রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে

জাফর খান

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৪, ০২:৩৪ পিএম

পরমাণু অস্ত্র।

পরমাণু অস্ত্র।

মানব সভ্যতা বিধ্বংসকারী ভয়াবহ ঘটনার কথা বলা হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পরমাণু বোমা হামলার বিষয়টি উঠে আসবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আট দশক পরও পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলো বিভিন্ন সময়ে পরমাণু যুদ্ধের হুমকি দিয়ে আসছে। সম্প্রতি পশ্চিমা বিশ্বকে সতর্ক করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, তার দেশ পরমাণু যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনে সৈন্য পাঠায় তবে মস্কো সেটিকে যুদ্ধ উত্তেজনা বৃদ্ধি বলে বিবেচনা করবে।

পুতিনের এই হুমকির পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি তার হাতে থাকা পরমাণু অস্ত্রের ভাণ্ডার। বিশ্বের যে কটি দেশ পরমাণু অস্ত্রে সমৃদ্ধ তার মধ্যে রাশিয়া অন্যতম। তবে রাশিয়ার হাতে কী পরিমাণ পরমাণু অস্ত্র আছে এবং তা নিয়ন্ত্রণই বা করেন কে... 

পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার: উত্তরাধিকার সূত্রে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে পাওয়া পারমাণবিক অস্ত্র ভাণ্ডার বিবেচনায় রাশিয়া এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের (এফএএস) মতে, পুতিন সাড়ে ৫ হাজারেরও বেশি (৫৫৮০টি) পারমাণবিক ওয়ারহেড নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার ২০০টি অকার্যকর বা অবসরপ্রাপ্ত হলেও বেশিরভাগই এখনো অক্ষত। একই সঙ্গে চার হাজার ৩৮০টি দীর্ঘ পাল্লার স্ট্র্যাটেজিক লঞ্চার ও স্বল্প-পাল্লার ট্যাকটিক্যাল নিউক্লিয়ার ফোর্স রয়েছে অস্ত্রভাণ্ডারে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেড ছিল, আর যুক্তরাষ্ট্রের ছিল ৩০ হাজার।

কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহারের আশঙ্কা : ২০২০ সালে বেশ কিছু শর্ত দিয়ে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার বিধিমালা প্রকাশ করেছে। আর সেসব শর্তের আওতায় দেশটির প্রেসিডেন্ট যদি দেখেন তার দেশ হামলার শিকার হতে পারে বা পারমাণবিক বা অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের ফলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হুমকির মুখে- তখন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেবেন প্রেসিডেন্ট। 

রাশিয়া কি আরও পরমাণু অস্ত্র বানাবে : যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালে পারমাণবিক অস্ত্র ইস্যুতে একটি পর্যালোচনামূলক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, রাশিয়া ও চীন তাদের পারমাণবিক শক্তি সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণে কাজ করে যাচ্ছে। এফএএস ২০২৪-এর এক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, ‘রাশিয়ার পারমাণবিক বিবৃতি এবং হুমকিমূলক বক্তব্য উদ্বেগের বিষয়। ভবিষ্যতে রুশ কৌশলগত বাহিনীর জন্য বরাদ্দকৃত ওয়ারহেডের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণ একক ওয়ারহেড ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে মাল্টিপল ওয়ারহেড সজ্জিত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে।’ 

মস্কো কি পারমাণবিক পরীক্ষা চালাবে : প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করার কথা বিবেচনা করে তবে রাশিয়াও করবে। গত বছর তিনি সমন্বিত পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ চুক্তিতে (সিটিবিটি) রাশিয়ার অনুমোদন প্রত্যাহার করে একটি আইনে স্বাক্ষরও করেছিলেন। সোভিয়েত-পরবর্তী রাশিয়া কখনো পরমাণু পরীক্ষা চালায়নি। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর থেকে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সমিতির মতে, যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ ১৯৯২ সালে, চীন এবং ফ্রান্স ১৯৯৬ সালে, ভারত ও পাকিস্তান ১৯৯৮ সালে এবং উত্তর কোরিয়া ২০১৭ সালে পরীক্ষা চালিয়েছিল।

অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বশেষ পরীক্ষা চালিয়েছিল ১৯৯০ সালে। সিটিবিটি চুক্তিতে ১৯৯৬ সালে রাশিয়া স্বাক্ষর করে এবং ২০০০ সালে অনুমোদনও দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৬ সালে চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও এখনো এটিতে অনুমোদন দেয়নি।

হামলার আদেশ কার হাতে : রাশিয়ার আইনে পারমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা একমাত্র দেশটির প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে। তথাকথিত পারমাণবিক ব্রিফকেস বা ‘চেগেট’ সব সময়ই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকে। বর্তমান রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সের্গেই শোইগু এবং চিফ অব জেনারেল স্টাফ ভ্যালেরি গেরাসিমভের কাছেও এ জাতীয় ব্রিফকেস রয়েছে বলে মনে করা হয়।

মূলত এই ব্রিফকেস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সামরিক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের যোগাযোগের এক হাতিয়ার। এর মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে ‘কাজবেক’ ইলেকট্রনিক কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে রকেট বাহিনীর সঙ্গে সংযুক্ত করে। কাজবেক ‘কাভকাজ’ নামে আরেকটি সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। 

২০১৯ সালে রাশিয়ার একটি টেলিভিশন ফুটেজে দেখানো হয়েছিল চেগেটে থাকা ‘কমান্ড’ বিভাগের বোতামগুলো আসলে কী কাজ করে। আর এই ব্রিফকেসটি একটি বিশেষ ফ্ল্যাশকার্ড দ্বারা সক্রিয় করা হয়। যদি রাশিয়া মনে করে যে দেশটি পারমাণু হামলার সম্মুখীন হয়েছে, সে ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ব্রিফকেসের মাধ্যমে সাধারণ স্টাফ কমান্ড এবং পারমাণবিক কোড ধারণকারী রিজার্ভ কমান্ড ইউনিটগুলোর মাধ্যমে সরাসরি ‘লঞ্চ’ করার আদেশ পাঠাতে পারবেন। 

যদি পরমাণু হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হয় তবে পুতিন তার ‘ডেড হ্যান্ড’ ব্যবস্থা সক্রিয় করবেন। মূলত কম্পিউটারই ধ্বংসযজ্ঞ শুরুর সিদ্ধান্ত নেবে। একটি নিয়ন্ত্রণ রকেট রাশিয়ার বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার থেকে পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দেবে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh