হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে, নেই চিকিৎসা উপকরণ

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২১, ০৪:৩৯ পিএম

চিকিৎসা উপকরণ

চিকিৎসা উপকরণ

দেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। রোগীর চাপে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় দেখা দিচ্ছে চিকিৎসা উপকরণের সংকট। দ্রুত সরবরাহ চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্রও পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর এ চাহিদা পূরণ করতে পারছে না অধিদপ্তর। রাজধানীর কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে (সিএমএসডি) অধিকাংশ জরুরি চিকিৎসা উপকরণেরই মজুত  শেষ।  

দেশে করোনার চলমান প্রবাহ মারাত্মক আকার নেয়া শুরু করে মার্চে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই সময়ে সারা দেশেই নতুন করে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ও উপকরণের চাহিদা তৈরি হয়। সে সময় হাসপাতালসহ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে দেয়া হয় সিএমএসডিকে। এরপর দিনে দিনে এ চাহিদার পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু আগের চাহিদাপত্রে চাওয়া সরঞ্জাম ও উপকরণের সংস্থান করতে পারেনি সিএমএসডি। বর্তমানে জরুরি সরঞ্জাম ও উপকরণের জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে এসব উৎস থেকে পাওয়া উপকরণ খুবই অপ্রতুল। 

কেন্দ্রীয় ঔষধাগার সূত্রে জানা যায়, এতদিন মজুদ সাপেক্ষে অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী কিছু কিছু যন্ত্রাংশ ও উপকরণ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। এখন এর মধ্যে বেশ কয়েকটিরই মজুদ শেষ হয়েছে। বর্তমানে সিএমএসডিতে কোনো হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, রেমডিসিভির ইনজেকশন, কভিড১৯ টেস্টিং কিট ও ভেন্টিলেটর নেই। অক্সিজেন সিলিন্ডারের মজুদ নেমে এসেছে পাঁচ হাজারে। এছাড়া সেখানে ৭০০টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ও ১০০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে।  

মে মাসের শুরুতে করোনার ভারতীয় ধরন ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় সংক্রমণ শনাক্তের হার অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। এসব জেলায় এখন জরুরি চিকিৎসা উপকরণের সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। ভারত সীমান্তবর্তী জেলা ঝিনাইদহে পরীক্ষার বিপরীতে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার ৪১ শতাংশ। জেলার সরকারি করোনা হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় প্রচুর কভিড-১৯ পজিটিভ রোগী এসে ভিড় করছে। এক মাস ধরেই জেলার হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। যদিও এত রোগীকে একসঙ্গে চিকিৎসা দেয়ার মতো জরুরি উপকরণের সংস্থান কোনো হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠানে নেই। মে মাসে এ নিয়ে অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র দিয়েছে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ। কিন্তু সিএমএসডিতে না থাকায় তা দিতে পারছে না অধিদপ্তর।

জানা যায়, করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও রোগীর চিকিৎসায় জরুরি সামগ্রী কেনাকাটায় সমন্বয় নেই। এই সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। একটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, অন্যটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি)।  

চিকিৎসাসামগ্রীর মজুত নিয়ে এই দুই প্রতিষ্ঠান দুই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ঔষধাগার বলছে, কোভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় সুরক্ষাসামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু তারা বারবার বলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ক্রয় পরিকল্পনা পায়নি।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এক্ষেত্রে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তিন মাসের পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্রয় করলে কোনো সমস্যা হবে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারির এই সময়ে সমন্বয় খুবই জরুরি। দুটি প্রতিষ্ঠানকে এক সুরে কথা বলতে হবে। অন্যকে দোষারোপ করার সময় এটা নয়। আসলে ঘাটতি আছে কি না, পরবর্তী প্রস্তুতি কী, তা সবাই মিলে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের শুরুতে বিভিন্ন হাসপাতালে নানা ধরনের ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। অথচ বিমানবন্দরে ১০ মাস ধরে পড়ে ছিল ১০২ কোটি টাকার জীবন রক্ষাকারী নানা সরঞ্জাম ও সামগ্রী। দেখা গেছে, শুধু উদ্যোগের অভাবে এসব খালাস করা হয়নি। যদিও সামগ্রীগুলো কেনা হয়েছিল জরুরি প্রয়োজন মেটাতে। 

এবার দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের মধ্যে সমন্বয় নেই। কেন্দ্রীয় ঔষধাগার বলছে, গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে মহামারি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ ও প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগে থেকেই ভবিষ্যৎ ক্রয় পরিকল্পনা করার দায়িত্ব স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। কিন্তু কোভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় সিএমএসডি কোনো উৎস থেকেই এখন পর্যন্ত কোনো ক্রয় পরিকল্পনা পায়নি। এমনকি মহামারির আকস্মিক নাজুক অবস্থাতেও কোনো জরুরি ক্রয় পরিকল্পনা পাওয়া যায়নি।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছে, কিংবা আমাদের পক্ষে দুর্বোধ্য কোনো কারণে তারা এই জরুরি বিষয়টির প্রতি যথাসময়ে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। তারা বলছেন, কোনোভাবেই যেন সংকট সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও একান্ত জরুরি। কারণ, জবাবদিহির অভাবেই অতীতে নানা ধরনের সমস্যা-সংকটে পড়তে হয়েছে।

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh