বেতন-ভাতা বৈষম্য: সরকারি কর্মচারীদের অসন্তোষ চরমে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২১, ০৪:১৬ পিএম | আপডেট: ২৪ জুন ২০২১, ০৪:১৭ পিএম

শতভাগ বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হলেও কর্মকর্তাদের চেয়ে কর্মচারীরা অনেক বেতন-ভাতার আর বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

শতভাগ বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হলেও কর্মকর্তাদের চেয়ে কর্মচারীরা অনেক বেতন-ভাতার আর বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

১১ থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত সরকারি কর্মচারীদের চলমান বৈষম্যের অবসান, জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিবকে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। শতভাগ বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হলেও কর্মকর্তাদের চেয়ে কর্মচারীরা অনেক বেতন-ভাতার আর বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। 

৮ম জাতীয় বেতন স্কেলে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীরা শতকরা হারে বেতন বৃদ্ধি দ্বিগুণ দেখানো হলেও টাকার অংকে আর্থিক সুবিধা বাড়েনি। এ বৈষম্য দূরীকরণে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে বহু আবেদন নিবেদন করার পর দীর্ঘ ৫ বছর পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বিষয়টি উপলব্ধি করে এ বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য একটি প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছে বলে জানান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নেতারা।

গত ২০ জন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব মো. সাজ্জাদুল হাসান স্বাক্ষরিত চিঠি অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিবকে পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, গত ৩১ মে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি মো. হেদায়েত হোসেনের আবেদনের প্রেক্ষিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বিচেনায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করার আবেদনের উল্লিখিত আর্থিক দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে যথাবিধি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশক্রমে প্রেরণ করা হলো।

জানা গেছে, সরকারি কর্মচারীদের পক্ষে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী কল্যাণ ফেডারেশনের নেতারা গত ৩১ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সচিবকে লিখিত আবেদন করে। এর আগে বেতন বৈষম্য দূরীকরণে কর্মচারী কল্যাণ ফেডারেশনের দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা সভাসমাবেশ করেন এবং সংবাদ সম্মেলনও করেছে তারা।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে শুরু করে একজন অফিস সহায়ক পর্যন্ত সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, যারা ২০টি গ্রেডে বিভক্ত। এর মধ্যে ১১-২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীরা বরাবরই বৈষম্যের শিকার। হয়তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে অল্প কিছু সাফল্য এসেছে, যা ন্যায়সঙ্গত প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের পর ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার জাতীয় বেতন স্কেলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য ১০টি গ্রেডের একটি সুষম বেতন কাঠামো উপহার দেন। ১৯৭৭ সালের বেতন স্কেলে ১০টি গ্রেডের পরিবর্তে ২০টি গ্রেডে বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করে বৈষম্যের সূত্রপাত করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সালে সচিবালয়ের সঙ্গে সচিবালয়ের বাইরের কর্মচারীদের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি করে এ বৈষম্যকে আরেক দফা বৃদ্ধি করা হয়। এর পর থেকেই শোষণ আর বৈষম্য ঘিরে কর্মচারীদের ন্যায্য আন্দোলন-সংগ্রাম চলতে থাকলেও তার অবসান না হয়ে বরং বিভিন্ন কৌশলে এ বৈষম্য আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার দিনবদলের কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে রূপকল্প ২০২০-২১ বাস্তবায়নে ব্যাপক জনমত নিয়ে যাত্রা করলে আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত দিয়ে এ বৈষম্যের অবসান হবে, কিন্তু আমাদের সে স্বপ স্বপ্নই থেকে গেল। সর্বশেষ ৮ম জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার প্রাক্কালে আবারো পুনরায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। বেতন দ্বিগুণ করার ষোষণা দিয়ে বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করা হলো একদিকে, অন্যদিকে এ ষোষণার আড়ালে টাইম স্কেল সিলেকশন গ্রেড বাতিল করে বঞ্চিত করা হলো কর্মচারীদের। শুধু তাই নয়, অতীতের নিয়মিত ৩টি টাইম স্কেল পেয়ে ১৬তম বছরে আমাদের বেতন বৃদ্ধির তুলনায় বর্তমান নিয়মে ১৬তম বছরে আমাদের উল্টো আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

৮ম জাতীয় বেতন স্কেলে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের শতকরা হারে বেতন বৃদ্ধি দ্বিগুণ দেখানো হলেও টাকার অঙ্কে আর্থিক সুবিধা খুবই নগণ্য ছিল। এ বৈষম্য দূরীকরণে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে অভিযোগ করা হলেও তা দীর্ঘ ৫ বছর পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বিষয়টি উপলব্ধি করে এ বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য একটি প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরিত প্রস্তাবটি আজো আলোর মুখ দেখেনি। লক্ষণীয়, ১-৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তাদের সুদবিহীন গাড়ি ঋণ বাবদ ২৫-৩০ লাখ টাকা এবং এরই সঙ্গে মাসিক ৫০ হাজার টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ভাতার নামে আর্থিক সুবিধা দেয়া হয়েছে। ১১-২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বিকল্প আর্থিক সুবিধা না রেখে বিমাতাসূলভ আচরণ করা হচ্ছে। সংস্থা, মন্ত্রণালয়, নথি, গতি প্রকৃতি এক হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র গ্রেড ব্যবধানে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ হতে বঞ্চিত হচ্ছে তারা।

২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার ৫ বছর অতিক্রান্ত হবার পর সরকার ২০২০ সালে কর্মচারীদের বেতন ভাতাদি বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার কথা। কিন্তু বিশ্বব্যাপী মহামারির কারণে স্থবির হয়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন বৃদ্ধির দাবি না জানিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরকার নির্দেশিত দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

বর্তমানে অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সীমিত আয়ের কর্মচারীরা সংসারের ন্যূনতম ব্যয় বহনে দিশেহারা। এ অবস্থা হতে উত্তোরণের কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ১৯৭৩ সালে প্রণীত ১০ ধাপের বেতন কাঠামো ৭৫ পরবর্তীতে ২০টি ধাপে পরিণত করে বৈষম্যের সৃষ্টি করা হয়েছে।

এ চিঠিতে আরো বলা হয়, ৭৫ পরবর্তীতে প্রতিটি জাতীয় বেতন স্কেল প্রণয়নের ক্ষেত্রে ০১-১০তম গ্রেডের অভ্যন্তরীণ ধাপগুলোর আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি করে ১১-২০তম গ্রেডগুলোর সুবিধা ক্রমাগত সঙ্কুচিত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের ৮ম জাতীয় বেতন স্কেলে ০১-১০ গ্রেডের মোট ব্যবধান দাঁড়ায়-১,৫৫,৬২০/- টাকা যা মোট টাকার ৯৪ শতাংশ, অপরদিকে ১১-২০ গ্রেডের ব্যবধান মাত্র ৬,৩৭৫/- টাকা যা মোট টাকার ৬ শতাংশ।

বেতন দ্বিগুণ ঘোষণার আড়ালে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত করা হয় ২০১৫ সালের বেতন স্কেল- ১৪তম গ্রেডভুক্ত একজন সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক ২০০৯ সালের ৭ম জাতীয় বেতন স্কেলের নিয়মে ১০,২০০/- টাকা স্কেলে সিলেকশন গ্রেড এবং ৮,১২ এবং ১৫তম বছরে টাইম স্কেল সুবিধা পেয়ে ১৬তম বছরে মূল বেতন পেত মোট ২৮,৮১০/- টাকা। একই পদধারী একই স্কেলে ২০১৫ সালের পে-স্কেলের নিয়মে ১৬তম বছরে ২ বার উচ্চতর স্কেল পেয়ে মূল বেতন পাবে ২২,৪৫০/- টাকা যা পূর্বের নিয়মের চেয়ে ৬,৩৬০/- টাকা কম। প্রথমোক্ত নিয়মে ৫ বছর পরপর সরকারিভাবে জাতীয় বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পেত, দ্বিতীয় নিয়মে সে সুযোগপ্রাপ্তি বন্ধ হয়ে গেল।

বিষয়টি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, ২০১৫ সালের পে-স্কেলে ১১-২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, বর্তমান বাজার মূল্য বিবেচনায় ৬ সদস্যের একটি পরিবারের পোশাক পরিচ্ছদ, সামাজিক ব্যয়, পারিবারিক বিনোদন ব্যয় এবং আপদকালীন ব্যয় ছাড়াই ন্যূনতম মাসিক ব্যয় ৩০,০০০/- টাকা অথচ ১৫তম গ্রেডভুক্ত একজন কর্মচারীর সর্বসাকুল্যে বেতন ১৯,০০৫/- টাকা এবং ২০তম গ্রেডভুক্ত একজন কর্মচারীর বেতন ১৫,৬৫০/- টাকা। আয় এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার এ অসঙ্গতি দূরীকরণে বিভিন্ন সময়ে তাদের উত্থাপিত দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়ে আসছে।

এ বিষয়ে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আকতার হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে শুরু করে একজন অফিস সহায়ক পর্যন্ত সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, যারা ২০টি গ্রেডে বিভক্ত। এর মধ্যে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীরা বরাবরই বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh