পত্র আঁকেন ভিনসেন্ট ইতি, ভ্যান গঘ পত্রকার

শফিকুল কবীর চন্দন

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:৪৫ পিএম | আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:৫৪ পিএম

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ।

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ।

‘যারা ভালো চিঠি লেখে তারা মনের জানালার
ধারে বসে লেখে, আলাপ করে যায়- তার কোনো
ভার নেই, বেগও নেই, স্রোত আছে। এই সব
চলতি ঘটনার পরে লেখকের বিশেষ অনুরাগ
থাকা চাই, তা হলেই তার কথাগুলি পতঙ্গের মতো
হালকা পাখা মেলে হাওয়ার উপর দিয়ে নেচে যায়।’ ১
পীড়িত গঘের পিরিতের ঘরের বাসিন্দাদের মুক্তির স্বপ্ন তার 

রং-তুলি-রেখায় উদ্দীপ্ত থেকেছে। শিল্পসৃষ্টির উদ্দীপনার এক্তিয়ার ছেড়ে তার পত্র রচনার জগতের সাহিত্যিক রোশনাই দেখে আমাদের চমকে উঠতে হয়। মানবশিল্পের এই রূপকারের শিল্প অনুষঙ্গে মানুষ আর শিল্পীর মাঝখানটায় আসলে কোনো বিপরীত অধিষ্ঠান নেই। ভিনসেন্ট মানে ভ্যান গঘ, বা ভ্যান গখ, ফ্যান গফ, গগ না গফ, ভান গো উচ্চারণ যেমনই হোক তার আঁকা, লেখা জীবনলগ্ন এক লড়াই। পত্র রচনায় শিল্পানুশীলনের প্রস্তুতির প্রত্যুষ, প্রদোষ, মধ্যাহ্ন, অপরাহ্ণ, সায়ংকালগুলোর নাতিদীর্ঘ জীবনে আঁকা, লেখা, সুতীব্র জীবনলিপ্সা, দুর্দমনীয় শিল্প আয়াশ, শ্রমনিষ্ঠার অতিমানুষী ক্লেশ, উৎপীড়ন, বেদনাবিধুর প্রত্যাখ্যানের ভার জর্জর, ধ্যান ও অধ্যবসায়ের ঘনতমসাচ্ছন্ন সত্তার গভীরতর বুঝ বিবেচনা, পর্যালোচনার অভীপ্সা এই নিবন্ধে ধৃত। পত্র আঁকার গঘীয় সাহিত্যিকদের প্রতি কুর্নিশ জানাই। 

‘আরও একজন সফদার অথবা মান্টো অথবা জীবনানন্দ! আমরা বাঁচতে দিইনি তাঁকে। আমরা আঁকার কাগজ, তুলি, স্প্যাচুলা তুলে দিইনি তার হাতে। আমরা গভীর আদর আর প্রগাঢ় চুম্বনের যমজ সঙ্গম করতে দিইনি কোনো অপার্থিব সারারাত জুড়ে তাঁকে! ভালোবাসেনি তাঁকে মানুষ! ভালোবাসেনি তাঁকে রাষ্ট্র! ভালোবাসেনি তাঁকে ঈশ্বর!

কিন্তু প্রেম দিয়েছে তাঁরে প্রকৃতি। ফসলের কোমল শরীর ছুঁয়ে সে নিজেকে পাগল করে তুলেছে!!! দারুচিনি-দ্বীপের ঘাস, ঠোঁটে তাঁর তুলতুলে স্তনের বাদামি বোঁটা ধ’রে দুধ খাইয়েছে!

ও আমার ভিনসেন্ট, ও আমার অকরুণ মৃত্যুর দেবদূত, আজ আয় তুই, আমি তোর প্রেম হব আজ; তোর জন্য আতীব্র ক্যানভাস খুলে দেব আমি আমি আমি
আয় উন্মাদ! রং মাখা, আয়! আয়!
আয় ভিনসেন্ট আমার।’ ২
‘বেশিরভাগ লোকের কাছে আমি কে?
একজন অকর্মা, উদ্ভট, খ্যাপাটে মানুষ। সেই লোক সমাজে যার কোনো অবস্থান নাই, থাকবেও না।
যদি তেমনটাই হয়ে থাকে, খুব ভালো। আমি আমার শিল্পকর্মের মধ্যে দিয়ে দেখিয়ে দিতে চাই, এই খ্যাপাটে লোকটারও আছে সুন্দর একটি হৃদয়।’ ৩
ভিনসেন্টের ক্যানভাস দেখলেই ঘুরে ফিরে রবি ঠাকুরের গানের কলি মনে পড়ে ...
‘আলোকে মোর চক্ষু দুটি, মুগ্ধ হয়ে উঠল ফুটি,
হৃদগগনে পবন হল সৌরভেতে মন্থর......’

বিখ্যাত ইংরেজ লেখক সমারসেট মম সেই কবে একটা ছোটগল্প লিখেছিলেন, যার শিরোনামই ছিল ‘দ্য লেটার’। সেখানে একটা লাইন ছিল, লেটার রাইটিং ইজ আ লস্ট আর্ট। এই শিল্পোন্মাদ ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ লোকটা তার লস্ট ফর লাইফের মতোনই তার লস্ট আর্ট লিখে গেছেন পত্রাবলিতে। এই খুনখারাপি শিল্পী চোখ-ঝলসানো রঙের কারবারি লোকটা বরাবরের মতো আমাদেরকে তার মুরিদ-ভক্ত করে রাখল।

শুধু আমি নই, দুনিয়াজোড়া ভক্তদের কাছে কেন তার রচিত লেটার্স ম্যাটার্স হয়ে রইল? কেননা, কালজয়ী আঁকিয়ে চিত্রকলায় নতুন পথ তৈরি করে অজান্তে বাগ্মী লেখকও হয়ে ওঠেন এই গঘ পত্রকার! 

আচ্ছা, মানুষ কেন চিঠি লেখে?

পত্রদাতার লেখনীর সুন্দর প্রতিফলন ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ এই চিঠির মাধ্যমে জানতে পারত পত্রলেখকের আবেগের অনুরণন, আনন্দের হাতছানি ও দুঃখের বিষাদগাথা। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটি কবিতার অংশ এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছেন- 

‘কত চিঠি লেখে লোকে, কত সুখে, প্রেমে, আবেগে স্মৃতিতে, কত দুঃখ ও শোকে।’

‘উপমহাদেশীয় প্রাচীন ইতিহাস অনুসারে জানা যায়, পূর্বে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য পাঠানো হতো কাসিদ বা ডাকবাহক। তবে দূরবর্তী অঞ্চলে খবর পাঠানোর জন্য ব্যবহার হতো পায়রা বা কবুতর। এর জন্য পায়রাকে রীতিমতো প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। পায়রার পায়ে বেঁধে দেওয়া ছোট সংবাদের চিরকুট, যা পৌঁছে যেত নির্দিষ্ট গন্তব্যে। সম্রাট চেঙ্গিজ খাঁ তার অধিকৃত রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতেন এই কবুতরের মাধ্যমে। তার পর যত দিন এগিয়েছে ডাক ব্যবস্থায় এসেছে নতুন সংযোজন। দিল্লির প্রথম সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেকের শাসনকালে ডাকব্যবস্থায় যুক্ত হয় ঘোড়ার ব্যবহার। পর্যটক ইবন বতুতার বিবরণী থেকে জানা যায়, সেই সময়ে দুইভাবে ডাকব্যবস্থার প্রচলন ছিল। এক. পায়ে হেঁটে সাধারণ ডাক বিলি-বণ্টন ও অন্যটি হলো জরুরি অবস্থায় যেমন- কোনো বহিরাগতদের আক্রমণের সংবাদ অথবা যুদ্ধের 

জয়-পরাজয়ের সংবাদ প্রেরণ করা হতো ঘোড়ার ডাকব্যবস্থার মাধ্যমে। শেরশাহের শাসনকালে ভারতীয় ডাকব্যবস্থার আমূল সংস্কার ঘটে। তিনি ডাকব্যবস্থার সুবিধার্থে নির্মাণ করেছিলেন সোনারগাঁও থেকে সিন্ধু প্রদেশ পর্যন্ত দীর্ঘ রাস্তা।

ভিনসেন্ট বেশিরভাগ চিঠি লিখেছিলেন ভাই থিওকে। প্রথম ও শেষ চিঠি লেখেন থিও ভাইকে। প্রথমটি ২৯ সেপ্টেম্বর ১৮৭২, শেষ চিঠি ২৯ জুলাই ১৮৯০ সালে মৃত্যুর দিনকয়েক আগে। চিঠি না লিখে থাকতে পারতেন না ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ। চিঠি লেখা ছিল তার রক্তে। আসলে উনিশ শতকে চিঠি লেখাটা উল্লেখযোগ্য সামাজিক দক্ষতা হিসেবে গণ্য হতো। ভ্যান গঘ পরিবারেও এই চিঠি লেখার চল ছিল মূলত একটি কারণে। অল্প বয়সে ভ্যান গঘ পরিবারের ছেলেমেয়েরা নানা কাজে বাড়ি ছেড়ে দূরে থাকত। চিঠি লিখে তারা নিজেদের খবরাখবর দিত, বাড়ির খবর নিত, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ দৃঢ় করত। বাড়ির লোকেরা তাদের দূরে থাকা ছেলেমেয়েদের খবর জেনে নিশ্চিন্ত বোধ করতেন। সপ্তাহান্তিক চিঠি লেখা দুপক্ষের অবশ্য-কৃত্যের অন্তর্গত ছিল। 

এই পরিবারের সদস্য হয়ে ভিনসেন্ট চিঠি না লিখে থাকবেন কী করে। সবচেয়ে বেশি চিঠি লিখেছিলেন ভাই থিওকে- ৬৫১টা, ভাইয়ের বউকে একটা, ভাই আর তার বউকে সাতটা। ডাচ শিল্পী আন্তন ভ্যান র‌্যাপার্ডকে লিখেছিলেন ৫৮টা। ফরাসি শিল্পী এমিল বার্নার্ডকে লিখেছিলেন ২২টা। বোন ভিলেমিয়েন আর মা আন্নাকে লিখেছিলেন যথাক্রমে ২১ আর ১২টা চিঠি। মা-বাবাকে একসঙ্গে লিখেছিলেন মাত্র পাঁচটি চিঠি। ভ্যান গঘের সঙ্গে সঙ্গে যে ফরাসি শিল্পীর নাম উঠে আসে সেই পল গগ্যাঁকে লিখেছিলেন মাত্র চারখানা চিঠি। এ ছাড়া বিভিন্ন পরিচিতজন, শখের শিল্পী এবং তার স্বল্পকালের ছাত্র আন্তন কোর্সমেকার্সকে, সমালোচক আলবার্ত অরিয়েরদের সব মিলিয়ে লিখেছিলেন ১৬০টি চিঠি। অন্যদিকে ভিনসেন্ট পেয়েছিলেন মাত্র ৮৩টি চিঠি। সবচেয়ে বেশি থিও আর তার বউয়ের কাছ থেকে, ৪৬টা। পল গগ্যাঁ তাকে লিখেছিলেন ১৬টা চিঠি। অন্যরা দুটি-একটি করে। ডাকঘরকর্মী যোসেফ রুলাঁর কাছ থেকে পেয়েছিলেন চারটি চিঠি। এই সংখ্যায়ন থেকে সিদ্ধান্ত করাই যেতে পারে- উত্তরের প্রত্যাশায় নয়, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ চিঠি লিখতেন প্রাণের তাগিদে। নিজস্ব ভাবনাচিন্তা উপলব্ধি, কাজের বিবরণ, দেশ দেখার অভিজ্ঞতা ধরে রাখার জন্য। এদিক দিয়ে তার চিঠিকে কি দিনপঞ্জির সঙ্গে তুলনা করা যাবে?’ ৪ 

মানব ইতিহাসজুড়ে এমন শিল্পীর উদাহরণ যথেষ্টই রয়েছে, যারা শিল্প সম্পর্কেও লিখেছেন। যেমন- সিসিয়নের জেনোক্রেটস, একজন গ্রিক ভাস্কর; যিনি ২৮০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তাকে বিশ্বের প্রথম শিল্প ইতিহাসবিদদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চিত্রশিল্পী অ্যাপেলিস ৩৩২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে শিল্প কৌশল সম্পর্কে লিখেছেন। ষষ্ঠ শতাব্দীর চীনে, Xie He Six Principles of Painting নিয়ে লিখেছিলেন, যেখানে চিত্রকর জোর দিয়েছিলেন যে, ‘আত্মা’ বা শক্তি চিত্রকলায় প্রাথমিক গুরুত্ব। ইতালির তুস্কানো চিত্রশিল্পী এবং ভাস্কর জিওর্জিও ভাসারি ১৫৫০ এবং ১৫৫৮ সালে প্রখ্যাত পেইন্টার, ভাস্কর এবং স্থপতিদের খুবই আকর্ষণীয় দুটি জীবনী সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন। যদিও আজ একজন লেখক এবং ইতিহাসবিদ হিসেবে ভাসারি বেশি পরিচিত, তার ভূমিকা অবশ্যই মিকেলাঞ্জেলো, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এবং অন্য অনেক রেনেসাঁ শিল্পীর জীবন ও কাজকে রঙিন করেছে।  

শিল্পীদের লেখা-পড়া মানে তাদের কাজের গভীরতা উপলব্ধি করা। এটি আমাদের বিভিন্ন স্তরের কাজ দেখায়, শিল্পের সঙ্গে একজন দর্শকের সম্পর্ককে সমৃদ্ধ ও উৎসাহিত করতে পারে। সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পী, যিনি ব্যাপকভাবে লিখেছেন তিনি ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ। আজ, তার চিঠিগুলো অনেক শিল্পী তাদের নিজস্ব কাজে প্রয়োগ করার জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পাঠ হিসেবে পড়েন। ভ্যান গঘ রঙ, রচনা, আলো এবং ছায়া, মাধ্যম এবং তিনি যেভাবে মানুষ এবং ল্যান্ডস্কেপ দেখেছিলেন সে সম্পর্কে লিখেছেন। এই অন্তর্দৃষ্টিগুলো যে কোনো পাঠকের জন্য, কীভাবে আরও গভীরভাবে দেখতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় দর্শন এবং সহনশীলতা বোঝার একটি প্রাথমিক অভিজ্ঞতা হাজির করে।

শিল্প সন্ধানে একটি জীবন; লেখায় জীবন, পড়ার জীবন; আবেগপ্রবণ, ব্যক্তিগত সংযুক্তি এবং যাপন বিশ্বাস বিষয়ে উদ্দীপিত একটি জীবন। কিছু শিল্পী আছেন, যাদের জীবন তাদের কাজের সঙ্গে এতটাই জড়িত যে, তাদের জীবনী এবং তাদের শিল্প এক ধরনের পৌরাণিক মর্যাদা অর্জন করে; তবে তাদের মধ্যে অসামান্য হলেন ডাচম্যান ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ। 

পাখির বাসা

এমনকি আরও উল্লেখযোগ্যভাবে ভ্যান গঘের কাজের প্রশংসা কেবল তার অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক জীবনের আশ্চর্যজনক সমৃদ্ধি এবং বৈচিত্র্যের কারণে নয়, এর কারণ তার সম্পর্কে তথা তার শিল্প এবং লেখা চিঠিপত্রে তার অব্যাহত প্রকাশ। তিনি বহুভাষী ছিলেন, অন্যের শিল্পের প্রতি ক্রমাগত আগ্রহী ছিলেন, এমনকি জাপানি প্রিন্ট সংগ্রহের বিন্দু পর্যন্ত যখন তার জীবন দারিদ্র্যের দ্বারপ্রান্তে ছিল তখনও চমকপ্রদভাবে তার পাঠ ছিল নিয়মিত। তিনি এমন তীব্রতার সঙ্গে জীবনযাপন করেছিলেন, যা একজন পর্যবেক্ষকের পক্ষে কল্পনা করা কঠিন। ফলে প্রয়োজন ভ্যান গঘ সম্পর্কে যে কোনো নতুন পর্যালোচনাকে স্বাগত জানানো। 

হ্যান্স লুইজটেন যেমনটা বলেছেন, ‘আমরা সত্যি জানি না তিনি কীভাবে কথা বলতেন, আমরা জানি না তিনি কীভাবে হাঁটতেন। এই চিঠিপত্রের মাধ্যমেই আমরা তাকে পেতে পারি সবচেয়ে কাছাকাছি।’ নিঃসন্দেহে যা তার বেশ কাছাকাছি।

তার মতে, চিঠিগুলো একটি আবেগময় এবং ব্যবহারিক যাপন উভয় ধরনের মিশেলে বিরল আত্মজীবনী তৈরি করতে ব্যবহার হয়, যা প্রতিদিনের কথাবার্তায় ভরা; কিন্তু ডামাডোলের ধারেকাছেও যায় না! প্রাণবন্ত পর্যবেক্ষণ, প্রেম সম্পর্কে তার চিন্তাভাবনা, অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে ভাই থিওর সঙ্গে তার জটিল সম্পর্ক, তাকে সমর্থনকারী এবং মাঝে মাঝে গভীর বিরক্তিকর এবং গগ্যাঁর সঙ্গে তার আপাত বিরোধাত্মক বন্ধুত্বউভয়ই মনে ধারণ করেছিলেন। 

কিউরেটর Ann Dumas বলেছেন, ... ‌‘Van Gogh, not the myth, the mad man who painted in a crayy freûy.’

যদি আমরা দেখতে ও পড়তে চাই শিল্প, স্বাধীনতা ও আত্মানুভুতি সম্পর্কে তবে পয়লা পছন্দ হতে পারে গঘ পত্রকারের আঁকা পত্র। একাধারে আঁকা হয়ে ওঠা লেখার শরীরজুড়ে। তেমনি লেখা হয়ে উঠল আঁকার রেখায় ভর করে। তার হৃদয়গ্রাহী চিঠির উদ্দেশ্য নিজেকে ও পরে আমাদের পরিমার্জিত করা। প্রকৃতপক্ষে তার চিঠিগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে বাগ্মিতা ও বুদ্ধিমত্তায় ঠাসা।

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ১৫০টি পত্রে স্কেচ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই কাজগুলো ভ্যান গঘের সবচেয়ে বিখ্যাত তেলরঙের চেয়ে কোনো উপায়ে কম উল্লেখযোগ্য বলা যাবে কি? কেননা এসব পত্রের মধ্য দিয়ে একজন শিল্পী হিসেবে ভিনসেন্টের চলমান অগ্রগতি এবং তার নৈপুণ্য সম্পর্কে অন্তরঙ্গ সূক্ষ্মতা দেখতে পারেন। ভ্যান গঘের চিঠির স্কেচগুলোতে বিশদ বিবরণ এবং এমনকি রঙের ব্যবহারে একটি আশ্চর্যজনক মনোযোগ রয়েছে। ফলস্বরূপ, চিঠিগুলোর মর্মস্পর্শী বিষয়বস্তু এবং তাদের মধ্যে অনেক সূক্ষ্ম মাস্টারপিস রয়েছে, ভ্যান গঘ চিঠিগুলোকে সত্যিই শিল্পকাজ করে তুলেছেন।

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ তার ভাই থিওর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের এবং পল গগ্যাঁ এবং এমিল বার্নার্ডসহ সহশিল্পীদের কাছে শত শত চিঠি লিখেছিলেন। তার অনেকগুলোতে তিনি শ্রমসাধ্য বিশদ এবং সুন্দর গদ্যে তার কাজের অগ্রগতি বর্ণনা করেছেন। ভ্যান গঘের চিঠিগুলোর আলোড়ন সৃষ্টিকারী ফল হলো- তা মার্জিতভাবে পাঠক দর্শক হিসেবে আমাদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীদের অন্যতম ব্যতিক্রম একজনের চোখের মাধ্যমে শিল্পবিশ্বকে দেখতে দেয়।

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ শুধু একজন প্রসিদ্ধ শিল্পীই ছিলেন না, তিনি তার সংক্ষিপ্ত কর্মজীবনে তৈরি করা প্রায় ৯০০টি ব্যতিক্রমী চিত্রকর্মের জন্য বিখ্যাত; কিন্তু তিনি তার বন্ধু এবং পরিবারকে ৮০০টিরও বেশি চিঠি লিখেছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে তার পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে, এই চিঠিগুলোর বেশিরভাগই তার ছোট ভাই বিশ্বস্ত থিওকে লেখা। ভ্যান গঘের জীবনের ঘটনাবলির বিস্তারিত ও অনুজের প্রতি স্নেহপূর্ণ চিঠিপত্রও ছিল। 

‘But the moment I read Van Gogh's letter I knew what art was, and the creative impulse. It is a feeling of love and enthusiasm for something, and in a direct, simple, passionate and true way, you try to show this beauty in things to others, by drawing it. And Van Gogh's little drawing on the cheap note paper was a work of art because he loved the sky and the frail lamppost against it so seriously that he made the drawing with the most exquisite conscientiousness and care.’৫ 

বারবার তিনি নিজের থেকে বেরিয়ে এসে, তার চোখ দিয়ে, জলপাই গাছের নীরবতা অনুভব করতেন এবং পাতার ছড়িয়ে পড়া আনন্দের স্বাদ নিতেন, যখন তারা ধীরে ধীরে উদিত সূর্য দ্বারা আলোকিত হতো। বারবার ঘুরে ফিরে, দৃশ্যমানতাকে অন্তর্চক্ষু দিয়ে গমক্ষেতে মধ্যাহ্নের আলোছায়া সোনালি রং বা প্রতিবেশীর মুখের বিষণ্ণ মেজাজের পথ ধরে অনুপ্রবেশ করেন। যদিও তিনি প্রায়শই তার ভাই এবং কয়েক বন্ধুকে লিখেছেন (উজ্জ্বল উদারতা এবং মায়ার চিঠি), শুধু অঙ্কন এবং লেখার মধ্যে তিনি এই চলমান মিলনকে প্রকাশ করতে সক্ষম হন, দৃশ্যমানতাকে তার বুকে স্থিরভাবে লীন করে সৃষ্টিতে ঢেলে দিতে পারেন, এমনকি তার প্রতিটি চিহ্ন তথা দৃশ্যমানতাকে ফিরিয়ে আনেন অপূর্ব কুশলতায়। ফলত তার আঁকা চিত্রগুলো হলো দৃষ্টির জানালা, যার মাধ্যমে আমরা এমন একটি পৃথিবীর দিকে তাকাই, যা চাক্ষুষতার চেয়ে কম জীবন্ত ও বুদ্ধিবৃত্তিক নয়।

ভ্যান গঘ পত্রে নানাভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন যেমন- ‘দুঃখের অনুভূতি দ্বারা পরাস্ত’ এবং একটি অবিরাম ‘হতাশার বিরুদ্ধে সংগ্রাম’, ‘বিরক্তিকর বা ভারসাম্যপূর্ণ’, ‘একটি জিনিস বা অন্যটির জন্য দরকারি নয়’ হিসেবে দেখে। তার জীবনের উদ্দেশ্য এবং দিকনির্দেশনার অভাব। ভাইদের মধ্যে সম্পর্ক ‘উভয় পক্ষের উপর আরও আস্থাশীল’ হওয়ার জন্য একটি ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি কিছু স্থান, সমর্থন এবং আশাবাদী হওয়ার জন্য একটি আবেগপূর্ণ সম্পর্ক ও প্রত্যাশা করেন কারণ তিনি তার আরাধ্য পথ খুঁজে পান! ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ তার ছোট ভাই থিওকে চিঠিগুলো লিখেছিলেন ২০ বছর ধরে। এই পত্রালাপে চিত্রশিল্পীর চিন্তাভাবনা তার ক্যানভাসের মতোই উজ্জ্বলতা এবং স্বচ্ছতাকে নথিভুক্ত করে। সাহিত্যে অবদান হিসেবে এই চিঠিগুলো লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নোটবুক এবং বেনবেনেতো সেলিনির আত্মজীবনীর কথা মনে করায়। অধিকাংশই প্রায়শ প্রকাশ করে যে, ভ্যান গঘের জীবন হতাশার কারণে ৩৭ বছর বয়সে আত্মহত্যার মাধ্যমে শেষ হয়ে গিয়েছিল!

ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন যে, একজন ব্যক্তির মন এমন একটি অহং বা আত্মা নিয়ে গঠিত, যা তিনটি বিষয়ের অধীন। প্রথমটি হলো- বাহ্যিক জগৎ বা বাস্তবতা। দ্বিতীয়টি হলো- কর্মপ্রেরণা। তৃতীয়টি হলো- নিজের বিবেক বা অতিঅহং। ভ্যান গঘ যে বাহ্যিক বিশ্বে বাস করতেন সে সম্পর্কে কিছু লোক বাদে সবাই তার কাজের প্রশংসা করতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং শিল্পী তার পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবন দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করেছিলেন। তার কর্মস্পৃহা বা প্রেরণা সম্পর্কে বলা যায়- যার বেশিরভাগ অংশে শৈল্পিক সৃজনশীলতার জন্য প্রাণিত হয়েছিল। তার বিবেক সম্পর্কে বলা যায়, যা তাকে সীমাবদ্ধ করে এবং তা ছিল আত্ম-ধ্বংসের প্রধান শক্তি।

শেষ চিঠি

ভ্যান গঘ মিথ, অন্ধকার হতে আলো 
ভ্যান গঘের কাছে তার ভাই থিওকে লেখা চিঠিটি তার কাছে পেইন্টিংয়ের মতোই অপরিহার্য ছিল, এবং প্রকৃতপক্ষে 

প্রায়শই কোনো একটি চিত্র সম্পূর্ণ যতক্ষণ না হচ্ছে ততক্ষণ তিনি এক একটি চিঠিতে তার ধ্যানমগ্নতার বিবরণী দিয়েছেন। চিঠিপত্রের বিভিন্ন মেজাজ এবং তার 

স্ব-প্রতিকৃতিগুলোর মধ্যে কেবল যন্ত্রণাদায়ক বহিরাঙ্গের প্রতিফলন করে তা-ই নয় বরং শান্তির জন্য গৃহস্থ লোকের আকাঙ্ক্ষাও প্রতিফলিত।

Julian Bell writes, The painter may be in hell, but painting is still heaven.’

ভ্যান গঘের শেষ চিঠিটি তার আগের শত শত চিঠির মতো চিন্তাশীল, স্পষ্টবাদী এবং সর্বোপরি, একজন শিল্পী হওয়ার চলমান এবং কঠিন অধ্যবসায়ের সঙ্গে আবেগও জড়িত।

প্রকৃতপক্ষে, ভ্যান গঘের জন্য পাঠ চিত্রকলা চর্চার মতোই বাধ্যতামূলক ছিল, ‘আমার বইয়ের প্রতি কমবেশি অপ্রতিরোধ্য আবেগ রয়েছে এবং আমার মনকে উন্নত করার ক্রমাগত প্রয়োজন, অধ্যয়নের মতোই ঠিক তেমন রুটি খাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।’

ভ্যান গঘ বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই ‘ভ্যান গঘ মিথ’ সম্পর্কে কথা বলেন, যে পাগলাটে শিল্পী দুর্ঘটনাজনিত প্রতিভা তৈরি করে। এটি ক্ষতিকারক, আরভিং স্টোনের বেস্টসেলিং 

বায়ো-উপন্যাস ‘লাস্ট ফর লাইফ’ এবং পরবর্তীতে কার্ক ডগলাস অভিনীত চলচ্চিত্র দ্বারা তা করা হয়েছে; কিন্তু এটা একটা মিথ।

আমরা এটি জানি কারণ ভ্যান গঘ আমাদের জন্য গল্পের আরেকটি দিক নির্দিষ্ট করে রেখে গেছেন। তার বেঁচে থাকা ৮০০টিরও বেশি চিঠি, সব মিলে এক মিলিয়ন শব্দের কাছাকাছি। প্রেম, বন্ধুত্ব, সাহিত্য, ধর্ম ও সর্বোপরি শিল্প সম্পর্কে তার ভাই এবং অন্যদের সঙ্গে সেসব আশ্চর্যজনক কথোপকথন।

‘তিনি একজন চমৎকার লেখক। আমি অন্য কোনো শিল্পীর কথা ভাবতে পারি না, যে তার নিজের শিল্প সম্পর্কে এত ব্যাপক এবং বুদ্ধিমানতার সঙ্গে সবিস্তার লিখেছেন। এক দিকে চিঠিগুলো এক একটি অগ্রগতির প্রতিবেদন, যা থেকে বিশেষভাবে থিও জানতে সক্ষম ভিনসেন্টের সময় কীভাবে কাটছে।’

Jan Hulsker, for decades an authority on Van GoghÕs correspondence, unreservedly placed the letters on the level of world literature: ÔVincent was able to express himself splendidly, and it is this remarkable writing talent that has secured the letters their lasting place in world literature, quite apart from their importance for the study of his life and work. ... In may letters his emotions and beliefs are expressed so strongly and convincingly that a ‌‘real’ writer could hardly have improved upon them’.২ 

Of course, qualifications like this are in part personal, but if, under the essence of literature, one understands that it expresses the generally valid through the specific, the condition humaine, then it cannot be denied that Van Gogh’s letters are indeed highly literary.

ভ্যান গঘ একজন প্রফুল্লচিত্ত, চিন্তাশীল, আবেগপ্রবণ পত্র রচয়িতা ছিলেন। তার চিঠিগুলো কখনো শুরু হয়, ‘আপনি কি আমাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কয়েকটি সাধারণ ব্রাশ পাঠাতে পারেন?’- ল্যান্ডস্কেপের কাব্যিক চিত্র বর্ণনার জন্য তিনি হয়তো তখন আঁকছিলেন।

Hans Luijten, who with Leo Jansen and Nienke Bakker formed the core of the Letters team at the Van Gogh Museum, says: “চিঠিগুলির মাধ্যমে আমরা তাকে একজন সাধারণ মানুষ, একজন সংগ্রামী মানুষ, একজন শিল্পী হিসাবে তার জীবন গড়ে তুলতে দেখি। একসময় তার ব্যক্তিত্ব তার হাতের লেখায় উদ্ভাসিত হতে শুরু করে। আপনি তাকে বিভিন্নভাবে ভাবতে, সংযোগ করতে, ক্রস আউট করে দেখতে পারেন। লেখক থেকে চিত্রকর নাকি চিত্রকর থেকে লেখক? ভ্যান গঘের এ তীর্থযাত্রা তার কৈশোর থেকে, তিনি শব্দে এঁকেছিলেন, একজন উদাসী পাঠকের সমস্ত তীব্রানুভূতির শক্তি দিয়ে ডাচ, ইংরেজি ও ফরাসি- তিনটি ভাষার কথাসাহিত্য এবং কবিতায় নিমগ্ন হয়েছিলেন।

কখনো কখনো আপনি তার হাতের লেখা থেকে জানতে পারছেন যে, তিনি পান করছেন বা ক্লান্ত। তিনি প্রায়শই দিনের শেষে লেখেন। এবং যখন তিনি বলেন, ‘আমি আজ ভোরে উঠেছিলাম,’ তার মানে তখন ভোর প্রায় ৪টা।”

তীব্র অব্যক্ত রাগ
চিঠিগুলো নিজেরাই একটি দুর্দান্ত আত্মজৈবনিক চিত্র প্রদান করে। আমরা সেসবকে আত্মজৈবনিক পত্র বলি বা বলি চিঠিপত্রে একটি জীবন। ভ্যান গঘ ভেবেছিলেন শব্দ এবং ব্রাশস্ট্রোক দিয়ে একজন শিল্পীর আঁকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এই চিঠিপত্র আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, তিনি উভয় মাধ্যমেই কেমন একজন অসাধারণ শিল্পী ছিলেন।

ভ্যান গঘের একটি সূক্ষ্ম জীবনবীক্ষা কিভাবে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল তা তার পত্রপাঠে পরিষ্কার হয়। যদি কেউ তার এই কৃতিত্বে অভিভূত হতে চায়, তবে পত্রপাঠে এই বিস্ময়কর সৃজনশীল জীবনের একটি আকর্ষণীয় দিক উন্মোচন করবে। হ্যাঁ, এটিও শিল্পই। গুরুত্বপূর্ণও; কিন্তু এখানে আমরা শিল্পসৃষ্টির পেছনের মানুষটিকে আরেকটু বেশি বুঝতে শিখি। এসব পত্রছবি ভাষান্তরের কোনো দিব্যি নেই; শুধুই পড়া।

যে পড়ায় গঘ পত্রকারের দিল দরিয়ার মাঝে দেখা মেলে পত্রআঁকার এক আজব কারখানা। যেসব চিঠিতে ধরা থাকে রচয়িতার নিজের মায়ানুভূতির মোড়কে আপাদমস্তক এক বেদনার্ত প্রতিরূপও!
‘চিনিলাম আপনারে
আঘাতে আঘাতে
বেদনায় বেদনায়।’৬ 

দুনিয়াসুদ্ধ আগ্রহী সকলেই কমবেশি জানেন ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ সম্বন্ধে। এই কথা যদি কবুল কইরা লই, তাইলে তার সম্পর্কে নতুন কইরা লেখনের নেসেসিটি কী? ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, তার চিত্রকর্ম, পত্র সাহিত্যকর্ম রচিত যে যাপনলীলাকে কেন্দ্র কইরা, তা আরেক কিসিমের লাইনে বয়ানের লিপ্সা। যে লিপ্সার কেন্দ্রে বিরাজ করেন স্বয়ং ভ্যান গঘ ওরফে ভিনসেন্ট। তার বীরোচিত শিল্প বিরচন কালে কালে দর্শন ও তেলাওয়াত হইছে, হইতেছে। কবুল কইরা নিতে অসুবিধা দেখি না যে, শিল্পের দুনিয়াদারির মেহনত আখেরে সফল, তার তরজমা করার একশো এক নিদানের পয়লাটা কিন্তু গঘ। এইরকম বুঝ যার তার জন্য গঘ কালাম পাঠ, তার তর্জমা, শানেনযুল খুঁজতে ক্ষেইপা যাওন ও এক তকদীর। এই তকদীরের বরাতে জানা-বুঝা-দেখা-অনুভব করবার তাছির, বলা ভালো খ্যাপামো এই মুসাবিদার আসল গোমর। এই দেখা-দেখি, চিন-পরিচয় সাতবাসি পশ্চিমা নকল না হইয়া পূর্বাচীর আগম নিগম ধারাপাতে হওয়াই দস্তুর আমার কাছে। 

পরিযায়ী একাকিত্বে দুঃখী ভিনসেন্ট মানবিক হৃদয়ের অপার ঐশ্বর্যের ধারক ছিলেন। মানসিক উথালপাতাল, দ্বিধাদ্বন্দ্ব, আশা-নিরাশা উজাড় করে দিয়েছেন চিঠির পাতায় পাতায়। চিত্র শিল্পের ইতিহাসে আলোচনা, সমালোচনা, তত্ত্ব বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা যতই থাকুক শিল্পীর নিজের লেখভাষ্যে নিজের অকপট কথার এমন নজির সত্যিই বিরল।

শিল্পীর দুর্মর বাঁচার একটি ধাঁচ যদি হয় শিল্পের জন্য প্রাণপাত, তবে ভ্যান গঘই সে পথে উৎসর্গকৃত প্রাণের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। স্বপ্নপূরণের সাধসিদ্ধির এমন ব্যাকুল পরানপারা জগতের আর কোনো শিল্পীর মধ্যেই কি পুনরাবৃত্তি হতে পেরেছে? তার অন্তর্গত ব্যাকুলতার সাফকবলা দলিল হয়ে ওঠে- পরসমাচার, প্রাপক, প্রেরক, ইতি লিখিত অন্য আরেক মাত্রার রেখা লেখা চিত্রকলায়।

...‘ভ্যান গঘ যদি একটি ছবি না এঁকেও শুধুমাত্র চিঠিই লিখে যেতেন, তাহলে শিল্পী বা সাহিত্যব্রতী হিসেবে আমাদের মনে তার একটি ভাববিগ্রহ ভাস্বর থাকত। এখন পর্যন্ত সংখ্যায় আটশোর চেয়েও বেশি চিঠিপত্রের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে, যেগুলোর রচয়িতা তিনি।

সংশয় নেই, এই ভাবসঙ্গের অজস্র আবহবিভাব এই চিঠিগুলোকে ঋদ্ধ করে তুলেছে। অন্তঃকরণ এবং উপকরণের সম্ভারবৈচিত্র্যে আমাদের এত আ-ঋণী করে রেখেছে যার ফলে তার বিষয়ে লেখা জ্ঞানগর্ভ সন্দর্ভসমূহ না পড়ে শুধু তাদের ভিতরে মজে থাকলেই আমাদের তাবৎ ঔসুক্য পুরস্কৃত হতে পারে।

কিন্তু তত্ত্বগত ও তথ্যগত মূল্য বাদ দিয়েও ভিনসেন্টের লেখা চিঠিগুলোর মধ্যে অতিশায়ী এমন এক অতিক্রান্তি ছড়িয়ে আছে, যার সাহায্যে তার মনের একেবারে মুখোমুখি হয়ে আমরা দাঁড়াই, নিজেদের সীমাবদ্ধতা বিষয়ে বড় অকৃতার্থ বোধ করি।’৭ 

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের আরদ্ধ দুরূহ শিল্পব্রত পালনকে ঘিরে যে অধরা মায়া বিচ্ছুরিত হয়েছে, তা অনেক বেশি আদরণীয় হলেও এসব ঘিরে আরোপিত কিংবদন্তি রহস্য মহিমা গঘের পপুলার শিল্পী ইমেজ বটে! তার বিষণ্ণতা, ছন্নছাড়া, উদ্ভট, পাগলা, কানকাটা, উপোসি, ব্যর্থ প্রেম, দুঃখবিলাসী, এবিসিনিথি নেশাগ্রস্ত, ছবি বিক্রি না হওয়া- এসবই এই শিল্প অধিকর্তার পপুলার পোর্ট্রেটের খোলনলচে! অথচ তার সঙ্গে নির্মমতর বিরোধাভাসেরই পরিহাস এসব। তার জীবনরঙ সৃষ্ট কাজকে যেমন পড়তে হয় তেমনি বেশ্যাগমন, এবিসিনিথি পান বিষয়ক কানাঘুষাকে আলগোছতে সরিয়ে রাখতে হয়। সৃষ্টির অপার আনন্দে যিনি বেঁচেছেন, বাণিজ্য বুদ্ধির 

বেচা-বিক্রির লাভের খতিয়ান দিয়ে তার সৃষ্টির পার্থক্যকে মূল্যায়ন করতে যাওয়া বেদাত। বিশ্বাসে জীবন্ত, বিন্যাসে রঙময় উষ্ণতায় মোড়া সৃজনাত্মক ভাবুকতার এক একটি গঘীয় শিল্প অভিজ্ঞতার মধ্যে পরস্পর বিভাজক কোনো রেখা নির্ণয় করে দেওয়া অসম্ভব।

অতি স্বল্পায়ু, অনিকেত, অস্থির ও প্রায় নিঃসঙ্গ; কিন্তু বিস্ময়করভাবে সৃষ্টিশীল এক জীবনের শেষে সবকিছুর ওপরে ভ্যান গঘ ছিলেন এক কর্মযোগী, যিনি নিজের কাজে আর বিশ্বাসের মধ্যে নিজেকে নিবেদিত করে দিয়েছেন। তাই প্রেমে, বিশ্বাসে, সংগ্রামে ক্ষতবিক্ষত হয়েও জীবনের শেষপ্রান্তে এসে বলতে পেরেছিলেন, ‘আমি অবশ্যই আজও শিল্প আর জীবনকে ভীষণ ভালোবাসি।’ যদি ভিনসেন্টের পক্ষে পরবর্তীতে তার পত্র রচনার শিল্পায়ুধ, শিল্পকর্মের খ্যাতি ও তার সমুদয় শিল্পের আন্তরিক মানবিক অনুভূতিগুলো প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হতো তবে তিনি ঝুঁকে পড়ে এ সুস্থায়ী কথাই বলতে পারতেন, ‘আমি নিশ্চিত ছিলাম না থিও, তবে আমি অনুভব করেছি একদিন এমনটাই হবে, আমরা এটা করেছি, তাই না? আমরা শেষ পর্যন্ত সফল।’

গঘের বেলায় ইহাই স্থায়ী সত্য ও সফল হইয়া উঠিল- ‘চিঠি লিখুন কেননা ইহা স্থায়ী।’
‘..... অনাহারে রয়েছে যারা শরীরে শরীর ঘষে ঘষে
তাদের ঘামের থেকে রক্তের আঁজলা তুলে এনে
ছবি জুড়ে স্প্যাচুলার আঁচড় টানছে খুঁড়ে খুঁড়ে
ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে কার শস্যের তীব্র অধিকার
দারিদ্র্য দারিদ্র্য খেতে না পাওয়ার মুখগুলো
ভাঙা গাল
ভাঙা চোখ
ভাঙা ভাঙা মৃত্যু-অক্ষর
তোমার পায়ের কাছে বসে আছে নতজানু আগুন
আগুনে দু-হাত পোড়া, ঝলসানো হাতের পাঁচালি
প্যালেটে গুলছে রোগা মেয়েদের ক্ষীণ অঙ্গুলি
যত্নে যত্নে ওঠে, ভরে ওঠে রাত্রির পাতা
মায়ের মুখের মতো গাঢ় আর লাল নীরবতা
তোমাকে হতাশা দিল
হাহুতাশ দিল আজীবন
তুমি তাকে এঁকে দিলে অমলিন সরল কানন
যেখানে পুষ্প ফোটে
যেখানে প্রেমিক এসে দাঁড়ায়
যেখানে প্রেমিকা তার পাত থেকে তুলে এনে ভাত-
প্রেমের আহুতি দেয় পৃথিবীর শূন্য থালায়
করুণ শিল্পী তুমি
অস্তিত্বের করুণতা
তোমার হলুদঘরে আজ সারারাত ঝরে যাবে
সে ছবি আঁকবে তুমি
বিষধর বেদনার ধারে
দাঁড়াবে শিশিরপড়া সবহারা ব্যাকুলতা নিয়ে
আর এক উতল বোধ
আরও এক আত্মহনন
দেখে যাবে এই রাত মৃত্যুর রাতের মতন
আঁতুড়ে আগুন ঢেলে সেই রঙে আঁকল সঙ্গম
নক্ষত্রের যোনি জন্ম দিল
মরণ... মরণ...’ ৮ 

উদ্ধৃতির কর্জ স্বীকার 
১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২. https://ww.wfacebook.com/search/top?q
৩. ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ
৪. পত্রলেখক ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, অনির্বাণ রায়
৫. Brenda Ueland (from If Want to Write: A Book about Art, Independence and Spirit)
৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রূপনারানের কূলে
৭. অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, শিল্পের অন্তর্বলয় বিপজ্জনক দুই শিখর, ব্যক্তি ও রচয়িতা, প্রমা, ষোড়শ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা।
৮. ঝিলম ত্রিবেদী, ভিনসেন্ট! ভিনসেন্ট!  




সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh