এফবিসিসিআই এর উদ্দেশ্য

ব্যবসা না-কি ব্যবসায়ীদের পাশে থাকা

মনজুরুল হক

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২১, ১২:৩১ পিএম | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২১, ১২:৪৪ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

দেশে করোনা পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ। এরকম বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে সরকার একবার লকডাউন দিচ্ছে, আবার তা তুলে নিচ্ছে। লকডাউন ভেঙে যাচ্ছে পেটের দায়ে পথে বের হওয়া কর্মজীবী মানুষের কারণে। তাদের পেটে ভাত নেই। কাজ না করলে চাল কেনার টাকা নেই। তাদের কাছে করোনার চেয়ে বড় ভীতি পেটের ক্ষুধা। আবার গার্মেন্ট মালিকরা কারখানা খুলে তাদের কাজে যোগ দেওয়ার হুমকি দেয়। অসহায় মানুষগুলো ফের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে ঢাকামুখে ছোটে। লকডাউন ভেঙে কারখানা খোলার এন্তার যুক্তি মজুদ আছে গার্মেন্ট মালিকদের হাতে; কিন্তু তারা কিংবা সরকার একবারও ভাবে না শ্রমিকরা কীভাবে ফিরবেন? গণপরিবহন বন্ধ! অথচ গার্মেন্ট কারখানা খোলা! তখন এসব হতভাগ্য শ্রমিকরা হেঁটে, রিকশায়, ট্রাকে, অটোতে পিকআপভ্যানে করে চার-পাঁচ গুণ টাকা খরচ করে ঢাকায় ফেরেন। সেসব দেখে আবার সুশীলসমাজ বোকাবাক্সের এসি রুমে বসে বসে নসিয়ত করে।

এ রকম ইঁদুর-বিড়াল খেলার মূল কারিগর গার্মেন্ট মালিকরা। আর ক্রীড়নক সেই গতরখাটা শ্রমিক। শ্রমিকদের সঙ্গে দাসসুলভ আচরণ করা নতুন নয়। এই শিল্পের শুরু থেকেই এরা শ্রমিকদের ক্রীতদাস মনে করে এবং সেই মতো আচরণ করে। এই মালিকদের ফেডারেশন, যার নাম- বিজিএমইএ বা বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক এবং রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশন। বিজিএমইএ সদর্পে ঘোষণা করে-তারাই দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। সুতরাং তারা দুধ দেওয়া গরুর মতো। মামা বাড়ির আব্দার তাদের থাকতেই পারে! বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ সংগঠনের ওপরও খবরদারি করার বা তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার সংগঠন হচ্ছে- এফবিসিসিআই। এটাই ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ সংগঠন। মতিঝিলের বিশাল এক ভবনজুড়ে তাদের পেল্লাই কারবার; কিন্তু এই সংগঠনটি কি গার্মেন্ট সেক্টরের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে? না। পারেনি। বলা ভালো চেষ্টাও করেনি। তাহলে এফবিসিসিআইর কাজটা কী?

বাংলাদেশের বড় সমস্যা বিনিয়োগ পরিবেশের। একটি সহায়ক বিনিয়োগ পরিবেশের অভাবে বিনিয়োগ বাড়ছে না, সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতির। বিশ্বব্যাংকের করা সহজে ব্যবসা পরিচালনা করার সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে কেবল আফগানিস্তান। অনেকেই দেশের কর-ব্যবস্থাকে ব্যবসা বৈরী বলে তীব্র সমালোচনা করেন। অথচ এসব বিষয়ে এফবিসিসিআইর কোনো বক্তব্য নেই, কোনো ভূমিকা নেই।

করোনার সময়ে সারাবিশ্বের অর্থনীতিই চরম সংকটে। উৎপাদন কমেছে, চাহিদা কমছে আরও বেশি। এ রকম এক সময়ে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন নীতি নিয়ে একের পর এক মূল্যায়ন ও সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করেই যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, আর বাংলাদেশের এফবিসিসিআইর ওয়েবসাইটে অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে একটি অক্ষরও খুঁজে পাওয়া যায় না। ব্যাংকগুলো প্রণোদনার ঋণ ঠিকমতো দিচ্ছে না বলে তারা অভিযোগ করেন; কিন্তু অর্থনৈতিক নীতি বিষয়ে এফবিসিসিআইর বক্তব্য বা ভূমিকা নেই।

এর মধ্যেই আবার এফবিসিসিআই ব্যাংক, বীমা, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল করার কথা জানিয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্তও হয়েছে। করোনা সংকটে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আসল চেহারা প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। অর্থ থাকলেও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে একটা সময় পর্যন্ত বিদেশে চিকিৎসা নিতে যেতে পারেননি অনেক ব্যবসায়ী। এই অভিজ্ঞতা থেকে যদি বড় ব্যবসায়ীরা উন্নতমানের চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হাসপাতাল করেন, সেটা ভালো সংবাদ; কিন্তু এটা কী বাস্তবসম্মত?

তাদের আসল উদ্দেশ্য ব্যবসা করা। ব্যবসায়ী সংগঠন নিজেই ব্যবসা করতে চাওয়া একটি বিস্ময়কর দিক। এমনিতে বেসরকারি খাতে ব্যাংক, বীমা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কমতি নেই; বরং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের চাপে সরকার একের পর ব্যাংক, বীমা বা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েই যাচ্ছে। এর মধ্যে অনেকই ঠিকমতো চলছে না। এখন আবার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের কেন ব্যাংক, বীমা বা বিশ্ববিদ্যালয় লাগবে, তা পরিষ্কার নয়। নাকি বছরের পর বছর ধরে সরকারের অনুগত থাকার পুরস্কার চাচ্ছে এখন এফবিসিসিআই।

ব্যবসাই যদি করতে হয়, তাহলে আর ব্যবসায়ীদের ‘শীর্ষ সংগঠন’ তকমার দরকার কেন? সরাসরি ব্যাপারী হলেই চলে! বরং একটা কাজ করতে পারে এফবিসিসিআই। বাণিজ্য সংগঠনের নিবন্ধন বাদ দিয়ে কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারে। আর ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন না বলে অনুগত ব্যবসায়ীদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবেও নিজেদের ঘোষণা দিতে পারে। সুতরাং এই অবস্থায় তাদের এখন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হয়ে যাওয়াটাই ভালো। তারপর ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠা করুক- কোনো সমস্যা নেই।

সামনে আরও কঠিন সময়। অর্থনীতির উত্তরণ নির্ভর করছে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ ও সরকারের সহায়ক নীতির ওপর। মহামারির সময়ে সবচেয়ে বিপদে থাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বড় অংশই ব্যাংকের বাইরে। তাদের প্রয়োজন আর্থিক সহায়তার। সমস্যা বড়দেরও আছে। অর্থনীতির উত্তরণে সরকারকে এখন যেতে হবে গতানুগতিক নীতির বাইরে; কিন্তু এসব কিছুই না, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের সব চিন্তাভাবনা এখন ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠার। তারা আজ অব্দি ৪ হাজার গার্মেন্ট কারখানায় প্রায় ২৪/২৫ লাখ শ্রমিকের জন্য একটা গ্রহণযোগ্য নীতিমালা তৈরি করতে পারল না। বিদেশি ক্রেতাদের ধমক-ধামক খেয়ে কিছু কারখানা বিএমআরই করে কিছুটা উন্নত এবং কাজের পরিবেশ আন্তর্জাতিক মানের করতে পারলেও, সেই সংখ্যা মাত্র ১৫ ভাগ। বাকি ৮৫ ভাগ কারখানাই চলে প্রভু-ভৃত্য সম্পর্কের ভিত্তিতে এই আধুনিক যুগেও!

এসব প্রত্যাশা পূরণের সক্ষমতা যে এফবিসিসিআইর নেই, তা পরিষ্কার। কেননা, সুবিধা পাওয়ার আশায় একদল অনুগত ব্যবসায়ীর এই সংগঠন সক্ষমতা, গুরুত্ব ও মর্যাদা হারিয়েছে অনেক আগেই। বছরের পর বছর এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার কোনো না কোনোভাবে সরকারি দলের লোকজন। সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছে যেমন এই সংগঠনের গুরুত্ব নেই, দলের লোকজন শীর্ষ পদে থাকার পরও সরকার আমলে নেয় না, তাদের মতামত। ফলে দেশের অর্থনীতির নীতি নির্ধারণে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারছে না তারা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন কেবল তারা নামেই, কাগজে আর কলমে, আর কোথাও না।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের (সেজান জুস) কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। 

‘আদালত বলেন, এতজন শ্রমিক মারা গেলেন। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর শোক জানিয়ে কোনো বিবৃতি দেখিনি। এফবিসিসিআই শ্রমিকদের মৃত্যুর বিষয়ে শোক জানাল না। তাদের কোনো প্রতিনিধি দল সেখানে গেল না। আমার মনে হয় এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর রোল প্লে করার প্রয়োজন এসব ক্ষেত্রে। ঠিকমত ফ্যাক্টরিগুলো রান করছে কি-না। কোথায় কী দুর্বলতা এগুলো তাদের দেখা উচিত। গার্মেন্টের ব্যাপারে বিদেশিরা চাপ দিয়েছে বলে সেখানে এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কারণ আমাদের দেশে যতক্ষণ চাপ না দিচ্ছেন, ততক্ষণ কাজ হয় না। এটা বোঝা উচিত।

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি পত্রপত্রিকা ফলো করার চেষ্টা করি। তাদের কোনো পজিটিভ ভূমিকা দেখি না। আমার মনে হয় যে, আমাদের এই জায়গাগুলোতে কাজ করার সুযোগ আছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তারা শুধু সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করে আর ব্যাংকের ঋণ মওকুফ কীভাবে করা যায়, সেই চেষ্টায় থাকে। আর কারখানা পরিদর্শকরা পরিদর্শনে গিয়ে খাম নিয়ে আসেন।’

হাইকোর্টের এই ভৎসনার পর পরই অবশ্য একখানা বিস্ময়কর শোকবার্তা তারা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন! ‘নারায়ণগঞ্জে সেজান জুস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ শোক জানায় তারা। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন নিহত সকলের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একইসঙ্গে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। এ ছাড়াও অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের উদ্ধারে যথেষ্ট আন্তরিক ও দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য ফায়ার সার্ভিস বিভাগের সকল কর্মীর প্রতি ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানান এফবিসিসিআই সভাপতি।’ এখানে একটি বারের জন্যও কারখানা মালিকের চরম গাফিলতি এবং আগুন লাগার পরও তালা বন্ধ রাখার মতো পৈশাচিক কাজের নিন্দা জানানো হয়নি।

এফবিসিসিআই যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেশের ব্যবসায়ীদের একটা ‘ক্লাব’ ছাড়া আর কিছু না, সেটি তারা বারে বারে ‘প্রমাণ’ করেছেন। এই প্রতিষ্ঠানের কাছে তাই বিজিএমইএ-কে সঠিক পথে চালিত করা বা দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে শ্রম-শ্রমিকবান্ধব করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা করা আর অটোরিকশায় চেপে মঙ্গল গ্রহে যেতে চাওয়া সমান কথা।

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh