নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি: অধ্যাপক এম তারিক আহসান

এম ডি হোসাইন

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৩, ১০:০৮ এএম | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৩, ১০:৩৮ এএম

অধ্যাপক এম তারিক আহসান। ফাইল ছবি

অধ্যাপক এম তারিক আহসান। ফাইল ছবি

চলতি বছর দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শুরু হয়েছে নতুন শিক্ষাক্রম। মাধ্যমিকে পুরোপুরি নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে আগামী জানুয়ারিতে। নতুন এ শিক্ষাক্রমে সব শিক্ষার্থীকেই বাধ্যতামূলকভাবে সাধারণ ১০টি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। বিশেষায়িতের পরিবর্তে নতুন এ শিক্ষাক্রমের বিষয়টিতে আপত্তি তুলছেন শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের বড় একটি অংশ। তাদের ভাষ্যমতে, সমন্বিতভাবে সব পড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা সবকিছু সঠিকভাবে শেখার সময় পাবে না। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয় শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও পরিমার্জন কোর কমিটির সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক এম তারিক আহসান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এম ডি হোসাইন...

নতুন শিক্ষাক্রমে কোন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে?
নতুন শিক্ষাক্রমে সব শিক্ষার্থীর শিখন অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সুতরাং তাদের কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আর এই সংখ্যা যত দিন পর্যাপ্ত না হবে, তত দিন পর্যন্ত বিকল্প উপায়ে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। যেমন আন্তঃবিষয়ের সম্পর্কের কথা মাথায় রেখে শিক্ষার্থীর শিখন-অভিজ্ঞতা সাজিয়ে কাজটি করা যায়। তবে এ জন্য শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সংখ্যা ও মান যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি শিক্ষকদের ভালো বেতন-মর্যাদা ও পদোন্নতির বিষয়টিও ভাবতে হবে। 

নতুন শিক্ষাক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষকের তুলনায় শিক্ষার্থী বেশি হলে স্বাভাবিকভাবেই তা সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা কঠিন হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, এখনো প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের মধ্যে কিছু সমন্বয়ের অভাব আছে। বিশেষ করে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়ে গেছে। সর্বশেষ প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন নির্দেশিকা নিয়েও এ সমস্যা দেখে গেছে। এসব সমস্যা সমাধান হলে অনেক পরিবর্তন আসবে।

নতুন শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীরা কি চ্যালেঞ্জে পড়ছে?
দেশে এখনো অনেক শ্রেণিকক্ষে ৭০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আছে। এতে সব শিক্ষার্থীর শিখন সম্ভব হয় না। অনেক শিক্ষার্থী শিখন অর্জনে চ্যালেঞ্জে পড়ে। আবার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হয়তো হুট করেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত বিদেশের মতো নামিয়ে আনা যাবে না। 

যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে স্বতন্ত্রভাবে বিবেচনায় নিয়ে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাতে এত ফারাক রেখে এটি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব?
নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে আনুপাতিক হারে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর প্রয়োজন। আমাদের দেশে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা কম। এটা পূরণের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। 

নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কী করা প্রয়োজন?
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে। এই দুই মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই দায়িত্ব পালন করে। বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব নীতি, কৌশল ও পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। বাস্তবায়নকারী এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই চাহিদা অনুযায়ী নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে অবশ্যই উদ্ভাবনী ও কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে কি ঘাটতি আছে?
যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা দরকার, তাতে এখনো ঘাটতি রয়েছে। তাই নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা যেমন করতে হবে, তেমনি তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত উপকরণের ব্যবস্থাও নিতে হবে। নইলে সমস্যাটি থেকে যাবে।

উন্নত দেশে একজন শিক্ষার্থীর জন্য কতজন শিক্ষক আছে?
কয়েক বছর আগে এনসিটিবি এক সমীক্ষায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যে চিত্র তুলে ধরেছে, তাতে বলা হয়েছে, যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম থাকা সিঙ্গাপুরে গড়ে ১২ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। মালয়েশিয়ায়ও একই চিত্র। থাইল্যান্ডে গড়ে ২৪ শিক্ষার্থীর জন্য একজন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৫ শিক্ষার্থীর জন্য একজন, কম্বোডিয়ায় ২৯ শিক্ষার্থীর জন্য একজন, অস্ট্রেলিয়ায় ৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন, ফিনল্যান্ডে গড়ে ১৩ শিক্ষার্থীর জন্য একজন এবং ডেনমার্কে ১১ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। অন্যদিকে ভারতে গড়ে ২৮ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন (ভারতে প্রবেশভেদে শিখনফলভিত্তিক ও যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম চালু আছে) সেখানে বাংলাদেশে ৭০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক। 

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh