সততা-স্বচ্ছতা-উদারতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে কাজ করতে হবে: অধ্যাপক জহিরুল হক

জাফর খান

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১২:২৮ পিএম

কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (সিইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এইচ. এম. জহিরুল হক।

কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (সিইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এইচ. এম. জহিরুল হক।

দেশের উচ্চশিক্ষার নানা বিষয় নিয়ে, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার গুণগত মান ও এর উন্নয়নে কীভাবে কাজ করা যায়, তা নিয়ে সাম্প্রতিক দেশকালের যুগ্ম বার্তা সম্পাদক জাফর খানের সঙ্গে এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে কথা বলেন কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (সিইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এইচ. এম. জহিরুল হক।

ভার্সিটির শুরুর দিকের গল্পটা যদি বলেন...
আমরা সবাই জানি বিশ্বে শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশি এগিয়ে নর্থ আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ডের শিক্ষামান ব্যবস্থা। উত্তর আমেরিকার শিক্ষা ব্যবস্থার আদলে আমরা চেয়েছিলাম প্রায়োগিক শিক্ষাকে এ দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কীভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। সেই আলোকেই চেয়ারম্যান ড. নাফিজ সারাফাত ভাবলেন কানাডা বা নর্থ আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ডের রূপরেখা অনুযায়ী একটি বিশ্ববিদ্যালয় দেশে প্রতিষ্ঠা করা যায় কিনা! আর উনার এমন ভাবনা থেকেই কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের যাত্রা শুরু। আমাদের মূল লক্ষ্য প্রায়োগিক শিক্ষার মাধ্যমে এ দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা। বর্তমানে প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হতে ব্যতিক্রমী ভিন্ন দর্শন ও ভাবনাকে সামনে রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু। মূলত বিশ্বমানের একটি শিক্ষা ব্যবস্থা এ দেশে কীভাবে চালু করা যায়, সেটিও ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের মূল চালিকা শক্তি। আর এভাবেই পথচলা শুরু। যদি আমাদের সামগ্রিক অবকাঠামোর দিকে তাকান দেখবেন একটি বিশ্বমানের ক্যাম্পাস যেমন হওয়া উচিত অনেকটা তেমন কাঠামোর আদলেই আমাদের ক্যাম্পাসকে সাজিয়েছি, যদিও পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। তবে আমরা একটি উন্নত পরিবেশসহ জীবনমুখী শিক্ষা কার্যক্রম রেখেছি, যাতে সনদ প্রাপ্তির পর আমাদের শিক্ষার্থীদের একটি দিনও বেকার বসে থাকতে না হয়। 

যেহেতু নর্থ আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করছেন সে ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগে কি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় হতে পাস করাদের প্রাধান্য দিচ্ছেন, নাকি দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদেরও সুযোগ দিচ্ছেন?
ইউজিসি কর্তৃক একটি নীতিমালা আছে, সে অনুযায়ী আমরা শিক্ষক নিয়োগ করে থাকি। এছাড়া আমাদের একটি স্ট্যান্ডার্ড আছে----- সিজিপিএ ৩.৫-এর নিচে আমরা কাউকে নেই না। দেশি বা বিদেশি নয়, মূলত মেধাবীদের অগ্রাধিকার দেই আমরা। তবে দেখেছি বুয়েট, চুয়েট থেকে যারা আসছেন তারা আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক হিসেবে খুব ভালো করছেন। আর ইংরেজি বা অন্য বিষয়গুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হতে পাস করা শিক্ষার্থীরা এখানে শিক্ষক হিসেবে ভালো করছেন। 

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে কতগুলো অনুষদ বা বিভাগ রয়েছে? প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব নিয়ে যদি বলেন...
আমাদের বর্তমানে তিনটি ফ্যাকাল্টি (অনুষদ) রয়েছে- ১. স্কুল অব বিজনেস, ২. স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ৩. স্কুল অব লিবারেল আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্স। স্কুল অব বিজনেসের অধীনে রয়েছে বিবিএ, এমবিএ ও ইএমবিএ। অন্যদিকে স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে রয়েছে ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই), কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই), শিপিং অ্যান্ড মেরিটাইম ইঞ্জিনিয়ারিং (এসএমএস)। আর স্কুল অব লিবারেল আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্স ফ্যাকাল্টিতে রয়েছে ইংরেজি, আইন ও মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম। 

শিক্ষার্থীদের জন্য কী কী সুবিধা রয়েছে? টিউশন ফির কাঠামো সম্পর্কে যদি বলেন...
শ্রেণিকক্ষ, অডিটরিয়াম, ল্যাব ফ্যাসিলিটি, খুব শিগগিরই স্থায়ী ক্যম্পাসে চূড়ান্তভাবে স্থানান্তর, রিসার্চ ল্যাব ও নানারকমের সুবিধা বাস্তবায়নে খরচের পরিমাণ কিন্তু কম নয়। তবে চেয়ারম্যান নাফিজ সারাফাত শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য নিয়েই সম্পূর্ণ ভর্তুকি দিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুর দিকে শতভাগ টিউশন ফি মওকুফের ব্যবস্থা ছিল। কোনো ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়ে ভর্তি করানোর নিয়ম ছিল। বর্তমানে সকল খাতেই একটি আদর্শ ভৌত অবকাঠামো লালন করতে ও খরচের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় সকলের জন্য ৪০ শতাংশ টিউশন ফি মওকুফের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এর বাইরে মেধার ভিত্তিতে যারা এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে তাদের জন্য স্কলারশিপ ও প্রতি সেমিস্টারে যারা ভালো করছেন তাদেরকে নগদ বৃত্তি দেওয়া হয়। আর মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্যও রয়েছে বিশেষ ছাড়। এছাড়াও শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তাও দিয়ে থাকি। 

উচ্চশিক্ষার গবেষণায় কেন পিছিয়ে আমরা?
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো যথার্থ গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। সেখানে আরও নজরদারি বাড়িয়ে গবেষণার মানকে সর্বোত্তম অবস্থানে নিয়ে যাওয়া জরুরি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক গবেষণাপত্র স্কোপাস ইনডেক্স জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে। ইউল্যাব, ড্যাফোডিল, ব্র্যাক, নর্থ সাউথ, ইস্টওয়েস্টসহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েরই শত শত জার্নাল প্রকাশ হচ্ছে আন্তর্জাতিক জার্নাল প্রকাশনা সংস্থাগুলো হতে। কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় ২০২২ সালে ডব্লিউইউআরআই র‌্যাংকিংয়ে ৫০তম স্থান লাভ করে। আমাদের মেরিটাইম সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট একটি ক্রিয়েটিভ গবেষণার জন্য এ অনন্য স্বীকৃতি লাভ করে। বলা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে। এখন আর বলা যাবে না আমরা পিছিয়ে আছি। 

সিইউবি গবেষণার ক্ষেত্রে কী উদ্যোগ নিয়েছে?
বর্তমানে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান শুরু করেছি। যার কার্যক্রম চলতি বছরেই শুরু হতে যাচ্ছে। এর অধীনে জার্নাল, প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু হচ্ছে। এরই মধ্যে নর্থ সাউথের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিশেষ করে ব্লু ইকোনমি নিয়ে গবেষণা করাই হবে এ প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। এ সেক্টরে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা হচ্ছে না। পাশাপাশি সোশ্যাল সায়েন্সের অধীনে দারিদ্র্য বিমোচন, জিডিপির উন্নতি, দেশের সম্পদ কাজে লাগিয়ে কীভাবে এগোনো যায় ও মানব চরিত্রে বৈশিষ্ট্যের মান উন্নয়ন, সিভিক সেন্স, দর্শন কেমন হওয়া উচিত আসলে একজন আদর্শ মানুষের, তা নিয়েও গবেষণা শুরু করতে যাচ্ছি। ফান্ডের ব্যবস্থাও করেছেন চেয়ারম্যান। সততা, স্বচ্ছতা ও উদারতা- এই তিন মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরে আমাদের কাজ করতে হবে। তবেই যে উন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা পৌঁছানোর প্রয়াস চালাচ্ছি তা অর্জন করা সহজ হবে। 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
ভবিষ্যতে আরও জীবনমুখী বিভাগ খোলার জন্য কাজ অব্যাহত রয়েছে। তবে ঢালাওভাবে বিভাগ খোলার পক্ষে আমরা নই। মান ও প্রসার দুটিতেই সফলতা আনতে যুগপৎভাবে কাজ করছি আমরা। তাই সর্বোচ্চ উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে গেলে শুধু প্রসার নয়, মানের কোনোভাবেই যেন ক্ষতি না হয় সে লক্ষ্য নিয়েই আমরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। সামনে মাস্টার্স ইন শিপিং সায়েন্স ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট খোলার পরিকল্পনা আছে। এর মধ্যেই স্থায়ী ক্যাম্পাসের নির্মাণ প্রক্রিয়া চলছে যেন পাঁচ বছরের মধ্যে সেখানে কার্যক্রম শুরু করা যায়। তবে শিক্ষার মান বাড়াতে আন্তর্জাতিকীকরণের বিকল্প নেই। সেটিকে মাথায় রেখে বিশ্ব শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানের একটি সূচক নির্ধারণেও কাজ করছি। এ ক্ষেত্রে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনাও নিয়েছি আমরা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh