বাংলা চলচ্চিত্রের ঊষালগ্নের নায়িকা শবনম

ফ্লোরা সরকার

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:৪৬ পিএম | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:৫৩ পিএম

শবনম। ছবি: সংগৃহীত

শবনম। ছবি: সংগৃহীত

আমাদের বাংলা চলচ্চিত্র ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট, ‘মুখ ও মুখোশ’-এর মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করার পর, ১৯৫৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার কর্তৃক এফডিসি (ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন) স্থাপন করা হয়। কার্যকরভাবে এফডিসির যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৮-৫৯ সালে।

মাত্র একটা স্টুডিও নিয়ে ১৯৫৯ সালে চারটা ছবি নির্মিত হয়-আকাশ আর মাটি, মাটির পাহাড়, জাগো হুয়া সাভেরা এবং এদেশ তোমার আমার। যে সময়ে এই ছবিগুলো নির্মিত হয়, আগেই বলেছি এফডিসিতে মাত্র একটা স্টুডিও ছিল, তার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬০ সালে বারি স্টুডিও (পূর্ব নাম ইস্টার্ন স্টুডিও), ঢাকা স্টুডিও এবং রোজ গার্ডেনের বেঙ্গল স্টুডিও স্থাপিত হয়। সেই সময়ে অর্থাৎ আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর সময়ে শুধু কারিগরি দিক দিয়েই আমাদের সিনেমা শিল্প অনুন্নত ছিল না, এই শিল্পের আনুষঙ্গিক বিষয় যেমন ডাবিং, মেকআপ, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রগ্রাহক, এডিটর, অভিনয় শিল্পী, সেট ইত্যাদি সবই খুব প্রাথমিক পর্যায় এবং নিম্নস্তরের ছিল। সিনেমা তৈরির বিশেষ কোনো দক্ষতা কারোর মধ্যেই সেভাবে গড়ে ওঠেনি। অথচ একই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেমন-আমেরিকা, ফ্রান্স, ইতালি, ব্রিটেন, জার্মানি, রাশিয়া ইত্যাদি দেশে সিনেমা নিয়ে রীতিমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে দিয়েছে। মূল ধারার পাশাপাশি অর্থাৎ কমার্শিয়াল মুভির পাশাপাশি এক্সপেরিমেন্টাল মুভি যেমন রিয়ালিজম, সুরিয়ালিজম, এক্সপ্রেশনিজম ইত্যাদি নানা প্রকারের সিনেমার আবির্ভাব ঘটে যাচ্ছে। আমেরিকান মিজ-অ-সিন বেশি ভালো নাকি রাশিয়ান পরিচালক আইজেনস্টাইনের মন্তাজ তত্ত্ব বেশি ভালো, সেসব নিয়ে রীতিমতো তর্ক চলছে। অথচ আমাদের এখানে চলচ্চিত্রের যাত্রা মাত্র শুরু করেছে। কোনোরকম পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া এই শিল্পের যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল। সেই সময়ের সেই দুর্যোগপূর্ণ চলচ্চিত্রের আবহাওয়ার মধ্যে যারা এই শিল্পে নিজেদের নিয়োজিত করেছিলেন অভিনেত্রী শবনম তাদের মধ্যে অন্যতম। সেই সময়ের বিখ্যাত পরিচালক এহতেশাম পরিচালিত ‘এদেশ তোমার আমার’ ছবিতে নৃত্যশিল্পী হিসাবে তার প্রথম আবির্ভাব। শবনম তার চলচ্চিত্র নাম, আসল নাম ঝর্ণা বসাক। জন্ম ১৭ আগস্ট, ১৯৪৬। শবনম যখন খুব ছোট প্রায় আট/দশ বছর বয়স, বাবা ননী বসাকের (একজন ফুটবল রেফারি ছিলেন) হাত ধরে বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নাচ শেখা শুরু করেন। নাচ শিখতে শিখতেই তিনি ‘এদেশ তোমার আমার’ ছবিতে নৃত্যশিল্পী হিসেবে সিনেমায় প্রথম পা রাখেন। তবে নৃত্যশিল্পী হিসেবে প্রথম ছবির পর, দ্বিতীয় ছবি ১৯৬০ সালে নির্মিত এবং এতেশাম পরিচালিত ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে আবার যখন নৃত্যশিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হন, ঠিক তখনই তার অভিনয় জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট এসে হাজির হয়। দর্শক ও নির্মাতারা তাকে এতটাই পছন্দ করে যে, সিনেমার পর্দায় শবনমকে সবাই লিড রোল বা প্রধান ভূমিকায় দেখতে চায়। শুরু হলো চলচ্চিত্রে শবনমের পথচলা। যে পথচলা তাকে, বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে কিংবদন্তি করে তোলে। সেই কিংবদন্তির সঙ্গে এই বছরের জানুয়ারি মাসের কোনো এক শীত-বিকেলে ওনার বারিধারার বাড়িতে সাক্ষাৎকার নিতে গেলাম।

প্রথম পরিচয়ের পরেই শবনম প্রথম যে কথাটা বললেন, ‘আমি সব সময়, লো-প্রোফাইলে থাকতে পছন্দ করি।’ কথাটা শুনে প্রথমে চমকে উঠলাম ঠিকই; কিন্তু খুব বেশি অবাক হইনি। কারণ তার কাছে পৌঁছাতে, আমাকে আরেকজনের সাহায্য নিতে হয়েছিল। আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাঈদা নাজনীন ফেরদৌসির (ফ্রিল্যান্স কমিউনিকেশন কনসালট্যান্ট) মাধ্যমে শবনমের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। নাজনীনের সহায়তা ছাড়া হয়তো এই সাক্ষাৎ সম্ভব হতো না। কারণ সেই লো-প্রোফাইল। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, এই আটাত্তর বছর বয়সেও কতটা তরুণী থেকে গেছেন। ধীর এবং গম্ভীর অথচ ভীষণ বিনয়ী, আন্তরিক ও সাবলীল। তার সিনেমা জীবনের অনেক গল্প বললেন এবং লক্ষ করেছি যখন বলছিলেন, কোনো রাখঢাক না রেখে, মন খুলে উদার হয়ে বলছিলেন। শবনমকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, নৃত্যশিল্পী থেকে কীভাবে অভিনয় শিল্পী হলেন? উত্তরটা ছিল চমৎকার, “নাচের সঙ্গে অভিনয় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নাচেও যেমন শরীর এবং মুখের এক্সপ্রেশন (অভিব্যক্তি) থাকে, অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তাই। কাজেই নৃত্যশিল্পী থেকে অভিনয়শিল্পীতে রূপান্তর হতে আমাকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।” জিজ্ঞেস করলাম, কখনো স্টার বা সেলিব্রিটি হওয়ার বাসনা কি ছিল? এই প্রশ্নের যে দীর্ঘ উত্তর পেলাম তাতে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। শবনম বললেন, “দেখো আমি কিন্তু সিনেমার কাছে যাইনি, বরং সিনেমাই আমার কাছে এসেছিল। পরিচালক এহতেশামের হাত ধরেই আমার চলচ্চিত্রে প্রথম আগমন। ওনার পরিচালিত ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে নাচের শিল্পী হিসেবে আমাকে দেখার পর, দর্শক এবং নির্মাতারা প্রচুর আগ্রহ দেখালেন নায়িকা হিসেবে দেখার জন্যে। তারপর পরিচালক মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন (১৯৬১)’ দিয়ে আমার নায়িকা পর্বের উত্থান শুরু হলো। এরপর আর আমাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। পরপর অনেক ছবি (কখনো আসেনি, চান্দা, তালাশ, নাচঘর, কাজওয়ান, আখেরি স্টেশন) করলাম। চান্দা তো রীতিমতো সুপার হিট করল। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত বাংলাসহ বিশেষ করে উর্দু ছবিতে আমার একচ্ছত্র অধিকার ছিল। প্রায় ২৩টা ছবি আমার ডায়মন্ড জুবিলি পেল। একজন বাঙালি নায়িকা হিসেবে সেই সময়ে বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানের জেবা, শামীম আরা, নিলোর মতো বাঘা বাঘা নায়িকার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা খুব কঠিন কাজ ছিল। অভিনয়কে মন দিয়ে ভালোবেসেছিলাম বলেই হয়তো সেই কঠিন কাজটা অতিক্রম করতে পেরেছিলাম এবং দর্শকরাও সে রকম আমাকে পছন্দ করেছিল।”

১৯৬৬ সালে, এই দেশের বিখ্যাত সুরকার ও সংগীত শিল্পী রবীন ঘোষের সঙ্গে শবনমের বিয়ে হয়। বিয়ে পরবর্তী অধ্যায় খুবই চমকপ্রদ। বিয়ের পর শবনম সিদ্ধান্ত নিলেন, আর সিনেমা করবেন না। এবার মন দিয়ে সংসার কাজ শুরু করবেন। শবনম সিনেমা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে কী হবে, সিনেমা তো ওনাকে ছাড়বে না। চারদিক থেকে সিনেমার ডাক আসতে থাকলে তিনি সোজা জানিয়ে দিলেন, তার পক্ষে আর সিনেমা করা সম্ভব না। কিছুতেই যখন নির্মাতারা শবনমকে ছাড়ছে না, তখন প্রায় নয় ভাইবোন পরিবেষ্টিত রবীন ঘোষের সংসারে শবনম নির্মাতাদের জানালেন, যদি তার শাশুড়ি এবং ভাশুর অনুমতি দেন, তাহলে আবার তার পক্ষে সিনেমা করা যেতে পারে। একটা সাংস্কৃতিক পরিবারে সিনেমায় ছেলের বউদের অভিনয় না করাটা অস্বাভাবিক। শাশুড়ির মত আগে থেকেই ছিল। পরিচালকরা যখন শবনমের ভাশুরের কাছে অনুমতি নিতে গেলেন, তিনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন। জানালেন, ঝর্ণা অবশ্যই সিনেমা করবে। সিনেমা-সংসার দুটোই একসঙ্গে করা যায়। শবনমকে শুধু কিছু উপদেশ দিলেন, “তুই অভিনয় কর। তবে এমন কোনো কাজ করবি না, যাতে পরিবারের বদনাম হয়। সিনেমাতে অশালীন কিছু করবি না তা হলেই হলো।” এই উপদেশ দেওয়ার কারণও ছিল। কারণ শবনমের ভাষায় সিনেমাতে তখন নোংরামির ছড়াছড়ি হচ্ছিল। তাছাড়া শবনমকে আবার ছবিতে নিয়ে আসার নেপথ্যে পরিচালক খান আতাউর রহমানের আবদানও ছিল যথেষ্ট। শুরু হলো, শবনমের চলচ্চিত্রে দ্বিতীয়বারের মতো পথচলা।

কিন্তু এই পথচলা তেমন মসৃণ ছিল না। কারণ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তান অনেক এগিয়ে ছিল। বাংলা ছবির চেয়ে উর্দু ছবির তখন ছড়াছড়ি। জেবা, শামীম আরার পাশাপাশি মোহাম্মদ আলী, ওয়াহিদ মুরাদ, নাদিমের মতো বিখ্যাত জনপ্রিয় নায়কেরা তখন সিনেমার পর্দা দখল করে আছে। তা ছাড়া সেই সময়ের পশ্চিম পাকিস্তানের সিনেমার বাজারও ছিল বিশাল। এই সময় শবনম সিদ্ধান্ত নিলেন বাংলা ছবির পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দু ছবিতে নিয়মিতভাবে অভিনয় করার। একজন বাঙালি অভিনেত্রী হিসেবে উর্দু ছবিতে স্থান করে নেওয়াটা সেই সময়ে তার জন্যে একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল, কিন্তু সাহসের সঙ্গে তিনি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করলেন। শুধু সংকট বাধল ভাষার ক্ষেত্রে। বাঙালি শবনম উর্দুতে তেমন পারদর্শী নন। অভিনয়ের জন্যে তিনি উর্দু শুধু শিখলেনই না, যাতে পড়তে এবং লিখতে পারা যায়, সেটাও শিখে নিলেন। একজন একনিষ্ঠ অভিনয় শিল্পী ছিলেন বলেই এসব চ্যালেঞ্জ তিনি অভিনয় করার জন্যে নিয়েছিলেন। সেই সময়ের বিখ্যাত পরিচালক সুরুর বারাবাংভির (আসল নাম সাঈদ সাইদুর রহমান) ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়মিতভাবে উর্দুতে কথোপকথন শুরু করলেন। এবং অল্পদিনের মধ্যেই উর্দু ভাষার আদ্যোপান্ত রপ্ত করে নিলেন।

লো-প্রোফাইলে থাকতেন বলে শবনম বরাবর সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। অথবা হাই-প্রোফাইলের রুপালি পর্দার ঝলমলে আলোয় থাকলেও, সাদামাটা জীবন পছন্দ করতেন বলেই হয়তো লো-প্রোফাইলে থাকাটা তার পছন্দ ছিল। কথায় কথায় দুটো খুব ইন্টারেস্টিং গল্প বললেন, যা তার লো-প্রোফাইলে থাকা জীবনযাপনকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। এক. যখন পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়মিত সিনেমার কাজ করছিলেন, সাধারণত স্টুডিওতে মেকআপ ছাড়াই তিনি যেতেন। একদিন এক নির্মাতা বা চলচ্চিত্র কর্মী শবনমকে বললেন, ‘আপনি মেকআপ ছাড়া কেন শুটিংয়ে আসেন? অন্যসব নায়িকা তো মেকআপ করে শুটিংয়ে আসে। মেকআপ করে আসলে আপনাকে আরও সুন্দর দেখাবে। পরিচালকদের আরও আকর্ষণ করতে পারবেন। অনেক নায়ক-নায়িকার আলাদা মেকআপ রুম আছে, আপনিও আপনার জন্যে আলাদা মেকআপ রুমের ব্যবস্থা করে  নেবেন।’ শবনম জানালেন, “ফিল্মের এসব খুঁটিনাটি আমি তখন কিছুই বুঝতাম না। ঘুম থেকে উঠে সোজা স্টুডিওতে চলে যেতাম। তখন আমি প্রতিদিন, সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা, আবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত কাজ করছি। গ্ল্যামার জগতে থেকেও গ্ল্যামার থেকে দূরে থাকতাম।” দুই. গ্ল্যামার থেকে তিনি যে কতটা দূরে থাকতেন সেটা আরও পরিষ্কার হলো, পরিচালক সুরুর বারাবাংভি পরিচালিত ‘আখেরি স্টেশন (১৯৬৪’ ছবির গল্প শুনতে যেয়ে। সেখানে একজন ভিখারির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এবং ইচ্ছে করেই তিনি এই চরিত্র করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। ছবিতে তার সঙ্গে একটা কুকুরকে সব সময় থাকতে দেখা যায়। তার সঙ্গে ঘুমায়। শুটিং শুরুর কিছুদিন আগে থেকে তিনি সেই কুকুরের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেললেন যাতে অভিনয়টা স্বাভাবিক দেখায়। মেকআপের প্রশ্নই আসে না, সারাদিন ধূলিকাদা মেখে বসে থাকতেন। কোনো গ্ল্যামারের তোয়াক্কা না করে, যারা এভাবে শিল্পী হতে পারে, আখেরে তারাই স্থায়ী শিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে টিকে যেতে পারে। শবনমের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছিল। 

পরিচালক শরীফ নায়ার পরিচালিত ‘দোস্তি (১৯৭১)’ ছবির আরেকটা সুন্দর গল্প আমরা পাই শবনমের কথোপকথন থেকে। যে গানটা আজও বিখ্যাত হয়ে আছে, সেই ‘চিঠি যারা সাইয়া দেকা নাম লিখ দে, হাল মেরে আচ্ছা নেহি তামাম লিখ দে’ গানের শুটিংয়ের সময় গানের জন্যে নাচের দৃশ্যে নৃত্যপরিচালক পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিচালকের মাথায় হাত। কী করবেন? শবনম ঝটপট বলে দিলেন, তিনিই নাচের কম্পোজ করে দিতে পারবেন এবং দিলেনও। শবনম জানালেন, ছবির চরিত্রের সঙ্গে এতটাই মিশে গিয়েছিলেন যে, নাচের কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে তার কোনো অসুবিধা হয়নি। প্রতিটা নায়কের সঙ্গে ওনার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তবু প্রশ্ন করলাম, নাদিম-শবনম জুটিকে তো মানুষ আজও মনে রেখেছে, এর কারণ কী? শবনম জানালেন, একসঙ্গে অভিনয় করতে করতে নাদিমের সঙ্গে একটা পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। নায়ক মোহাম্মদ আলী সম্পর্কে জানালেন, উনি খুবই সময়ানুবর্তী মানুষ ছিলেন। শুটিং এমন এক জায়গা, যেখানে সময়মতো কোনোকিছু করা যায় না। বিশেষ করে, বর্তমান টিভি এবং সিনেমার স্থূল নায়ক-নায়িকারা শুটিংয়ে দেরি করে আসাটা খুব সম্মানজনক মনে করেন। কিন্তু মোহাম্মদ আলী নায়কের মতো নায়ক ছিলেন বলেই সময় সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। নায়ক ওয়াহিদ মুরাদ সম্পর্কে শবনম জানালেন, খুব বাস্তববাদী এবং ট্যালেন্টেড ছিলেন। ইংরেজিতে পিএইচডি করা নায়ক। কখনো ভারতীয় ছবির অফার ছিল কিনা জানতে চাইলে শবনম জানালেন, একটা ছবির অফার তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। কারণ জানতে চাইলে শবনম জানালেন, ভারতীয়রা অন্য দেশের অভিনয় শিল্পীদের দিয়ে অভিনয় করালেও সিনেমার গল্পে শেষ পর্যন্ত তাদের দেশের অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্রাধান্য থাকে বেশি। কারণ এর আগে জেবা-মোহাম্মদ আলী ভারতীয় ছবিতে অভিনয় করেছিলেন, শুটিংও হয়েছিল বিস্তর, কিন্তু সিনেমা রিলিজ পাওয়ার পর তারা দেখলেন, গল্পে তাদের প্রাধান্য নেই বললেই চলে। তবে আমাদের মতে, শবনম তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে একাই একশ ছিলেন, তাকে অন্য কোথাও তাই যেতে হয়নি। 

চট্টগ্রামের রাজা ত্রিদিব রায় একবার, শবনমকে বলেছিলেন, সংখ্যালঘু হিসেবে (অর্থাৎ বাঙালি এবং হিন্দু) আপনি তো খুব ভালোভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এই সংখ্যালঘু প্রসঙ্গে শবনম একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জানালেন। সময়টা ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর শাসনকাল। ভুট্টোর একটা অনুষ্ঠানে শবনমকে নিমন্ত্রণ করা হয়। শবনমকে সেখানে সংখ্যালঘু নিয়ে কিছু কথা বলতে হবে। উক্ত অনুষ্ঠানে সংখ্যালঘু নিয়ে শবনম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেছিলেন, যে কথা পরদিন পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিটা দৈনিক পত্রিকায় শিরোনাম হিসেবে আসে। শবনম জানালেন, “আমি বলেছিলাম, এই দেশে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য, ধর্মের কোনো প্রয়োজন নেই, and I am the living example।” শবনমের এই কথাটি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আমরা যত দিন যাচ্ছে ততই উপলব্ধি করছি।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, যখন বাংলাদেশ নামের দেশটার জন্ম হলো, তখনো শবনম পাকিস্তানে ছবির কাজে ব্যস্ত। অনেকবার তিনি তার জন্মভূমিতে আসতে চাইলেও সেখানকার সরকার ও নির্মাতারা ভয়ে এনওসি দিতে চাইতেন না, কারণ শবনমের মতো এমন উঁচু মাপের শিল্পীকে না তারা আবার হারিয়ে ফেলেন; কিন্তু উনি এর মধ্যেই যাওয়া-আসার মধ্যেই থেকেছেন। কিছুদিন লন্ডনে বসবাস করলেও ১৯৯৭ সালে সিনেমা জগৎ থেকে চিরবিদায় নিয়ে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে চলে আসেন। এখানে আসলেও সিনেমা তাকে ছাড়েনি। ১৯৯৯ সালে কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘আম্মাজান’ ছবিতে অভিনয় করেন এবং বলাই বাহুল্য ছবিটি সেই সময়ে খুব ভালো হিট করেছিল। স্বামী রবীন ঘোষ ২০১৩ সালে মৃত্যুবরণ করার পর কিছুটা একা হয়ে পড়েন। শ্বশুরবাড়ির অনেকে গত হলেও একজন ননদ এখনো বেঁচে আছেন এবং তার সঙ্গেই যোগাযোগ থাকে বেশি। এক ছেলে লন্ডনে ব্যবসা করেন এবং মাঝে মাঝে ঢাকায় আসেন। একমাত্র বোন বর্তমানে কলকাতায় থাকেন। সবশেষে একটা একান্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলাম, এই যে এখন একা থাকেন খারাপ লাগে কিনা। উত্তরে মৃদু হেসে শবনম দুর্দান্ত উত্তর দিলেন, ‘দেখো, আমি যখন সিনেমায় কাজ করতাম, তখন খুব ভালোভাবেই জানতাম, একদিন আমাকে এই সিনেমা জগৎ থেকে বিদায় নিতেই হবে। নিজেকে আমি সেভাবে প্রস্তুত করে রেখেছিলাম। তাছাড়া সিনেমাকে তো অনেক দিয়েছি। এখন নিজেকে না হয় একটু সময় দেই। নিজের সংসার, শ্বশুরবাড়ির মানুষজন এদের নিয়ে না হয় একটু থাকি।’

শবনম যেমন সিনেমাকে দিয়েছেন, সিনেমাও তাকে দিয়েছে অনেককিছু। সুনাম, জনপ্রিয়তা আর সম্মানই শুধু পাননি, পাকিস্তানের ‘নিগার অ্যাওয়ার্ড’ যা, পাকিস্তানের একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড নামে সুপরিচিত এবং বিখ্যাত, সেই অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন একবার বা দুইবার নয়, তেরোবার। প্রায় দেড়শ ছবির এই মহানায়িকা বাংলা এবং উর্দু ছবি দাপিয়ে বেরিয়েছেন দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে। ২০১৯ সালে, পাকিস্তানের ‘লাক্স স্টাইল অ্যাওয়ার্ড’ অনুষ্ঠানে তাকে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দিয়ে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়। শিল্পকর্ম এত সহজ কাজ নয়। প্রচুর ত্যাগস্বীকার করতে না পারলে, শিল্পী হওয়া যায়, কিন্তু শিল্পীর মতো শিল্পী হওয়া যায় না। বিশেষ করে, শবনমের মতো শিল্পী যিনি, আমাদের সিনেমা শিল্পের শুরুর সময়ের সমস্যাসংকুল পরিস্থিতিতে যেভাবে অভিনয়ের হাল ধরেছিলেন, এই শিল্পকে দাঁড় করানোর জন্যে যে কষ্টগুলো তাকে অতিক্রম করতে হয়েছিল, সেই মহানায়িকা শবনম নিজেকে যতই লো-প্রোফাইলে রাখুন না কেন, চিরদিন তিনি আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হাই-প্রোফাইলে থাকবেন।

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh