গাজায় প্রতি সেকেন্ডেই সাংবাদিকদের সংবাদে পরিণত হওয়ার শঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৩, ১০:২৭ পিএম | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৩, ১১:২৫ পিএম

গাজায় অন্তত ১৫ জন সাংবাদিক নিহতের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। ছবি- সংগৃহীত

গাজায় অন্তত ১৫ জন সাংবাদিক নিহতের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। ছবি- সংগৃহীত

ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রাকান আবদেলরহমান ‘প্রেস’ লেখা ভেস্ট পরে একটি ক্যাফেতে বসে কাজ করছিলেন, যাতে করে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের বোমা হামলার প্রতিবেদনের জন্য তিনি যেন দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারেন। তবে আবদেলরহমান, যার প্রতিবেদন মিডল ইস্ট আই ও দ্য ন্যাশনালের মতো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, তিনি সেখানে কেবল একটি ঘটনা কাভার করছেন না। আবদেলরহমানের মতো গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা প্রতিকূলতা ও মৃত্যুকে উপেক্ষা করে যুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্বের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।

গত ১০ দিন ধরে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান উপকূলীয় এলাকায় টানা বোমা হামলা করছে। এরই মধ্যে দুই হাজার ৮০৮ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের এক চতুর্থাংশই শিশু। বিমান হামলায় আরও ১০ হাজার ৮৫৯ জন আহত হয়েছেন এবং সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বোমা হামলায় ধ্বংস হওয়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি আটকে আছেন।

গত সপ্তাহে ইসরায়েল গাজার অবরুদ্ধ এলাকার যোগাযোগ টাওয়ারে বোমা হামলা করে এবং গাজার একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি এবং আশেপাশের ইসরায়েলি শহর ও বসতিগুলোতে হামাসের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল যে 'সম্পূর্ণ অবরোধ' দেয়, তারই অংশ হিসেবে ইসরাইল এটি করে। ওই হামলায় অন্তত এক হাজার ৪০০ ইসরায়েলি নিহত হয়।

বোমা হামলা ও অবরোধের ফলে গাজা উপত্যকা ইন্টারনেট, বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকদের কাজকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।

আবদেলরহমান বলেন, দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে, আমরা রিয়েল টাইমে কোনো বিষয়ে রিপোর্ট করতে পারি না। কাজ করার জন্য কোনো উপযুক্ত জায়গাও নেই।

তিনি বলেন, প্রেস ভেস্ট ও হেলমেট পরা সত্ত্বেও সাংবাদিকদের যুদ্ধে টার্গেট করা হয়েছে।

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় অন্তত ১৫ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।

আবদেলরহমান বলেন, যেখানে গণহত্যা চালানো হয়েছে, আমরা সেখানকার ঘটনা কাভার করতে পারি না। এমনকি বোমা হামলার জায়গাগুলোতেও যেতে পারি না এই আশঙ্কায় যে, একই এলাকায় ইসরায়েল আবারও হামলা করতে পারে।

প্রতি সেকেন্ডে আপনি এখানে বিপদে আছেন। সাঈদ আল-তাওয়াইল, মোহাম্মদ সুবহ ও হিশাম আলনাওয়াজার মতো আমাদের সহকর্মীরা তাদের জীবন দিয়ে মূল্য শোধ করেছেন।

গত ১০ অক্টোবর গাজা শহরের একটি ভবনে বোমা হামলার ভিডিও করতে গিয়ে ওই তিন সাংবাদিক নিহত হন। তারা সবাই হিজি বিল্ডিংয়ের উল্লিখিত লক্ষ্য থেকে কয়েকশ মিটার দূরে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু এর পরিবর্তে বিমান হামলা তাদের অনেক কাছাকাছি অন্য একটি ভবনে করা হয়।

গাজার জনসংখ্যা ২৩ লাখ। তার মধ্যে অর্ধেকেরই বয়স ১৮ বছরের নিচে। তারা বলছে, চলমান এই যুদ্ধ গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর। এরই মধ্যে কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

আব্দেলরহমান বলেন, রিপোর্টিং করার সময় নিজের জীবনের ভয়ের পাশাপাশি তিনি তার পরিবার ও চার সন্তানের জন্যও উদ্বিগ্ন থাকেন।

তিনি বলেন, আমি তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার কথা চিন্তা করি, এই ভয়ংকর যুদ্ধে তাদের অবস্থা নিয়ে ভাবি।

এর আগের ইসরায়েলি যুদ্ধের সময় তারা খুব ছোট ছিল। তেমন কিছু মনে রাখতে পারত না। কিন্তু এখন তারা বড় হয়েছে। এখন যে ভয় তাদের গ্রাস করেছে, সেটা প্রত্যক্ষ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ, বলছিলেন আব্দেলরহমান।

জর্ডানের আল-রোয়া টিভি চ্যানেলের সংবাদদাতা গাজী আল-আলাউল বলেন, গাজা উপত্যকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার অবিচ্ছেদ্য অংশ এই ভয় মোকাবিলা করা।

আল রোয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত রোববার গাজা উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাফাহতে তারা যে ভবনে অবস্থান করছিলেন, সেখানে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও তিন বছরের মেয়েসহ তার পরিবার ইসরায়েলের হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যায়।

আল-আলাউল বলেন, অবশ্যই আপনি একজন সাংবাদিক হিসেবে সত্য প্রকাশ করার ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও এর সঙ্গে আসা ঝুঁকি এবং আপনার পরিবার কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার মধ্যে বিভক্ত। আমি মনে করি আমরা এখন এই চাপের সঙ্গে অভ্যস্ত। আমাদের পথে যত বাধাই আসুক না কেন, আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাব।

তিনি বলেন, আমরা সবাই জানি যে ইসরায়েল দায়মুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইন অবজ্ঞা করে কাজ করে এবং আমরা সবসময় আমাদের কাভারেজে যতটা সম্ভব তা বোঝানোর চেষ্টা করি।

ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের অভাবে অনেক সাংবাদিক তাদের মিডিয়া অফিস থেকে কাজ করতে পারছেন না। পরিবর্তে তারা যে ক্যাফে খোলা থাকে সেখানে জড়ো হন, একে অপরের কাছ থেকে তথ্য নিশ্চিত করেন এবং তাদের প্রতিবেদন জমা দেন।

গাজা সিটির শিফা হাসপাতাল সাংবাদিকদের জন্য একটি হাবে পরিণত হয়েছে। সেখানে জেনারেটর চালু থাকায় তারা ফোনে চার্জ দিতে পারছেন।

বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত হওয়ায় অন্য কোথাও থেকে জানতে পারেন না-এমন সব তথ্যও তারা এখানে পান। এখানে ইসরায়েলের বোমা হামলায় আহত ও মৃতদের গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে নিয়ে আসা হয়।

সিরিয়া টিভির সংবাদদাতা শোরুক শাহীন বলেন, যখন ইন্টারনেট থাকে না, তখন সাংবাদিকেরা গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকার ঘটনার রিপোর্ট করতে পারে না। এটা এক ধরনের সেন্সর।

তিনি বলেন, আমরা এখনো সংবাদ কাভার করছি। কিন্তু আমাদের কাভারেজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছি।

তিনি বলেন, নিহত ও আহতরা যখন হাসপাতালে আসে, তখন ইসরায়েলি বিমান হামলা কোথায় হয়েছিল, তা আমরা জানতে পারি। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় যেসব হামলা হয়, যেখানে আমরা পৌঁছাতে পারি না, সেগুলোর কী হবে? কীভাবে আমরা দ্রুত সময়ে তা কাভার করতে পারি?

আল-আলাউল স্বীকার করেন যে, সাংবাদিকরা তাদের জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে জানেন। এমন সম্ভাবনা‌ও আছে যে আমরা খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজেরাই সংবাদে পরিণত হতে পারি। কিন্তু আমাদের সহকর্মীদের মৃত্যু ও তাদের স্মৃতি আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে অনেক বেশি অনুপ্রেরণা যোগায়।

তিনি বলেন, সাংবাদিক হিসেবে আমরা সবসময় প্রমাণ করেছি যে, আমরা কাজ করতে প্রস্তুত। সেই সঙ্গে ইসরায়েল আমাদের বিরুদ্ধে যে নৃশংসতা চালাচ্ছে, তা সবার সামনে তুলে ধরতেও আমরা দায়বদ্ধ।

সূত্র- আল জাজিরা

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh