আমাদের বইমেলা

উপল বড়ুয়া

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৩০ এএম

বইমেলা। ফাইল ছবি

বইমেলা। ফাইল ছবি

উডি অ্যালেনের ‘মিডনাইট ইন প্যারিস’ আমার খুব প্রিয় মুভির একটি; যেখানে শিল্প-সাহিত্যের তীর্থভূমি হযে ওঠা বিংশ শতাব্দীর প্যারিস জীবন্ত হয়ে হয়ে ধরা দেয় ছবির প্রধান চরিত্র গিলের (ওয়েন উইলসন) কাছে। রাতের প্যারিসে তার সঙ্গে দেখা হয় স্কট ফিটজেরাল্ড, সালভাদর দালি, গারট্রুড স্টেইন, পাবলো পিকাসো, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো শিল্প-সাহিত্যের মহারথীদের। আমাদের কাছেও ফেব্রুয়ারির বইমেলা কী নয় উডি অ্যালেনের ‘মিডনাইট ইন প্যারিস’-এর মতোই জীবন্ত! শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আহমদ ছফা, হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদরা চলে গেছেন বটে তবে এখনো হয়তো তাদের হৃদয় পড়ে আছে বইমেলায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবুজ মাঠে। জীবনানন্দ দাশ চেয়েছিলেন ‘শঙ্খচিল, শালিকের বেশে’ এই ‘কার্তিকের নবান্নের দেশে’ ফিরে আসতে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে যারা এত সমৃদ্ধিশালী করে গেলেন, আমৃত্যু ভালোবাসলেন, তারা কি প্রতিবছর একুশের বইমেলায় একবার ঢুঁ না মেরে থাকতে পারবেন! 

বইমেলায় তাদের অদৃশ্য উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। জনপ্রিয়তার কারণে হয়তো হুমায়ূন আহমেদ অন্য লেখকদের মতোন চষে বেড়াতে পারতেন না মেলায়। কোনো এক স্টলের ভেতর মুখভার করে বসে থাকতেন আর ভক্তরা লাইন ধরে তার বই কিনে অটোগ্রাফ নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। এখন হুমায়ূন আহমেদ জীবিত নেই বটে তবে এখনো মেলায় ছবিসংবলিত সবচেয়ে উঁচু ব্যানার হোক বা কাগুজে মূর্তিটি বানানো হয় তারই। মেলার মাঝখানে অন্যপ্রকাশের স্টলের ওপরে পেছনে হাত রেখে দাঁড়ানো হুমায়ূন আহমেদের মূর্তি আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসতে থাকেন। তার বইয়ের অন্যান্য প্রকাশনীও (অনন্যা, কাকলী, অনুপম) ছবি টাঙাতে ভোলেন না। তার সাহিত্য টিকে থাকবে কি থাকবে না- বছরজুড়ে সেই আলোচনা চললেও মেলায় কিন্তু এখনো তার বই ‘হটকেক-কোল্ডড্রিংস’। অবশ্য এখন জনপ্রিয়তায় হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছেন সাদাত হোসাইন। তিনিও ‘বার্গার, পেস্ট্রি’র মতোন ধুমধাড়াক্কা বিক্রি হচ্ছেন। তরুণ-তরুণীরা যেন তার লেখায় পেয়ে গেছেন ‘জ্যোৎস্না রাতে বনে’ যাওয়ার পথ। কিন্তু একটু বিদেশি সাহিত্য পড়া, জ্ঞানভারে ঈষৎ নত ঈর্ষাকাতর তরুণেরা সাদাতকে নিয়ে নাক সিটকাচ্ছেন। অবশ্য এসবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনিও দুহাত ভরে কাব্য ও কথাসাহিত্য লিখে যাচ্ছেন। বই প্রকাশের উসিলায় কবি মারজুক রাসেল মেলায় এলে জমে যাবে ভিড়। উড়বে ধুলো। মাঝেমধ্যে হুটহাট ছোটদের চমকে দিতে সালভাদর দালির মতোন গোঁফ পাকিয়ে চলে আসবেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। প্রথমা প্রকাশনীতে বসে পাঞ্জাবি পরে হালকা সাদা গোঁফের ফাঁকে মিষ্টি হাসিতে অটোগ্রাফ দেওয়ার সঙ্গে ফেসবুকে লাইভ ভিডিও করতে দেখা যাবে আনিসুল হককে। একদিন রাত ৮/৯টার দিকে হুট করে মেলায় ঢুকে পড়বেন নির্মলেন্দু গুণ। তাকে ঘিরে ধরবে মিডিয়ার বুম। দুয়েকজন তরুণী কি থাকবেন না গুণদার সঙ্গে! একবার নাকি বই নিয়ে মেলায় ঢোকার মুহূর্তে হুমায়ুন আজাদকে আটকে দিয়েছিল পুলিশ। দায়িত্বরত পুলিশেরা এমন বিতর্কিত কাজ করে থাকেন প্রায় সময়। নিরাপত্তার খাতিরে তারা ঘুরে ঘুরে এবারও কি ‘বিতর্কিত’ বই প্রকাশ হয়েছে কিনা নজরদারি করবেন? নাকি কানা ঘুপচি বা বস্তির মতোন অনাদরে অবহেলায় পড়ে থাকা লিটলম্যাগ কর্নারে এসে কোনো তরুণ কবি ধূমপান করছে কিনা দেখবেন? হুমায়ুন আজাদ থাকলে মেলা আয়োজক কমিটির এসব অবহেলা নিয়ে বিদ্রুপ করতেন। ছফা থাকলে চেঁচাতেন আমাদের বই দোকানগুলোতে ভারতীয় বইয়ের বিপুল সমাহার দেখে। 

আয়তনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইমেলা বসে ফ্রাঙ্কফুর্টে। সময়ের হিসেবে হয়তো এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশের বইমেলা। ফেব্রুয়ারির ২৮ দিনের মেলা নিয়েও অনেকের অভিযোগ রয়েছে। পরিসীমা বাড়ানো ও সময়সীমা কমিয়ে আনার পক্ষে অনেকে। তবে এবার তাদের আরও একটা দিন বেশি ‘যন্ত্রণা’ সহ্য করতে হবে। বছরটি যে ‘লিপ ইয়ারের’! লম্বা ১ মাসের মেলা অবশ্য প্রাণ পায় মাঝামাঝিতে এসে। এক সময় একুশে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলা হতো। প্রকাশকদের দাবিতেই হয়তো দিনের সংখ্যা বেড়েছে। দেশে পাঠক সমাজ কমে যাওয়া নিয়ে হা-হুতাশ থাকলেও বেড়েছে প্রকাশকের সংখ্যা। যিনি লেখক, প্রকাশকও তিনি। এটা অবশ্য মন্দ নয়। কবি জসীমউদ্দীন কি নিজের ‘পলাশ প্রকাশনী’ থেকে নিজের বই ছাপাতেন না! 

একটু বিশুদ্ধবাদীরা অবশ্য মেলার ভেতরে খাবারের দোকান দেখে নাক সিটকায়। আবার কেউ বলে, নাগরদোলা হলে ভালো হতো। ভিন্নমত থাকবেই। তবে সেই ভিন্নমত প্রকাশের দায়ে যেন মেলা থেকে ফেরার সময় কারও ঘাড়ে কোপ না পড়ে। জীবন দিতে না হয় হুমায়ুন আজাদ-অভিজিৎ রায়ের মতোন লেখকদের। অনেক অভিযোগ-অনুযোগের পরও বইমেলা আমাদের গর্বের। ভাষার জন্য জীবন দেওয়া একটা জাতির জন্য বইমেলা তুচ্ছ ঘটনা নয়। যে জাতির ইতিহাস মুছে গেছে, অনাথ হয়ে পড়েছে। মেলা মানুষকে একত্রিত করে। লেখকে-লেখকে চেনাজানা হয়। পাঠকের কাছে নিজের সৃষ্টিটাকে পৌঁছে দেওয়া যায়। 

এই অনলাইনের যুগে চাইলে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে আপনি কয়েক ক্লিকে ঘরে বসে পেয়ে যাবেন প্রিয় লেখকের বইটি। নিজের লেখাও প্রকাশ করে ফেলতে পারেন মুহূর্তেই। ই-বুকের পাঠকও এখন কম নেই। তবে মানুষ শেষ পর্যন্ত মানুষের সান্নিধ্যই পেতে চায়। মুখোমুখি বসে দুটো সেরা কথা নিতে চায়। অনলাইনের অ-শরীরী দুনিয়া আমাদের অনেক সুযোগ সুবিধা দিয়েছে, তবে মানুষের স্পর্শ সেটা তো আর সেখানে সম্ভব নয়। মেলায় গিয়ে মানুষে মানুষে ধাক্কা খাওয়ার ভেতরেও তৈরি হয় অনেক কথার। বইমেলা তখন আর লেখকের থাকে না, হয়ে ওঠে পাঠকদেরও। শেষ পর্যন্ত লেখক-প্রকাশকের জন্য তারাই তো লক্ষ্মী। তবে এত বড় মেলা আয়োজন ও আমাদের সমগ্র সৃজনশীল বইয়ের জগৎ নিয়ে ব্যর্থতাও কম নেই। গত বছর বস্তির মতোন ঘিঞ্জি পরিবেশ, ব্যাঙের ছাতার মতোন স্টল, অসম্পাদিত ও মানহীন বইপত্র দেখে খারাপই লেগেছে। কর্তৃপক্ষের উচিত, সময়ের সঙ্গে তাল রেখে বইমেলাকে আরও কীভাবে আকর্ষণীয় করা যায়, সেসব নিয়ে ভাবা। লেখক-পাঠক প্রতিবছর সবকিছু একই রকম দেখে হয়তো অভ্যস্ততার সঙ্গে বিরক্তও হয়ে গেছে। প্রতিবছর লেখক মঞ্চে দেখা যায়, দর্শকসারিতে হাতেগোনা কয়েকজন বসে আছেন। অথচ এই মঞ্চটাকে আরও জমজমাট করা যেত। বাড়ানো যেত তরুণ 

কবি-লেখকদের অংশগ্রহণ। এমনকি সঙ্গীত, নৃত্য ও নাটকের ব্যবস্থা থাকলেও মন্দ হয় না। মেলা উন্মুক্তই থাকুক। বই না কিনুক, তারপরও টিকিট কেটে প্রবেশ করানো হলে মানুষ হয়তো একদিন মেলায় আসবে। সপ্তাহে ১৫ দিন নয়। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রকৃত বইমেলাপ্রেমীরা। অনেকের বই কেনার সামর্থ্য না থাকলেও কবি-সাহিত্যিকদের দেখে, নতুন বই নেড়েচেড়ে যে আনন্দ পায়, তাকে ব্যবসার দোহাই দিয়ে সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত করার কোনো মানে হয় না।

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh