বরিশালের নির্বাচনে ১৬ দল, অস্তিত্বহীন অধিকাংশ

বরিশাল প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৯:০৫ এএম | আপডেট: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৯:১১ এএম

১৬টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে বরিশাল বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনে। ফাইল ছবি

১৬টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে বরিশাল বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনে। ফাইল ছবি

জাতীয় নির্বাচন মানেই নৌকা-ধানের শীষ আর লাঙ্গলের লড়াই। তবে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাচ্ছে না দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তারা না গেলেও নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ৪৪টি দলের মধ্যে ৩০টি দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।

এর মধ্যে নতুন-পুরাতন মিলিয়ে ১৬টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে বরিশাল বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনে। যার মধ্যে স্থানীয় রাজনীতিতে বেশিরভাগ দলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি বরিশালের মানুষের কাছে দলগুলোর নাম যেমন অজানা, তেমনি দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নাম লেখানো প্রার্থীরাও অপরিচিত।

ফলে আসন্ন নির্বাচনে এসব দলের ভূমিকা এবং তাদের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই সাধারণ মানুষের মাঝে। অবশ্য নির্বাচনে অংশ না নেয়া দলগুলোর নেতাদের দাবি পাতানো একতর্ফা নির্বাচন জায়েজ করতেই এসব দলের আবির্ভাব। তবে এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ১৭২টি মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়। যার মধ্যে যাচাই বাছাইতে টিকেছে ১৩২টি মনোনয়ন।

তথ্য মতে, বিভাগের ২১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য স্বতন্ত্রের বাইরে অংশগ্রহণ করেছে মোট ১৬টি দল। যার মধ্যে সর্বোচ্চ উল্লেখযোগ্য ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ (নৌকা) এবং সংসদের বর্তমান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি-জাপা (লাঙ্গল)।

এর বাইরে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (হাতুড়ী), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ (মশাল), জাতীয় পার্টি- জেপি (বাইসাইকেল), ন্যাশনাল পিপল্স পার্টি- এনপিপি (আম), জাকের পার্টি (গোলাপ ফুল), বাংলাদেশ কংগ্রেস (ডাব), তৃণমূল বিএনপি (সোনালী আঁশ), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ (গামছা), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট- মুক্তিজোট (ছড়ি), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম (নোঙ্গর), বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (ফুলের মালা), বাংলাদেশ সুপ্রীম পার্টি- বিএসপি (একতারা), বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট- বিএনএফ (টেলিভিশন) এবং জাগ্রত বাংলাদেশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনে ১৬টি দলের নাম উঠে আসলেও বরিশালে মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে বেশিরভাগ দলের কার্যক্রম নেই। এমনকি নেই কোন সাংগঠনিক ইউনিট কমিটি।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়া বরিশালে স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে সক্রিয় বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের কয়েকজন নেতা জানান, বরিশালের প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন এবং বাসদ।

এছাড়া মাঝে মধ্যে দলীয় কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে দেখা যায় ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাসদের নেতাকর্মীদের। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বাকি দলগুলোর কোন কার্যক্রমই বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলে নেই বলে দাবি করেছেন রাজপথে সক্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতারা। ফলে এসব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও ভোটের ফলাফলে তাদের অবস্থান কোথায় দাঁড়াবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ ভোটাররাই।

জানা গেছে, ভোটের রাজনীতিতে প্রথম অংশগ্রহণ নতুন নিবন্ধনভুক্ত দল তৃণমূল বিএনপি। আলোচনা রয়েছে জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপির কিছু নেতা মিলে গঠন করেছেন এই দলটি। যেখানে তৃণমূল পর্যায়েও বিএনপি নেতারা তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন।

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বরিশালে তৃণমূল বিএনপি থেকে যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাদের অনেকেই ইতিপূর্বে রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না। অনেক প্রার্থী রয়েছেন যারা, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের রাজনীতিও করেছেন। এদের মধ্যে একজন বরিশাল-৩ আসনে তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী শাহানাজ হোসেন। যিনি ইতিপূর্বে মৌখিকভাবে বাবুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন বলে দাবি তার।

তাছাড়া ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের কাছে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন শাহানাজ। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সংরক্ষিত আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশাও করেন। কিন্তু তিনবারই দল থেকে প্রত্যাখাত হয়েছেন। এখনও নিজেকে আওয়ামী লীগের লোক বলেই পরিচয় দিচ্ছেন তিনি। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উৎসব মুখর ও অংশগ্রহণমূলক করতেই তৃণমূল বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করছেন বলে জানিয়েছেন সাংবাদিকদের।

অপরদিকে, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বরিশাল সদর এবং হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেন সাংবাদিক আসাদুজ্জামান। বাছাইতে বরিশাল-৪ আসনে তার মনোনয়ন বাতিল হলেও বরিশাল-৫ আসনে মুক্তিজোটের প্রার্থী হিসেবে টিকে গেছেন তিনি। তবে বরিশালের প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট একেবারেই অপরিচিত দল।

জানা গেছে, সাংবাদিক আসাদুজ্জামান ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বরিশাল জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীও ছিলেন তিনি। বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। কিন্তু দলীয় চাপে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। তবে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। এরপর আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুক্তিজোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন।

আলাপকালে মো. আসাদুজ্জামান জানান, বরিশালে মুক্তিজোটের কার্যক্রম নেই। এমনকি কবেনাগাদ দলটি নিবন্ধনভুক্ত হয়েছে সেই তথ্যও জানা নেই। তবে নির্বাচনে প্রতীকের থেকে ব্যক্তির গুরুত্ব বেশি দাবি করে তিনি বলেন, মার্কাটা বড় বিষয় নয়, আমাকে যারা চেনে যানে, তারা তো আমার বাইরে যাবেন না। দল নতুন হলেও জয়ের বিষয়ে আমি আশাবাদী।

অপরদিকে, ন্যাশনাল পিপল্স পার্টি- এনপিপির হয়ে বরিশাল সদর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আব্দুল হান্নান শিকদার। যিনি জন্মসূত্রে বরিশালের বাসিন্দা হলেও থাকেন ঢাকায়। দলে কোন উল্লেখযোগ্য পদও তার নেই বলে জানিয়েছেন। বরিশালে তার দল- এনপিপির তেমন কার্যক্রম নেই বললেই চলে। রাজপথে দলটির কার্যক্রম না থাকলেও মাঝে মধ্যে গণমাধ্যমে দলটির দু-একটি ই-মেইল বার্তা পাওয়া যায়। তবে সেসব বার্তায় জনমুখি রাজনীতির কোন বার্তা মেলেনি।

এই দলের প্রার্থী আব্দুল হান্নান বলেন, বরিশালে আমাদের দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম রয়েছে। তাছাড়া আগেও আমাদের দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। আমরা কোন জোটের প্রার্থী নই। আমাদের দল একক প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। জনগণের স্বার্থে কিছু না করলে কেন জনগণের ভোটের আশা করছেন? এমন প্রশ্নের সদুত্তোর দিতে না পেরে ব্যবস্তা দেখিয়ে এড়িয়ে যান তিনি।

আসন্ন নির্বাচনে এসব দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে বামগণতান্ত্রিক জোটের সংগঠক ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদ বরিশাল জেলার সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, নির্বাচনের আগে সরকারের মদদে কিছু দলকে দ্রুত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এগুলো রাজনীতির মধ্য দিয়ে আসা কোন দল নয়। মূলত একতরফা নির্বাচন জায়েজ করার জন্যই এই দলগুলোর দ্রুত অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

তবে নির্বাচনে এসব দলের অংশগ্রহণ নিয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বরিশাল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, এ নিয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি নই। তবে তারা যেহেতু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে তাদের আমরা প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখছি। কেননা প্রতিপক্ষকে কখনই ছোট করে দেখা ঠিক নয়। যেই দলেরই হোক।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরিশাল জেলার সাবেক সভাপতি অধ্যাপক শাহ্ সাজেদা বলেন, অনেকে সারা বছর রাজনীতি করেও জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েও নির্বাচনে আসেনি। অথচ অনেক দল নির্বাচন করছে যার নামও মানুষ ভালোভাবে যানে না। মূলত কিছু লোক জনসেবার ইচ্ছা নিয়ে নির্বাচনে আসছে। আবার কিছু লোক নির্বাচনে আসছে সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে নিজের পরিচিতি বাড়াতে এবং প্রতিপক্ষের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিতে। এরা কখনই প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসতে পারে না। তাদের দ্বারা কিছু আশা করাও ঠিক নয়।

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh