গাউট বা গেঁটে বাত হওয়ার কারণ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়

ডা. তাহমীদ কামাল

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৩, ১২:৩৪ পিএম | আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০২৩, ১২:৪৩ পিএম

প্রদাহজনিত রোগ গাউটের প্রতীকী চিত্র | ছবি: সংগৃহীত

প্রদাহজনিত রোগ গাউটের প্রতীকী চিত্র | ছবি: সংগৃহীত

যেসকল ব্যক্তির রক্তে উচ্চ মাত্রায় ইউরিক অ্যাসিড থাকে তাদের প্রদাহজনক আর্থ্রাইটিসের বিকাশ ঘটে, যা গাউট বা গেঁটে বাত নামে পরিচিত। এটি জয়েন্টে ঘন ঘন তীব্র ব্যথা, স্ফীত হওয়া, এবং লালচেভাবের দ্বারা চিহ্নিত করা যায়, যা আকস্মিক এবং রাতারাতি বিকাশ ঘটতে পারে। ইউরিক অ্যাসিড জমে যাওয়ার ফলে জয়েন্টে ছুঁচের মত স্ফটিক গঠন হয়, যার কারণে আকস্মিক ব্যথা হয়।

গাউট এর উপসর্গগুলো কি?

এটি সাধারণত পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের জয়েন্টকে আক্রান্ত করে। গাউটের সঙ্গে যুক্ত কিছু সাধারণ লক্ষণ এবং উপসর্গগুলির মধ্যে রয়েছে। যেমন- 

* জয়েন্টে (বিশেষত হাঁটু, পায়ের আঙ্গুল, কনুই এবং হাতের আঙ্গুল) গুরুতর এবং আকস্মিক ব্যথা।

* ব্যথা হওয়া অংশের উপর গরম ত্বক ফোলা এবং লাল হওয়া।

* জ্বর এবং কাঁপুনি।


প্রধান কারণগুলি কি কি?

গাউটের বেশকিছু কারণ লক্ষ্য করা যায়। সাধারণত নিম্নলিখিত কারণগুলোর জন্য গাউট হয়-

* আপনার রক্ত প্রবাহে ইউরিক অ্যাসিড জমে যাওয়া এবং জয়েন্টে ইউরেট স্ফটিকের গঠন হওয়া।

* জিনগত এবং পরিবেশগত বিষয়গুলির সমন্বয়।

* খাদ্যে নির্দিষ্ট পিউরিনের মাত্রা।

* স্থূলতা।

* অতিরিক্ত মদ খাওয়া।

* সিউডোগাউট (বা একিউট ক্যালসিয়াম পাইরোফসফেট আর্থ্রাইটিস)।


রোগ নির্ণয় পদ্ধতি ও করণীয়

চিকিৎসক উপসর্গগুলির বিস্তর ইতিহাস নিতে পারেন, এবং একটি শারীরিক পরীক্ষা করতে পারেন। এর নির্ণয় করাকে সাহায্য করতে কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষাও করা হয়:

* সিরাম ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা নির্ধারণ করার জন্য রক্ত পরীক্ষা।

* এক্স-রে।

* জয়েন্টের মধ্যে তরলে দ্রুত স্ফটিকের গঠনকে সনাক্ত করার জন্য আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান।

* নরম টিস্যু বা কলা এবং হাড়ের পরীক্ষা করার জন্য কম্পিউটেড টোমোগ্রাফি (সিটি/CT) বা ম্যাগনেটিক রেসোনেন্স ইমেজিং (এমআরআই/MRI)।


চিকিৎসা পদ্ধতি

চিকিৎসার প্রথম ধাপ হলো ব্যথা কমানো। এক্ষেত্রে NSAID যেমন ন্যাপ্রক্সেন, আইবুপ্রফেন, ইনডোমেথাসিন খুবই কার্যকর। আক্রান্ত জয়েন্টে বরফ লাগালে কিছুটা উপশম পাওয়া যায়। কোলচিসিন একটি কার্যকরী ঔষধ তবে এটি বমি ও ডায়রিয়া করতে পারে। কর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ রোগের তীব্রতা কমাতে খুব ফলপ্রসূ। এক্ষেত্রে আক্রান্ত জয়েন্টে কর্টিকোস্টেরয়েড ইনজেকশন দিলে খুব উপকার পাওয়া যায়। 


চিকিৎসার দ্বিতীয় ধাপ হলো ইউরেট এর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে আনা; এক্ষত্রে জ্যানথিন অক্সিডেজ ইনহিবিটর যেমন অ্যালোপিউরিনল, ফেবুক্সোস্ট্যাট ইউরিক এসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত রাখতে ব্যবহার করা হয়। এসব ওষুধ শুরু করার পরপর গাউটের ব্যথা বাড়তে পারে। রোগীকে পূর্বেই এ ব্যাপারে সতর্ক ও আশ্বস্ত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ওষুধ বন্ধ না রেখে খাওয়া চালিয়ে যাবার কথা বলা হয়। প্রতি বছর ইউরিক এসিড লেভেল মনিটর করার সুপারিশ করা হয়। অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে অনির্দিষ্টকালের জন্য ইউরেট কমানোর ঔষধ চালিয়ে যেতে হয়।


প্রতিরোধের উপায়

ওজন কমাতে হবে তবে খাওয়া দাওয়া একদম ছেড়ে দিয়ে নয়। কম চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া উপকারী। অ্যালকোহল এড়িয়ে চলতে হবে। বেশি পিউরিন আছে এমন খাবার কম খাওয়া ভালো যেমনঃ বিভিন্ন ধরনের ডাল বিশেষ করে মসুর ডাল ও মটর ডাল। শিম, শিমের বিচি, বরবটি, মটরশুঁটি, কড়াইশুঁটি, পুঁইশাক, পালং শাক, অ্যাসপ্যারাগাস, ফুলকপি, মাশরুম, কচু, ইস্ট, লাল মাংস যেমন গরু, খাসি, ভেড়া, হরিণ, সব ধরনের হাঁসের মাংস যেমন- রাজহাঁস, জংলি হাঁস ও পাতিহাঁস; শূকর ও খরগোসের মাংস, বড় পাখির বা তুর্কি মোরগের মাংস, কবুতর ও তিতির পাখির মাংস। মগজ, কলিজা, বৃক্ক, যকৃৎ, অগ্ন্যাশয়, জিহ্বা, বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ ও মাছের ডিম, সামুদ্রিক খাবার, কাঁকড়া, চিংড়ি, শামুক ইত্যাদি। উল্লেখ্য খাবার থেকে যে পিউরিন শরীরে ঢুকে তা মাত্র ১ mg/dL ইউরিক এসিড বাড়াতে পারে এবং খাবারের ব্যাপারে সংযমী হয়ে মাত্র ১৫% ইউরিক এসিড লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তাই খাবারের ব্যাপারে অত্যধিক সংযমী হবার প্রয়োজন নাই। ফলমূল, অন্যান্য শাকসবজি প্রচুর খেতে হবে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন পেয়ারা, বাতাবী লেবু, কামরাঙা, কমলা, আমড়া, বাঁধাকপি, টমেটো, আনারস, কাঁচা মরিচ, আমলকী, তাজা শাকসবজি ইত্যাদি প্রচুর খেতে হবে। এছাড়া কম পিউরিন সমৃদ্ধ আরো খাবারের মধ্যে আছে দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য (দৈ, ঘি, মাখন), ডিম, চীনাবাদাম, লেটুস, পাস্তা, সাগু, ময়দা ইত্যাদি। প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে যেন প্রতিদিন ২ লিটার বা তার বেশি প্রস্রাব হয় এতে অতিরিক্ত ইউরিক এসিড শরীর থেকে বের হয়ে যেতে সাহায্য করবে এবং ইউরিনারি ট্রাক্টে ইউরেট জমা হয়ে পাথর হবার সম্ভাবনা কমে যাবে। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করতে হবে। যে সকল ওষুধ ইউরিক এসিড লেভেল বাড়ায় যেমন থিয়াজাইড ডাইউরেটিকস, অ্যাসপিরিন, নিয়াসিন ইত্যাদি পরিহার করতে হবে। 


লেখক: ডা. তাহমীদ কামাল

এফসিপিএস (ফিজিক্যাল মেডিসিন এ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন)

পেইন, আর্থ্রাইটিস, প্যারালাইসিস এ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh