গ্যাস-বিদ্যুৎ-ডলার সংকটের মাসুল দিচ্ছে জনসাধারণ

মনজুরুল হক

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২২, ০৯:৪০ এএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, সচিবালয় আর অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কথায় মনে হয়েছে সব কিছু ঠিকই ছিল; কিন্তু হঠাৎ করেই জুলাই মাসে দেশে ডলার সংকট, রিজার্ভ কমে যাওয়া, ডিজেল কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাসে এবং মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে রাশিয়ার উপর পুরোদস্তুর নিষেধাজ্ঞা আরোপ শুরু হয়। বিশেষ করে ইউরোপে তখন থেকেই গ্যাস, তেল, কয়লার সংকট চলছে। জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রিটেন, ইতালির মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোও এনার্জি রেশনিং শুরু করে দিয়েছে। পাশাপাশি সরকারি পরিবহনগুলো প্রায় ফ্রি করে দেওয়া হয়েছে, যেন মানুষজন ব্যয়বহুল প্রাইভেটকার বাদ দিয়ে গণপরিবহনে যাতায়াত করে।

সরকারের একাধিক মন্ত্রী সেই সময়গুলোতে জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আমাদের কোনো সমস্যা হবে না।’ তাহলে আজকে কেন সব দায় ইউক্রেন যুদ্ধ ও রুশ নিষেধাজ্ঞার উপর চাপানো হচ্ছে? একটু গভীরে দেখলেই বোঝা কষ্টকর নয় যে, ডলার সংকট, রিজার্ভ কমে যাওয়া, ডিজেল সংকট, রেমিট্যান্স কমে যাওয়া, এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়া, টাকার অবমূল্যায়ন- এসব আগেই ঘটেছে এবং অনেক দিন ধরেই ঘটেছে। আর এর সঙ্গে ডলার সংকট, রিজার্ভ সংকট, ডিজেল সংকট, রেমিট্যান্স সংকট, এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়া, টাকার অবমূল্যায়ন, ডলারের দুষ্প্রাপ্যতা- একসঙ্গে প্রকাশ করে বিদ্যুতের শিডিউল লোডশেডিংকে ‘জায়েজ’ করা হলো।

ইতোমধ্যে প্রমাণ হয়েছে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে লোডশেডিং দিয়ে ডিজেল সাশ্রয় হয়নি, বরং ৩০-৪০ শতাংশ বিক্রি বেড়েছে। প্রথম দিকে দিনে-রাতে ২/৩ ঘণ্টা হলেও এখন খোদ ঢাকার অভিজাত এলাকাতেই ৫-৬ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। দরিদ্র অঞ্চল আর গ্রামের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বিদ্যুৎ নেই মানে সব ধরনের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া। এর ফলে স্বভাবতই পণ্যমূল্য বেড়ে যাবে। অনেকেই ভেবে পাচ্ছেন না গরিব কৃষকের তরি-তরকারি, শাক-সবজি ছাড়া সব পণ্যের দাম বাড়ল কেন? কেনই বা সরকার টিসিবি কার্ডের মাধ্যমে পণ্য বিক্রির সিদ্ধান্ত নিল? বোঝা কঠিন নয়, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি পণ্যের দাম বেড়েছে, ডিজেল পুড়িয়ে উৎপাদন করায় উৎপাদিত পণ্যের দাম বেড়েছে।

মুদ্রাস্ফীতি লাগামহীন বাড়তে থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যে পদক্ষেপ নিতে হতো তারা তা নিতে পারেনি বিজনেস সিন্ডিকেটের চাপে। আমদানির লাগাম টেনে ধরার আদেশও ব্যর্থ হয়েছে। ভারতের দেওয়া ৫ লাখ টন গম আর তেল আপাতত সংকট সামাল দিচ্ছে, কিন্তু কত দিন?

ইতোমধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গত দেড় মাস ধরে বন্ধ আছে যমুনা সার কারখানায় উৎপাদন। এই কারখানাটি দেশের বৃহত্তম ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় গত ২১ জুন যমুনা সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। কারখানাটিতে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস লাগে। কারখানাটিতে গ্যাস সরবরাহ হতো ৩৫ থেকে ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ ভাগ উৎপাদন কম হতো। পরে গ্যাস সংকটের মুখে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।’ ইউরিয়া উৎপাদন বন্ধ থাকায় জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল ও উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলায় বোরো-আমন মৌসুমে ইউরিয়ার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে। যদিও কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘আমদানি করা সার দিয়ে চাহিদা পূরণ হবে।’ এ কথা বলার শেষে ফলাফল এসেছে সারের দাম বাড়িয়ে। ১৬ টাকা দরের ইউরিয়া সার ৬ টাকা, অর্থাৎ ৩৮% দাম বাড়িয়ে ২২ টাকা করা হয়েছে ১ আগস্ট থেকে। তাহলে এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে- আমদানি করা সারে ভর্তুকি বাড়িয়ে কেন আগের দামে রাখা গেল না? এই প্রশ্নের উত্তর নেই।

এখন এই গ্যাস সংকটের ব্যাকফায়ারে সারের দাম বেড়ে গেল, বিদ্যুতের অভাবে জমিতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে না এবং স্বভাবতই ধানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। তখনো কি বলা হবে- ‘আমদানি করা চাল দিয়ে সংকট মোকাবেলা করা হবে?’ সেটা বলতে বাধ্য হবে সরকার, কারণ উপায় নেই। সার-সেচ না হলে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হবেই।

সরকারের তরফে বার বার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে- ডিজেল, পেট্রল, অকটেন, এলএনজি, গম, খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। তাই যদি হবে তাহলে জুলাই মাসেই মোটা চাল কেজিপ্রতি ১০-১২ টাকা বৃদ্ধি পায় কী করে? কেন হাইকোর্টকে বলতে হচ্ছে- ‘ব্যাংক খাতে সাংঘাতিক অপরাধ হচ্ছে।’ এক মামলার শুনানিকালে গত মঙ্গলবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই মন্তব্য করেন। আদালত বলেন, ‘সবচেয়ে সাংঘাতিক ক্রাইম হচ্ছে ব্যাংকে। ব্যাংক খাতে বড় বড় অপরাধ হচ্ছে। দেশটাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এভাবে চললে দেশ এগোবে কীভাবে?’ এত সংকটের পরও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করা যাচ্ছে না! বিভিন্ন কৌশলে তারা বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণ অব্যাহত রেখেছেন। শেষ পর্যন্ত ভ্রমণ বাতিলে ব্যক্তি পর্যায়ে তাদের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন করতে হয়েছে। আমলাতন্ত্র কি তারপরও মিতব্যয়ী হবে না? সব মিতব্যয়িতা দেখাতে হবে সাধারণ মানুষকে? ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই কেন অনুমান করা গেল না, সামনে খাদ্য-জ্বালানি সংকট হতে পারে? 

আফ্রিকার একটি প্রবাদ : ‘সব গাছপালা কেটে ফেলার পর একদিন মানুষ দেখল টাকা চিবিয়ে খাওয়া যায় না।’

বাংলাদেশের বাস্তবতা : চোর-বাটপাড় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার ঠেকাতে না পেরে একটার পর একটা মেগা প্রকল্প হাতে নিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার চেষ্টা এবং সেই জনপ্রিয়তাকে ‘বিরাট অর্জন’ ভেবে নিশ্চিন্ত থাকার পর একদিন মানুষ দেখল মেগা প্রকল্প আর সুপার স্ট্রাকচার চিবিয়ে খাওয়া যায় না।

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh