সুবর্ণরেখা, ঋত্বিক ঘটকের চোখে দেশভাগ

অরুণ স্যানাল

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২১, ০৩:১০ পিএম

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র দেখেননি এমন সিনেমাপ্রেমী দর্শক খুব কম রয়েছে বাংলা মুল্লুকে। আর তা দেখে অনুপ্রাণিত হননি এমন দর্শকসংখ্যাও খুব কম। ঋত্বিক ঘটকের একটি ছবি-সুবর্ণরেখা। ‘সুবর্ণরেখা’ আমি দেখেছি, আমার মনে হয়েছে- এ ছবিতে বাস্তবের সঙ্গে যথোপযুক্ত চিন্তার একাধিক স্তর রয়েছে এবং ছবির প্রসঙ্গ ও প্রকরণ সমস্ত স্তরগুলিতেই প্রসারিত ও বিন্যস্ত। সব মিলিয়েই এর কনটেন্ট, যা মুখ্যত একটি মৌলিক বিন্দুতে সমাহৃত।

প্রথম স্তরের কথা বলি, ‘সুবর্ণরেখা’ সমাজবাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ইতিহাসের নেমিচক্রে, রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হয়ে যেন নির্লিপ্ত মানুষ চলে আসতে বাধ্য হলো সাতপুরুষের ভিটে, কালানুক্রমিক জীবিকা, আর পরিচিত দেশ-কাল ছেড়ে। তারপর নতুন করে ঘর বাঁধার লড়াই শুরু করল, তাদের কয়েকজনকে কেন্দ্র করে পরিচালক একালের জীবন ও মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলো প্রকাশ করেছেন, ঘটনা ও চরিত্র উভয় দিক থেকে। ফুটে উঠেছে বর্তমান পরিবেশ ও তদন্তর্গত জীবনসংগ্রাম, বাঁচার দুরন্ত প্রচেষ্টা। এ চেষ্টা কোথাও দল বেঁধে, কোথাও দলছুট একাকিত্বে, কোথাও পারিবারিক ঐক্যের মধ্যে, কোথাওবা সেই ঐক্যের অনিবার্য ভাঙনে। নবজীবন কলোনির অন্যতম যোদ্ধার সামনে যখন লোভনীয় চাকরির হাতছানি, তখন থেকেই সমষ্টি ও ব্যষ্টির মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত; ব্যালকনি থেকে ক্যামেরার প্রথমে নতদৃষ্টি, পরে ঊর্ধ্বমুখী দৃষ্টিপাতের মধ্যে দিয়ে এই বিচ্ছেদরেখাটি সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তার প্রত্যাশিত ফলশ্রুতি- উদ্বাস্তু ঈশ্বর ও ম্যানেজার ঈশ্বর, নবজীবন কলোনি ও ছাতিমপুর বাংলোর মধ্যে ক্রমদূরত্ব। তার পরে, সমষ্টিবিরোধী ব্যষ্টিচেতনা প্রতিহত হয়ে ফিরে আসে ঈশ্বরেরই কাছে। কিন্তু দ্বন্দ্ব তো শুধু বাইরে নয় ভেতরেও- প্রতিষ্ঠার মোহে ঈশ্বর পেছন ফিরে তাকায় না, সমষ্টির কথা ভাবে না, অথচ সামষ্টিক প্রয়োজনে তৈরি সমাজবিধিকে মেনে চলে নিজের স্বার্থ ও সুবিধে মতো। আত্মদ্বন্দ্ব তাই তার ললাটলিখন, নবজীবন তার করতল অতীত, আপন মানুষ সরে গেল দূরে। তারাও কি সুখ-শান্তি পেল? হরপ্রসাদের, ঈশ্বরের, আর সবার মতো, তারাও পরিবেশের হাতে নিয়ত নিহত, বাস্তবের অশান্ত স্রোতে বিপর্যস্ত, নিরালম্ব বায়ুভূত ... পরাজিত। সীমান্তের ওপারে যে বাড়ি হারিয়ে গেল, কোনো পাড়েই তা আর মিলল না।

দেশ স্বাধীন হলো, পরিবেশ স্বচ্ছ হলো না, হলো জটিলতর। প্রাণরক্ষার দুরূহ সংগ্রামে, নানামুখী সংঘাতে, জীবনের ধারা বক্র, মন তির্যক, পুরনো ধ্যান-ধারণা ভাবনা বাসনা ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ ভাঙনের মুখে; নীড়ের হাতছানি অথচ আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নবিলাস বারবার ধুলোয় লুটিয়ে দিচ্ছে বিশ্বাসকে, এষণাকে, ঐক্যবদ্ধ মানুষ একলা হয়ে উঠছে। বিক্ষোভ, বিচ্ছিন্নতা, বিভ্রান্তি অবশেষে বিনষ্টি। ঈশ্বরের চোখের সামনে সীতার মুখ তাই কেবলি অস্পষ্ট থেকে স্পষ্ট, স্পষ্ট থেকে অস্পষ্ট হয়ে যায়। চশমা গুঁড়িয়ে যায় ভোগের পদতলে, আদর্শ গুঁড়িয়ে য়ায় পলায়নী মনোবৃত্তির অতিচাপে। শেষ পর্বে পরিচালক নতুন করে লড়াই আরম্ভের মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন, তবু অবসাদ, বিষণ্ণতা, অসহায় আশাহীনতা, ফ্রাসট্রেশন ও ডিসইনট্রিগেশনের সুর সচেতন চিত্তকে প্রবলভাবে আক্রমণ করে থাকে। প্রথম সচেতনতা নবজীবন কলোনির ওপর শোষণ-শক্তির নির্মম অত্যাচারের মুখোমুখি হয়ে, দ্বিতীয় আঘাত বহুরূপীর কালীমূর্তির হঠাৎ সম্মুখিনতায়; তৃতীয় ও চূড়ান্ত শীর্ষবিন্দু সীতার দা দিয়ে গলা কুপিয়ে আত্মহত্যায়। প্রথমটি বাস্তব, দ্বিতীয়টি রূপক, তৃতীয়টি সাংকেতিক, যার সঙ্গে মিশে থাকে একটি ফুটন্ত সরল মুখ, একটি চোখ-লা দলচে ভিতা’র সেই মৎস্যচক্ষুর মতো বিবেকের তন্দ্রাহীন দৃষ্টি; পরিচালক সমকালীন জীবনের ও মনের অবক্ষয়কে একটু-একটু করে তুলে নিয়ে গেছেন ভয়ংকরতার, বীভৎসতার অপ্রত্যাশিত এলাকায়, এবং বক্তব্যের প্রতিষ্ঠায় ও রসের স্ফূর্তিতে সিদ্ধিলাভ করেছেন। আমাদের পরিচিত জগৎ তার সমস্ত সুন্দর অসুন্দর, ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়াশীলতা, লড়াই ও স্বপ্নবিলাস নিয়ে, শিল্পরূপ লাভ করেছে। ছবির প্রথম দিকে বস্তুভার যতটা, শেষ দিকে ব্যঞ্জনার ততধিক প্রাধান্য, এবং এই ব্যঞ্জনা ‘সুবর্ণরেখা’কে দিয়েছে গভীরতা ও রসময়তা।

এবারের স্তরটিও বলি- ছাতিমপুরের মাঠ ভাঙতে ভাঙতে বিদায়ী ম্যানেজার রামায়ণের গল্প শুনিয়েছে বালিকা-সীতাকে। নিছক গল্পের জন্য কিংবা ভক্তিভাব জাগাবার জন্য নয়, পরিচালক ‘সুবর্ণরেখা’ কাহিনির মধ্যে রামায়ণের আদল আনবার চেষ্টা করেছেন। এ চেষ্টা নতুন নয়। শিল্পে সাহিত্যে অসংখ্যবার এই রীতিটি অনুসৃত হয়েছে, ঋত্বিকের আগেকার ছবিতেও এর আভাস আছে, এখানে আরও ব্যাপকভাবে। শুধু রাম-সীতা নামকরণে নয়, তার চেয়েও বেশি। সীতা ‘সীতামা’ বলে উল্লিখিত হয়েছে। মূল রামায়ণে সীতার জন্ম রহস্যাবৃত, এখানে সেই রহস্য অভিরামে (রক্তকরবীর ‘রঞ্জন’-এরও এই জাতীয় রাহস্যিক পরিচয়) আরোপিত। তার নাম কৌশল্যা। অভিরাম সীতার বিবাহ স্বয়ংবর সভাকে স্মরণে আনে। বিনু লব-কুশের সগোত্র। ঈশ্বর একই দেহে দশরথ ও রাবণ (পুনশ্চ রক্তকরবী- যক্ষপুরীর রাজা একই দেহে রাবণ ও বিভীষণ)। ঈশ্বর যখন দশরথ, রামবিলাস তখন কৈকেয়ীর স্বজাতি। ঈশ্বর যখন রাবণ, হরপ্রসাদ তখন বিভীষণ, এবং মুখার্জি কালনেমি। অবশ্য মহাকাব্যের আদলে গড়ার অর্থ চরণে-চরণে তার সঙ্গে সাযুজ্য নয়, এবং এসব ক্ষেত্রে স্রষ্টা-শিল্পী প্রচুর স্বাধীনতা গ্রহণ করে থাকেন, ধ্রুপদী সাহিত্যের সঙ্গে একালকে মেশাতে গিয়ে অনেক প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ঘটান। তাই রেখায় রেখায় না মিলিয়েও দর্শক ‘সুবর্ণরেখা’য় রামায়ণ কাহিনীর আভাস খুঁজে পান, সেই বারে বারে নির্বাসন বা স্থানান্তর ও আত্মাহুতি, রাম-সীতার দশরথের-রাবণের জীবনপালা। সেই সমান দুঃখ, সমান যন্ত্রণা একালের রাম-সীতার মধ্যেও। এইভাবে একাল ও সেকালকে যুক্ত করে পরিচালক সমকালীন সমাজবাস্তবতাকে দিয়েছেন মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি, সর্বকালীনতা ও সর্বজনীনতা। এই যোগাযোগের ফলশ্রুতি- বর্তমান জীবনের ও তন্নিষ্ঠ শিল্পের আস্তর স্বরূপটি ব্যাপক আবেদনের মধ্যে দিয়ে প্রত্যক্ষ প্রতিষ্ঠিত। বাস্তবে যদি এ ছবি অতি সরল না হয়ে থাকে, সে দায় বা দোষ পরিচালকের নয়। তিনি শুধু একটি অপরাধ করেছেন- গ্রাম্য লৌকিক পৌরাণিকতার রীতিতে রামায়ণ-কাহিনির অবতারণা করেননি, রবীন্দ্রনাথ এবং অন্যদের মতো মননশীলতার আশ্রয় নিয়েছেন। সুতরাং ‘সুবর্ণরেখা’র মহাকাব্যিকতা যদি দুরূহ হয়ে থাকে, তাহলে রেফারেন্স দেবো ‘রক্তকরবী’র দুর্বোধ্যতার। উভয় ক্ষেত্রেই দর্শক সমাজের পরিশীলিত চিত্তের এপিক দৃষ্টি প্রার্থনীয়।

তৃতীয় স্তরে এসে দেখি- রামায়ণ কাহিনির অভিযোজনা আর একটি দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে- একে উপকথাবৃত্তি বলে। আধুনিক সাহিত্যে আধুনিক রীতিতে প্রাচীন উপকথার শৈল্পিক প্রয়োগ। যেহেতু, রামায়ণও মৌলত আদিম উপকথা; কিন্তু এই উপকথাবৃত্তি সম্পর্কে আমি সচেতন হয়েছি ছবির দেহে ‘শিশুতীর্থ’ কবিতার প্রয়োগে। যীশু খ্রিস্টের জন্ম-কথাকে আশ্রয় করে এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ মানব-ইতিহাসের একটি ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন- জন্ম-মৃত্যু-পুনর্জন্ম পেরিয়ে পেরিয়ে মানুষ চলেছে প্রেমের ও শক্তির তীর্থের অভিমুখে, নবজাতক তথা চিরজীবিত মানুষের জয়গান কণ্ঠে নিয়ে। রামায়ণের মতো খ্রিস্টকাহিনিও আদিম উপকথা থেকে ক্রম-সঞ্চারিত। এবং আদিম উপকথার একটি মূল সুর হলো গিয়ে- জন্ম-মৃত্যু-পুনর্জন্ম।

পৃথিবীর তাবৎ স্থাবর কৃষি-সমাজে শস্যের আসা-যাওয়া-পুনরাবির্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে জাদু-কৃত্যের আধারে কৃষি-প্রজনন তত্ত্বের জন্ম, যার মূল কথা- জন্ম-মৃত্যু পুনর্জন্মের মাধ্যমে সৃষ্টি তথা প্রাণের অব্যাহত লীলা ও প্রবহমানতা। প্রথমে আকাশ বা সূর্য ও পৃথিবী বা সমুদ্রের মিলন-বিচ্ছেদ-পুনর্মিলনের কাহিনিতে এই আদিম ভাবনার রূপায়ণ; তারপর আরও অনেক কাহিনি ও বিচিত্র বিবর্তন। এই আদিম কৃষি ভাবনাঘনিষ্ঠ উপকথাগুলোর অন্যতম রামায়ণ ও খ্রিস্টকাহিনি; প্রথমটির অনুরণে ‘রক্তকরবী’, দ্বিতীয়টির আশ্রয়ে ‘শিশুতীর্থ’ লেখা হয়েছে। সুতরাং ‘সুবর্ণরেখা’য় ‘শিশুতীর্থ’র প্রয়োগ অকারণ নয়, রামায়ণের অভিযোজনা কেবলমাত্র মহাকাব্যিক নয়, অন্তত তা আর থাকে নি। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, ছবির বিষয়বস্তু এই আদিম উপকথার প্যাটার্নে সাজানো। পুরুষানুক্রমিক ভিটে থেকে উদ্বাস্তু জীবন থেকে নবজীবন কলোনী থেকে ছাতিমপুর থেকে কলকাতায়- কেবলই অপসরণ এক অবস্থা থেকে অবস্থান্তরে, রূপ থেকে রূপে, বাধা-বিপদ-বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে কেবলই এগিয়ে চলা, এ যেন মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে বারে বারে পুনর্জাত হওয়া; তারপর দৈহিক মৃত্যু, তারও পরে বিনুর হাত ধরে নতুনতর উজ্জীবন ও যাত্রা। বুড়ো ঈশ্বর ও শিশু বিনু; একজন মৃতপ্রায়, অন্যজন নবজাতক। যে ঈশ্বর নিজেই একদা অজ্ঞাতের পথিক হয়েছিল, আত্মহত্যার চেষ্টা ও আত্মিক মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে সে-ই যেন পুনর্জাত বিনুর মধ্যে, আবার নতুন পদক্ষেপ। এক যায় আর এক আসে, এই যাওয়া-আসার মাধ্যমে, বাধা-প্রতিরোধ পেরিয়ে পেরিয়ে, মৃত্যু-বাহন প্রাণের আশ্চর্য লীলা। সেই লীলা দৃশ্যগোচর, যেমন বুনুয়েল- বেয়ারম্যানে, তেমনি অবশ্যই স্বতন্ত্রভাবে ‘সুবর্ণরেখা’য়।

আদিম মৃত্যু-পুনর্জন্ম-ভাবনা তথা প্রাণ গতির লক্ষণ আরও কয়েকটি আছে ইতস্তত। যেমন- তিন ম্যানেজার, জলে মুকুট ভাসানো, ভাঙা বিমানঘাঁটি, নচিকেতার এবং উপনিষদের ‘ক্রতোং ষ্মর কৃতং ষ্মর’ শ্লোকের ও সূর্যমন্ত্রের উল্লেখ, ভোরের বৃষ্টির ও ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ার গান ইত্যাদি। এগুলো মৃত্যু ও নবজন্ম, স্থিতি থেকে গতির অর্থ দ্যোতনা করে। ‘নতুন বাড়ি’র বাসনা সবার মনে- কলোনীবাসীদের, হরপ্রসাদের, ঈশ্বরের, অভিরামের, সীতার, বিনুর, বাসা আর ভালোবাসার সন্ধান, নীড়ে আশ্রয় লাভ, পুনরায় স্থান-চ্যুতি। নবজীবন হাতছানি দিয়েছে, পরমুহূর্তে পরিস্থিতির টানাপড়েনে নতুনতর বাঁকে উড়িয়ে চলা। স্থায়ী বাসা কেউই পাননি; ‘আঁকা বাঁকা নদী, আর দূরে নীল নীল পাহাড়; সেইখানে বাগানে প্রজাপতিরা দ্বেরো আর গান গায়’- বিনুও পৌঁছবে সেখানে, আবার ভেসে চলে যাবে অজ্ঞাত দিগন্তে। সুবর্ণরেখার তীরে তীরে চলবে নিত্যকালের আসা-যাওয়া, জন্ম-মৃত্যু ও পুনর্জন্ম। তার কাছে পৌঁছতে হয় ‘গাছের তলা’ দিয়ে সজীব ‘ধানক্ষেত’-এর মধ্যে দিয়ে। কারণ, সুবর্ণরেখা নদী নয়, বলাকা কাব্যের ‘চঞ্জলা’র মতো প্রবহমান প্রাণের প্রতীক, তাই তার তীরেই নব জীবনের ঘোষণা, এলিয়টের ভাষায় ‘ইন মাই অ্যান্ড ইজ মাই বিগিনিং’ ‘দাঁড়ালে কেন? চলো চলো’, ‘চরৈবেতি চরৈবেতি’।

এরপরের স্তরটি দেখা যাক- মৃত্যু পুনর্জন্ম প্রসঙ্গে আদিম দর্শনচিন্তা আদিম যুগেই শেষ হয়ে যায় নি। ধ্রুপদী ও মধ্যযুগে নতুন নতুন রূপ ও অর্ঘ্যে স্নান করে সে এসে পৌঁছেছে সাম্প্রতিকের ঘাটে। এখন, অবশ্যই অন্যভাবে, বিজ্ঞানও বলছে মৃত্যু-পুনর্জন্মের তথা বিবর্তনের কথা। সাহিত্যে-শিল্পে এই চিন্তার নব নব অভিব্যক্তি। রক্তকরবীর বা শিশুতীর্তের মত ‘সুবর্ণরেখা’র প্রাণভাবনাও একদিকে যেমন আদিম কৃষিভাবনা, অন্যদিকে তেমনি আধুনিক বিজ্ঞানভাবনার সঙ্গে যুক্ত, শুধু গতিবিজ্ঞান নয়, আর একটি শাখার সঙ্গেও।

‘চিত্রপট’, ‘চলচ্চিত্র’ ইত্যাদি পত্রিকায় ইতি-উতি মুদ্রিত রচনায় ঋত্বিক ঘটকের চিন্তাধারার পরিচয় পাওয়া যায়, সে-চিন্তা মনোবিজ্ঞানী ইয়ুংয়ের ‘কালেকটিভ আনকনসাস’ বা ‘সামষ্টিক অসংজ্ঞান’ তত্ত্ব-সিদ্ধান্তের অনুগামী। ছবির মধ্যেও ইয়ুংগীয় ভাবনার লক্ষণ স্বতঃবিদ্যমান। প্রিমডিয়াল ইমেজ বা পুরাকল্পীয় চিত্রকল্পরূপে কালীর অবতারণা; ঈশ্বরের ‘সোল-ইমেজ’ বা দ্বিতীয় সত্তারূপে হরপ্রসাদের পরি-কল্পনা; ঈশ্বর (হরি) ও হরের সমন্বয়ে জীবন-মৃত্যুর যামলতার দ্যোতনা; সামষ্টিক অসংজ্ঞান তত্ত্বের অভিব্যক্তি ও তার পটভূমিকায় ‘ইনসেসট’ বা নিষিদ্ধ কামের নিগূঢ় প্রকাশ। আদিম কাল থেকে অভিজ্ঞতা ও অনুভব ও চিন্তা মানুষে মানুষে চলে এসেছে, তারাই বিচিত্র রূপ নিয়ে জড়ো হয় এই ‘ইমপার্সোনাল কালেকটিভ আনকনসাস’- সর্বকালের পার্থিব অভিজ্ঞতার সার। শিশুর অবচেতন থেকে যেমন ফ্যান্টাসি বা কল্পকথার জন্ম হয়, তেমনি ব্যক্তির এই সামাজিক অসংজ্ঞান থেকে জন্ম নেয় আদিম পুরাকল্পীয় ইমেজ, এই প্রতীকী ইমেজগুলো আদিম উপকথার শৈল্পিক ফসল। সুতরাং আধুনিক ব্যক্তিচিত্তের জীবনধারা ও জীবনভাবনার সঙ্গে আদিম চিন্তা-ভাবনা- চেতনার ও উপকথার ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে; শিল্পে-সাহিত্যে কনসাস ও আনকনসাস, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক আনকনসাসের এই লীলাবৈচিত্র্য ফুটিয়ে তোলা হয়, তারই নাম ‘মাইথোপিয়া’ বা ‘উপকথাবৃত্তি’। ‘সুবর্ণরেখা’ এমনই একটি মাইথোপিয়িক বা উপকথা বৃত্তিক শিল্পসৃষ্টি; আদিম মানবসন্তান কালক্রমে বাসা বেঁধেছে, ঘর বেঁধেছে, শান্ত হয়েছে। তবু আদি স্বাধীন যাযাবরত্বকে কোনোদিনই ভুলতে পারেনি; তাই যুগে যুগে মানুষের মধ্যে স্থাবরতা ও জঙ্গমতার নিত্য দ্বন্দ্ব, নিত্য লীলা। ‘সুবর্ণরেখা’র মানুষগুলো চেয়েছে বাসা বাঁধতে, স্থাবর হতে, আর কেবলই বাসা বদল করেছে, জঙ্গম হয়েছে, শেষে পা রেখেছে সেই দিগন্তে, যেখানে সুবর্ণরেখার নিরবধি গতি, যেখানে তার তীরে নতুন বাড়ির ইশারা, চলার পাশেই অচলতা। সমুদ্র-পাহাড়-নদী, উপত্যকা, গাছ, ধান, মৃত্যু ইত্যাদির অবশ্যম্ভাবী প্রতীকী সমাবেশ। আদিম সমাজমানসে বিদ্যমান ছিল এবং তারই রূপান্তরিত তির্যক রূপ আধুনিক ব্যক্তিচিত্তে নাগরিক। এবং যেহেতু সামষ্টিক সত্তা ব্যক্তিত্বের বেদী, এই মানসকূট বর্তমান সমাজ জীবনে ও মানসে নানাভাবে ক্রিয়াশীল, দ্বন্দ্বে-অবদমনে-অভিপ্রকাশে জটিল। সেই সক্রিয় জটিলতার চিত্ররূপ ‘সুবর্ণরেখা’।

১৯৬৫ সালে মুক্তি পেয়েছিল ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিনেমা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালকের দেশভাগ নিয়ে ট্রিলজির শেষ চলচ্চিত্র হচ্ছে এটি। আগের দুটি হচ্ছে- ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০) ও ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১)। তিনি আগেভাগে চাননি ট্রিলজি হোক। কিন্তু পরপর একই বিষয় কেন্দ্র করে টানা তিনটি সিনেমা নির্মাণ করায় হয়ে গেল ট্রিলজি। তার সিনেমায় রাজনীতি, দেশভাগ আর দারিদ্রের কষাঘাত সবসময়ই প্রাধান্য পায়। বিশেষ করে এই দেশভাগ ব্যাপারটি। তিনি এই বাংলার বুক চিরে দু’ভাগ করাকে কখনোই মেনে নিতে পারেননি। ঋত্বিক ঘটকের জন্ম অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ঢাকায় ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর। তার বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি নাটক ও কবিতা লিখতেন। বড় ভাই মণীষ ঘটকও বিখ্যাত লেখক। ফলে ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠেন তিনি। রাজশাহী কলেজের ছাত্র ছিলেন ঋত্বিক ঘটক। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতা চলে যান পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে; কিন্তু পূর্ব বঙ্গকে এবং বিশেষ করে পুরান ঢাকার জিন্দাবাহারে হৃষিকেষ লেনে তাদের বাসস্থানের কথা তিনি ভুলতে পারেননি কখনো। দেশভাগের ফলে মানুষদের নামের আগে ‘উদ্বাস্তু’ ট্যাগটি সবসময়ই তার মনে কষ্ট দিত। সিনেমায় সেই কষ্টই যেন বারংবার উঠে এসে ধরা দেয় চাপা কান্নার সুর হয়ে দর্শকের চোখে। দর্শক কষ্ট পায়, দেশভাগ- একটি দেশ দুটি খণ্ড। নিজের জন্মস্থান থেকে বিচ্যুত হওয়া, গৃহহীন হয়ে ফের গৃহের আশায় ঘুরে বেড়ানো এ এক আজীবন বয়ে চলা কষ্ট। সুবর্ণরেখা সিনেমার মধ্যে দেশভাগ, মানুষের কান্না-ধর্ম নামক অদ্ভুত একটি ব্লাকহোলে ঢুকিয়ে দেয় সময়কে। মানুষ হেরে যায় সেই ধর্মের কাছে। কিন্তু সত্যিই কি হারে? 

চলচ্চিত্রে একেবারে নিজস্ব একটি ভাষা ছিল ঋত্বিক ঘটকের। ঋত্বিকের ছবি দেখলে মনে হয়, হলিউড বলে যেন কখনো কিছু ছিল না! নাটকীয় সংলাপ, চরিত্রদের মঞ্চ-নাটকীয় শরীরী ভাষা, উচ্চকিত অভিনয়, আপতিক ঘটনার অতিব্যবহার, এসব বৈশিষ্ট্য তার ওপর গণনাট্যের দিনগুলোর প্রভাব ছাড়াও যা তুলে ধরে, তা হচ্ছে পশ্চিমী সিনেমার প্রভাব বলয় থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রেখেছিলেন ঋত্বিক। খণ্ডিত বাংলার মানুষ ঋত্বিক, সেই বাংলার মায়ের রূপ এঁকে নেন মনে। জীবনভর যেন সেই মায়ের দৃশ্যই এঁকেছেন সব সমীক্ষায় তিনি হয়তো তাই বাংলাকে মনে রেখেছেন এভাবে। আর দেশভাগের ভাষা কী সত্যিই তৈরি হয়েছে? তৈরি হয়েছে কী ঘরহীন মানুষের বুকের কান্নার গল্প? হয়নি আজও-কখনো হয় না বাস্তবতা হলো এটা। তবুও সেই চেষ্টায় যেন ঋত্বিক ঘটক অদ্বিতীয় হয়ে রইলেন ট্রিলজির মাধ্যমে। কারণ ঋত্বিক জানতেন দেশভাগ মানে যন্ত্রণা, পুরনো স্মৃতি মাথার ভেতর ঘুরবে আর নতুন স্বপ্নের আশায় পথ চলা। তাই তো চলচ্চিত্র ঋত্বিকের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি নির্মাণ করেছেন এমন একটি সুবর্ণরেখা। যে চলচ্চিত্রের প্রতিটি স্তরের গল্প আলাদা কিন্তু সব মিলিয়ে একেবারে বিপন্ন মানুষের গান, যা পরিচালকের দেশভাগের অভিমান হয়ে রইল, পুরো পৃথিবীর মানুষের সমাজে। 

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh