তিন বিধানসভায় বিজেপি নয়, মোদির জয়

স্বর্ণা চৌধুরী

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৫:৩১ পিএম

নরেন্দ্র মোদি। ছবি: ইন্টারনেট

নরেন্দ্র মোদি। ছবি: ইন্টারনেট

চার রাজ্যের ফলাফল ঘোষণার পর উল্লাস চলছে বিজেপি শিবিরে। কারণ মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে জয়ের ফলে দলের এককভাবে ক্ষমতায় থাকা রাজ্যের সংখ্যা এক ডজন হয়ে গেল। আর কংগ্রেসের হাতে থাকল মাত্র তিন রাজ্য। ‘হিন্দি’ বলয়ের কোনো রাজ্যে ক্ষমতায় নেই কংগ্রেস। বিজেপি অবশ্য শূন্য দক্ষিণে। তবে এ নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নয় ক্ষমতাসীনরা। আবার বিধানসভা ফলের ওপর পুরোপুরি ভরসাও করা যাচ্ছে না। কারণ লোকসভা নির্বাচনে তাদের সঙ্গে যুক্ত হবে আঞ্চলিক দলগুলো। যেসব আঞ্চলিক দল বিধানসভা নির্বাচনে পৃথক থেকে নির্বাচন করেছে, তারা কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে লোকসভা নির্বাচনে অংশ নিলে ফল যে উলটে যেতে পারে, তা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে বিজেপিকে। তবে এসবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার পথে এগিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

ভারতীয় রাজনীতিতে বহুল প্রচলিত এবং প্রমাণিত প্রবাদ হলো- ‘উত্তরপ্রদেশ যার, দিল্লি তার।’ তবে শুধু উত্তরপ্রদেশ নয়, গোটা উত্তর ভারতের সমর্থন সঙ্গে নিয়েই কংগ্রেস একদা রাজত্ব করেছে দেশটিতে। কিন্তু সেই সব রাজ্যেই এখন ক্রমে ক্ষমতাহীন হয়ে চলেছে ১৩৭ বছরের পুরনো দলটি। আবার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ থেকে ১৯৮০ সালে জন্ম নেওয়া বিজেপি সেই পুরনো পথেই বসেছে দিল্লির মসনদে। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের আগে তাই এ বিধানসভা নির্বাচন বিজেপিকে শক্তি জোগাবে। 

ভারতে ৩০ নভেম্বর একসঙ্গে পাঁচ রাজ্যে (রাজস্থান, তেলেঙ্গানা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও মিজোরাম) ভোট হয়। ভারতে লোকসভার আসন ৫৪৩। যে পাঁচ রাজ্যে ভোট হলো, তাতে লোকসভার আসন ৮৩টি। এই হিসাব দেখিয়ে সর্বশেষ নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের ১৫ শতাংশের সমান গুরুত্বপূর্ণ বলছেন অনেকে। যদিও ভোট হয়েছে বিধানসভার জন্য। এসব রাজ্যে লোকসভার আসন হলো রাজস্থানে ২৫, তেলেঙ্গানায় ১৭, মধ্যপ্রদেশে ২৯, ছত্তিশগড়ে ১১ ও মিজোরামে এক। অন্যদিকে এই পাঁচ রাজ্যের সব বিধানসভা মিলে আসন হলো ৬৭৯টি। একটি আসনে প্রার্থী মারা যাওয়ায় ভোট স্থগিত হয়েছে।

এই নির্বাচনে পাঁচ রাজ্যের যে ৬৭৯টি আসনে ভোট হয়েছে, গত নির্বাচনে তার ১৯৯টি পেয়েছিল বিজেপি এবং কোথাও তারা কংগ্রেস বা আঞ্চলিক দলগুলোর চেয়ে বেশি আসন পায়নি। এবার সেই পরিস্থিতি বদলে গেল আমূলভাবে। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়-সর্বত্র বিজেপি অন্যদের এবং আগের চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। গতবার তারা রাজস্থানে পেয়েছিল ৭৩টি আসন, এবার ১১২। ছত্তিশগড়ে গতবারের ১৫টির জায়গায় এবার পেল ৫৫টি। মধ্যপ্রদেশে ১০৯টির জায়গায় পেয়েছে ১৬১টি। তেলেঙ্গানায় গতবার পেয়েছিল একটি, এবার ৯টি। গতবার যেখানে বিজেপি রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, তেলেঙ্গানা ও মিজোরাম মিলে ২০০ আসনের নিচে ছিল এবার কেবল প্রথম চারটিতে তারা পেল ৩৩৭; অর্থাৎ আসনের হিসাবে বিজেপি অনেক এগিয়েছে। সর্বত্র তাদের আসন বিপুলভাবে বেড়েছে। 

২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস আলোচ্য পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনে ৩০৬টি আসন পায়; অর্থাৎ তখন বিজেপির চেয়ে তারা ১০৭টি আসন বেশি পেয়েছিল। তখন রাজস্থানে তারা পায় ১০০ আসন, ছত্তিশগড়ে ৬৮, মধ্যপ্রদেশে ১১৪, তেলেঙ্গানায় ১৯ ও মিজোরামে ৫। এবার তারা রাজস্থানে পেল ৭২, ছত্তিশগড়ে ৩২, মধ্যপ্রদেশে ৬৬ ও তেলেঙ্গানায় ৬৪। তেলেঙ্গানা ছাড়া ইতোমধ্যে ফল ঘোষিত বাকি তিন রাজ্যে কংগ্রেসের আসন বড় ব্যবধানে কমেছে। এদিকে ৪০ আসনের মিজোরামে দুই আঞ্চলিক দলের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। জেডপিএম জয়ী ২৭ আসনে। তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। রাজ্যে ক্ষমতাসীন এমএনএফ ১০ আসনে জয়ী। বিজেপি দুটি ও কংগ্রেস একটি আসনে জয়ী হয়েছে। 

বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, লোকসভা নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানে কংগ্রেস খারাপ করেছে। তবে তেলেঙ্গানায় গতবারের চেয়ে ভালো করায় রাহুল গান্ধীর কিছুটা মুখ রক্ষা হলো। পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনকে অনেকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সেমিফাইনাল বলছেন, তাতে বিজেপি ‘বিজয়ী’। প্রধানমন্ত্রী মোদি সাধারণ মানুষের জনসমর্থন পাওয়ার জন্য মিজোরাম ব্যতীত নির্বাচনী রাজ্যগুলোতে হাই-ভোল্টেজ প্রচারণাও চালিয়েছিলেন। মোদি রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে ১৪টি এবং ছত্তিশগড়ে পাঁচটি সমাবেশে ভাষণ দেন। তিনি রাজস্থানে দুটি এবং মধ্যপ্রদেশে একটি বিশাল রোডশো করেন। মোদির জনপ্রিয়তা এবং হিন্দুত্ববাদী অনুভূতি বিস্তৃত করার মধ্য দিয়ে গেরুয়া দলটি আরও একটি মেয়াদে ভারত শাসনের পথ পরিষ্কার করছে বলে মনে হচ্ছে।

মোদি তিন রাজ্যে ভোটের ফল এবং বিজেপির সাফল্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে পোস্ট করেছেন। লিখেছেন, ‘জনতার কাছে আমরা মাথা নত করছি। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তিশগড়ের ফল থেকে পরিষ্কার, মানুষ উন্নয়নের পক্ষে। বিজেপিকে সমর্থনের জন্য এই তিন রাজ্যের মানুষকে আমি ধন্যবাদ জানাই। আমরা তাদের সেবায় কঠোর পরিশ্রম করব। দলের পরিশ্রমী কর্মীদেরও আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ জাতীয় ও রাজ্যস্তরের ভোটেও বিজেপির একমাত্র মুখ যে এখনো মোদি, সবার কথায় উঠে এসেছে সেই কথা। ভোটে বিজেপির জয়ের এই অশ্বমেধের ঘোড়া নাগাড়ে ছুটিয়ে চলেছেন তিনি। কেন্দ্রীয় সংসদীয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশি বলেন, ‘তিন রাজ্যের মানুষ মোদির নেতৃত্বকে আশীর্বাদ করেছেন।’ মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের মতে, ‘মোদির দক্ষ নেতৃত্বের ফলেই এই জয়।’ রাজস্থানের বিজেপি প্রার্থী এবং মুখ্যমন্ত্রী পদের অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী দিয়া কুমারী বলেন, ‘রাজস্থান এবং ভারত জুড়ে মোদিজির সুনামি হচ্ছে। আমরা বিপুল ব্যবধানে জিতে রাজস্থানে সরকার গঠন করতে চলেছি।’

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির এখন ১২টি রাজ্যে পূর্ণ শাসন রয়েছে- উত্তরাখণ্ড, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, গোয়া, আসাম, ত্রিপুরা, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে হিন্দি হার্টল্যান্ডে। উত্তর ভারতে কংগ্রেস শুধু হিমাচল প্রদেশে ক্ষমতায় রয়েছে। এর সঙ্গে তাদের হাতে রয়েছে কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানা। এবারের ভোটে কংগ্রেসের পরাজয় ‘ইন্ডিয়া’ জোটে তার অবস্থানকে দুর্বল করবে। আবার তা জোটের শক্তি বাড়াতেও পারে। সেখানে দলীয় সমীকরণ পরিবর্তন হতে পারে। কারণ অন্যান্য বিরোধী দল এটিকে বিরোধী জোটের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছেন, দল অস্থায়ী ধাক্কা কাটিয়ে উঠবে এবং ইন্ডিয়া জোটের অংশীদারদের সঙ্গে লোকসভা নির্বাচনের জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত হবে। খাড়গে আগামী সপ্তাহে ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের সঙ্গে সভা করছেন। ২০২৪ সালের জন্য ভোটের লড়াইয়ে সব দলই তৈরি হচ্ছে। যে আঞ্চলিক দলগুলো ভালো ফল করতে পারেনি, তাদেরও পৃথক ভোট ব্যাংক রয়েছে। আর বড় জোট গঠন করে তা ঠিকমতো কার্যকর করা গেলে সেটি বিজেপি ও মোদির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলতে পারে। তবে আপাতত মোদি হিন্দি-ভারত ও বিজেপির ভেতরে নিজের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার কথা জানান দিতে সক্ষম হয়েছেন। এ নির্বাচন মূলত মোদি ও হিন্দুত্বের বাড়বাড়ন্তেরই নিদর্শন হয়ে থাকল।

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh