলফলকগুলোতে আরবীয় চিঠির বিশাল উপস্থিতি দেখে আমি অবাক হয়েছি। 

এ ছাড়াও ইস্তাম্বুলে, যেখানে লিপিশৈলির ক্ল্যাসিক রূপটি মসজিদ এবং জাদুঘরে প্রচুর ছিল। যখন আমি ফিরে এসেছি আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছি শিল্পের এই রূপটি ছড়িয়ে দিতে। জাতীয় ফরাসি গ্রন্থাগারে আরব পাণ্ডুলিপিগুলো অনুসন্ধান করে আরও পাঁচ বছর পর আমি একটি আরবি ক্যালিগ্রাফি বইয়ের কাজ শুরু করি। এই বইটি এখন চল্লিশ বছর ধরে বাজারে রয়েছে। এতে আমরা ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করি এমন সমস্ত ক্ষেত্রগুলো ধরে রাখার জন্য এটির সঙ্গে সজ্জিত আর্কিটেকচারাল স্মৃতিচিহ্নগুলো ও লিপিকলার প্রতিদিনের ব্যবহার অধ্যয়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, প্যারিসে প্রথম পাঁচ বছরে, আমি পশ্চিমা শিল্প অধ্যয়ন করার পরে আরও পাঁচ বছর ইসলামী শিল্প অধ্যয়নে ব্যয় করেছি। শিল্পের উত্তরোত্তর রূপটি আমি জলরঙের সঙ্গে আটকেছি। এ ছাড়াও, আমি জাদুঘর এবং চিত্রের বইতে ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে ইসলামী শিল্পের অন্যান্য রূপগুলো সম্পর্কে জানতে পারি।

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh