প্রেম চন্দের ‘সদগতি’, সত্যজিৎ রায়ের সরল উপস্থাপন

অরুণ সান্যাল

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২১, ০৪:৫২ পিএম | আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২১, ০৩:৩৫ পিএম

 প্রেম চন্দ

প্রেম চন্দ

এক
আধুনিক হিন্দি ও উর্দু ভাষার সফল সাহিত্যিক মুন্সি প্রেমচন্দ বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় লেখকদের মধ্যে অন্যতম। মুন্সি প্রেমচন্দ ১৮৮০ সালের ৩১ জুলাই বেনারসের লমহি (বর্তমানে উত্তর প্রদেশ) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মুন্সি অজায়বলাল এবং মা আনন্দা দেবী। জাতিতে তারা ছিলেন কায়স্থ। দাদা গুরু শাহাই রায় ছিলেন গ্রামের পাটোয়ারী। আর বাবা কাজ করতেন লমহি গ্রামের ডাকঘরের কেরানি হিসেবে। প্রেমচন্দ ছিলেন বাবা-মায়ের চতুর্থ সন্তান। তার প্রকৃত নাম ধনপত রায় শ্রীবাস্তব। আর তার লেখনী জগতে তিনি মুন্সি প্রেমচন্দ নামেই খ্যাত। প্রেমচন্দকে হিন্দি সাহিত্যের জনক বলা হয়ে থাকে। তাঁরই লেখা ছোট গল্প ‘সদগতি’ অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। দূরদর্শনের অর্থে সত্যজিৎ রায় ‘সদগতি’ চলচ্চিত্রটি তৈরি করেছিলেন। পঞ্চাশ মিনিটের রঙিন ছবি ছিল এটি।

ছবিটি তৈরির অনেক দিন হওয়ার পরও দূরদর্শন কর্তৃপক্ষ ছবিটি দেখাচ্ছিলেন না। এর কী কারণ হতে পারে- সে নিয়ে সাধারণ্যে সন্দেহ প্রকাশ করা হতে লাগল, ভারত সরকার ভয় পেয়েছেন, ছবিটি দেখান হবে না। ছবিটি তৈরির সময়েই শোনা গিয়েছিল, উত্তর ভারতের কয়েকটি গ্রামের ব্রাহ্মণরা ঘোর আপত্তি তুলেছিলেন ছবির বিরুদ্ধে, কেননা, ছবিটিতে দেখান হচ্ছে, বর্ণহিন্দুরা কীভাবে চামারদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলত আগেকার দিনে। ‘তুলত’, কেননা সেই আপত্তিকারিরা জানালেন, প্রেমচন্দের কাহিনি একসময়ে সত্যি হলেও এখন আর নয়, অতএব, ছবিটি তৈরির আর কোনো প্রয়োজন নেই, অযথা বর্ণহিন্দু তপশীলী জাতিদের মধ্যে অপ্রীতি খুঁচিয়ে তোলার নতুন কোনো কারণ ঘটেনি।

এদিকে চলচ্চিত্র বানানোর পর সত্যজিতের ছবিটি অনইয়ার করতে দেরি করা হচ্ছে, এই আশঙ্কার কারণটি ঠিক কী? দূরদর্শনের কর্তৃপক্ষ জেনেশুনেই প্রেমচন্দের কাহিনিটি পছন্দ করেছিলেন। তাহলে তাঁরা জানতেনই গল্পের কাহিনিটি কী? অতএব, ছবি প্রকাশ না পেতে দেওয়া হচ্ছে বলে যাঁরা সন্দেহ করছিলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন প্রেমচন্দের কাহিনি পড়া এক, আর চাক্ষুষ দেখা অন্য। সত্যজিতের হাতে পড়ে নিশ্চয় ওঁর লেখা গল্প চামারদের বা অত্যাচারিতের মনে আগুন ধরিয়ে দেবে। সুতরাং ছবিটি চেপে দেওয়া যাক। সাহিত্য থেকে ফিল্ম শক্তিমান, এই জাতীয় একটা ধারণা চালু আছে কোনো কোনো মহলে সর্বদা। সেই ধারণাটিও নিশ্চয় ছিল চেপে দেওয়া হচ্ছে সন্দেহের পিছনে।

এইবারে দেখে নেওয়া যায় প্রেমচন্দের গল্পটির কিছুটা অংশ- এ গল্পে দুখি চামার বাড়ির দরজায় ঝাড়ু দিচ্ছিল আর তার স্ত্রী ঝুরিয়া গোবর দিয়ে ঘর লেপছিল। দু’জনের যার যার কাজ শেষ হলে চামারনি বলেছিল তাকে, পণ্ডিত বাবাকে নিয়ে আসবার জন্য। পরে আবার কোথাও চলে না যান সেই ভয়ে। তারপর দেখা গেল পণ্ডিত এসে বসবে কোথায়? ধার করে ‘খাটিয়া’ এনে বসাতে চাইল পাশের বাড়ির মুখিয়ার থেকে; কিন্তু ওরা তো কিচ্ছুটি দেয় না। চুলোর আগুন, কুয়োর থেকে এক ঘটি জল কিচ্ছুটি নয়। এভাবে তো হয় না। ছোট জাতের লোক চামারেরা। এবারে ভাবা চলল তবে, নিজেদের খাটিয়ায় বসাবে; কিন্তু বউ ঝুরিয়া বলেছিল, ‘উনি আমাদের খাটিয়ায় বসবেনই না। দ্যাখো না কত আচারবিচার মেনে চলেন। দুখি চিন্তিতভাবে বলল- হ্যাঁ, এটাও একটা কথা। মহুয়া গাছের পাতা ছিঁড়ে একটা পাত্র করে নিলেই হয়ে যাবে। এরকম মহুয়ার পাত্রে বড় বড় লোকেরাও খাবার খান। মহুয়ার পাতা পবিত্র। দে, একটা লাঠি দে, পাতা পেড়ে আনি।’ এভাবেই এগিয়ে যায় গল্প। এমনি একটি গল্প নিয়ে সত্যজিৎ ছবি বানালেন, তা কী করে চালাতে দেবে সরকার। হিন্দুস্থান তো এমনিই বর্ণবাদে দুষ্ট ছিল তখন যেমন-আজও। তারপর সে চলচ্চিত্র নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের এক মন্ত্রী যখন প্রকাশ্যে বিবৃতি দিলেন যে তিনি জানেন, সত্যজিতের ‘সদগতি’ চেপে দেওয়া হচ্ছে, তখন দূরদর্শনের কর্তাব্যক্তি একগাল হেসে জানিয়েছিলেন, সেরকম কোনো অভিপ্রায় তাঁদের নেই। দেরি হচ্ছে, তার কারণ, দূরদর্শনের সবকটি কেন্দ্র থেকে এক দিনে ছবিটি দেখানোর বন্দোবস্ত তাঁরা করছেন। তাঁরা এ কথাও বলতে পারতেন,‘সদগতি’ যখন একবারই দেখানো হবে, রোজ রোজ নয়, তখন অত হুড়োহুড়ি করার কী আছে। তাঁরা জানালেন, আনুষ্ঠানিক আড়ম্বর করেই তাঁরা ছবিটি দেখাবেন। তাই দেরি হচ্ছে। তবে আর দেরি নেই। অদ্ভুত সব বক্তব্য ছিল এ ছবি নিয়ে। তবুও শেষমেশ দেখানো হলো, আর দেরি হয়নি। সমস্ত কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হলো ‘সদগতি’। তার আগে, দেখানো হলো পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের একটি সাক্ষাৎকার। পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা খুব খুশি হলেন, রাজ্যের চাপে পড়ে কেন্দ্র জব্দ হলো এমনিই সে খুশি ছিল। 

কী যা তা কাণ্ড সিনেমা দেখানো নিয়েও এমন ঢিমেতাল করা হয়? হয় হয়তো, না হলে সত্যজিতের ছবি নিয়ে এ কাণ্ড কেন? তাছাড়া দূরদর্শনে দেখানোর আগেই অবশ্য এখানে ওখানে, সদগতি দেখান হয়েছিল। তবে, তাঁরা তো মুষ্টিমেয় ফিল্মবোদ্ধা, তাঁদের দিয়ে তো বিপ্লব হবে না, দরকার লক্ষ লক্ষ টেলিভিশন দর্শকদের দেখানো, যাতে বিপ্লব ত্বরান্বিত হতে পারে। গরিব চামারদের, হরিজনদের অবশ্য টেলিভিশন নেই, তপশীলী জাতি উপজাতিরা টেলিভিশন দেখে না, তবুও যাঁরা উত্তেজিত হয়েছিলেন সদগতি চেপে দেওয়া হচ্ছে ভেবে, তাঁরা নিশ্চিন্ত হলেন, বিপ্লবের একটি ধাপ পেরনো গেল।

সেই সময়ে কলকাতা শহরের খবরের কাগজে প্রকাশ হলো- যেদিন সদগতি দেখান হলো দূরদর্শনে, সেদিন বিকেলে এবং সন্ধ্যায় রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল না কি, সবাই টেলিভিশনের সামনে জড়ো হয়েছিলেন। উত্তর ভারতের এক চামারের দুঃখে কলকাতার লোকেরা সেদিন নাকি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু আজকের ভারতের অবস্থা আরও ভয়াবহ, শুদ্ধচারিতার নামে, জাত-পাতের নামে যা চলেছে- তা সকাল বেলার খবরের কাগজে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। বোধোদয় হতে বাকি থাকে না মানুষ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। সনাতনী পন্থার নামে, ঠাকুর-দেবতার দোহাইয়ে কত কী যে হচ্ছে! রাজনীতি থেকে শুরু করে, শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাকার বিষয়াদি সবই এই জাত-পাতে গুলিয়েছে। বাস্তুসংস্থানে দেখা যায়- বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়- প্রেমচন্দের গল্পটি ঠিকই এমন। আর প্রেমচন্দের গল্পের চিত্ররূপকার সত্যজিৎও তা বুঝেছিলেন। ফলে কাজটি তিনি করতে সক্ষম হন। 

এই ছবিটি যারা বড় পর্দায় রঙিন দেখেছিলেন তারা কিন্তু টেলিভিশনের দর্শকদের জন্য আফশোস করতে কম করেননি। কেননা, টিভিতে ছবিটি তেমন জমেনি না, রঙ মার খায়, ডিটেলস হারিয়ে যায়। ছবিটি করা হয়েছিল টিভির পর্দার জন্য, এবং তখন যখন ভারতীয় দূরদর্শনের রঙিন ছবি দেখানোর কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কিছু নিন্দুক মুখ টিপে হেসেছিলেন, সত্যজিৎ নতুন মিডিয়াটি আয়ত্ত করতে পারেননি এমন ভেবে। ভক্তরা জানালেন, রঙিন ছবির দরকার ছিল, বিদেশে তো রঙিন টিভি, সেখানে তো রঙেই দেখানো দরকার। দূরদর্শনেরও টাকার দরকার, হয় তো সেজন্যই তাঁরা রঙে রাজি হয়েছিলেন। অবশ্য বিদেশের টিভির জন্য ছবিটির স্বত্ব কার ছিল তা আজ আর বলবার বিষয় নয়।

এরপর সদগতি দেখানো হলো, হালের যা রীতি, সত্যজিতের পক্ষে বিপক্ষে দু’দলের লড়াই শুরু হয়ে গেল। একদল লোক খ্যাতিমান পরিচালকের শক্তিমত্তার নতুন প্রকাশ দেখে যেমন মুগ্ধ হলেন। তেমনি আর এক দল লোক খ্যাতিমানের খ্যাতি খসিয়ে দিতে তেমনই বদ্ধপরিকর হয়ে উঠল। হিন্দি সিনেমার বোদ্ধারা বললেন, সংলাপের হিন্দি রূপ হাস্যকর, গ্রামবিশারদেরা জানালেন, গ্রামের চেহারা আদৌ ফোটেনি, বাচ্চা মেয়েটি নিশ্চয় কোনো ইংলিশ- মিডিয়াম স্কুল থেকে ধার করে আনা। বিপ্লব-বিশারদরা বলেছিলেন, গ্রামের হরিজনরা বামুনের বদমাইশি সহ্য করে নিল, এই চেহারা দেখানো অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীলতা। ইতিহাসবিশারদেরা জানালেন, হরিজনরা কখনোই চুপ করে বামুনের বামনাইগিরি আর সহ্য করে না, অতএব, আজকের এই সংগ্রামশীল সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে সত্যজিৎ গ্রামবাসীর সংগ্রামকে ব্যঙ্গ করছেন। মনস্তত্ত্ববিশারদরা জানালেন, চামারটির লাশ সারারাত বৃষ্টিতে পচলো, গ্রামের লোক নির্বিবাদে বাড়িতে শুয়ে থাকলো লাশ সরাবে না এই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে আর ভোরবেলা বামুন সেটা বিনা প্রতিরোধে পাচার করে দিল, এরকম একটা অবান্তর ব্যাপার কী করে যে পরিচালকদের মাথায় আসে!

অন্যদিকে ভক্তরা মনোযোগ দিয়ে দেখলেন কখনো লো অ্যাঙ্গেলে ক্যামেরা ধরে দুঃখীকে, কখনো ফ্রেমের বাঁ দিক থেকে, কখনো দুঃখীর তামাক চাওয়ার পর কাট করে ক্যামেরা চলে যায় বাসিরামের খাওয়ার দৃশ্যে- আর কখনইবা ‘চামারপল্লিতে গোঁড় আসে, ঘর থেকে ঝুরিয়া বেরিয়ে আসে- তারপর আসে ঘাসি। সাউন্ডট্রাকে তখন মেঘগর্জন। মিডশট থেকে ক্লোজে ঝুরিয়া, গরুর গলার ঘণ্টার শব্দ-শব্দ বাড়তে থাকে। ঘাসির কথা শোনা যায়। মিডশটে ঝুরিয়া, পিছনে গরুর পাল ঘণ্টা, পায়ের শব্দ, ঝুরিয়া পড়ে যায় জলকাদার মধ্যে। গরুর পাল পিছন থেকে তাকে পেরিয়ে যায়। কান্নায় ভেঙে পড়ে ঝুরিয়া। অসামান্য সিনেমাটিক এই সিকোয়েন্স তীব্র ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে’, কখন ক্যামেরা স্থির হয়ে থাকে প্রায় সাত সেকেন্ড কাঁধে বিঁধে থাকা কুড়ুলের ওপর।


দুই
প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের দুঃখ তার দেশের লোকরা চলচ্চিত্র বোঝে না, তাঁর উপযুক্ত সমালোচনা করতে পারে বিদেশের সাহেবরা। মনে পড়ে, শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথেরও এমন একটা অবস্থা হয়েছিল, তাঁর শিল্পের কদর এদেশে না হলো তো না হলো, সাগরপাড়ের লোকেরা প্রশংসা তো করছে। আরও মনে পড়ে স্তুতি-নিন্দা ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের মনোভাব সম্পর্কে সুরেশচন্দ্র সমাজপতির মন্তব্য, পুরোটাই তুলে দেওয়ার লোভ সামলানো যাচ্ছে না- ‘কিন্তু কবি বলিয়াছেন-/যত লিখছি কাব্য/ততই নোংরা সমালোচনা হতেছে অশ্রাব্য। ইহার ওপরে আর কথা চলে না। বাংলাদেশে কবির ভাগ্যে নোংরা সমালোচনা একেবারেই ফলে নাই, এমন কথা আমি বলিতে না পারি; কিন্তু ইহাও স্থির যে, এত অ-নোংরা, শুচি সমালোচনা এদেশের কোনো কবির ভাগ্যে ঘটেনি। এত স্তুতি, এত স্তব, এত ভক্তি, এত শ্রদ্ধা, এত অল্প সমালোচনা, এত স্তাবকের অনুকরণ, স্তুতি ও সমালোচকের বিশ্লেষণ রবীন্দ্রনাথ ভিন্ন আর কোনো কবি লাভ করিয়াছেন? তবু ভরিল না চিত্ত? বাঙালি যে ‘রাজা ও রাণী’র মতো ক্রমাগত বলিতেছে, একান্ত তোমারই আমি; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ দেশের ভালোবাসার অত্যন্ত অবিশ্বাসী।’ সেই যে তিনি একবার যুদ্ধের পরে সম্ভবত পাঁচের দশকে- সারা ভারত কাঁপিতেছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে, মানুষ মরছে, পুলিশি নির্যাতন হচ্ছে আর তিনি গেলেন জার্মানিতে, শান্তির বাণী শোনাতে। জার্মানরা তাঁর কাছে, তাঁর কথায় শান্তি খুঁজে পেয়েছিল বৈকী!

সদগতির চুলচেরা বিশ্লেষণ হবেই। গবেষক দেখেছেন, গরুর পালের অর্থ ছবির প্রমো এক রকম, পরে অন্যরকম; এই ছবির বৃষ্টির তাৎপর্য পথের পাঁচালির বৃষ্টি, অপুর সংসারের বৃষ্টি অথবা মহানগরের বৃষ্টির তাৎপর্য থেকে ভিন্ন, হরিহর থেকে গঙ্গাচরণ থেকে ঘাসিরামে উত্তরণের মধ্যে দেখা যায় সত্যজিতের পুরোহিত সংক্রান্ত মানসিকতার সামন্ততন্ত্র-ধনতন্ত্র-সমাজতন্ত্রে উত্তরণের বিন্যাস; অরণ্যের দিনরাত্রি- তে শোষিত আদিবাসীর বিকৃত রূপ করেছিলেন সত্যজিৎ, হীরকরাজার দেশে-তে শ্রমিক-কৃষক পেয়েছিল ইতিবাচক ভূমিকা, সদগতির গোঁড় চরিত্রে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদী চরিত্র ফুটে উঠল, প্রতীকী ব্যঞ্চনা নিয়ে। গবেষকের শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায় যখন তিনি লক্ষ্য করেন ছবিটির গড়ন এবং তার ব্যঞ্চনা। ঘাসিরাম এবং দুঃখীদের জীবন তাঁর প্রথমে মনে হয় সমান্তরাল পরে মনে হয় মুখোমুখি। দুঃখীর হাত থেকে ছুটে যাওয়া কুড়ুল পড়ে বামুনের পায়ে। সেটা গবেষকের মনে হয়, প্রতীকী তাৎপর্যের বাহন। দুঃখীর জমাট ক্ষোভ, শক্ত কাঠের মতো গ্রামীণ সংস্কারকে বিদ্ধ করতে পারছে না বলেই, কুড়ুলের রূপ নিয়ে ছিটকে পড়ে বামুনের দিকে। এটা সচেতন প্রতিবাদ না, ক্ষোভের প্রকাশ। দুঃখী প্রতিবাদী চরিত্র না, কাঠকে সে বিদ্ধ করেছে নিজেকে চূড়ান্ত ভেবে মেরে, কিন্তু এটা আত্মহনন নয়, নিজেকে শেষ করেছে, তবে কাঠকেও সে হার মানিয়েছে, লক্ষ্যভেদ করা কুড়ুলের ওপর ক্যামেরার স্থির থাকা মানে প্রতিবাদের মর্ম গাঁথা এই হলো চলচ্চিত্রের ইত্যাদি।

সদগতি দেখে কারো কারো মনে হয়েছে, এটা কিছু হয়নি। কেউ কেউ গদগদ হয়েছেন, এবং আতিশয্যে অনেক কিছু, মধ্যে মধ্যে পরস্পরবিরোধী হলেও, আবিষ্কার করেছেন। এই দুয়ের মঝেও একটি পথ আছে। ছবিটিতে ত্রুটি বিচ্যুতি আছেই, সমালোচকরা যেসব ত্রুটি লক্ষ্য করেছেন, সেসব ছবিতে আছেই। তা সত্ত্বেও ছবিটি বরবাদ হয়ে যায় না। আবার যেসব অসাধারণ ব্যঞ্জনা ভক্তরা খুঁজে পাচ্ছেন সে সব না থাকলেও ছবিটির গুরুত্ব একটুও কমে না।

ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্রটি অচ্ছুৎ হলেও ঘটনাপ্রবাহের চালিকা শক্তি অস্পৃশ্যতা বা অশুচিতাবোধ নয়। গল্পটি মনে করা যাক। একটি চামার সবে রোগ থেকে উঠেছে। তার মেয়ের বিয়ের দিন ধার্য করার জন্য তার বাড়িতে পুরোহিতের আসা দরকার। পুরোহিত আনতে হলে কিছু উপঢৌকন দরকার। রুগ্ণ শরীরেও চামারটি ঘাস কাছে। পাছে যতে দেরি হয় তাই অভুক্ত অবস্থায় সে চলেছে পুরোহিতের বাড়িতে, কাজ সেরে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবে বলে। তার স্ত্রী চিন্তিত, রোগা মানুষটা না খেয়ে চলল। পুরোহিতের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, পুরোহিতের মনেই নেই সে কথা দিয়েছিল চামারের বাড়িতে যাবে। সুতরাং সঙ্গে সঙ্গেই সে বেরুল না, খেয়েদেয়ে সে বেরুবে। এতক্ষণ বসে বসে চামারটি কী করবে, তাই তাকে বলা হলো নানারকম ফাইফরমাস খাটতে এবং শেষে কাঠ কাটতে। বামুনকে খুশি রাখা দরকার তার নিজেরই গরজে, অতএব, বিনা বাক্যব্যয়ে চামারটি কাঠ কাটতে গেল। কাঠ কাটার অভ্যাস নেই, পুরনো শক্ত গুঁড়ি, অভুক্ত শরীর, সবে রোগ থেকে উঠেছে, কাঠ কাটতে না পারলে বামুন যাবে না, সর্বশক্তিদিয়ে কাঠ কাটতে কাটতে চামারটি মারা গেল।

কলকাতার মানুষ, গ্রাম চামার পুরুত ইত্যাদির সঙ্গে যাদের পরিচয় সাহিত্য ইতিহাসে পড়ে যা ফিল্ম দেখে, তাদের কাছে সদগতি ছবিটির শুরু হয় আর পাঁচটি ছবির মতোই। তখনকার দিনে ছিল আজকের ফিল্মের নতুনত্বের শুরুর সময়, গ্রামের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে ছবি করা, সদগতিও সেইভাবে শুরু। সদগতি নাম দিয়ে ছবির শুরু, সুতরাং মনে একটা চিন্তা খচ্ খচ্ করতেই থাকে, কিছু একটা অঘটন ঘটতে যাচ্ছে। তবে সেটা কী জাতীয়, আন্দাজ করা যাচ্ছে না।


এখানে বলে রাখা ভালো এ লেখা বা ভাবনা, সত্যজিতের চলচ্চিত্রের ইংরেজি স্ক্রিপ্ট পাঠেরই এক রূপ এটি এবং আমার নিজস্ব ভাবনার পুরোটাই। চামারের কাহিনি, অতএব ঘরের চালে ছাগলের চামড়া শুকোচ্ছে, বাচ্চা ছাগলের সঙ্গে খেলছে। চামারের বউ চামারকে সকালবেলার ঘাস কাটতে দেখে অবাক হচ্ছে, ঘাস যে পুরুতের জন্য ঘুষস্বরূপ সেটা চামারকে বলতে হচ্ছে। পুরুত আসবে, অতএব, বউকে পাতার আসন তৈরি করতে হবে পুরুতের বসার জন্য, কেননা চামারের খাটে সে বসবে না, বর্ণহিন্দুদের কেউ চামারকে খাট ধারও দেবে না। অস্পৃশ্যতার ব্যাপারটি সত্যজিৎ এইভাবে প্রতিষ্ঠিত করে নিলেন। এগুলো অবশ্য প্রায় অঙ্কের সূত্র ধরে করা, ছবিটির বৈশিষ্ট্য এখনো ফোটেনি। সেই অঙ্কের নিয়মেই, চামার এবং তার বউ জিনিসপত্র কেনার সূত্রে কিছু কথাবার্তা বলে, উদ্দেশ্য কিছু মজা পরিবেশন করা, আবহাওয়াটা তরল করে রাখা ভবিষ্যতের শোচনীয়তা আরও তীব্র হয়ে ওঠে যাতে, হয়তো দুস্থ চামারদের জীবনেও হাসিঠাট্টা আছে সেটাও বলে রাখা।

এরপর চামারটি তাড়াহুড়ো করে বামুনের বাড়ি যখন পৌঁছল, বামুন তখন ধীরে সুস্থে অজসজ্জা করছে,পূজোর প্রস্তুতিতে। চামারের আগমনের কারণ জানতে পেরে বামুন তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়। এটাই ছবিটির কেন্দ্রবিন্দু। চামারের সংস্কার, তার মেয়ের বিয়ের দিন ধার্য করার জন্য বামুনকে দরকার, বামুনও বাগে পেয়ে তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়। বামুনকে দোষ দেওয়া যায় না, চামারকে দেখে সে অবাক হয়, চামারের কথা শুনেও বোঝা যায় না, বামুন কথা দিয়েছিল, সে আজই যাবে। যদি কথা দিয়েও থাকে, চামারের বাড়িতে প্রস্তুতির ঘটা দেখে মনে হয় কথা আগে তারা পেয়েছিল, তবু চামারটি হয়ত প্রতিশ্রুতি মনে করিয়ে দিতে ভরসা পায়নি; কিন্তু যে করেই হোক বামুনকে আনতে হবেই এই ধর্মসংস্কারই চামারের কাল হলো। গল্পের ট্র্যাজেডি এভাবেই আসে। পরবর্তী অংশে আর তাৎপর্যময় কিছু ঘটে না, যদিও সদগতি নামকরণ বোঝানোর জন্য গল্পটিকে আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজন হয়। চামারবস্তির লোকেরা লাশ সরাবে না, বামুনেরা লাশ পড়ে থাকায় আপত্তি জানায়, সারা রাত বৃষ্টি পড়ে, চামারের বউ একা একা লাশ আগলায়, কিন্তু তারপর ভোর রাতে কী কারণে লাশ ফেলে সে চলে যায়, পুরুত সেই সুযোগে লাশ টেনে ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে আসে, গঙ্গাজল ছিটিয়ে লাশ পড়ে থাকা জায়গাটি পবিত্র করে তোলে।

হালের দিনে আমরা যারা এই গল্পের সঙ্গে যুক্ত নই, চামার নই, বামুনও নই, কিংবা বর্ণবাদকে সমর্থন করি না, তাদের কাছে এ ছবিটি কিছুটা অস্বস্তির আবার মানুষের জীবনের গল্প কেমন তা ভেবে কষ্ট পেতে পারি; কিন্তু আজকের দিনেও ভারতের মতো ক্ষমতাসীন দেশের প্রতিটি গ্রামের দিকে তাকিয়ে দেখুন, চামার নয় শুধু জাত-পাত গিলে খাচ্ছে ওই দেশের মানুষগুলোকে। সত্যজিৎ তাঁর ক্যারিশমা দিয়ে প্রেমচন্দের গল্প সদগতি’র একটি গতি করে দিয়েছেন। অথচ সাম্প্রতিকতম সময়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দিকে দৃষ্টিপাত করে দেখুন, জাত হিসেবে ইশতেহার ছুঁড়ছে, সে জাতের কোনো উপকার হবে কি না পরের বিষয়, ভোটের রাজনীতিটি ঠিকঠাক করে করবারই প্রয়াস কেবল রাজনীতিকদের। এই সমস্ত ভাবনা মাথায় এলেও একটি বিষয় সত্য যারা দেখেননি চামারেরা কেমন, ছোটজাতের লোকেরা কেমন তারা ঠিক জেনে গেলেন ওদের সঙ্গে আচরণটি কেমন করতে হবে সত্যজিৎ রায় শিখিয়ে দিলেন এমন নয় কী? 

তবুও এমন সত্য ক’জনা তোলেন চলচ্চিত্রে, সকল রাজনীতিকে এড়িয়ে? সত্যজিৎ সেই সাহসটি দেখিয়েছেন সততার সঙ্গে। ফলে তার নির্মিত ‘সদগতি’ হয়ে উঠেছে- মানুষের জন্য ছবি।  

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh