পাথরকুচি

গৌতম কৈরী

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৩, ১১:২৩ এএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

এই রাস্তা দিয়া বন্ধু বাড়ি যায়। যেটুকু পথ যায়, তারও অধিক পথ বুকের মধ্যে বয়ে নিয়ে যায়। বন্ধুর বুকের মধ্যে পথ জমা হতে থাকে। একদিন তারে কই, দে কিছু পথ ধার দে। হেঁটে আসি। বন্ধু হাসে আর মেঘলা আকাশের জন্য অপেক্ষা করে আর পাথরকুচি গাছে জল দিতে থাকে। তার হাফ বিল্ডিং বাড়ির সামনে টিউবওয়েল, তার পাশে অনেক পাথরকুচি গাছ।

গাছগুলোর বয়স বন্ধু আন্দাজ করতে পারে না। আমিও পারি না। আশপাশের মানুষও পারে না। আমরা জানি পাথরকুচি গাছের জন্য তেমন কিছু প্রয়োজন হয় না। একটি পাতা মাটিতে ফেলে দিলেই, কিছুদিন পর সেখান থেকেই চারাগাছ গজায়। পাথরকুচি পাতার গুণাগুণ অনেক। বন্ধু অবশ্য পাথরকুচি পাতার ঔষধি গুণাগুণের জন্য এই পাতা বাড়ির আঙিনায় ফলায় নাই। আবার গাছগুলো আপনাআপনি হয় নাই। এর পেছনে আছে এক আকাশ মেঘ, এক কুয়াশাচ্ছন্ন অতীত। যদিও আমরা জানি, অতীত কখনো অতীত হয় না।

আমাদের হাতে একদিন অফুরন্ত অবসর ছিল। ‘অবসর’ শব্দটি তখন আমাদের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজত। বৃষ্টিপরবর্তী সময়ে জলজমা রাস্তায় আমি আর বন্ধু হাঁটতাম। সাথী ডেকোরেটর, বাদশা মাইক, স্টার টেইলার্স, সামুর হোটেল, জামাইয়ের চা স্টল-এইসব দোকানে তখন বাংলা সিনেমার গান বাজত। জলজমা দিনে ওইসব অপার্থিব প্রেমপ্রেম গান শুনতে আমাদের বেশ ভালো লাগত। তখন আমাদের টগার দোকানের ডালের বড়া, শিঙাড়া এসব খেতে মন চাইত। তিন রাস্তা মোড়ে বড় পুকুরের পাশে ধানের মিল। আমরা বলতাম খলা। মিলের পাশেই টগার ছাপরা দোকান। জলজমা রাস্তায় দুই ফিতা স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে আমরা হাঁটতাম। এতে আমাদের হাফহাতা শার্টের পেছনে কাদার কারুকাজ তৈরি হতো। গরম গরম বড়া খেতে খেতে আমাদের মনে হতো এটাই হলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্বাদময় খাবার। বড়া খেয়ে পানি খাওয়ার জন্য আমরা ক্যাম্পের মাঠের কোনায় যেতাম। সেখানে এক টিউবওয়েল ছিল। এভাবে আমরা প্রায় উদ্দেশ্যহীনভাবে প্রচুর হাঁটতাম। কারণ আমাদের হাতে অফুরন্ত সময় ছিল। 

জমানো পথ থেকে একটা খুচরা পথ নিয়ে একদিন বিকালবেলা পথ হাঁটছিল বন্ধু। তার কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছিল না। চৌরঙ্গী মোড় থেকে এড়াইচ্তলা বা মুজাটি কৃষি ফার্মের পথ যেদিকে যায় সেই পথ ধরে ছোট্ট লোহার ব্রিজ পার হয়ে বন্ধু হাঁটছিল। আমরা জানি পথের কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকে না। দাঁড়ালেই গন্তব্য সৃষ্টি হয়। খুচরা পথ শেষ হলেই সে হয়তো দাঁড়াবে অথবা দাঁড়াবে না। এখানে হেঁটে চলা বা থামার মধ্যে কোনো ফারাক নাই। সেদিনের বিকালটা মেঘ মেঘ ছিল, ঠিক মেঘলা না মেঘ মেঘ নরম মিহি বাতাসের আবরণ ছিল। কবিরা বলে, মেঘ মেঘ এমন বিকালে মানুষ একলা হয়ে যায়। এইরূপ বিকালে কৃষি ফার্মের উল্টাপাশে যে ডোবা তার সম্মুখে বিস্তর বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ের কালো ও শীতল ছায়ার তলে এসে বন্ধু থমকে দাঁড়ায়। বাঁশঝাড়ের পাতার চিকন লম্বা কচি অংশ ছিঁড়ে মুখে পুরে। কেউ কেউ বলে এই নরম কচি অংশ খাওয়া যায় এবং আমরা এটা খাওয়া শিখছিলাম হাফপ্যান্ট পরার সময়ে। বন্ধু বাঁশের কচি নরম অংশ চিবাতে চিবাতে সেইসব অতীত দিন ভাবতে ভাবতে খুচরা পথ হাঁটছিল ঠিক তখন মেঘ মেঘ আকাশ আর ওইসব ঘন কালো বাঁশঝাড়ের ছায়ার তলে হঠাৎ মাহবুবা বাতাসের মতো এলো। মানুষ বাতাসের মতো আসতে পারে কি? হয়তো পারে। এইক্ষণে মাহবুবাকে বাতাসের মতো বলাই সমুচিত, কারণ বন্ধু অতীত দিনের ভাবনা ও দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর হয় আর এইক্ষণে মাহবুবাকে আবিষ্কার করে। ছোটবেলায় বিটিভিতে দেখা ‘দ্য গার্ল ফ্রম টুমোরো’ সিরিজটার মতো। সামনে হঠাৎ বন্ধুকে দেখে মাহবুবা পড়ে যেতে যেতে সামলে ওঠে। তার এক হাতে গাঁদা অথবা গন্ধরাজ ফুলের গাছ, অন্য হাতে পাথরকুচি গাছের চারা। নিজেকে সামলালেও হাতের গাছ সামলাতে পারে না মাহবুবা। আমরা জানি মাহবুবা আর তার বোন সবুজ গেটের ভেতরে একটা বাসায় থাকে। তাদের বাসায় ছাদ আছে এবং ছাদে তারা নানাবিধ ফুল-ফলের বাগান করে। এইটা তাদের হবি। যদিও পরীক্ষায় ইয়োর হবি রচনায় সে কখনো গার্ডেনিং লেখেনি। দুই বোনের আব্বা উঁচু টিন দিয়ে ছাদের চৌপাশ ঘিরে দিয়েছে। নিচ থেকে বদ ছেলেরা যেন তাকিয়ে শিস অথবা বাইকের হর্ন বা সাইকেলের ঘণ্টি বাজাতে না পারে। এ সবকিছু পাঠক হিসেবে আমরা জানি, কিন্তু আমার বন্ধু জানে না। গাঁদা অথবা গন্ধরাজ ফুলের গাছ ভেজা ঘাসের মাটি থেকে তুলে মাহবুবা অতি দ্রুত বন্ধুকে অতিক্রম করে চলে যায়। বলা ভালো ঝড়ো বাতাসের মতোই মিলিয়ে যায়। বাতাস মিলিয়ে গেলেও কচি বাঁশপাতা অল্প অল্প দুলতে থাকে বাতাসের স্মৃতিতে। 

পাতা আর চোখের সঙ্গে মনের দুলুনিতে বন্ধু মাটিতে পড়ে থাকা পাথরকুচি গাছের চারাটি দেখতে পায়। যত্নের সঙ্গে চারাটি তুলে নেয় এবং চারাটি হাতের তালুতে নিয়ে মাহবুবাকে আর দেখতে পায়নি বন্ধু আমার। দেখতে পাওয়ার কথাও না, কারণ আমরা জানি মাহবুবাকে লেখক ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আকাশের আলো নরম হয়ে এসেছে, কৃষি ফার্মে গেট তালা দিয়ে লোকজন চলে গেছে, গঞ্জের হাট-ভাঙা জনমানুষ অনেকেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, রাস্তার পাশে বান্ধা গরু ও ছাগল নিয়ে রতন ও রত্না মধ্যমাঠ দিয়ে হাঁটা ধরেছে। মনু কাকা মাছ ধরার পর্ব চুকিয়ে খলুই আর ছিপ হাতে রওনা দিয়েছে, গোটা বিশেক ইঞ্জিনচার্জার ভ্যান রাস্তা দিয়ে সাঁই সাঁই করে চলে গেছে। এইক্ষণে নৈঋত কোণে আকাশ কালো করে আসে। এড়াইচ্ গাছের মগডালে গম্ভীর মেঘের ঘনছায়া পড়তে দেখা যায় এবং কোনো রকম ইশারা ছাড়াই কিংবা কে জানে এটাই হয়তো ইশারা, হঠাৎ মেঘ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হয়। বন্ধু হাতের তালুতে পাথরকুচির চারাগাছ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আর বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে। বৃষ্টি দিয়ে জলরঙের মতো বারবার মাহবুবার থতমত মুখটা সে আঁকার চেষ্টা করে, কিন্তু বারবার বৃষ্টি ধুয়ে দেয়, বন্ধু আবার আঁকে। তার মনে হয় সে ৫ মিনিট অথবা ৫০ মিনিট অথবা ১৫০ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়ির হিসাবে মুহূর্তকে আমরা মাপতে চাই না। মুহূর্তের সঙ্গে মনের দুলুনি আর আকাশের মেঘ আর বৃষ্টির সম্পর্ক বিরাজমান। মনে আকাশের ছায়া পড়ে। বন্ধু ভিজে ভিজে ফিরতি পথ হাঁটে। তার হাতে পাথরকুচির চারা।

একই পথ। একই মুখ। একই গাছ। একই বাড়িঘর। একই পুকুর। একই মাঠ। একই ব্রিজ। একই অন্নকুড়ি বিল। একই হাট-বাজার। একই আড্ডা। একই জটলা। একই বন্ধু। একই চায়ের দোকান। একই ভাঙা রাস্তা। একই কবি নাসির মামুন। একই কবি। একই বাঁশঝাড়। একই ধানক্ষেত। একই বাজার। একই হাটবার। একই বিকাল। একই দিগন্তের ঢাল। সব একই। মাঝখানে চৌদ্দ বছর নাই। 

চৌদ্দ বছরের ব্যবধানে আমাদের জীবনে অনেক অতীত জমা হয়েছে। বন্ধুর হাফবিল্ডিং বাসার আশপাশ জুড়ে সুবিশাল পাথরকুচির বাগান তৈরি হয়েছে। এত বড় পাথরকুচির বাগান বা ক্ষেত এর আগে কেউ দেখেছে কিনা সন্দেহ। আর যেহেতু পাথরকুচির পাতায় ঔষধি গুণাবলি বিদ্যমান তাই লেংড়ারবাজার, চেচুয়া, সরিষাবাড়ী, জামালপুর, গৌরীপুর আরও আরও নানা দিক থেকে হেকিম, কবিরাজ বন্ধুর বাড়িতে পাথরকুচির পাতা নিতে আসে নিত্যদিন। বন্ধু গম্ভীর হয়ে পাতা দেয় এবং তাদের সঙ্গে বাতচিত করে। আশপাশের জনমানুষও পাতা নিয়ে যায়। কারণ আমরা জানি কলেরা, ডায়রিয়া কিংবা রক্ত আমাশয়, শরীরের জ্বালাপোড়া, জন্ডিস নিরাময়ে পাথরকুচি পাতার রস অনেক কার্যকরী।

সেই মেঘ মেঘ দিনের পর বন্ধু পাথরকুচি চারা হাতে বৃষ্টিতে প্রায় ৫ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল। বন্ধু ভেবেছিল, মাহবুবা হয়তো চারাটি নিতে আসবে। কিন্তু মাহবুবা আসেনি। বৃষ্টিতে ভিজে বন্ধুর সর্দি, কাশি, জ্বর হয়। দীর্ঘদিনের সর্দি থেকে মেহ দেখা দেয়। মেহ হলো সর্দির কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশে ফোড়ার মতো অংশ। এই মেহ থেকে শরীরে তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয়। ব্যথার ঘোরে বন্ধু মাহবুবাকে বারবার দেখে। সেই থতমত মুখ দেখে দেখে মাহবুবাকে সে সম্পূর্ণ এঁকে ফেলে এবং মাহবুবার সঙ্গে সে কথাবার্তাও বলে। খালেক কবিরাজ মেহ সারাতে তাজা পাথরকুচির পাতার রস নিয়মিত সকালে এবং বিকালে খেতে বলেন। সেই পাথরকুচির চারাটি বন্ধু বাড়ির উঠানে রোপণ করে। সেই পাথরকুচি পাতা থেকে পাথরকুচি, তার পাতা থেকে পাথরকুচি এভাবে পুরো বাড়ি এবং বাড়ির আশপাশ পাথরকুচিতে ভরে যায়। ধীরে ধীরে পাথরকুচির এই বাগানের গল্প চারদিকে ছড়িয়ে যায়। কেউ একজন ব্লগার পাথরকুচি বাগান নিয়ে ইউটিউবে ব্লগ করে। সেটা দেখে বহু লোকজন দেখতে আসে। ধীরে ধীরে হেকিম, কবিরাজরা পাতা নিতে আসে বন্ধুর বাড়িতে। বন্ধু বাগানে নিয়মিত পানি দেয়। সেই ছোট্ট চারাগাছটিকে সে বাঁচিয়ে রেখেছে। 

এরপর বহু বহু বহু বার বন্ধু সেই পথে হেঁটেছে। ঝড়ো বাতাসের মতো আসা মাহবুবা আর আসেনি। বন্ধু যতটা পথ হেঁটে যায় তারও অধিক পথ বুকের মধ্যে বয়ে নিয়ে আসে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh