ইরানের তেল রপ্তানিতে নতুন নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ১০:২৯ এএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্য সংকট যে শুধু ইসরায়েল, হামাস ও গাজায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল। সিরিয়া, লেবানন ও সুদানে ইরানের মদদপুষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের প্রধান মদদদাতা যুক্তরাষ্ট্রের হামলাও বেড়েছে। সর্বশেষ ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের জ্বালানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদার করা সম্পর্কিত একটি বিল যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার নিম্নকক্ষে পাস করা হয়েছে। স্টপ হারবারিং ইরানিয়ান পেট্রোলিয়াম (এসএইচআইপি) নামের বিলটি ৩৪২-৬৯ ভোটে পাস হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এ বিলের লক্ষ্য হচ্ছে, বিদেশি যেসব বন্দর ও পরিশোধনাগার মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে ইরান থেকে আমদানি করা তেল প্রক্রিয়াজাত করবে, তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।

গত ৭ অক্টোবর স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েলে হামলার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে নানা রকম আইন প্রণয়নের সম্ভাবনা নিয়ে তর্কবিতর্ক করছিলেন। হামাস ইরানের পৃষ্ঠপোষকতা পায়, যদিও তেহরান এ হামলায় কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে। হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের সদস্য, রিপাবলিকান দলের মাইক ললার ও ডেমোক্র্যাটিক সদস্য জ্যারেড মস্কোউইটজ বলেছেন, এ বিলের মধ্য দিয়ে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোকে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরানকে সহায়তা বন্ধ করুন, তা না হলে পরিণতি ভোগ করতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির দাবি, কর্মসূচির আড়ালে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে ইরান। এই ইস্যুতে জাতিসংঘের পাশাপাশি তেহরানের ওপর একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন। যার ফলে ইরানের অর্থনীতি নাজুক আকার ধারণ করে এবং একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় সম্মত হয়।

আলোচনার ধারাবাহিকতায় পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ২০১৫ সালে ইরান একটি বহুজাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিটি হয়েছিল ইরানের সঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া এবং জার্মানির। শেষ পক্ষ ‘পি৫ + ১’ হিসেবে পরিচিত। ইরানের পক্ষে চুক্তি সই করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। ওই চুক্তিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও মজুদ করার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। চুক্তি অনুসারে তেহরান তাদের কিছু পরমাণু স্থাপনা বন্ধ করে দিতে অথবা পরিবর্তন করতে সম্মত হয়। এছাড়া ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের অনুমতিও দেওয়া হয়। বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত অনেক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দৃশ্যপট বদলে যায়। ক্ষমতায় আসার বছরখানেক পরই ২০১৮ সালে ওই পরমাণু চুক্তিকে ‘সবচেয়ে বাজে চুক্তি’ অভিহিত করে চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন তিনি। একই সঙ্গে ইরানের ওপর আগের সব নিষেধাজ্ঞা বহাল করেন। সেই থেকে ইরানের অর্থনীতির বিভিন্ন খাত যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। পাল্টা জবাব হিসেবে চুক্তির শর্ত মানা বন্ধ করে দেয় ইরান। চুক্তিতে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছে দেশটির সরকার।

জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর আলোচনা ফের শুরু হয়। কয়েক মাস ধরে আলোচনার পর চূড়ান্ত খসড়া চুক্তি তৈরি হয়। তবে উভয় পক্ষের দরকষাকষিতে আলোচনা স্থগিত হয়। এর মধ্যেই আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপের সেই পুরনো খেলা শুরু করে ওয়াশিংটন। সেই সঙ্গে চলছে চাপ প্রয়োগও। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নয়টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যে কোম্পানিগুলোকে নিশানা করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তার মধ্যে ছয়টি ইরানভিত্তিক কোম্পানি, দুটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং একটি মালয়েশিয়াভিত্তিক কোম্পানি রয়েছে। ওই কোম্পানিগুলো পেট্রোকেমিক্যাল বা পেট্রোলিয়াম উৎপাদন ও বিক্রয় ও বিতরণের সঙ্গে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বলেন, ইরানের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে এই পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার প্রতিফলিত হয়েছে।

এক বিবৃতিতে টেররিজম অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ট্রেজারি আন্ডার সেক্রেটারি ব্রায়ান নেলসন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ইরান পেট্রোকেমিক্যাল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রির জন্য পূর্ব এশিয়ার ক্রেতাদের দিকে ঝুঁকছে। তেহরানের অবৈধ রাজস্বের উৎসগুলোকে লক্ষ্য করার দিকে মনোনিবেশ করছে যুক্তরাষ্ট্র, যারা এই বাণিজ্যে সহায়তা করবে তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ অব্যাহত থাকবে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর বাইডেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরান চুক্তিতে ফিরে না আসা পর্যন্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে। তবে এবার নতুন করে নিষেধাজ্ঞার পেছনে রয়েছে গাজায় ইসরায়েলি নিধনযজ্ঞের বিপরীতে ইরান ও অন্যান্য শক্তিগুলোকে চাপে রাখার কৌশল। তবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এ নতুন নিষেধাজ্ঞা কাজে আসবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের চুক্তি প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা বহালের সিদ্ধান্তের পরও ইরানের তেল রপ্তানি প্রতিবছরই বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের প্রভাব ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকার পরও ইরানের তেল বিক্রির প্রবণতারেখা উপরে উঠেই চলেছে।

গত জুন মাসেই ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইরান এখন প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস রপ্তানি করছে। প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরও রাইসি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথম কয়েক মাসে তেল বিক্রি ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হচ্ছে চীন। সেই তেলের বেশিরভাগ কিনছে ছোট ছোট পরিশোধনাগারগুলো।  ইরান থেকে চীন যত তেল কেনে, তার ৯৫ শতাংশই যায় এই ছোট ছোট তেল পরিশোধনাগারগুলোতে। ইরানের তেল বিশ্ববাজারের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০-১২ ডলার ছাড়ে পাওয়া যায়, যেখানে রাশিয়ার তেলে ছাড় পাওয়া পায় ব্যারেলে পাঁচ ডলার। নিষেধাজ্ঞার কবল থেকে বাঁচতে চীনের এই ছোট পরিশোধনাগারগুলো চীনা মুদ্রায় লেনদেন করে, ডলারে নয়। এ কৌশলের মধ্য দিয়ে ইরান নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল কেনাবেচা করতে পারছে।

ইউরোপেও যাচ্ছে ইরানের তেল। ২০১৮ সালে ইরানের তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর সর্বশেষ তেহরানের তেল কেনার তালিকায় নাম লিখিয়েছে বুলগেরিয়া। গত ডিসেম্বরে সেখান থেকে ১৬৮ মেট্রিক টন আমদানি করে দেশটি। জানুয়ারিতেও তা কেনা অব্যাহত রাখে তারা। ওই মাসে ইরান থেকে ৮১ মেট্রিক টন নিয়েছে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রটি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, ২০২২ সালে ইরান থেকে ৪ হাজার ১৮১ মেট্রিক টন তেল আমদানি করেছে পূর্ব ইউরোপের তিন দেশ রোমানিয়া, পোল্যান্ড ও বুলগেরিয়া। এর মধ্যে ৪ হাজার টনই কিনেছে রোমানিয়া।

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh