মধ্যপ্রাচ্যে কেন বাড়ছে কাতারের গুরুত্ব

অনিন্দ্য আরিফ

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:১৫ এএম

কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি। ছবি: রয়টার্স

কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি। ছবি: রয়টার্স

আজ থেকে ১০ বছর আগে কাতারের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন দেশটির বর্তমান আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি। তখন বিশ্বের অন্যতম একটি ধনী দেশ হলেও ভূ-রাজনীতিতে কাতারের তেমন একটা গুরুত্ব ছিল না। তার শাসনামলে বিশ্বের তৃতীয় গ্যাস সম্পদের মজুদে সমৃদ্ধ এই দেশটির জীবনমানকে অধিকতর উন্নত করার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যার ফলে মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে উপরে থাকা দেশগুলোর মধ্যে কাতার এখন ছয় নম্বরে রয়েছে। এই সমৃদ্ধিশীলতাকে কেন্দ্র করে কাতারকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। এবারের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে কাতারের এ ধরনের ক্ষমতাধর চরিত্রটা ভালোভাবেই টের পাওয়া যাচ্ছে। 

অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া হামাস এবং ইসরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষ এবার থানির সামনে একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। যদি তিনি এই সুযোগটাকে নিজের পকেটে ঢুকাতে পারেন, তাহলে তিনি আরব বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব দেওয়ার একটা বন্দোবস্ত সৃষ্টি করতে পারবেন। আরব বিশ্বের অন্য শাসকদের মতো থানির সামনে রাজনৈতিক ইসলামপন্থিদের তরফ থেকে কোনো দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জ নেই। আবার দেশটিতে এ ধরনের কোনো ধর্মীয় রাজনীতির উত্থানেরও শঙ্কা নেই। একদিকে থানি যেমন হামাসের মতো ইসলামি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন, অন্যদিকে এই দেশটিতে ইসরায়েলের বাণিজ্য অফিসও রয়েছে। সর্বোপরি, এই দেশটির আল উদাইদ বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাতে পারে।

তবে সন্দেহ নেই যে, ফিলিস্তিনের বিষয়ে থানির একটি সহানুভূতি কাজ করছে। তারই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামাসের আক্রমণের জন্য ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে এককভাবে দায়ী করেছে। এই দেশটির রাজধানী দোহাতেই হামাস সদস্যরা তাদের পরিবারের সঙ্গে রিইউনিয়নে মিলিত হওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন। 

২০১২ সালে সিরীয় সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা সিরিয়ার বিদ্রোহী এবং হামাসের নেতৃত্বকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিল কাতারের সরকার। কাতার তখন এই রাজনৈতিক আশ্রয়ের অনুমোদনে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কথা উল্লেখ করেছিল। হামাস কাতারের প্রতি কেবল তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্যই কৃতজ্ঞ নয়, উপরন্তু এই দেশটির মাধ্যমেই তারা গাজার ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য বার্ষিক আন্তর্জাতিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে পারে। এটা দিয়ে তারা গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারে এবং তাদের পরিচালিত আমলাতন্ত্রের ভরণপোষণও এই সহায়তা দিয়েই হয়। 

এবারও হামাসের হাতে বন্দি চার ইসরায়েলি নারীর মুক্তির সমঝোতা আলোচনায় কাতারই মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল। এ রকম মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থেকে কাতার হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে সমঝোতার আলোচনায় আশার আলো দেখতে পারছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেছেন, ‘যদি আমরা সমঝোতা শুরু হওয়ার আগের অবস্থা বিবেচনা করি, তাহলে বুঝতে পারব কোন জটিল পরিস্থিতিকে এমন একটা আশাপ্রদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া গেছে।’ 

যেদিন দুজন ইসরায়েলি নাগরিককে মুক্তি দেওয়া হয়, সেদিন কাতারের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেছিলেন যে এবার অনেক ইসরায়েলি নাগরিককে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু পরের সপ্তাহেই তিনি বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, এই বন্দি মুক্তি প্রক্রিয়ায় অনেক শ্লথগতি দেখা যাচ্ছে। এর জন্য তিনি গাজার হাসপাতালে ইসরায়েলের বোমা হামলাকে দায়ী করেছেন। 

ইসরায়েল এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা মনে করে যে, হামাসের ওপর কাতারের আমিরের একটি বড় প্রভাব রয়েছে এবং তার প্রশ্রয়েই ইসরায়েলের বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতৃত্ব গড়িমসি করছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলি কোহেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্পষ্ট অভিযোগ তুলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখনই উচিত কাতারকে জরুরি তলব করা, তারাই তো হামাসের অর্থায়ন করছে। এখন এই সন্ত্রাসীরা যেন দ্রুত ইসরায়েলের বন্দিদের মুক্তি দেয়, সেই ব্যবস্থার জন্য কাতারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা দরকার।’ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বহিঃস্থ সম্পর্ক বিভাগের মুখপাত্র পিটার স্টেনোও ইসরায়েলের সুরে সুর মিলিয়ে বলেছেন, ‘আমরা জানি যে কীভাবে হামাসের ওপর কাতার তার প্রভাব বিস্তার করে আসছে এবং আমাদের এটি অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।’

ইসরায়েল এবং তার মিত্ররা সাম্প্রতিক সমঝোতা আলোচনায় হামাসের শর্তে কিছুটা নড়ে বসেছে। হামাস আলোচনায় বলেছে যে, গাজায় যদি ইসরায়েল বোমা হামলা বন্ধ করে তখন তারা বিভিন্ন ইসলামিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ও ফিলিস্তিনিদের হাতে বন্দি দুই শতাধিক ইসরায়েলির মুক্তির ব্যবস্থা করতে প্রস্তুত। অবশ্য তারা এটাও জানে যে, হামাস এরপর ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির বিনিময়ে সশস্ত্র ইসরায়েলিদের হস্তান্তরের দাবি করে বসতে পারে।

তবে হামাসের সবচাইতে বড় পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র কাতার জানে, ইসরায়েল যদি এভাবে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখে, তাহলে হামাস সমঝোতার বিষয়ে অনাগ্রহী হয়ে পড়তে থাকবে। তখন সব আলোচনাই ভেস্তে যেতে পারে। এমনকি গাজায় যদি এভাবে মৃতের সংখ্যা হু-হু করে বাড়তেই তাকে, তাহলে হামাসের হাতে বন্দি ইসরায়েলি নাগরিকদের জীবনও অরক্ষিত হয়ে পড়তে পারে। তখন এই দেশটির প্রতি ইসরায়েল এবং তার মিত্রদের ইসরায়েলি বন্দিদের রক্ষার তথাকথিত মানবিক চাপ আসতে পারে। এজন্যই ইইউ বারবার এই ধরনের ঘটনা এড়াতে কাতারকে তলব করে আসছে। অনুরূপভাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনও কাতারকে এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে, সে ভূমিকা নেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছেন। 

এইসব ঘটনায় কাতার এখন মধ্যপ্রাচ্যে একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের স্থান তৈরি করে নিয়েছে। এই অঞ্চলের অন্য রাষ্ট্রগুলো কাতারের মতো অবস্থানে যেতে পারছে না। একই সঙ্গে, হামাস-ইসরায়েল সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে পশ্চিমাদের কাছে কাতারের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে। 

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh